সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩
সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

পাইকগাছায় মাল্টা চাষে সফল উদ্যোক্তা জিয়া বিশ্বাস

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:৩৪ অপরাহ্ণ
পাইকগাছায় মাল্টা চাষে সফল উদ্যোক্তা জিয়া বিশ্বাস

প্রকাশ ঘোষ বিধান, পাইকগাছা (খুলনা): খুলনার পাইকগাছায় মাল্টা চাষে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে জিয়া বিশ্বাসের অবদান স্থানীয় কৃষিতে এক দারুণ অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেছে। তিনি উপকূলীয় অঞ্চলের প্রতিকূল লবণাক্ত আবহাওয়া ও মাটিকে জয় করে বাণিজ্যিকভাবে মাল্টা আবাদ করে সাফল্য লাভ করেছেন।

সাধারণত পাইকগাছা অঞ্চলের মাটিতে লবণাক্ততার কারণে ঐতিহ্যগত ফসলের বাইরে ভিন্ন কিছু চাষ করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। তবে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করে তিনি এই অসাধ্য সাধন করেছেন।

খুলনার পাইকগাছা উপজেলার গদাইপুর ইউনিয়ানের মটবাটি গ্রামের সভ্রান্ত ও ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান জিয়া উদ্দিন বিশ্বাস। তিনি সাবেক ব্যাংকার, সৌখিন ও রুচিশীল মানুষ হিসাবে এলাকায় পরিচিত। তিনি সখের বসে মালটা বাগান করলেও পরবর্তীতে বাণিজ্যিকভাবে রুপ নিয়েছে।

জানাগেছে, মটবাটি বাড়ির পাশে নিজের পাঁচ বিঘা জমিতে মালটা বাগান তৈরি করেছেনে। বাগানে ৭শত একটি মালটা গাছ রয়েছে। মালটা বাগান দেখাশুনা ও পরিচর্যা করেন আর এক সফল কৃষক লুৎফর রহমান সানা (লুতু)। প্রথম দিকে বিপনন ব্যাবস্থা ভালো থাকায় আশানারুপ লাভ হয়নি। তবে বিগত বছর থেকে বাগানের মালটা বিক্রি করে আশানারুপ লাভ হচ্ছে। বাগানের প্রতিটা গাছে মালটায় ভরে আছে। মালটার ভরে গাছের ডাল মাটিতে নুয়ে পড়েছে। চলতি মৌসুমে মালটা বাগানের ফল প্রায় ৭লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে এবছর মালটার ব্যাপক চাহিদা ও মূল্য বেশি থাকায় ব্যাবসায়ীরা ক্রয়কৃত বাগানের মালটা প্রায় ১৫ লাখ টাকা বিক্রি হবে বলে তার জানিয়েছে।

বাংলাদেশের আবহাওয়া উপযোগী উচ্চ ফলনশীল ও খরাসহিষ্ণু বারি মাল্টা-১ জাতটি চাষের জন্য বেছে নেওয়া হয়। এই জাতের মাল্টা আকারে বড়, রসালো এবং অত্যন্ত সুস্বাদু হয়ে থাকে। লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা এড়াতে উঁচু জমি বা নিপুণভাবে ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরি করে বেলে-দোআঁশ মাটিতে মাল্টা চাষ করা হয়। সঠিক পরিমাণে গোবর সার, ইউরিয়া, টিএসপি এবং পটাশ সার ব্যবহার করে গাছের পুষ্টি নিশ্চিত করা হয়।

মাল্টা চাষ একটি অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা। একবার গাছ বড় হয়ে ফল দেওয়া শুরু করলে দীর্ঘ কয়েক বছর পর্যন্ত সেখান থেকে নিয়মিত ফলন পাওয়া যায়, যা স্থানীয় বেকারত্ব দূরীকরণে ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে।

জিয়া বিশ্বাসের এই উদ্যোগ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে এখন পাইকগাছার আরও অনেক তরুণ ও কৃষক ঐতিহ্যবাহী চাষাবাদের পাশাপাশি মালটা ফল চাষের দিকে ঝুঁকছেন।

Ads small one

সাতক্ষীরার মেয়ে প্রজ্ঞার প্রকৌশল প্রতিযোগিতায় বিশ্বজয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:০৬ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরার মেয়ে প্রজ্ঞার প্রকৌশল প্রতিযোগিতায় বিশ্বজয়
আসাদুজ্জামান সরদার: সাতক্ষীরার কৃতি সন্তান, মেধা ও মননে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী শিক্ষার্থী প্রজ্ঞা পারমিতা রহমান বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন। প্রজ্ঞার এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছেন তাঁর মা-সাতক্ষীরা জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুন নাহার। যিনি নিজে একজন সফল সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে সমাজসেবায় অবদান রাখার পাশাপাশি প্রজ্ঞাকে গড়ে তুলেছেন একজন অল-রাউন্ডার হিসেবে। মা নাজমুন নাহারের সার্বিক দিকনির্দেশনা ও অনুপ্রেরণায় ছোটবেলা থেকেই একের পর এক সাফল্য অর্জন করা এই ‘সাতক্ষীরার মেয়ে’ এবার জয় করেছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রকৌশল সংগঠন ASHRAE-এর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অসাধারণ সাফল্য অর্জন করে বিশ্বমঞ্চে বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছেন প্রজ্ঞা। আন্তর্জাতিক এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়ে তিনি বর্তমানে মিশরের রাজধানী কায়রোতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে (সিআরসি) অংশগ্রহণ করছেন। গত ১ থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে বিশ্বের খ্যাতনামা প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে প্রজ্ঞা পারমিতা রহমানের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা ক্রেস্ট ও সার্টিফিকেট তুলে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী এবং বুয়েট অটোমোবাইল ক্লাবের প্রেসিডেন্ট প্রজ্ঞার এই অনন্য সম্মাননা অর্জন পুরো সাতক্ষীরাবাসী তথা পুরো দেশের জন্য এক অভাবনীয় গর্বের বিষয়।
প্রতিযোগিতার কঠিন বাছাই প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে প্রজ্ঞার মা জানান, প্রায় দুই মাস আগে ASHRAE-এর আন্তর্জাতিক বিজ্ঞপ্তির পর সারা বিশ্বের হাজারো শিক্ষার্থী আবেদন করেন। অত্যন্ত কঠোর ও সুনির্দিষ্ট নথিপত্র যাচাই-বাছাই এবং একাধিক ধাপের সাক্ষাৎকার শেষে বিশ্বজুড়ে মাত্র তিনজনকে চূড়ান্ত বিজয়ী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। এই ৩ জনের মধ্যে ২ জনই বাংলাদেশের বুয়েটের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী (প্রজ্ঞা পারমিতা রহমান ও আফতাব) এবং অপরজন দুবাইয়ের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বিজয়ী হওয়ায় আয়োজক সংস্থা ASHRAE প্রজ্ঞার বিমান ভাড়া, ভিসা, থাকা-খাওয়াসহ যাবতীয় খরচ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বহন করেছে।
সাতক্ষীরার সন্তান প্রজ্ঞার এই বিশ্বজয়ের পেছনে রয়েছে তাঁর শৈশব থেকেই অল-রাউন্ডার হয়ে ওঠার গল্প। প্রজ্ঞা সাতক্ষীরা কিন্ডার গার্টেন, সাতক্ষীরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে শিক্ষা শেষ করে বুয়েটে সুযোগ পান। এসএসসিতে জিপিএ-৫ সহ জেলার সর্বোচ্চ নম্বর অর্জনকারী প্রজ্ঞা ছোটবেলা থেকেই পড়ালেখার পাশাপাশি সংস্কৃতি ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে ছিলেন ঈর্ষণীয়ভাবে সফল।
তিনি জাতীয় শিশু পুরস্কারসহ চার-পাঁচটি জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছেন। ছিলেন সাতক্ষীরা বিতর্ক দলের ক্যাপ্টেন; ২০২১ সালে বিভাগীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় তাঁর দল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি তিনি টানা ৭টি বিতর্কেই ‘শ্রেষ্ঠ বক্তা’ হন। এছাড়া তিনি চ্যানেল আই-এর ‘স্বর্ণকিশোরী’ হিসেবে খুলনা বিভাগের প্রধান ছিলেন এবং দীর্ঘদিন বিডিনিউজ২৪ ডটকমের হ্যালোর শিশু সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রজ্ঞার বাবা আলহাজ্জ মো. সাহিদুর রহমান সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কর্মার্স ব্যাংকের খুলনা শাখার ম্যানেজার ও সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট।
মেয়ের এই আন্তর্জাতিক অর্জনে আবেগপ্লুত মা নাজমুন নাহার অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, প্রজ্ঞা শুধু আমার মেয়ে নয়, সে সাতক্ষীরার মেয়ে, পুরো বাংলাদেশের মেয়ে। একজন মা হিসেবে ওর এই বিশ্বজয়ের আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। ছোটবেলা থেকেই প্রজ্ঞাকে সময় দেওয়ার পাশাপাশি ওর মেধা বিকাশে সবসময় পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনে ও যেন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে মর্যাদার সাথে তুলে ধরতে পারে এবং ভবিষ্যতে দেশের জন্য বড় অবদান রাখতে পারে-এই জন্য আমি দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই।

আন্তর্জাতিক ভূ-বৈচিত্র্য দিবস: আমাদের দোরগোড়ায় ভূ-প্রকৃতির বিস্ময়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৩৪ অপরাহ্ণ
আন্তর্জাতিক ভূ-বৈচিত্র্য দিবস: আমাদের দোরগোড়ায় ভূ-প্রকৃতির বিস্ময়

সাকিবুর রহমান বাবলা

পৃথিবী শুধু জীবজগতের আবাসভূমি নয়; জীবনের পাশাপাশি রয়েছে এক বিশাল অজীব জগৎ-শিলা, খনিজ, মাটি, জীবাশ্ম, নদী, পাহাড়, উপত্যকা, গুহা, উপকূল ও নানা ভূ-প্রাকৃতিক গঠন। এসব অজীব উপাদান এবং তাদের বৈচিত্র্য ও পারস্পরিক সম্পর্ককে বলা হয় ভূ-বৈচিত্র্য। জীববৈচিত্র্যের ভিত্তি থেকে শুরু করে মানুষের খাদ্য, পানি, আবাসন, শিল্প, প্রযুক্তি ও সভ্যতার বিকাশ-সবকিছুর সঙ্গেই ভূ-বৈচিত্র্যের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।

৬ অক্টোবর আন্তর্জাতিক ভূ-বৈচিত্র্য দিবস। ইউনেস্কোর ৪১তম সাধারণ সম্মেলনে ২০২১ সালে দিবসটি ঘোষণা করা হয় এবং ২০২২ সালের ৬ অক্টোবর প্রথমবার আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি পালিত হয়। ভূ-বৈচিত্র্যের গুরুত্ব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি, এর সংরক্ষণ, টেকসই ব্যবহার এবং ভূবিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞানকে মানবকল্যাণে কাজে লাগানোই দিবসটির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য-‘আমাদের দোরগোড়ায় ভূ-বৈচিত্র্য’। প্রতিপাদ্যটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভূ-বৈচিত্র্য কোনো দূরবর্তী বা দুর্বোধ্য বিষয় নয়। আমরা যে মাটিতে দাঁড়াই, যে পানি ব্যবহার করি, যে নদী ও পাহাড় দেখি, যে শিলা ও খনিজ দিয়ে ঘরবাড়ি-সড়ক নির্মাণ করি-সবই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ভূ-বৈচিত্র্যের অংশ। প্রতিপাদ্যটি আমাদের নিজস্ব এলাকার ভূ-প্রকৃতি নতুন করে চিনতে ও সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করে।

ভূ-বৈচিত্র্যের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। শিলা ও ভূতাত্ত্বিক স্তর ভূগর্ভস্থ পানি ধারণ, প্রবাহ ও প্রাকৃতিক পরিশোধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিলার ক্ষয় ও পরিবর্তনের মাধ্যমে মাটি গঠিত হয়, আর মাটিই কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের প্রধান ভিত্তি। খনিজ ও শিলা আধুনিক সভ্যতার শিল্প, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর অপরিহার্য কাঁচামাল। ফলে মানবকল্যাণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নও ভূতাত্ত্বিক সম্পদের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল।

দুর্যোগ মোকাবিলাতেও ভূ-বৈচিত্র্যের জ্ঞান অপরিহার্য। ভূমিকম্প, ভূমিধস, বন্যা, সুনামি ও আগ্নেয়গিরির মতো ভূ-প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া বোঝার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা এবং ভূমি ব্যবহার ও অবকাঠামো পরিকল্পনা করা সম্ভব। বাঁধ, সড়ক, সেতু, সুড়ঙ্গ, ভবন, বন্দর ও পাইপলাইন নির্মাণেও ভূবৈজ্ঞানিক জ্ঞান নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে; অত্যন্ত নগরায়িত ও ডিজিটাল এই পৃথিবীতে আমরা হয়তো ভূবৈচিত্র্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি বলে মনে করতে পারি।

অতীতের শিলা, পলি ও জীবাশ্ম পৃথিবীর দীর্ঘ ইতিহাস এবং অতীত জলবায়ুর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জলবায়ু পরিবর্তনের অতীত ধারা বুঝতে পারেন এবং ভবিষ্যতের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণে সহায়তা পান। একই সঙ্গে পাহাড়, গুহা, উপকূল ও অনন্য ভূদৃশ্য ভূ-পর্যটনের ভিত্তি তৈরি করে; যা স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গেও যুক্ত।

বাংলাদেশের ভূ-বৈচিত্র্যও বিশেষভাবে সমৃদ্ধ। নদীবাহিত পলিতে গড়ে ওঠা বিস্তীর্ণ বদ্বীপ ও প্লাবনভূমির পাশাপাশি রয়েছে বরেন্দ্র ও মধুপুরের সোপানভূমি, সিলেটের টিলা-পাহাড়, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল এবং দক্ষিণে বিস্তীর্ণ উপকূল ও সুন্দরবন। নদী, পলি, মাটি, পাহাড়, উপকূল ও ম্যানগ্রোভ ভূ-প্রকৃতির এই বৈচিত্র্য বাংলাদেশের প্রকৃতি ও মানুষের জীবনকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।

কিন্তু নদীভাঙন, পলি সঞ্চয়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পাহাড় কাটা, জলাভূমি ও বনভূমির পরিবর্তন, উপকূলীয় লবণাক্ততা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি ক্রমাগত চাপের মুখে পড়ছে। এর প্রভাব কৃষি, পানি, জীববৈচিত্র্য, বসতি ও মানুষের জীবিকার ওপর পড়ছে। বাংলাদেশের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় ভূমিকম্পের ঝুঁকিও ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ; তাই ভূবৈজ্ঞানিক গবেষণা ও ঝুঁকি-সচেতন ভূমি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

ভূ-বৈচিত্র্য সম্পর্কে প্রকৃত শিক্ষা কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। ভূবিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব ও ভূগোলের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের গবেষণা, ফিল্ডওয়ার্ক, জিআইএস, রিমোট সেন্সিং ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভূ-পৃষ্ঠের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং দুর্যোগের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ বিষয়ে আধুনিক গবেষণা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পৃথিবীর পরিবর্তনশীল পরিবেশ বুঝতে সহায়তা করতে পারে। সুইজারল্যান্ড ইটিএইচ জুরিখ গবেষণার বিশ্বের মানদন্ডে ভূবিজ্ঞান এবং ভূতত্ত্ব শিক্ষার জন্য সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা হয়।

ভূ-বৈচিত্র্য তাই কেবল পাথর, মাটি বা পাহাড়ের বৈচিত্র্য নয়; এটি পৃথিবীর সৃষ্টি ও বিবর্তনের নীরব দলিল, জীববৈচিত্র্যের ভিত্তি এবং মানবসভ্যতার অন্যতম অবলম্বন। একটি শিলা কিংবা জীবাশ্মের মধ্যেও লুকিয়ে থাকতে পারে পৃথিবীর কোটি বছরের ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে জানা, সম্পদকে বিচক্ষণভাবে ব্যবহার করা এবং ভূ-প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করাই টেকসই ভবিষ্যতের অন্যতম শর্ত।

‘আমাদের দোরগোড়ায় ভূ-বৈচিত্র্য’-২০২৬ সালের এই আহ্বান তাই চারপাশের মাটি, নদী, পাহাড়, উপকূল ও ভূদৃশ্যকে নতুন চোখে দেখার আহ্বান। কারণ পৃথিবীর ভূ-বৈচিত্র্য শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; এটি আমাদের বর্তমান জীবনের ভিত্তি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন।

 

সাংবাদিকতা কি ভয়মুক্ত?/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:২৬ অপরাহ্ণ
সাংবাদিকতা কি ভয়মুক্ত?/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

