সাকিবুর রহমান বাবলা
পৃথিবী শুধু জীবজগতের আবাসভূমি নয়; জীবনের পাশাপাশি রয়েছে এক বিশাল অজীব জগৎ-শিলা, খনিজ, মাটি, জীবাশ্ম, নদী, পাহাড়, উপত্যকা, গুহা, উপকূল ও নানা ভূ-প্রাকৃতিক গঠন। এসব অজীব উপাদান এবং তাদের বৈচিত্র্য ও পারস্পরিক সম্পর্ককে বলা হয় ভূ-বৈচিত্র্য। জীববৈচিত্র্যের ভিত্তি থেকে শুরু করে মানুষের খাদ্য, পানি, আবাসন, শিল্প, প্রযুক্তি ও সভ্যতার বিকাশ-সবকিছুর সঙ্গেই ভূ-বৈচিত্র্যের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।
৬ অক্টোবর আন্তর্জাতিক ভূ-বৈচিত্র্য দিবস। ইউনেস্কোর ৪১তম সাধারণ সম্মেলনে ২০২১ সালে দিবসটি ঘোষণা করা হয় এবং ২০২২ সালের ৬ অক্টোবর প্রথমবার আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি পালিত হয়। ভূ-বৈচিত্র্যের গুরুত্ব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি, এর সংরক্ষণ, টেকসই ব্যবহার এবং ভূবিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞানকে মানবকল্যাণে কাজে লাগানোই দিবসটির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য-‘আমাদের দোরগোড়ায় ভূ-বৈচিত্র্য’। প্রতিপাদ্যটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভূ-বৈচিত্র্য কোনো দূরবর্তী বা দুর্বোধ্য বিষয় নয়। আমরা যে মাটিতে দাঁড়াই, যে পানি ব্যবহার করি, যে নদী ও পাহাড় দেখি, যে শিলা ও খনিজ দিয়ে ঘরবাড়ি-সড়ক নির্মাণ করি-সবই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ভূ-বৈচিত্র্যের অংশ। প্রতিপাদ্যটি আমাদের নিজস্ব এলাকার ভূ-প্রকৃতি নতুন করে চিনতে ও সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করে।
ভূ-বৈচিত্র্যের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। শিলা ও ভূতাত্ত্বিক স্তর ভূগর্ভস্থ পানি ধারণ, প্রবাহ ও প্রাকৃতিক পরিশোধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিলার ক্ষয় ও পরিবর্তনের মাধ্যমে মাটি গঠিত হয়, আর মাটিই কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের প্রধান ভিত্তি। খনিজ ও শিলা আধুনিক সভ্যতার শিল্প, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর অপরিহার্য কাঁচামাল। ফলে মানবকল্যাণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নও ভূতাত্ত্বিক সম্পদের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল।
দুর্যোগ মোকাবিলাতেও ভূ-বৈচিত্র্যের জ্ঞান অপরিহার্য। ভূমিকম্প, ভূমিধস, বন্যা, সুনামি ও আগ্নেয়গিরির মতো ভূ-প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া বোঝার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা এবং ভূমি ব্যবহার ও অবকাঠামো পরিকল্পনা করা সম্ভব। বাঁধ, সড়ক, সেতু, সুড়ঙ্গ, ভবন, বন্দর ও পাইপলাইন নির্মাণেও ভূবৈজ্ঞানিক জ্ঞান নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে; অত্যন্ত নগরায়িত ও ডিজিটাল এই পৃথিবীতে আমরা হয়তো ভূবৈচিত্র্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি বলে মনে করতে পারি।
অতীতের শিলা, পলি ও জীবাশ্ম পৃথিবীর দীর্ঘ ইতিহাস এবং অতীত জলবায়ুর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জলবায়ু পরিবর্তনের অতীত ধারা বুঝতে পারেন এবং ভবিষ্যতের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণে সহায়তা পান। একই সঙ্গে পাহাড়, গুহা, উপকূল ও অনন্য ভূদৃশ্য ভূ-পর্যটনের ভিত্তি তৈরি করে; যা স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গেও যুক্ত।
বাংলাদেশের ভূ-বৈচিত্র্যও বিশেষভাবে সমৃদ্ধ। নদীবাহিত পলিতে গড়ে ওঠা বিস্তীর্ণ বদ্বীপ ও প্লাবনভূমির পাশাপাশি রয়েছে বরেন্দ্র ও মধুপুরের সোপানভূমি, সিলেটের টিলা-পাহাড়, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল এবং দক্ষিণে বিস্তীর্ণ উপকূল ও সুন্দরবন। নদী, পলি, মাটি, পাহাড়, উপকূল ও ম্যানগ্রোভ ভূ-প্রকৃতির এই বৈচিত্র্য বাংলাদেশের প্রকৃতি ও মানুষের জীবনকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।
কিন্তু নদীভাঙন, পলি সঞ্চয়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পাহাড় কাটা, জলাভূমি ও বনভূমির পরিবর্তন, উপকূলীয় লবণাক্ততা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি ক্রমাগত চাপের মুখে পড়ছে। এর প্রভাব কৃষি, পানি, জীববৈচিত্র্য, বসতি ও মানুষের জীবিকার ওপর পড়ছে। বাংলাদেশের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় ভূমিকম্পের ঝুঁকিও ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ; তাই ভূবৈজ্ঞানিক গবেষণা ও ঝুঁকি-সচেতন ভূমি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
ভূ-বৈচিত্র্য সম্পর্কে প্রকৃত শিক্ষা কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। ভূবিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব ও ভূগোলের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের গবেষণা, ফিল্ডওয়ার্ক, জিআইএস, রিমোট সেন্সিং ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভূ-পৃষ্ঠের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং দুর্যোগের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ বিষয়ে আধুনিক গবেষণা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পৃথিবীর পরিবর্তনশীল পরিবেশ বুঝতে সহায়তা করতে পারে। সুইজারল্যান্ড ইটিএইচ জুরিখ গবেষণার বিশ্বের মানদন্ডে ভূবিজ্ঞান এবং ভূতত্ত্ব শিক্ষার জন্য সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা হয়।
ভূ-বৈচিত্র্য তাই কেবল পাথর, মাটি বা পাহাড়ের বৈচিত্র্য নয়; এটি পৃথিবীর সৃষ্টি ও বিবর্তনের নীরব দলিল, জীববৈচিত্র্যের ভিত্তি এবং মানবসভ্যতার অন্যতম অবলম্বন। একটি শিলা কিংবা জীবাশ্মের মধ্যেও লুকিয়ে থাকতে পারে পৃথিবীর কোটি বছরের ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে জানা, সম্পদকে বিচক্ষণভাবে ব্যবহার করা এবং ভূ-প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করাই টেকসই ভবিষ্যতের অন্যতম শর্ত।
‘আমাদের দোরগোড়ায় ভূ-বৈচিত্র্য’-২০২৬ সালের এই আহ্বান তাই চারপাশের মাটি, নদী, পাহাড়, উপকূল ও ভূদৃশ্যকে নতুন চোখে দেখার আহ্বান। কারণ পৃথিবীর ভূ-বৈচিত্র্য শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; এটি আমাদের বর্তমান জীবনের ভিত্তি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন।