প্রবন্ধ/বাংলা সাহিত্যে মহররম ও কারবালা
নূরুজ্জামান দিশারী
হিজরি সনের সূচনা-মাস মুহাররম। এটি ইসলামের চারটি মহিমান্বিত ও সম্মানিত মাসের অন্যতম। ইতিহাসের দীর্ঘ পরিসরে এ মাস এক গভীর তাৎপর্য ও মর্মস্পর্শী স্মৃতির ভার বহন করে চলেছে। এর বুকে অঙ্কিত হয়েছে সত্য ও মিথ্যার চিরন্তন সংঘাতের এক জাজ্বল্যমান দলিল। ৬১ হিজরি সনের ১০ মহররম (১০ অক্টোবর ৬৮০ খ্রি.) ফোরাতের তীরে কারবালার প্রান্তরে সংঘটিত হয়েছিল এক হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি। ক্ষমতার মোহে অন্ধ, নিষ্ঠুর ইয়াযীদ বাহিনীর নির্মম আঘাতে শাহাদাত বরণ করেন প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর আদরের নাতি, জান্নাতের যুবকদের নেতা ইমাম হোসাইন (রা.)। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর নিষ্ঠাবান ৭২ জন সঙ্গী- যারা অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে, সত্যের পতাকা সমুন্নত রাখতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। এ বিয়োগান্ত ঘটনায় শোককাতর হয় না এমন মুসলমান নেই বললেই চলে। দল-মত, দেশ-ভাষা, বর্ণ, গোত্র, মাযহাব, তরিকা নির্বিশেষে সকল ঈমানদার মুসলমান- যাদের হৃদয়ে আল্লাহর রাসূল (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতের প্রতি বিন্দুমাত্র ভালোবাসা রয়েছে, তার পক্ষে কারবালার এই বিয়োগান্ত দৃশ্য উপেক্ষা করা অসম্ভব।
কারবালার প্রান্তরে সংঘটিত সেই হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি শুধু ইতিহাসের পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা রূপ নিয়েছে কবিতায়, কাব্যে, পুঁথিতে, গদ্যে, সংগীতে- এক বিস্তৃত সাহিত্যধারায়। এই ঘটনাই পরবর্তীকালে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে, আর বাংলাও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলায় মহররম বিষয়ক সাহিত্যচর্চার সূচনা মূলত মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের মধ্য দিয়ে যে নতুন সাংস্কৃতিক ধারা সূচিত হয়, তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল ছিল বাংলা ভাষার বিকাশ। মুসলিম শাসকরা বাংলা ভাষাকে রাজদরবারে মর্যাদা দেওয়ার ফলে এটি ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক কাহিনীর ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। এই প্রেক্ষাপটেই কারবালার ঘটনা বাংলা সাহিত্যে প্রবেশ কওে এবং ধীরে ধীরে একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যধারার জন্ম দেয়।
মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে মহররমের প্রভাব সবচেয়ে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে পুঁথি সাহিত্যে। এই পুঁথিগুলোতে কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে জঙ্গনামা ও মর্সিয়া- যেখানে যুদ্ধ, বীরত্ব, শোক ও বিলাপ একত্রে মিশে এক অনন্য রস সৃষ্টি করেছে। ষোলো শতকের কবি শেখ ফয়জুল্লাহ হোসাইন (রা.)-এর স্ত্রী জয়নবের শোক ও বিলাপকে আশ্রয় করে লিখেন ‘জয়নবের চৌতিশা’। এটিকেই ধরা হয় ‘মহররমের’ ওপর রচিত প্রথম মর্সিয়া। কবি ফয়জুল্লাহর পথ ধরে কবি দৌলত উজির বাহরাম খান রচনা করেন ‘জঙ্গনামা’। কবি ‘লায়লী-মজনু’ কাব্যের জন্য খ্যাতি অর্জন করলেও তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ হলো ‘ইমাম বিজয়’-যা রচিত হয়েছিল মহররমের বিষাদময় কাহিনীকে উপজীব্য করে।
মধ্যযুগের অন্যতম শক্তিশালী কবি সৈয়দ সুলতানও (আনু. ১৫৫০-১৬৪৮) মহররমের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘মকতুল হোসেন’ লিখতে শুরু করেছিলেন। বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি উক্ত কাজ সম্পন্ন করতে না পারলেও তার প্রিয় শিষ্য মুহাম্মদ খান (১৫৮০-১৬৫০) তা সম্পন্ন করেন। কবি মুহম্মদ খান জঙ্গনামার শ্রেষ্ঠ কবি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন । তিনি ১১ পর্বে কারবালার যুদ্ধ, ঈমাম হোসাইনের শাহাদত, হোসাইন- পুত্র কাসেমের বীরত্ব, সখিনার বিলাপ প্রভৃতি বিষয়কে উপজীব্য করে রচনা করেন
‘মকতুল হোসেন’ । গ্রন্থটি মহররম মাসে চট্টগ্রাম অঞ্চলে সুর করে অধিক পরিমাণে পঠিত হতো। কাব্যরস সিক্ত গ্রন্থটি কোমল হৃদয় বাঙালি পাঠককে মুগ্ধ করেছিল। আঠারো শতকের আরেক পরিচিত কবি ফকীর গরীবুল্লাহও ‘মহররম সাহিত্য’ রচনা করেছিলেন। ফোরাত তীরের পানি সংকটের করুণ দৃশ্য তুলে ধরতে তিনি লিখেন, ‘ঘিরিয়া রাখিল কুফার পানি বন্ধ করে পানি পানি করে যত সব গেলো মরে।’
আঠারো শতকে কবি হায়াত মাহমুদ ‘জঙ্গনামা’ বা ‘মহরম’ পর্বে হযরত জিব্রাইলের জবানিতে রাসূল (সা.)-এর প্রিয় নাতির মৃত্যু দৃশ্য, বিষের পেয়ালা পানে হাসানের মৃত্যু, নববধূ সখিনার অকাল বৈধব্য, বিলাপ, হোসাইন (রা.)-এর নির্মম শিরচ্ছেদ করুণভাবে উপস্থাপন করেছেন। মূলত কাশেমের লড়াই নিয়ে রচিত তার ‘জঙ্গনামা’ মর্সিয়া সাহিত্যের এক সমৃদ্ধ রচনা। একই ধারায় আব্দুল হাকিম (১৬২০-১৬৯০) ‘কারবালা’, ইয়াকুব আলী (১৮শ শতক) ‘জঙ্গনামা’, জাফর (১৮শ শতক) ‘শহীদ-ই-কারবালা’ ও ‘সখিনার বিলাপ’, কবি হামিদ (১৮শ শতক) ‘সংগ্রাম হুসেন’, শেরবাজ চৌধুরি (১৮শ শতক) ‘কাশিমের লড়াই’ ও ‘ফাতিমার সুরতনামা’, মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ খান (১৯শ শতকের প্রথমার্ধ) গুলজার-ই- শাহাদৎ’, ওয়াহিদ আলী (১৯শ শতকের প্রথমার্ধ) ‘বড় জঙ্গনামা’, জনাব আলী (১৯শ শতক) ‘শহিদ-ই-কারবালা’, মুহাম্মদ মুনসি (১৯শ শতক) ‘শহীদ-ই-কারবালা’, মুহাম্মদ ইসহাক উদ্দীন (২০শ শতক) ‘দাস্তান শহিদ-ই-কারবালা’ রচনা করেন। এসব গ্রন্থাবলি মহররম মাসে পঠিত হতো এবং তা পাঠক-শ্রোতাদের মনে গভীর শোকাচ্ছ্বাস ও বেদনার সৃষ্টি করত। মহররমের সাহিত্যিক প্রভাব শুধু লিখিত কাব্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি প্রবলভাবে প্রভাব ফেলে লোকসংস্কৃতিতেও। জারি গান, মর্সিয়া, পাঁচালি- এসবের মাধ্যমে গ্রামবাংলার মানুষ কারবালার শোককে নিজের জীবনের অংশ করে নেয়। জারি গানের সুরে, করুণ বিলাপে, নাটকীয় উপস্থাপনায় কারবালার কাহিনী এমনভাবে পরিবেশিত হতো যে, শ্রোতারা অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ত।
ইংরেজ আমলে বাংলা সাহিত্য প্রবেশ করে আধুনিক ধারায়। এ যুগেও ‘মহররম’কে কেন্দ্র করে মর্সিয়া সাহিত্য রচিত হতে থাকে সমান তালে। আবুল আলী মোহাম্মদ হামিদ আলীর কাসেম বধ কাব্য (১৯০৬) ও জয়নাল উদ্ধার (১৯০৯), মোহাম্মদ উদ্দীন আহমদের মোহররম কাব্য (১৯১২), মোহাম্মদ আব্দুল বারীর কারবালা (১৯১৩), কাজী আমিনুলের জঙ্গে কারবালা (১৯৪৫) ও মোহাম্মদ বরকতুল্লাহর কারবালার যুদ্ধ ও নবী বংশের ইতিবৃত্ত (১৯৫৭) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব রচনায় কবিদের মুনশিয়ানার পরিচয় মেলে। ঊনবিংশ শতকে এসে মহররম বিষয়ক সাহিত্য নতুন মোড় নেয় । এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি বিষাদ সিন্ধু, যার রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৮-১৯১২)। এই গ্রন্থে কারবালার ঘটনাকে গদ্যের শিল্পরীতিতে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা বাংলা সাহিত্যে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এর ভাষা, বর্ণনা, চরিত্র নির্মাণ- সবই এক ধ্রুপদী সৌন্দর্যে ভরপুর। তবে এই গ্রন্থের ঐতিহাসিক নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন কায়কোবাদ (১৮৫৭-১৯৫১)। তিনি ‘মহরম শরীফ’ রচনা করে কারবালার ঘটনাকে আরও