যাঁরা কথায় কথায় বলেন, দেশে এখন স্বাধীন সাংবাদিকতার স্বর্ণযুগ চলছে, সবাই নাকি মন খুলে কথা বলতে পারছেন, তাঁদের কাছে একটি সরল প্রশ্ন রাখা যায়-এই কি সেই স্বাধীনতা? স্বাধীন সাংবাদিকতার অর্থ শুধু সংবাদ প্রকাশের সুযোগ থাকা নয়। এর অর্থ হলো ভয়, চাপ, হুমকি কিংবা হামলার আশঙ্কা ছাড়াই একজন সাংবাদিক সত্য অনুসন্ধান করতে পারবেন, প্রশ্ন করতে পারবেন এবং জনগণের সামনে তথ্য তুলে ধরতে পারবেন। সংবাদকর্মী যখন কোনো ঘটনার ছবি তুলতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন, তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হুমকি পান কিংবা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হন, তখন স্বাধীন সাংবাদিকতার বাস্তব চিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

 

সাংবাদিকের হাতে অস্ত্র থাকে না। থাকে কলম, ক্যামেরা, মাইক্রোফোন আর সত্য তুলে ধরার দায়িত্ব। তাঁর শক্তি কোনো পেশিশক্তি নয়; তথ্য ও জনস্বার্থ। তাই সাংবাদিকের ওপর হামলা কেবল একজন ব্যক্তির ওপর হামলা হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জানার অধিকার।

 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা সেই প্রশ্নটিই আবার সামনে এনেছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কথা জ্ঞান, যুক্তি, মতবিনিময় ও মুক্ত চিন্তার জায়গা। সেখানে সাংবাদিকেরা যদি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হন, তাহলে বিষয়টি শুধু ক্যাম্পাসের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং প্রশ্ন ওঠে, মতের ভিন্নতা ও সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে আমরা কী ধরনের আচরণ করছি? কোনো সংবাদ পছন্দ না হলে তার প্রতিবাদ করার অধিকার আছে। কোনো তথ্য ভুল মনে হলে সংশোধনের দাবি তোলার অধিকার আছে।

 

সাংবাদিকের প্রতিবেদনের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে যুক্তি দিয়ে তার জবাব দেওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু হামলা, হুমকি বা ভয় দেখানো কোনোভাবেই সেই জবাবের বিকল্প হতে পারে না। সমস্যাটি এখানেই। আমরা অনেক সময় সংবাদকে নিজের পক্ষে বা বিপক্ষে হিসেবে দেখতে শুরু করি। যে সংবাদ নিজের পছন্দের, সেটিকে সত্য বলে গ্রহণ করি; আর যে সংবাদ অস্বস্তি তৈরি করে, সেটিকে সাংবাদিকের অপরাধ হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়। এই মানসিকতা সাংবাদিকতার জন্য যেমন বিপজ্জনক, তেমনি সমাজের জন্যও।

 

একজন সাংবাদিক যদি মনে করেন, একটি তথ্য প্রকাশ করলে তাঁর ওপর হামলা হতে পারে, কোনো পক্ষ তাঁকে হুমকি দিতে পারে কিংবা তাঁর ক্যামেরা কেড়ে নেওয়া হতে পারে, তাহলে তিনি স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারবেন না। তখন তৈরি হয় আত্মনিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি। সাংবাদিক হয়তো কিছু তথ্য জানেন, কিন্তু ঝুঁকি এড়াতে তা প্রকাশ করেন না। সংবাদ প্রকাশের আগে বারবার ভাবেন, কারও অসন্তোষ হবে কি না। এভাবে সরাসরি সেন্সরশিপ ছাড়াও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা সংকুচিত হতে পারে। এ কারণেই সাংবাদিকের নিরাপত্তা শুধু সাংবাদিক সমাজের দাবি নয়। এটি নাগরিকেরও দাবি। কারণ সংবাদমাধ্যম দুর্বল হলে সাধারণ মানুষও তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ে।ক্যামেরাকে ভয় পাওয়ার সংস্কৃতি কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়। ক্যামেরা কোনো অপরাধের হাতিয়ার নয়। ক্যামেরা একটি ঘটনার সাক্ষ্য ধারণ করে। কোনো সড়ক দুর্ঘটনা, দুর্নীতি, অনিয়ম, সহিংসতা কিংবা মানুষের দুর্ভোগ-সবকিছুর বাস্তব চিত্র ক্যামেরায় উঠে আসতে পারে।

 

