বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩

মুক্তমত: আইনের শাসন, ক্ষমতা, বিচারহীনতা ও নাগরিক নিরাপত্তা: কোথায় দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ
মুক্তমত: আইনের শাসন, ক্ষমতা, বিচারহীনতা ও নাগরিক নিরাপত্তা: কোথায় দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ?

কাজী মামুনুর রহমান মাহিম
“বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই”Ñ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম উচ্চারিত এই স্লোগানের মধ্য দিয়ে যে বৈষম্যহীনতার প্রত্যাশা সামনে এসেছিল, চব্বিশের জুলাই-আগস্টের পটপরিবর্তন এবং দীর্ঘ ১৬ বছরের একটি শাসনামলের অবসানের পর বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিলÑআইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, মানবাধিকারের নিশ্চয়তা মিলবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় ও ব্যক্তিগত প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের আস্থার জায়গা হয়ে উঠবে, এমন প্রত্যাশার কথাই বিভিন্ন মহলে উঠে এসেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনা সেই প্রত্যাশার সামনে একের পর এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন হাজির করছে।
ন্যাম ভবনের মতো সংসদ সদস্যদের জন্য নির্ধারিত আবাসিক ভবনে একজন তরুণীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিয়ে নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে। ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মোছা. মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ফ্ল্যাটটি জামায়াতের মনোনয়নে নির্বাচিত হওয়া সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের। পুলিশ জানিয়েছে, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত শুরু করে এবং ফরেনসিক পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

একজন সাংবাদিক এবং আইন ও নীতি বিশ্লেষক হিসেবে এখানেই আমার প্রথম প্রশ্নÑরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের জন্য নির্ধারিত আবাসিক ভবনেও যদি একজন নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের সুরক্ষা-ব্যবস্থা নিয়ে আমরা কতটা নিশ্চিন্ত হতে পারি?

মরিয়মের এই করুণ পরিণতির তদন্তই নির্ধারণ করবে তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও দায় কার। কিন্তু এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পূর্ববর্তী ঘটনাবলি, অভিযোগ, নথি, ভিডিও ফুটেজ, কথিত কাবিননামা, বয়স ও পরিচয়সংক্রান্ত নথিÑসবকিছুই যদি তদন্তের আওতায় না আসে, তাহলে পূর্ণ সত্য উদ্ঘাটন কঠিন হয়ে পড়বে।
এর আগেও গাজী নজরুলকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ ও বিতর্ক সামনে এসেছিল। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এক নারীর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি ওই নারীকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে দাবি করেছিলেন। পরে জামায়াত তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে।

ঘটনাপ্রবাহের বিভিন্ন প্রতিবেদনে চাকরির প্রলোভন, মগবাজারের একটি হোটেলে অবস্থান, পরবর্তী সময়ে বিয়ের দাবি এবং একটি কাবিননামা সামনে আসার কথাও এসেছে। ওই কাবিননামার প্রস্তুতি, নিবন্ধন ও বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যও ছিল পরস্পরবিরোধী। গাজী নজরুল নিজে মরিয়মকে তাঁর আইনসম্মত দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেছিলেন। ফলে শুরু থেকেই বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ, পাল্টা বক্তব্য এবং নথিগত প্রশ্নের একটি ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছিল।
এর সঙ্গে যদি জন্মসনদ জালিয়াতির মাধ্যমে একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীকে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে দেখানোর অভিযোগও যুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুতর। তবে এসব অভিযোগের কোনটি সত্য, তা নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থা ও আদালতের। তদন্তে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে, সংশ্লিষ্ট প্রতিটি কর্মকা-ের জন্য প্রচলিত আইনে দায় সৃষ্টি হতে পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে গাজী নজরুলের যোগাযোগ বা সম্পর্কের সূত্র তৈরি হয়েছিলÑএমন অভিযোগও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। পরবর্তীতে ওবায়দুর রহমানের করা হত্যাচেষ্টা মামলায় গাজী নজরুল হাইকোর্ট থেকে আট সপ্তাহের আগাম জামিন পান। ১০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে এই জামিনের তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

এরপর ২০ সেপ্টেম্বর ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। ২১ সেপ্টেম্বরের বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা হয়েছে এবং গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
এখানেই রাষ্ট্রের কাছে বড় প্রশ্নÑএকজন প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিকে ঘিরে যখন একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে, তখন তদন্ত কতটা স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত থাকে? আইন কি সবার জন্য একইভাবে প্রয়োগ হচ্ছে? নাকি ক্ষমতার অবস্থান বিচারপ্রক্রিয়ার বাস্তবতায় কোনো না কোনো সুবিধা তৈরি করে?
সাংবাদিক আদালত নন। সাংবাদিকের কাজ রায় দেওয়া নয় বরং সত্য উদ্ঘাটনের জন্য প্রশ্ন তোলা। আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কারও অপরাধ বা নির্দোষতা নির্ধারণ করবেনÑএটাই আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু কোনো ঘটনা, নথি, বক্তব্য বা প্রক্রিয়ার মধ্যে অসঙ্গতি দেখা দিলে সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো সেই প্রশ্নগুলো সামনে আনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা।