ইতিহাসসম্মতভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন। তাঁর কাব্যে আমরা দেখি ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা ও সাহিত্যিক সংবেদনশীলতার এক সমন্বয়। কারবালাকে উপজীব্য করে অনল প্রবাহের কবি ইসমাইল হোসেন সিরাজী (১৮৮০- ১৯৩১) রচনা করেন ‘মহাশিক্ষা’ কাব্য। মহররমকে কেন্দ্র করে কবিতা লিখেছিলেন কবি শাহাদাৎ হোসেন (১৮৯৩-১৯৫৩) এবং পল্লীকবি জসীমউদ্দীনও (১৯০৩-১৯৭৬)। বিশ শতকে এসে মহররম বিষয়ক সাহিত্য এক নতুন চেতনার জন্ম দেয়, যার প্রধান রূপকার কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি মহররমকে ঘিরে কবিতা ও গান রচনা করেছেন প্রচুর। তাঁর বিখ্যাত ‘মহররম’ কবিতা বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য সংযোজন। কবিতার শুরুতে কবি লিখেন, নীল সিয়া আসমান, লালে লাল দুনিয়া ‘আম্মা! লা’ল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া!” কাঁদে কোন্ ক্রন্দসী কারবালা ফোরাতে সে কাঁদনে আসু আনে সীমারেরও ছোরাতে। তিনি কারবালার ঘটনাকে শুধু শোকের দৃষ্টিতে দেখেননি; বরং এটিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি জ্বালাময়ী আখরে লিখেন, ফিরে এল আজ সেই মহররম মাহিনা,- ত্যাগ চাই মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না। উষ্ণীষ কোরানের, হাতে তেগ আরবীর দুনিয়াতে নত নয় মুসলিম কারো শির,- তবে শোন ঐ শোন বাজে কোথা দামামা। শমসের হাতে নাও, বাঁধো শিরে আমামা! এভাবে আগুরা ও মুহররমের প্রেক্ষাপটে অনেকেই লিখেছেন। এখনো তা চলমান আছে। বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে। বিশ শতকের পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর, আশি ও নব্বই দশকের কবিরা অনেকেই আশুরা ও মুহররম নিয়ে কবিতা ও গান লিখেছেন। মর্সিয়া লিখেছেন ও লিখছেন অথবা আওরা, মোহররম, ইমাম হোসাইন, ফোরাত, কারবালা প্রান্তর, কে হোসাইন-কে ইয়াযীদ, ঘৃণিত সীমার ইত্যাদি মুহররম সম্পর্কিত শব্দাবলীকে উপমা-উৎপ্রেক্ষাতে হলেও বিভিন্ন কবিতার বিভিন্ন লাইন প্রসঙ্গে টেনে এনেছেন। কারবালা সংক্রান্ত স্বতন্ত্র কবিতার রচনা অথবা উপমা-উৎপ্রেক্ষায় মুহররমকেন্দ্রিক শব্দাবলিকে টেনে আনা এই সব কবির তালিকায় রয়েছেন ইসলামি রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ, সৈয়দ আলী আহসান, আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, আবদুস সাত্তার, মতিউর রহমান মল্লিক, আবদুল হাই শিকদার, গোলাম মোহাম্মদ, আসাদ বিন হাফিজ, আল মুজাহিদী, আসাদ চৌধুরী, মোশাররফ হোসেন খান, শাহাদাত হোসাইন, মাওলানা রুহুল আমিন খান, ফজল শাহাবুদ্দিন, মোহাম্মদ নূরুল হুদা, আ স ম বাবর আলী, মসউদ উশ শহীদ, জহুরুশ শহীদ, আবু নসরত রহমত উল্লাহ, ফারুক মাহমুদ, হোসেন মাহমুদ, মোহসিন হোসাইন, বুলবুল সরওয়ার, সৈয়দ মুসা রেজা, অধ্যাপক সিরাজুল হক, সোলায়মান আহসান, মুকুল চৌধুরী, আবদুল মুকিত চৌধুরী, মহিউদ্দিন আকবর, আমিন আল আসাদ, চৌধুরী গোলাম রব্বানী, আতিক হেলাল, মানসুর মুজাম্মিল, মোহাম্মদ আলী আকবর, এম. মনিরুল হক প্রমুখ।
বাংলা সাহিত্যে মহররম নিয়ে সপ্তদশ শতক থেকে শুরু করে বর্তমানকাল পর্যন্ত যত লেখা রচিত হয়েছে দ্বিতীয় এমন কোনো বিষয় নিয়ে এত লেখা ছাপা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। মধ্যযুগের পুঁথি থেকে আধুনিক কবিতা পর্যন্ত এই ধারার বিস্তার প্রমাণ করে, কারবালা কেবল অতীতের ঘটনা নয়; এটি বর্তমানের চেতনা এবং ভবিষ্যতের প্রেরণা। মহররম আমাদের শেখায় সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে, এবং মানবতার পথে অটল থাকতে। এই শিক্ষা যতদিন মানবসমাজে প্রাসঙ্গিক থাকবে, ততদিন বাংলা সাহিত্যে মহররমের এই প্রবাহও অবিরাম বহমান থাকবে।