সেই ছবি কখনো কারও জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। কিন্তু অস্বস্তিকর সত্যকে আড়াল করার জন্য ক্যামেরার ওপর হামলা করা হলে সত্যটি কি মুছে যায়? যায় না। বরং প্রশ্ন আরও বড় হয়ে ওঠে। আমাদের মনে রাখা দরকার, সাংবাদিকতা কারও প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ নয়। এটি একটি পেশা এবং একই সঙ্গে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট দায়িত্ব। সংবাদকর্মীরও ভুল হতে পারে। কোনো প্রতিবেদনে তথ্যগত ভুল থাকলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সাংবাদিকতার নামে মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশের অভিযোগ থাকলে আইনগত ও পেশাগত প্রক্রিয়ায় তার প্রতিকার হতে পারে। কিন্তু সেই প্রতিকার কখনো হামলা বা ভয় দেখানো হতে পারে না।

 

সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতার প্রশ্নটি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতা মানে যা খুশি তাই বলা নয়। তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া, গুজব এড়িয়ে চলা এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে বিরত থাকাÑএসব সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব। সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা যত বাড়বে, তার স্বাধীনতার সামাজিক ভিত্তিও তত শক্ত হবে। তবে সাংবাদিকের ভুলকে অজুহাত বানিয়ে তাঁর ওপর হামলা বৈধ হয়ে যায় না। একজন চিকিৎসকের ভুলের অভিযোগ থাকলে চিকিৎসককে মারধর করা যায় না, একজন শিক্ষকের সঙ্গে মতবিরোধ হলে তাঁকে হুমকি দেওয়া যায় না। একইভাবে সাংবাদিকের প্রতিবেদনের সঙ্গে দ্বিমত থাকলেও তার উত্তর দিতে হবে তথ্য ও যুক্তি দিয়ে।

 

আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে ভাবার সময় এসেছে। সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় প্রায়ই কিছুদিন আলোচনা হয়, প্রতিবাদ হয়, তদন্তের দাবি ওঠে। এরপর বিষয়টি ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়। এতে অপরাধীর মনে দায়মুক্তির ধারণা তৈরি হতে পারে। তাই সাংবাদিকের ওপর হামলার প্রতিটি ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কারণ বিচার না হলে পরবর্তী হামলার ঝুঁকি থেকেই যায়। আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন, কাল অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিক হতে পারেন। তার পরদিন কোনো স্থানীয় সংবাদকর্মী, ফটোসাংবাদিক বা নাগরিক সাংবাদিকও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন।

 

ভয় যদি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়, তার প্রভাব সংবাদকক্ষের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ তখন প্রশ্ন করতে ভয় পায়, তথ্য দিতে ভয় পায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে ভয় পায়। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে এই ভয় কমানো দরকার, বাড়ানো নয়। সাংবাদিককে ভয় দেখানো মানে শুধু একজন সংবাদকর্মীকে থামানোর চেষ্টা নয়; এর মাধ্যমে একটি ঘটনার সত্য প্রকাশের পথও সংকুচিত করা হয়। ক্যামেরায় হামলা মানে শুধু একটি যন্ত্র ভাঙা নয়; এর সঙ্গে জনগণের জানার অধিকারের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে।

 

কলম থামিয়ে দিলে কাগজ সাদা থাকে, কিন্তু সমাজের সমস্যাগুলো সাদা হয়ে যায় না। বরং অন্ধকারে থেকে যায়।তাই স্বাধীন সাংবাদিকতার স্বর্ণযুগ চলছে কি নাÑএমন দাবি করার আগে আমাদের দেখতে হবে সাংবাদিক কতটা নিরাপদে প্রশ্ন করতে পারছেন, কতটা স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে পারছেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের পর কতটা সুরক্ষা পাচ্ছেন। স্বাধীন সাংবাদিকতা কোনো দয়া নয়, কোনো বিশেষ সুবিধাও নয়। এটি নাগরিকের তথ্য জানার অধিকারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

 

সাংবাদিকের কলম ও ক্যামেরা ভয়মুক্ত থাকলেই সমাজ নিজের বাস্তব চেহারাটি দেখতে পারে। অতীতে সাংবাদিক নির্যাতন অন্যায় ছিল, আজও অন্যায়, ভবিষ্যতেও অন্যায় থাকবে। তাই সাংবাদিকের ওপর হামলার প্রতিবাদ শুধু সাংবাদিকদের করতে হবেÑএমন ভাবার সুযোগ নেই। এটি প্রত্যেক নাগরিকের প্রশ্ন হওয়া উচিত: সত্য বলার জন্য যদি সাংবাদিককে ভয় পেতে হয়, তাহলে আমরা যে স্বাধীনতার কথা বলি, সেই স্বাধীনতা আসলে কতটা স্বাধীন?

লেখক: সংবাদকর্মী