আইনি বিশ্লেষণের জায়গা থেকে আরও একটি প্রশ্ন সামনে আসেÑভিন্ন ব্যক্তি, ভিন্ন অভিযোগ ও ভিন্ন মামলায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কি একই ধরনের প্রক্রিয়াগত ন্যায়, তদন্তের সুযোগ এবং বিচারিক মানদ- অনুসরণ করছে? রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতার অবস্থান কি কোনো মামলার তদন্ত, জামিন, বিচার বা প্রশাসনিক পদক্ষেপের বাস্তবতায় প্রভাব ফেলছে? এসব প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে নয়, আদালতের নথি, তদন্তের অগ্রগতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমের তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকেই পাওয়া সম্ভব।
ন্যায়বিচারের মৌলিক প্রশ্নটি এখানেইÑআইনের চোখে ক্ষমতাবান ও ক্ষমতাহীন ব্যক্তির জন্য কি একই মানদ- কার্যকর হচ্ছে?
মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনাটিও এই প্রশ্নকে আরও গভীর করে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর দিন ন্যাম ভবনের সংশ্লিষ্ট ফ্ল্যাটে গাজী নজরুলের উপস্থিতি এবং তাঁর সঙ্গে মরিয়মের অবস্থানের বিভিন্ন বিবরণ সংবাদমাধ্যমে এসেছে। কিন্তু ঠিক কী ঘটেছিল, মরিয়মের মৃত্যুর আগে ও পরে কারা সেখানে ছিলেন এবং কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিলÑএসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত ও আদালতের নথি থেকেই নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন।
এখানে ব্যক্তিবিশেষের অপরাধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার বিষয়টি আদালতের এখতিয়ার। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার অধিকার নাগরিকের রয়েছে। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও যদি ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অবশ্যই জনসমক্ষে আলোচনার দাবি রাখে।
আরও একটি প্রশ্ন হলোÑঅভিযোগ, তদন্ত, বিচারিক সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির মধ্যে সীমারেখা কোথায়? কোনো দল কাউকে বহিষ্কার করলেই রাষ্ট্রীয় বা সংসদীয় দায়ের প্রশ্ন শেষ হয়ে যায় না। আবার কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করাও ন্যায়বিচারের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, প্রমাণের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং আইনের সমান প্রয়োগ।
শুধু ন্যাম ভবনের ঘটনাই নয়Ñদেশের বিভিন্ন প্রান্তে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা, গণপিটুনি এবং কথিত ‘মব জাস্টিস’ নিয়েও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো উদ্বেগ তৈরি করছে। ৫ আগস্টের পর একটি নতুন ও অধিকতর মানবিক রাষ্ট্রের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেই প্রত্যাশার সঙ্গে এসব ঘটনা সাংঘর্ষিক কি নাÑসেটিও এখন আলোচনার বিষয়।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও সহিংসতার অভিযোগ সেই উদ্বেগকে আরও তীব্র করেছে।
খুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার মাত্র দশ দিনের মাথায় নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী আজমুল হোসেন ওরফে আযমকে ‘ভাত চুরি করে খাওয়ার’ অপবাদে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। ১৯ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ঘটনায় তাঁর বাবা হত্যা মামলা করেছেন।
একজন তরুণ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করার অভিযোগ যদি তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে সেটি শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়Ñএটি আমাদের সামাজিক ন্যায়বোধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও গুরুতর সংকেত।
অন্যদিকে শিশুদের নিরাপত্তার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ২০ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিখোঁজ হওয়ার পর অন্তত ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় মোট ২৫৪ শিশুর মৃত্যুর তথ্য আসকের পর্যবেক্ষণে এসেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়; তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হলেও ২ হাজার ৩৮ শিশু তখনও নিখোঁজ ছিল।
কুমিল্লায় শিক্ষক নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও নতুন করে শিশুদের নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে এনেছে। এ ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র অপ্রতিমসহ সাম্প্রতিক সময়ে নিখোঁজ হয়ে নিহত শিশুদের প্রতিটি ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
শিশুদের এমন পরিণতি আমাদের কোন সভ্যতার ইঙ্গিত দেয়?
একদিকে যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য ঊর্ধ্বগতি, সাধারণ মানুষের জীবন ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে এত প্রশ্ন, অন্যদিকে জনপ্রতিনিধিদের আচরণও জনমনে নতুন বিতর্ক তৈরি করছে। সম্প্রতি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের লংমার্চ চলাকালীন দলটির ৩৪ জন এমপিসহ মোট ৭১ জনের বিদেশ সফরের কথা প্রথম আলোসহ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সফরটি দলীয়ভাবে পূর্বপরিকল্পিত ও শিক্ষামূলক কর্মসূচির অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হলেও, এত বিপুলসংখ্যক এমপির একযোগে বিদেশ সফরের সময় ও উদ্দেশ্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সফরটিকে ঘিরে ‘প্রমোদ বিলাস’-কেন্দ্রিক সমালোচনাও দেখা গেছে।
এখানে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিকÑএকসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক সংসদ সদস্য কেন বিদেশ সফরে গেলেন, সফরের সুনির্দিষ্ট ম্যান্ডেট কী, ব্যয়ের উৎস কী এবং জনগণের কাছে এর উদ্দেশ্য কতটা স্বচ্ছ?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আসিফ মোহাম্মদ শাহান এবং অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খানও গণমাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের এমন বিদেশ সফরের উদ্দেশ্য ও ম্যান্ডেট জনসম্মুখে পরিষ্কার থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
অন্যদিকে, অর্ন্তর্বতী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম, ঘুষ ও অর্থপাচারের অভিযোগ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান করছেÑএমন প্রতিবেদন একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। একই অনুসন্ধান-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। এমন গুরুতর অভিযোগের পরও তাঁর প্রকাশ্য কর্মকা- ও অবস্থান নিয়েও বিভিন্ন মহলে সমালোচনা দেখা গেছে।
এসব দৃশ্যমান অসঙ্গতি দেখে একজন সচেতন নাগরিক, সংবাদকর্মী ও আইন ও নীতি বিশ্লেষক হিসেবে প্রশ্ন করতেই হয়Ñরাষ্ট্রের আইন কি সত্যিই সবার জন্য সমান? নাকি ক্ষমতাবান ও সাধারণ মানুষের জন্য তার প্রয়োগের বাস্তবতা ভিন্ন?
ক্ষমতার অবস্থান যদি কখনো ন্যায়বিচারের সমান প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে, তখন রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। আর বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারানো কোনো রাষ্ট্রের জন্যই ছোট সংকট নয়।
আজ মরিয়ম, আজমুল বা অপ্রতিমদের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা না গেলে রাষ্ট্রের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। মরিয়মের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও প্রমাণনির্ভর তদন্ত জরুরি। একই সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পূর্ববর্তী অভিযোগ, নথি, ভিডিও ফুটেজ, বয়স ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য, কথিত কাবিননামা এবং সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর পুরো ঘটনাপ্রবাহও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন।
অভিযুক্ত ব্যক্তি যতই প্রভাবশালী হোন, তাঁর জন্য আলাদা কোনো বিচারিক মানদ- থাকতে পারে না। একইভাবে, কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে বিচার শেষ হওয়ার আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবেও চিহ্নিত করা যায় না। প্রয়োজনÑতদন্তে স্বচ্ছতা, প্রমাণের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বাধীনতা এবং আইনের সমান প্রয়োগ।
তাই আজকের প্রশ্ন শুধু মরিয়মের মৃত্যুর কারণ কীÑতা নয়। প্রশ্ন আরও গভীর: রাষ্ট্র কি প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমান নিরাপত্তা, সমান আইনি সুরক্ষা এবং সমান বিচার নিশ্চিত করতে পারছে?
মরিয়মের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্তেই নির্ধারিত হবে। আজমুলের মৃত্যুর দায়ও আদালতের বিচারেই নির্ধারিত হবে। অপ্রতিমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও দায়ও তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হতে হবে। একইভাবে, কোনো জনপ্রতিনিধি, সাবেক বা বর্তমান রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা কিংবা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগই।
কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখানেই শেষ নয়। অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।
কারণ রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা কোনো বক্তব্যে তৈরি হয় না; তৈরি হয় তখনই, যখন একজন সাধারণ নাগরিক বিশ্বাস করতে পারেনÑক্ষমতার পরিচয় নয়, সত্য ও প্রমাণই শেষ পর্যন্ত আইনের ভিত্তি। লেখক: সাংবাদিক, আইন ও নীতি বিশ্লেষক এবং সমাজকর্মী

 

 

Ads small one

গুড় গ্রাম থেকে গুড় বংশ: ইতিহাস ঐতিহ্যের গুড়পুকুরের মেলা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:৩২ পূর্বাহ্ণ
গুড় গ্রাম থেকে গুড় বংশ: ইতিহাস ঐতিহ্যের গুড়পুকুরের মেলা

