দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের পদক্ষেপ জরুরী
মিনাক্ষী শীল
রাজধানীর কাফরুল, কলেজ গেট ও চিটাগাং রোডে শুক্রবার রাতে তিনটি বাসে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। ওদিকে যাত্রাবাড়ি, মালিবাগ, মগবাজার, রামপুরা, আগারগাঁও, মহাখালি ও বাবুবাজারে ককটেল ও হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে দুষ্কৃতকারীরা। শুক্রবার দুপুর থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত এসব ককটেল হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটে বলে পুলিশ জানিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা বাড়ছে, যাতে মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও শংকা দেখা দিয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলার এহেন অবনতি পুলিশের শোচনীয় ব্যর্থতার নামান্তর। অর্ন্তর্বতী সরকারের সময় পুলিশের অনুপস্থিতি বা অপারগতা সাধারণ বাস্তবতা হিসাবে দেখা দিয়েছিল। তখনো এ ধরনের সন্ত্রাস ও নাশকতার ঘটনা ঘটেনি। এখন বিপুল ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার ক্ষমতায়।
ছয় মাসের অধিক সময় সরকার ক্ষমতাসীন অথচ এই সময়ে নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি ছাড়া উন্নতি হয়নি। পুলিশ আগের মতো নিরাপত্তার সংকটে নেই, ট্রমায় নেই। প্রশ্ন ওঠে, তারপরও আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হচ্ছে না কেন? এই ছয় মাসে সারাদেশে খুন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, ছিনতাই, রাহাজানি, ডাকাতি ইত্যাদি অপরাধ উদ্বেগজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনো কোনো অপরাধের সঙ্গে আগের মতো পুলিশের সংশ্লিষ্টতাও লক্ষ্য করা গেছে। পুলিশের বিপুল সংখ্যক সদস্য ও অফিসার পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত। যোগ্যতা যাই থাক, তারা মূলত রাজনৈতিক বিবেচনায় মনোনীত। ফলে প্রত্যাখ্যাত রাজনীতি ও নিষিদ্ধ দলের প্রতি এখনো তাদের আনুগত্য রয়েছে বলেই ধারণা করা যায়।
স্বভাবতঃই এ ধরনের পুলিশের কাছ থেকে সরকার যথাযথ দায়িত্বশীলতা ও সহযোগিতা পাচ্ছেনা। এমতাবস্থায় পুলিশের খোলনোলচে পাল্টে পুনর্গঠিত করা ছাড়া উপায় নেই বলে মনে করে ওয়াকিবহাল মহল। আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনো সরকারের সফলতা ও জনপ্রিয়তা প্রমাণিত হয়না। বর্তমান নির্বাচিত সরকারের ক্ষেত্রেও এটা সমানভাবে প্রযোজ্য। সঙ্গত কারণেই ফ্যাসিস্ট সরকার এবং নিষিদ্ধ দলের সদস্য ও গু-াপা-ারা বর্তমান সরকার সফল হোক, তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাক, তা চায় না। তাদের ভারতীয় প্রভুরাও চায় না। শুরু থেকেই তাই তারা সরকারকে ব্যর্থ ও অসফল করার জন্য অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক খবরে জানা গেছে, বিএনপি সরকারের ২১০দিনে ৩৭১ বার দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। ঝটিকা মিছিল, ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তারা আতংক সৃষ্টি করছে। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কতদূর যেতে পারে, তার প্রমাণ রয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তাদের আচরণ ও কর্মের মধ্যে। বর্তমান সরকারকে একদিনের জন্যও পতিত ফ্যাসিস্টরা শান্তিতে থাকতে দেবেনা, তাদের অরাজকতা সৃষ্টির লাগাতার চেষ্টাই তার সাক্ষ্য বহন করে। এখনো প্রশাসনে, পুলিশে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে আওয়ামীপন্থীদের অবস্থান প্রায় অটুট রয়েছে। ফ্যাসিস্টরা নাশকতা ও অরাজকতা সৃষ্টির কাজে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা নিতে পারে এবং পেতেও পারে। ইতোমধ্যে কিছু ঘটনায় এ ধরনের আলামত লক্ষ্য করা গেছে।
