বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস: গাড়ির শহর নয়, মানুষের শহর চাই
সাকিবুর রহমান বাবলা
শহর মানুষের জন্য-গাড়ির জন্য নয়। অথচ আধুনিক নগরজীবনের একটি বড় বৈপরীত্য হলো, মানুষের চলাচলের জন্য নির্মিত সড়কের বিপুল অংশ ক্রমেই ব্যক্তিগত গাড়ির দখলে চলে যাচ্ছে। একটি গাড়িতে অনেক সময় একজন বা দুজন মানুষ চলাচল করলেও সেই গাড়ি সড়কের উল্লেখযোগ্য জায়গা দখল করে। ফলাফল-যানজট, জ্বালানি অপচয়, বায়ু ও শব্দদূষণ, কর্মঘণ্টার ক্ষতি এবং নগরজীবনে বাড়তি চাপ। এই বাস্তবতার বিপরীতে সচেতনতা তৈরির একটি প্রতীকী ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস। প্রতি বছর ২২ সেপ্টেম্বর দিবসটি পালিত হয়। ইউরোপে পরিবেশ ও জ্বালানি-সচেতনতার বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্য দিয়ে এর ধারণার বিকাশ ঘটে; ২০০০ সালে ইউরোপীয়ন কমিশন বার্ষিক ‘ইন টাউন উইদাউট মাই কার’ কর্মসূচির মাধ্যমে এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক প্রচারণার রূপ দেয়। বর্তমানে এটি ইউরোপীয়ন মোবিলিটি সপ্তাহের ১৬–২২ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচির সমাপনী ‘কার-ফ্রি ডে’ হিসেবে পালিত হয়।
গাড়িমুক্ত দিবসের অর্থ এই নয় যে আধুনিক সমাজে সব গাড়ি নিষিদ্ধ করে দিতে হবে। এর মূল দর্শন হলোÑব্যক্তিগত গাড়িনির্ভরতা কমানো এবং মানুষের সামনে বিকল্প, নিরাপদ ও কার্যকর চলাচলের ব্যবস্থা তুলে ধরা। হাঁটা, সাইকেল, রিকশা, বাস, মেট্রোরেল, ট্রেনসহ গণপরিবহন ও সক্রিয় যাতায়াতের মাধ্যমকে অগ্রাধিকার দেওয়াই এই উদ্যোগের কেন্দ্রীয় বার্তা। ইউরোপীয়ন কমিশনের ‘ইউরোপিয়ান মোবিলিটি উইক’-ও আচরণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে গণপরিবহন, হাঁটা, সাইক্লিং ও অন্যান্য পরিচ্ছন্ন পরিবহনব্যবস্থাকে উৎসাহিত করে।
বাংলাদেশেও দিবসটির একটি দীর্ঘ ধারাবাহিকতা রয়েছে। ২০০৬ সালে বেসরকারি উদ্যোগে দেশে প্রথমবার বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস পালনের তথ্য পাওয়া যায়। ২০১৬ সাল থেকে ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে দিবসটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়ে আসছে।
ঢাকার যানজটের জন্য শুধু ব্যক্তিগত গাড়িকে এককভাবে দায়ী করা যায় না; অপর্যাপ্ত গণপরিবহন, রাস্তার সীমাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অবৈধ দখল ও পার্কিং, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নির্মাণকাজ এবং যানবাহনের সমন্বয়হীনতাও এর জন্য দায়ী। বিশ্বব্যাংকও ঢাকার যানজটকে অবকাঠামো ও গণপরিবহনের ঘাটতির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেছে। তবে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নগর পরিবহন ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। ২০০৬ সালের এক ঢাকাকেন্দ্রিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, শহরের মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ বাসিন্দা গাড়ি ব্যবহার করলেও মিরপুর রোডের প্রায় ৬০ শতাংশ জায়গা গাড়ি দখল করে রাখতÑযা ব্যক্তিগত গাড়ির জায়গা ব্যবহারের অসমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র।
পরিবহন খাত জলবায়ু পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আইইএ-এর হিসাবে, ২০২৪ সালে সড়ক পরিবহন খাতের কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন ৬ গিগাটনের কিছু বেশি ছিল এবং এর ৬০ শতাংশের বেশি এসেছে যাত্রীবাহী গাড়ি ও ভ্যান থেকে।
ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানো শুধু যানজটের বিষয় নয়; এটি জ্বালানি দক্ষতা ও জলবায়ু নীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত। আইইএ-এর হিসাবে পরিবহন খাত বিশ্বব্যাপী মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত। একই সঙ্গে গণপরিবহন ও সাইক্লিংয়ের মতো অধিক দক্ষ পরিবহনব্যবস্থা জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়াতে পারে।
গাড়ির নির্গমনে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পাশাপাশি নাইট্রোজেন অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও সূক্ষ্ম কণাসহ বিভিন্ন দূষক থাকতে পারে। যানবাহনের ধরন, জ্বালানির মান, ইঞ্জিনের অবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং যানজটের পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্গমনের মাত্রাও পরিবর্তিত হয়। ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের গবেষণাতেও যান চলাচল ও নির্মাণকাজ-প্রবণ এলাকায় পিএম২.৫-এর উচ্চমাত্রার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবন পরিবহনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কিন্তু একই সঙ্গে পরিবহন খাত দেশের জ্বালানি ব্যবহারের একটি বড় অংশের সঙ্গে যুক্ত। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৬৩ শতাংশ পেট্রোলিয়াম পণ্যের সঙ্গে পরিবহন খাতের সম্পর্ক রয়েছে এবং দেশের মোট নির্গমনের প্রায় ১৫ শতাংশ পরিবহন খাত থেকে আসে।