আবুল কালাম আজাদ

মেলা বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি অংশ। কবে, কোথায়, কখন মেলার প্রচলন শুরু হয় তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে, অনেকের ধারণা গ্রাম্য হাট থেকেই এই মেলার উৎপত্তি। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প সংস্থার জরিপে সারাদেশে মোট মেলার সংখ্যা বলা হয়েছে ১০০৫টি। এর অল্প কিছু ছাড়া আর প্রায় সবটাই গ্রামীণ মেলা।

 

আবহওয়ামান বাংলার সংস্কৃতির ঐতিহ্য মেলার একটি বাণিজ্যিক দিক রয়েছে। ধর্মীয় চেতনার বাইরে অন্যান্য সামাজিক বা লৌকিক আচারগুলোও এই মেলার সঙ্গে যুক্ত।

 

বহুকাল ধরে সাতক্ষীরায় হয়ে আসছে গুড়পুকুরের মেলা। দেশের অন্যান্য অনেক মেলার মতো এই মেলারও উৎপত্তি, নামকরণ এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়না। অতীতে এনিয়ে তেমন কোন লেখালেখিও হয়নি। তবে গত বিংশ শতাব্দির শেষ দিক থেকে এই মেলা সম্পর্কে অনেকের আগ্রহ সৃষ্টি হয়। শুরু হয় লেখালেখি। এসব লেখায় পর্যাপ্ত তথ্য উপাত্ত না থাকলেও কিছু সূত্র পাওয়া যায়। যেসব সূত্র এই মেলার ইতিহাস সম্পর্কে একটা মোটামুটি গ্রহণযোগ্য ধারণা দিতে পারে।

গুড়পুকুর নামে পরিচিত পলাশপোলের সেই ঐতিহাসিক পুকুরটির বর্তমান অবস্থা (২০২৩ সালে তোলা ছবি)

এক.
গুড় বংশের উত্তরসূরিদের পুকুর। তাই গুড়পুকুর। সেই পুকুরকে ঘিরে শুরু হয়েছিল মেলা। তাই নাম হয়েছে গুড়পুকুরের মেলা। সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহি গুড়পুকুরের মেলার নামকরণের ইতিহাস নিয়ে যে সীমিত পরিমান লেখালেখি হয়েছে, সেখানে কামদেব ও জয়দেব-এর কামালউদ্দিন খাঁ ও জামালউদ্দিন খাঁ হয়ে ওঠার কাহিনী উল্লেখ রয়েছে। এ দু’জনের মধ্যে কোনো একজনের পরবর্তী বংশধর হিসেবে বোরহার খাঁ ওরফে বুড়া খাঁ এঁর নাম উল্লেখ করেন কেউ কেউ।

 

বাগেরহাটের পীর খান জাহান আলী দক্ষিণবঙ্গে আগমনের পর দক্ষিণডিহির শাসনভার তাঁর বিশ্বস্ত সহচর মুহম্মদ আবু তাহেরের হাতে অর্পন করেন। তিনি তাঁর দলকে দুটি ভাগে বিভক্ত করে একটি দল নিয়ে ভৈরবকূল দিয়ে বাগেরহাট অভিমুখে যাত্রা করেন। অপরদলটির নেতৃত্বে ছিলেন বোরহান খাঁ ওরফে বুড়া খাঁ। বুড়া খাঁ ও তাঁর পুত্র ফতেহ খাঁ এর নেতৃত্বে এই দলটি কপোতাক্ষ নদ বেয়ে দক্ষিণে সুন্দরবনাঞ্চলে পৌছান। বুড়া খাঁ এই এলাকা দিয়ে রাস্তা নির্মাণ, আবাদ পত্তন ও ধর্ম প্রচার করেন। এছাড়াও তিনি কয়রার আমাদি এলাকায় শাসনভার পরিচালনার জন্য কাছারি গড়ে তোলেন। তাঁর নেতৃত্বে এখানে নির্মাণ করা হয় মসজিদকুড় মসজিদ। রাজা প্রতাপাদিত্যের যশোর রাজ্যের রাজধানী ঈশ্বরীপুর এলাকায়ও বুড়া খাঁর আস্তানা ছিল। খান জাহান আলীর পরামর্শে বুড়া খাঁসহ তাঁর সহচররা যে পথ দিয়ে অগ্রসর হয়েছিলেন তার উভয় পার্শ্বের জনসাধারণের পানির কষ্ট নিবারণের জন্য দিঘি খনন করেছিলেন। কেশবপুরের বিদ্যানন্দকাটি, মাগুরাঘোনা, আসরনগর, পাইকগাছার লষ্করবেড়, বেদকাশিসহ বিভিন্নস্থানে এ ধরনের দিঘির অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

 

কারো কারো মতে বুড়া খাঁ বাগেরহাট থেকে চলে এসে সাতক্ষীরার প্রাণকেন্দ্রের পলাশপোল গ্রামে বাড়ি ঘর তৈরি করে বসতি স্থাপন করেন। গড়ে তোলেন পলাশপোল চৌধুরী বাড়ি। চৌধুরী বাড়ির পূর্বপাশের একটা দরগা তৈরি করে সেখানে ধর্ম সাধনা করতে থাকেন। দরগাটি বিরাট এক বটগাছ কাঁধে নিয়ে বহুকাল টিকে ছিল। বুড়া খাঁ তার বংশধরদের রেখে যান পলাশপোল চৌধুরী বাড়িতে। চৌধুরী বাড়ির অধীনে তখন পলাশপোল মৌজার বৃহৎ এলাকা। এলাকাবাসী খাজনা দিতো চৌধুরীদের। এটি সাতক্ষীরার জমিদারদের অধীনে ছিল না।

 

গুড়পুকুরের মেলার নামকরণের ইতিহাস খুঁজতে সাতক্ষীরার কোনো কোনো লেখক কামদেব, জয়দেবদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের সময়কাল চতুর্দশ শতাব্দির মধ্যভাগ পর্যন্ত পিছনে গেছেন এবং শুরু করেছেন সেখান থেকেই। কিন্তু এই কামদেব, জয়দেবরা কোথা থেকে এলেন এবং তাদের পূর্বপুরুষরা কারা ছিলেন সেই ইতিহাস খুঁজে দেখেননি। অথবা সেটাকে গুরুত্ব দেননি।

 

ইতিহাসে পাওয়া যায় কামদেব, জয়দেবরা ছিলেন গুড় বংশের উত্তরসূরি। এই গুড় বংশের উৎপত্তি মুর্শিদাবাদের ৬ ক্রোশ পশ্চিমে গুড় গ্রাম থেকে। কনোজাগত দক্ষ-এর জ্যৈষ্ঠ পুত্র ধীর ‘গুড় গ্রাম’ প্রাপ্ত হয়ে সেখানে বসবাস শুরু করেন। সেজন্য এই বংশের লোকজন গুড়ী বা গুড়গ্রামী হিসেবে পরিচিতি পান। ধীর হয়ে ওঠেন ‘ধীর গুড়’।

 