সম্প্রতি পুলিশের একজন ওসি বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ আবার ফিরবে, আওয়ামী লীগ এলে কিছুই হবে না। সব ঠিক হয়ে যাবে। ডিসেম্বরে দেরি হয়ে গেছে, এই মাসেই শেখ হাসিনার আসা উচিৎ ছিল। শেখ হাসিনা ফিরলে পুলিশ কিছুই করতে পারবেনা।’ এই যদি পুলিশ নামধারীদের মাইন্ডসেট হয়, তবে তাদের কাছ থেকে কী আশা করা যায়! এ রকম আওয়ামী-অন্ধ পুলিশের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া যায়, তা ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের ঠিক করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা, নাগরিক নিরাপত্তা, শান্তি-স্থিতি ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পুলিশের অনিবার্য ও অগ্রবর্তী ভূমিকার কথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখেনা। পুলিশকে দেশবান্ধব, নাগরিকবান্ধব, সৎ, ন্যায়নিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল হওয়া বাধ্যতামূলক। পুলিশের ভাবমর্যাদা ও সম্মান যথেষ্ট বিনষ্ট হয়েছে। এখন সেই ভাবমর্যাদা ও সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।
সরকারকে এদিকে গুরুত্বের সঙ্গে নজর দিতে হবে। দুঃখজনক হলেও একটি প্রসঙ্গ এখানে বিশেষভাবে স্মরণ করতে হচ্ছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় জঙ্গী কার্ড খেলার ক্ষেত্রে পুলিশকে যথেচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে। মসজিদ, মাদরাসায় জঙ্গী খোঁজা হতো এবং পাওয়াও যেতো। টুপি-দাঁড়িওয়ালা মানুষ, কোরআন-কেতাব পড়া শিক্ষার্থী, আলেম-ওলামা জঙ্গী হিসাবে চিহ্নিত হতো। তাদের অনেককে হত্যা করা হতো, অনেককে অপরিসীম নির্যাতন-নিপীড়ন শিকারে পরিণত করা হতো। ওই সময় এ ধরনের ঘটনা ছিল খুবই স্বাভাবিক। পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়েছে, ঘটনাগুলোর বেশির ভাগই ছিল সাজানো, পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যমূলক। দেশ মৌলবাদী বা জঙ্গীরাষ্ট্র হয়ে যাচ্ছে, তার প্রমাণ হিসাবে ঘটনাগুলো ঘটানো হতো।
সম্প্রতি রাজধানীতে ঘটা এরকম একটি ঘটনার খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এখানেও মসজিদকেই নিশানা করা হয়েছে। তেজগাঁওয়ের ওই মসজিদ থেকে জঙ্গী বা উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য সন্দেহে ২৩ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পুলিশের বক্তব্য মতে, শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর তারা বৈঠক করছিল। গোপনসূত্রে খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে হানা দিয়ে তাদের গ্রেফতার করে। আসলেই তারা উগ্রবাদী বা জঙ্গী কিনা, পুলিশ এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি।
বিষয়টি বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কাজেই তার অনুপুংখ তদন্ত হতে হবে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, ফ্যাসিস্টরা এবং তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা ভারত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই বাংলাদেশে উগ্রবাদী ইসলামের জয় হয়েছে বলে প্রচার করে আসছে। ভারতীয় গণমাধ্যম ও পত্র-পত্রিকায় বাংলাদেশ মৌলবাদী বা জঙ্গীরাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে বলে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। এখানে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দুদের কোনো নিরাপত্তা নেই, তারা নানা ভাবে অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হচ্ছে ইত্যাদি ধরনের মিথ্যাচার করছে। সরকারকে এব্যাপারে সতর্ক ও সাবধান হতে হবে। জঙ্গী আটকের খেলা বন্ধ করতে হবে। জজমিয়ার নাটক এদেশে কেউ আর দেখতে চায়না। আশার কথা, এ দেশের মানুষ উগ্রবাদী ও জঙ্গী নয়।
দেশের পীর-মাশায়েখ, আলেম-ওলামা অতীতের আওলিয়া-দরবেশদের উত্তরাধিকারী ও অনুসারী। সাধারণ মানুষও মানবিক, সহনশীল, সহৃদয়। বাংলাদেশের মৌলবাদী বা জঙ্গীরাষ্ট্র হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। সরকার মৌলবাদী বা জঙ্গীরাষ্ট্র চায়না। জাতীয় সংসদে যে স্ট্রংবিরোধী দল রয়েছে, তারাও চায়না। ইসলামে উগ্রবাদ, মৌলবাদ বা জঙ্গীবাদের কোনো স্থান নেই। সুতরাং এ বিষয়ে সকল অপপ্রচার সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশকে লিবারেল মুসলিম দেশ এবং তার উন্নতি-সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাকে সহযোগিতা করা মানে দেশকে এগিয়ে নেয়া। কোনো কারণেই যেন তার এ মিশন ব্যাহত না হয়, আমাদের সকলকে তা নিশ্চিত করতে হবে।
মিনাক্ষী শীল সাবেক শিক্ষার্থী খানজাহান আলী মহাবিদ্যালয়, সমাজকর্ম বিভাগ, খুলনা