এ কারণে ব্যক্তিগত গাড়ির অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানো জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত। যানজটে দীর্ঘ সময় গাড়ি চলাচল বা ইঞ্জিন চালু রেখে দাঁড়িয়ে থাকলে একই দূরত্ব অতিক্রম না করেও জ্বালানি খরচ হয়। ফলে যানজট কমানো মানে শুধু সময় বাঁচানো নয়Ñজ্বালানি সাশ্রয়ও।
বাংলাদেশের বায়ুদূষণের স্বাস্থ্যগত মূল্যও অত্যন্ত বড়। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে বায়ুদূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত কারণে ১ লাখ ৫৯ হাজারের বেশি অকালমৃত্যু এবং ২৫০ কোটির বেশি অসুস্থতার দিন ছিল; সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য ব্যয়ের অর্থনৈতিক মূল্য জিডিপির ৮.৩ শতাংশের সমপরিমাণ বলে অনুমান করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান কেবল গাড়ির কারণে নয়Ñবায়ুদূষণের সামগ্রিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বোঝায়।
তবে এই দিবসে পুরো দেশের সব ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক যানবাহন একদিন বন্ধ করে দিলে সেটিকে নিঃশর্তভাবে ইতিবাচক বলা যাবে না। অ্যাম্বুলেন্স, অগ্নিনির্বাপণ, জরুরি চিকিৎসা, খাদ্য ও পণ্য সরবরাহ, আইনশৃঙ্খলা, প্রতিবন্ধী ও বিশেষ প্রয়োজনসম্পন্ন মানুষের চলাচলসহ অপরিহার্য সেবার জন্য যানবাহন প্রয়োজন। তাই বাস্তবসম্মত গাড়িমুক্ত কর্মসূচিতে জরুরি ও প্রয়োজনীয় চলাচলের জন্য সুস্পষ্ট ব্যতিক্রম এবং পর্যাপ্ত বিকল্প পরিবহন থাকতে হবে। এর দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব হলো মানুষের আচরণ ও নগর পরিবহন নীতিতে পরিবর্তনের পথ তৈরি করা।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে যানবাহনের নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, যানবাহন পরিদর্শন ও বৈদ্যুতিক গণপরিবহনের দিকে এগোচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রকল্পে ঢাকায় ৪০০টি শূন্য-নির্গমন বৈদ্যুতিক বাস চালুর উদ্যোগ, যানবাহন পরিদর্শন কেন্দ্র সম্প্রসারণ এবং নির্গমন পরীক্ষার ব্যবস্থা উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ দেখায় যে সমাধান শুধু গাড়ি কমানো নয়; পরিবহনব্যবস্থাকে পরিচ্ছন্ন, দক্ষ ও জনবান্ধব করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নাগরিকের দায়িত্বের পাশাপাশি রাষ্ট্র ও নগর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব আরও বড়। মানুষকে শুধু ‘গাড়ি ব্যবহার করবেন না’ বললেই হবে না; তাকে নিরাপদ, সাশ্রয়ী, সময়নিষ্ঠ ও মর্যাদাপূর্ণ বিকল্প দিতে হবে। কারণ ভালো গণপরিবহন ছাড়া গাড়িনির্ভরতা কমানো কঠিন।
বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই গাড়িবিরোধিতা নয়Ñঅতিরিক্ত গাড়িনির্ভরতার বিরুদ্ধে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নগরদর্শন। ব্যক্তিগত গাড়ি প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু একটি শহরের পরিবহনব্যবস্থা যদি এমন হয় যে অল্পসংখ্যক মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ির সুবিধার জন্য বিপুলসংখ্যক মানুষকে যানজট, দূষণ ও সময়ের ক্ষতি সহ্য করতে হয়, তাহলে সেই ব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
একটি বাসে বেশি মানুষ, একটি সাইকেলে শূন্য জ্বালানি, একটি হাঁটার পথে কোনো পার্কিংয়ের প্রয়োজন নেইÑএই সরল সত্যের মধ্যেই টেকসই নগরপরিকল্পনার একটি বড় দর্শন নিহিত। বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস সেই দর্শনকে বছরে একদিন দৃশ্যমান করে। কিন্তু প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন ২২ সেপ্টেম্বরের প্রতীকী বার্তা বছরের বাকি ৩৬৪ দিনেও নগর পরিকল্পনা, পরিবহননীতি এবং নাগরিক আচরণে প্রতিফলিত হবে।
শহরের সড়ক যত বেশি মানুষের জন্য উন্মুক্ত হবে, শহর তত বেশি বসবাসযোগ্য হবে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত গাড়ি কমানো নয় শুধুÑলক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি শহর গড়ে তোলা, যেখানে মানুষের চলাচল গাড়ির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।