এই বংশের চতুর্থ প্রজন্ম শরণ বল্লালসেনের গৌণ কুলীনের অন্যতম। শরণের প্রপৌত্র ভবদত্ত পশ্চিমবঙ্গের পাঠান শাসনকালে গুণগরিমায় খাঁ উপাধি পান। ব্রাহ্মণের খাঁ উপাধি পাওয়ায় লোকে তাঁকে ‘বামন খাঁ’ বলতেন। ভবদত্তের পৌত্র রঘুপতি আচার্য্য শেষ বয়সে বানপ্রস্থ অবলম্বন করে (ধর্মীয় কারনে অবসর গ্রহণ) কাশীবাস কালে পান্ডিত্যের জন্য দন্ডীদের নিকট হতে একটি স্বর্ণদন্ড উপহার পান, এজন্য তাঁর উপাধি হয় কনকদন্ডী। তাঁর বংশধররা কনকদন্ডী গুড় বলে পরিচিতি পান।

 

বল্লালসেনের সময় সূর্যমাঝি নামক একজন জেলে সম্প্রদায়ের লোক অদ্ভুত কাজের পুরস্কার স্বরূপ সূর্যদ্বীপের রাজত্ব পান। এই সূর্যমাঝির এক অধস্তন পুরুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে সুলতান মাঝি বলে পরিচিত হন। প্রবাদ আছে, কনকদন্ডী গুড়-এর পুত্র রমাপতি এই সুলতান মাঝির কাছ থেকে সূর্যর্দ্বীপ অধিকার করে নেন।

 

রমাপতির চার পুত্র-সর্ব্বানন্দ, জ্ঞানানন্দ, প্রেমানন্দ ও অমৃতানন্দ। তন্মধ্যে অমৃতানন্দ সরস্বতী সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণ করে সিদ্ধিলাভ করেন। জ্ঞানানন্দের পুত্র জয়কৃষ্ণ; তৎপুত্র নাগরনাথ ও দক্ষিণানাথ। সম্ভবত: রাজা গণেশের সময় নাগর ও দক্ষিণানাথ ভ্রাতাদ্বয় হিন্দু নরপতির সাহায্য করে সন্তুষ্ঠ করেন এবং তার ফলে রায়চৌধুরী উপাধি পান। এই দুই ভ্রাতা চেঙ্গুটিয়া পরগণা দখল করেন এবং অপেক্ষাকৃত নিরাপদ প্রদেশে সদর্পে শাসনদন্ড পরিচালনার জন্য দক্ষিণডিহি অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করেন। কেউ কেউ দক্ষিণডিহি নামের সাথে দক্ষিণানাথ নামেরও সম্বন্ধ স্থাপন করেন।

 

নাগরনাথ নি:সন্তান ছিলেন। দক্ষিণানাথের চার পুত্র ছিল- কামদেব, জয়দেব, রতিদেব ও শুকদেব। ১৪৪২ খ্রিষ্টব্দে খান জাহান আলী দক্ষিণবঙ্গ জয় করেন। দক্ষিণডিহিতে তাঁর শাসন প্রতিষ্ঠার পর কামদেব ও জয়দেব প্রধান কর্মাধ্যক্ষ হন এবং তাঁর উজীর হন মুহম্মদ আবু তাহের। এই মুহম্মদ আবু তাহের ছিলেন ব্রাহ্মণ এবং তার নাম ছিল গোবিন্দ ঠাকুর। তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তার বিভিন্ন কর্মকান্ডে সন্তুষ্ট হয়ে স্থানীয় হিন্দু মুসলমানরা তাঁকে ‘পীর আলী’ উপাধি দেন। এই পীর আলীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে স্থানীয় হিন্দু বৌদ্ধরা দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে থাকেন। এভাবে যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন, তারা পীর আলী মুসলমান’ বলে চিহ্নিত হন এবং যারা ইসলাম গ্রহণ করলেন না তারা পীর আলী ব্রাহ্মণ, পীর আলী কায়স্থ, পীর আলী নাপিত ইত্যাদি হিসেবে চিহ্নিত হন। এইরূপ পীর আলী বা পীরালি হিন্দু ও মুসলমান যশোহর-খুলনার বহুস্থানে বসবাস করেন।

 

পীর আলী উপাধি সম্পর্কে আর একটি ধারণা প্রচলিত আছে। দক্ষিণানাথ রায় চৌধুরীর দুই পুত্র কামদের ও জয়দের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করায় তৎকালীন ব্রাহ্মণ সমাজ তাদেরকে ভালো চোখে দেখতো না। তাদের অপর দুই ভ্রাতা রতিদেব ও শুকদেবসহ অন্যান্য আত্মীয় স্বজন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করলেও তাদেরকে সমাজচ্যুত করা হয়। এজন্য কামদেব ও জয়দেবদেরকে পীর আলী মুসলমান এবং রতিদেব ও শুকদেবসহ তাদের অন্যান্য আত্মীয় স্বজনদের পীর আলী ব্রাহ্মণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কারো কারো মতে পীর আলী উপাধিটাকে এভাবে উপস্থাপন করা হলেও প্রকৃত পক্ষে অনেকের কাছে এটি একটি সম্মানজনক পদবীতে পরিণত হয়।
একবার রোজার দিনে কামদেব, জয়দেরসহ কর্মচারিরা বসে থাকা অবস্থায় একব্যক্তি পীর আলীকে একটি সুগন্ধি কমলা লেবু উপহার দেন। পীর আলী উক্ত কমলার ঘ্রাণ নেন। এ সময় কামদেব রসিকতা করে বলেন, হুজুর, ঘ্রাণ নিলে যে অর্ধেক ভোজন হয়, আপনি যে গন্ধ গ্রহণ করে রোজা ভেঙে ফেললেন?

 

পীর আলীর দরবারে এই হাস্য রসিকতার কিছুদিন পর দরবারে গরুর মাংস রান্না হচ্ছিল। এর গন্ধে দরবার ভরপুর ছিল। এ সময় কামদেব ও জয়দেবসহ প্রজারা দরবারে উপস্থিত হন। তখন কামদেব কিসের গন্ধ জিজ্ঞেস করলে পীর আলী বলেন, সেখানে গরুর মাংস রান্না হচ্ছে। আর ঘ্রাণে তাদের অর্ধেক ভোজন হওয়ায় জাত গেছে। এই ঘটনার কিছুদিন পর কামদেব ও জয়দেব ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে কামাল উদ্দীন খাঁ ও জামাল উদ্দীন খাঁ উপাধি পান (কমলা লেবু ও গরুর মাংস রান্নার ঘ্রাণ সম্পর্কিত হাস্য রসিকতার ঘটনাটি দরবারের পীর আলীর পরিবর্তে খান জাহান আলীর সাথে হয়েছিল বলে কোন কোন লেখায় উল্লেখ রয়েছে)।

 

পরবর্তীতে কামাল উদ্দীন খান ও জামাল উদ্দীন খান জায়গীর পেয়ে নিকটবর্তী সিঙ্গিয়া গ্রামে বাস করতে শুরু করেন। তাঁরা মুসলমান হলেও হিন্দু আচার ব্যবহার পরিত্যাগ করতে তাদের বহুপুরুষ লাগে। এসময় পীর আলী মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তারা বহুপুরুষ পর্যন্ত হিন্দুর মতো নাম রেখে শিবপূজা, শিবরাত্রিব্রত, ষষ্ঠীপূজা প্রভৃতি অনুষ্ঠান করতেন।

 

মোগল শাসনের শুরুতে জনৈক চাঁদ খাঁ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে এঁর নেতৃত্বে বহু মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এই চাঁদ খাঁ সাতক্ষীরার চাঁদপুরে বসবাস করতেন। তিনিও পীর আলী মুসলমান হিসেবে পরিচিতি পান।

ক্রমে ক্রমে সাতক্ষীরার শ্রীরামপুর, কুলিয়া, কোমরপুর, পলাশপোল, হেলাতলা, নগরতলা, (সম্ভবত নগরঘাটা) গণপতিপুর, পাথরঘাটা, হাকিমপুর, রসুলপুর প্রভৃতি স্থানে পীরালি মুসলমানের বসবাস শুরু হয়।

 

দক্ষিণানাথ রায় চৌধুরীর পুত্র কামদেব ও জয়দেব ওরফে কামাল উদ্দীন খাঁ ও জামাল উদ্দীন খাঁ গুড় বংশের ত্রয়োদশ প্রজন্ম। তাদের অপর দুই ভাই রতিদেব ও শুকদেব। এরমধ্যে শুকদেব প্রথম পীর আলী হিসেবে চিহ্নিত। এই শুকদেবের বংশধররা দক্ষিণডিহী, হলদা-মহেশপুর, জগন্নাথপুর, মহাকাল, শেখহাটি, নরেন্দ্রপুর, ঘোপেরঘাটসহ বিভিন্নস্থানে ছড়িয়ে পড়েন। শুকদেবের কন্যা বা পৌত্রীর বিবাহ হয় খুলনার পিঠাভোগের কুশারী বংশে। এই বংশে বিবাহ করেন কবিগুরু রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরসহ ঠাকুর পরিবারের অনেকেই।

গুড়পুকুর এর পাশে মনষা পূজা ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সাল

সাতক্ষীরার গুড়পুকুরের মেলার নামকরণ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মত প্রচলিত হয়েছে। যেমন-

ক) কেউ বলেন, মনসা পূজার সময় পুকুরে বাতাসা ফেলা হতো। ওই বাতাসার জন্যে পুকুরের পানি মিষ্টি লাগতো। তখন থেকেই গুড়পুকুর।

খ) অনেকের ধারণা পুকুরে পানি থাকতো না বেশিদিন। স্বপ্ন দর্শনে জানা গেল একশ’ ভাঁড় গুড় ঢালতে হবে পুকুরে। স্বপ্ন নির্দেশ মোতাবেক কাজ করা হলো। সেই যে পুকুরে পানি এলো আর শুকালো না।

গ) আবার শোনা যায় পুকুরের তলদেশ থেকে এক সময় মিষ্টি পানি উঠতো তাই এর নাম গুড়পুকুর হয়েছে।

ঘ) আবার কারো মতে পুকুরের জায়গাতে অসংখ্য খেজুর গাছ ছিল এবং প্রচুর রস হতো ওই গাছে। একবার গাছের সমস্তরস দিয়ে গুড় তৈরি করে তা বিক্রি করা হলো এবং ওই বিক্রিত টাকা দিয়ে পুকুরটি কাটা হলো। তখন থেকে গুড়পুকুর।

ঙ) আবার পলাশপোল চৌধুরী পাড়ার রায় চৌধুরীরা গৌর বর্ণের ব্রাহ্মণ ছিলেন। তাই তাদের পুকুরকে বলা হতো গৌরদের পুকুর। কালক্রমে হয়েছে গুড়পুকুর।

 

দুই.
সাতক্ষীরার এই গুড়পুকুরের মেলাকে ঘিরে প্রতিবছর ভাদ্র মাসের শেষ দিনে পলাশপোল গুড়পুকুরের দক্ষিণ পাশে মনসা পূজা অনুষ্ঠিত হয়। মা মনসা হিন্দুধর্মের লৌকিক সর্পদেবী। মধ্যযুগের লোককাহিনী বিষয়ক মনসামঙ্গল কাব্যের প্রধান চরিত্র। আষাঢ় মাসের কৃষ্ণাপঞ্চমী তিথিকে বলা হয় নাগপঞ্চমী। ভাদ্রমাসের কৃষ্ণাপঞ্চমী তিথিতেও মনসাপূজার বিধান আছে। বর্ষাকালে সাপের উপদ্রুপ বেড়ে যায়, তাই সর্পদংশন প্রতিরোধ ও সাপের বিষের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এ সময় তাঁর পূজা করা হয়। বাঙালি মেয়েরা শ্রাবণ মাসের নাগ পঞ্চমীর দিন উপবাস ব্রত করে সাপের গর্তে দুধ ঢালতেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে, প্রতিমায় মনসা পূজা করা হয় না। মনসা পূজিতা হন বিশেষভাবে সর্পচিত্রিত ঘট বা ঝাঁপিতে। যদিও কোথাও কোথাও মনসা মূর্তিরও পূজা হয়। বর্তমানে সর্বজনীনভাবে মনসাদেবীর মন্দিরে মনসাপূজা করা হয়। আবার পারিবারিক পর্যায়ে পারিবারিক মন্দিরেও মনসাদেবীর পূজা হয়। প্রধানত সর্পদংশনের হাত থেকে রক্ষা পেতে বা সর্পদংশনের প্রতিকার পেতে মনসার পূজা করা হয়।

 

এক সময় সাতক্ষীরা শহরের পলাশপোলসহ বিভিন্ন এলাকা ঘনজঙ্গলে ঘেরা ছিল। এখানে ছিল বিষধর সাপের উপদ্রুপ। ধারণা করা হয় সে কারণে এখানে মনসা পূজার প্রচলন হয়।

 

তবে, গুড় পুকুরের মেলার উৎপত্তির মতো মেলা এলাকায় মনসা পূজার উৎপত্তি নিয়েও রয়েছে নানা কাহিনী। সেই বাংলা ১২ শতকের কোনো এক সময় বুড়া খাঁর বংশধর ফাজেল খান চৌধুরী পলাশপোল এলাকায় খাজনা আদায় করে ফিরছিলেন। সেদিন ছিল ভাদ্র মাসের ৩১ তারিখ। ক্লান্ত ফাজেল খাঁ গুড়পুকুরের দক্ষিণ পাড়ের বটের ছায়ায় বসেন এবং ঘুমিয়ে পড়েন। এ সময় বটের পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের তীব্র রশ্মি এসে পড়ে ফাজেলের মুখে। তখন ঘুম ভেঙে যেতে লাগল এবং অস্বস্তিবোধ করলেন তিনি। মগডালে ছিল এক পদ্মগোখরো। সাপটি এই অবস্থা দেখে যে পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের রশ্মি পড়ছিল ফাজেলের মুখে ঠিক সেখানে ফণা তুলে দাঁড়াল। সাপের ফণার ছায়া এসে পড়ল ফাজেলের মুখে। আরাম পেয়ে আবারো ঘুমিয়ে পড়লেন তিনি। কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে থাকার পর আবার ঘুম ভেঙে গেল। এর মধ্যে ক্লান্তি অনেকটা দূর হয়ে গেছে তার। বটের পাতায় পাতায় দৃষ্টি ঘোরাতে লাগল ফাজেল। হঠাৎ চোখে পড়ল সেই সাপটা। তখনও সে ফণা তুলে সূর্যকে আড়াল করে রেখেছে। এবার ফণাটা একটু দুলে উঠল। দুলে উঠল গাছের পাতারা। ফণা নামিয়ে সাপটা হারিয়ে গেল ডালে ডালে। আবার সূর্য রশ্মি এসে পড়ল ফাজেলের মুখে। তখন তার চোখে ঘুমের রেশ মাত্র নেই। শরীরে নেই একরত্তি ক্লান্তি। ফাজেল বটতলা ত্যাগ করল এবং এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের ডেকে বলল, এখানে তোমরা মনসা পূজা করো।

 

সাতক্ষীরার জেলার ওয়েব পোর্টালে জেলার ঐতিহ্য হিসেবে সোবহান খান চৌধুরীর উদ্ধৃতি দিয়ে এ কাহিনী লেখা হয়েছে। তার এই বর্ণনা অনুযায়ী ১২ শতকের কোনো এক সময়ের এই কাহিনী অনুযায়ী গুড়পুকুর পাড়ে মনসা পূজার বর্তমান (১৪৩০ বঙ্গাব্দ) বয়স হয় দু’ শ’ বছরের কাছাকাছি। সেই পূজাকে ঘিরে এই মেলা শুরু হয়েছে হয়তো আরো পরে অথবা আগে মেলা পরে পূজা শুরু হয়েছে। তবে উক্ত কাহিনী অনুযায়ী বর্তমানে এই মেলার বয়স সর্বোচ্চ দু’ শ’ বছর।

 

তিন.
পলাশপোল এলাকার প্রবীন ব্যক্তিত্ব সাপ্তাহিক সূর্যের আলো সম্পাদক আব্দুল ওয়ারেশ খান চৌধুরী এই মেলা, পুকুর এবং মনসা পূজার উৎপত্তি নিয়ে আলোচনা করতে বেশ আগ্রহী মানুষ। তিনি বলেন, তৎকালীন বুড়ন পরগনার পলাশপোলসহ বেশ কয়েকটি মৌজা সাতক্ষীরার জমিদারদের অধীনে ছিল না। এসব মৌজার খাজনা আদায় করা হতো পলাশপোলের চৌধুরীপাড়ায়। এখানকার খাজনা আদায়ের কাছারিবাড়িতে বর্তমানে আমজাদ খান চৌধুরী ও শওকত খান চৌধুরীর পরিবার বসবাস করেন। আদায়কৃত খাজনা সরাসরি রাজার দরবারে জমা দেওয়া হতো। আউস ধান ওঠার সময় ভাদ্র মাস ছিল প্রজাদের খাজনা পরিশোধের নির্ধারিত শেষ সময়। হয়তো সেটা ভাদ্র মাসের শেষ তারিখ হতে পারে।

 

ওয়ারেশ খান চৌধুরী আরো বলেন, সাধারণ মুসলমানরা যেসব ধর্মীয় আচার, অনুষ্ঠান, প্রথা, রীতি বহু পূর্ব থেকে পালন করে আসছে সেগুলো চৌধুরীদের মধ্যে এসেছে অনেক পরে। কিছুদিন পূর্বেও চৌধুরীদের ছেলে মেয়েদের বিয়ে-শাদী নিজেদের বংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। চৌধুরীদের পুরাতন বাড়িগুলো হিন্দু সম্প্রদায়ের অভিজাত পরিবারের বাড়ি ঘরের মতোই ছিল। ঘরের প্রশস্ত দেওয়ালে খাদ কেটে মূর্তি রাখার মতো ছোট ছোট ঘর রাখা হতো। সেগুলোর চারিপাশে আলপনা আঁকা হতো। ওয়ারেশ খান চৌধুরীর বর্ণনার সাথে বর্তমানেও পলাশপোল এলাকায় অনেক পরিবারের কিছু কিছু মিল পাওয়া যায়। পুরাতন বাড়ি-ঘরগুলোতে সেই অতীতের ছাপ পাওয়া যায়।

 

চার.
সাতক্ষীরার গুড়পুকুরে মেলা এক সময় এ অঞ্চলের ব্যবসা-বানিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সারাবছর ধরে নিয়মিত কাজের অবসরে সংশ্লি¬ষ্ট কাজের সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা দা, কুড়াল, খুন্তা, কড়াই, কোদাল, ছুরি, চাকু, লাঙ্গল, ফলা, ধামা, কুলা, ঝুড়ি, খারা, চেয়ার, টিবিল, খাট, পালং, শোকেজ, আলমারি, দরজা, জানালা, মাটির তৈরী হাড়ি-পাতিল, কলসসহ বিভিন্ন সামগ্রী তৈরী করে মজুদ করতো। সম্ভবত এদেশে নার্সারী শিল্পের গোড়াপত্তন হয় সাতক্ষীরা থেকে এবং তা আসে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে। এক সময় এই এলাকায় গড়ে ওঠে বড় বড় নার্সারী। সে সময়ে এখানে মেলাকে সামনে রেখে লক্ষ লক্ষ গাছের চারা উৎপাদন করা হয়। সেই চারা বেচা-কেনা হতো গুড়পুকুরের মেলায়। আনুষ্ঠানিকভাবে মেলা শুরুর ১৫দিন থেকে একমাস আগে গাছের চারা নিয়ে অস্থায়ী দোকানগুলোর কার্যক্রম শুরু হয়ে যেত। সারাদেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ গাছের চারা কেনার জন্যেও এই মেলায় আসতেন।

 

এক সময় এই মেলা বৃক্ষমেলা হিসেবেও পরিচিতি পায়। গাছের চারা ছাড়াও হাজারো সামগ্রী তৈরী করে মজুত করা হতো সাতক্ষীরা খুলনা যশোরসহ বিভিন্ন এলাকা বাড়িতে বাড়িতে। রীতিমতো এসব তৈরীর সময়ও উৎসব চলতো। তারপর মেলার নির্ধারিত সময়ের পূর্ব থেকেই পশারীরা সাতক্ষীরা শহরে এসে বিভিন্ন এলাকায় বসে পড়তো। ভাদ্র মাসের শেষ দিন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া তিন দিনের এই মেলা চলতো আশ্বিন মাসব্যাপি। তারপর কর্তৃপক্ষ অস্থায়ী দোকানঘরগুলো ভেঙে না দেওয়া পর্যন্ত অনেকেই থেকে যেতেন আরো অনেক দিন।

 

সাতক্ষীরা খুলনা যশোরাঞ্চল নয় কোলকাতাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের আগমন ঘটতো এই মেলায়। ফলে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এই মেলা ছড়িয়ে পড়ে সাতক্ষীরা শহরব্যাপি। ১৯৮৪ খ্রি. জেলায় উন্নীত হওয়ার পূর্বে তৎকালীন সাতক্ষীরা মহাকুমার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল খুবই অনুন্নত। এ সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল মূলত নদী কেন্দ্রীক। খাদ্যসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র ছাড়া অন্যান্য সামগ্রীর জন্য অপেক্ষা করতে হতো আশাশুনির বড়দলের সাপ্তাহিক হাট, দেবহাটার পারুলিয়া সাপ্তাহিক গরুহাট, শ্যামনগরের নওয়াবেকী সাপ্তাহিক হাটসহ হাতে গোনা কয়েকটি হাটের জন্য। সেখানেও অনেক কিছু পাওয়া যেত না। কালক্রমে গুড়পুকুরের মেলা হয়ে ওঠে সেইসব দুষ্প্রাপ্য সামগ্রীর বেচা- কেনার কেন্দ্রবিন্দু।

 

যদিও স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে এই মেলার কেন্দ্রস্থল সাতক্ষীরা শহরের পলাশপোল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের উত্তর পাশের বটতলাকে ঘিরে। মেলার পরিধি ছিল পুরাতন বাসস্ট্যান্ড থেকে বর্তমান জজকোট পর্যন্ত। এছাড়া বর্তমানের মতো সে সময় পলাশপোল গুড়পুকুর এলাকায় এত বাড়ি ঘর দোকানপাট ছিল না। এই এলাকা ঘিরে বসতো মূল মেলা। বর্তমানের পূজার স্থানটিতে থাকা বটগাছটির স্থানে বিশাল আকৃতির একটি বটগাছ ছিল। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই ১৯৭২-৭৩ সালে সেই গাছটি কেটে ফেলা হয়। বটগাছটি ছিল মনসা পূজার কেন্দ্রবিন্দু। এখানে থাকা পূজার পুরাতন থানটি পরবর্তীতে নতুন বটগাছটি ঘিরে সংস্কার করা হয়েছে।

 

মেলার পরিধি এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী গুড়পুকুরের মেলা সম্পর্কে ধারণার জন্য এই লেখকের পূর্বে প্রকাশিত একটি লেখা “সাতক্ষীরার গুড়পুকুরের মেলা: একাল সেকাল” পঞ্চম পরিচ্ছেদে যুক্ত করা হলো।

 

পাচ.
এক মেলায় লক্ষ্মীঘট কিনতাম, আর এক মেলায় তা ভেঙে যে টাকা হতো তাই দিয়ে খেলনা সামগ্রীসহ অন্যান্য জিনিষপত্র কিনতাম। তখন আমি স্কুলে পড়ি। বাড়ির সামনে হাট। প্রতিদিন বিকালে হাট বসতো। বাবা প্রতিদিন কোর্ট থেকে এসে ৫ পয়সা- আবার কোন কোন দিন ১০ পয়সা দিতেন। তখন ৫ পয়সায় একটা আইসক্রিম পাওয়া যেত। ঐ হাটে বিকালে সাধারণত যে আইসক্রিম পাওয়া যেত তা অনেকটা গলে যাওয়া। ফলে ৫ পয়সায় কখনো কখনো ২-৩টা আইসক্রিমও কিনতাম। মাঝে মধ্যে যে পয়সা বাঁচতো তা ফেলতাম লক্ষ্মীঘটে। এভাবেই সারা বছর পর ৪-৫ টাকা যা হতো তাই ছিলো আমার সম্বল। তা ছাড়া মেলা উপলক্ষেও বাবা চারআনা-আটআনা, মা আরো দু’এক টাকা ছাড়া আত্মীয়-স্বজন যারা মেলা দেখতে আমাদের বাড়ি এসে উঠতেন তাদের কাছ থেকেও পাওয়া যেত নগদ অর্থ ছাড়াও মেলার জিনিষপত্র। তারা সঙ্গে নিয়ে যেয়ে পছন্দমত জিনিষপত্র কিনে দিতেন।

আমাদের বাড়ি তখন কেবল একতলা হয়েছে। ৫টি ঘর এবং সামনে পিছনের বারান্দা ভরে যেত আত্মীয়-স্বজনে। বোন-বোনাইরা আসতেন। সাথে তাদের ননদ-দেবরসহ অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন। আমাদের রাত কাটানোর জায়গা ছিলো ফাকা ছাদের উপর। যদিও মূল মেলার সময় আমরা রাত কাটাতাম সারারাত সিনেমা দেখে। বাড়িতে কখনো কখনো দাদী নানীরাও আসতেন। তাদের কাজ ছিলো রান্না ঘর সামলানো। প্রায় সারাটা দিনই তাদের কাটতো রান্না ঘরে।

 

সাধারণত মূল মেলার তিনদিন শহরের প্রায় সকল স্কুল ছুটি থাকতো। আমরা সকাল হলেই বেরিয়ে পড়তাম মেলা দেখতে। হাওয়াই মিঠাই খেয়ে মুখ লাল করে ঘুরে বেড়াতাম। কখনো রসমুন্ডা, বাতাশা, গজাসহ মিস্টি-মিঠাই কিনে বাড়ি ফিরতাম। আঁখ কিনে চিবুতে চিবুতেও ঘুরতাম বিভিন্নস্থানে। নাগরদোলায় চড়ার আনন্দটাই ছিল আলাদা। তারপর দু’আনা চারআনা দিয়ে প্রথম দিকে মাটির নৌকা, গাড়ি, মাথা কাপানো বুড়ো দাদাসহ বিভিন্ন পুতুল কিনে নৌকায় দড়ি বেঁধে পাকারাস্তা ধরে টানতে টানতে বাড়ি আসতাম। তারমধ্যে নৌকা বা গাড়ির চাকা শেষ। বুড়ু দাদার দাড়ি খুলে গেছে। তাই আরো পরের দিকে মাটির খেলনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে টিনের প্রতি আকর্ষণ শুরু হয়। পিস্তল কিনে কাগজে লাগানো বারুদের ব্যান্ডিল নিয়ে শুরু করতাম চোর-পুলিশ আর দারোগার খেলা। দু’একদিনের মধ্যে ভেঙে যেয়ে পিস্তলও শেষ। তাই আরো বেশি দামের ভালো টিনের খেলনা পিস্তল কিনতাম মেলার শেষের দিকে। শুনেছি মেলার শেষের দিকে দাম কমে যায়। তাই প্রতিদিন যেয়ে দাম শুনতাম, দাম কমেছে কি না? লঞ্চ কিনতাম। আর তার পলতেতে আগুন ধরিয়ে পানিতে ছেড়ে দিতাম। বড-বড করে চলতো কিছু সময়। তারপর পানি ঢুকে লঞ্চ শেষ।

 

গুড়পুকুরের মেলা ছিলো সাতক্ষীরাবাসির মিলনমেলা। হিন্দু মুসলিম সব সম্প্রদায়ের মানুষের এক হওয়ার মহা উৎসব। যে উৎসবের ঢেউ ছড়িয়ে পড়তো তৎকালীন সাতক্ষীরা মহাকুমার সকল এলাকায়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের মধ্যে।

 

আমার বাবা সারা বছর ধরে এই মেলার জন্য অপেক্ষা করতেন ঘরের একটি দরজা অথবা জানালা বা চেয়ার-টেবিল কেনার জন্য। মা অপেক্ষা করতেন খুন্তা কড়াই দা বটি ধামা কুলা ঝুড়ি বা অন্য কোন জিনিষ কেনার জন্য। শহরের বাইরের মানুষেরও অপেক্ষা ছিলো এ মেলার জন্য। কৃষক তার চাষের জিনিষপত্র তথা লাঙ্গল ফলা ইত্যাদী কেনার জন্য অপেক্ষা করতেন। শ্রমিক তার নির্মাণ কাজের জন্য হাতুড়ি কড়াইসহ প্রয়োজনীয় জিনিষ কিনতেন এই মেলা থেকে।

 

এতো গেল ক্রেতাদের কথা। কাঠ মিস্ত্রিরা সারা বছর ধরে তার কাজের ফাকে কাঠের জিনিষপত্র বানিয়ে নিজ বাড়ি ভরতেন। কুমাররা মাটির জিনিষপত্র বানিয়ে মজুদ করতেন। নার্সাারী ব্যবসায়ীরা সারা বছর ধরে চারা তৈরী করতেন। কামাররা বানাতেন লৌহজাত জিনিষপত্র। বিভিন্ন পেশার মানুষ সারা বছর ধরে গায়ে-গতরে খেটে এসব তৈরী করতেন মেলায় বিক্রি করে একসাথে অনেক টাকা উপার্জনের জন্য। প্রথমে দাম একটু বেশ হলেও পরে কম দামেই সব বিক্রি করে একসাথে অনেকগুলো নগদ টাকা নিয়ে তারা বাড়ি ফিরতেন। তাদের লোকসান হতো না। কারণ অবসর সময়েই কমদামে সংগ্রহ করা সামগ্রী দিয়েই এগুলো বানাতেন তারা।

 

শুনেছি সাতক্ষীরার প্রাণসায়রে লঞ্চ চলতো। তবে আমরা তা দেখেনি। আমরা দেখেছি সাতক্ষীরা বড়বাজারের কাছে প্রাণসায়র খালে একটা বড় দোতলা লঞ্চ বাঁধা ছিল বেশ কয়েক বছর। বর্তমান সাতক্ষীরা নাইট স্কুলটি তখন ছিল সাতক্ষীরার এসডিপিও’র অফিস। সামনে লেখা ছিল জ্ঞান মন্দির। তার সামনে থাকতো স্পীডবোর্ড বাঁধা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্পীড বোর্ড থাকতো বড়বাজারের দক্ষিণ পাশে খাদ্যগুদামের দক্ষিণ দিকে। আর স্টেডিয়ামের সামনে বর্তমান টেনিস গ্রাউন্ড ছিল তখন বিডিআর ক্যাম্প। ক্যাম্পের পাশে বাঁধা থাকতো বিডিআর ও এসডিও’র স্পিডবোর্ড। প্রাণসায়রের পানি উন্নয়ন বোর্ড এলাকা থেকে গার্লস স্কুলের কাঠের পুল পর্যন্ত থাকতো ছোট বড় শত শত গহনা ও টাবরু নৌকা। মেলার বিভিন্ন সামগ্রী আসতো ঐ সব নৌকায়। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ নৌকায় করে মেলায় এসে রাত কাটাতো সেখানে। রান্না-বান্না খাওয়া দাওয়া চলতো ঐসব নৌকায়।

 

শহরের সঙ্গীতা সিনেমা হলের উত্তর পাশের রাস্তার দু’ধারে সারিবদ্ধভাবে বসতো অসংখ্য নার্সারীর দোকান এবং তা বর্তমান নিউমার্কেট পর্যন্ত যেত। তার উত্তর পাশে প্রায় বর্তমান জজকোর্ট পর্যন্ত বসতো কাঠের ফার্নিচার, দা-বটি-খোন্তা-কোদাল-লাঙ্গলসহ বিভিন্ন লৌহজাত সামগ্রী। পলাশপোল স্কুলে বসতো বাশ বেতের বিভিন্ন সামগ্রীর দোকান। আর সেই সাথে নাগরদোলা। পাশে গুড়পুকুর কান্দায় (পাড়ে) বসতো জিলাপি বাতাশাসহ হরেক রকমের মিষ্টি মিঠাইয়ের দোকান। পলাশপোল বর্তমান সেটেলমেন্ট অফিসের এলাকাটি (আমতলা নামে খ্যাত) ছিল সার্কাসের এলাকা। এখানে সার্কাস বসতো। তখন সাতক্ষীরা নিউমার্কেট নির্মিত হয়নি। ঐ স্থানে টিনের বেড়া দিয়ে উপরে চট টাঙিয়ে প্রোজেক্টর মেশিনের মাধ্যমে অস্থায়ী সিনেমা হল বসানো হতো।

 

লাবনী সিনেমা হলের সামনের রাস্তাটির দু’ধারে পাকাপুল পর্যন্ত বসতো হরেক রকমের খেলনা সামগ্রীসহ মনোহরি পন্যের দোকান। পাকাপুলের বর্তমান মুক্তিযোদ্ধা সড়কে থাকতো কমদামী কাঠের চেয়ার টেবিল চৌকি দরজা জানালাসহ কাঠজাত সামগ্রীর দোকান। পাকাপুলের উত্তর পাশের পাওয়ার হাউজের পাচিলের পূর্ব পাশে বসতো আখ লেবুসহ বিভিন্ন ফলের দোকান। মাটির খেলনার দোকান বসতো এর আশে পাশের এলাকায়। ইলিশের দোকান বসতো ইটাগাছা হাটের সামনে। আর সাতক্ষীরা স্টেডিয়ামে কখনো কখনো বসতো যাত্রা-সার্কাস-পুতুলনাচের আসর। এ রকমই ছিল সাতক্ষীরার গুড়পুকুরের মেলার পরিধি। এক এক বছর এর কম বেশি হতো।
ভাদ্র মাসের ৩১ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে মেলা শুরু হওয়ার ১৫ দিন পূর্ব থেকে শুরু হতো দোকান পাট বানানোর কাজ। মূল মেলা ৩দিনের হলেও তা চলতো মাসব্যাপি। তারপর পুলিশ ভেঙে না দেওয়া পর্যন্ত ব্যবসায়ীরা থেকে যেত। মূল মেলার তিনদিন সাতক্ষীরা-কালিগঞ্জ সড়ক ছাড়া মেলা এলাকায় তেমন কোন যানবাহন চলতো না। চলার কথাও নয়। পাকাপুল থেকে লাবনী পর্যন্ত মানুষের ভীড় ঠেলে যাতায়াত করতে কখনো কখনো আধাঘন্টাও সময় লেগে যেত। দিনরাত ২৪ ঘন্টার শেষ রাতের কিছু সময় ছাড়া প্রায় সকল সময় মেলার দোকানপাট খোলা থাকতো।

 

মেলায় দেশের বিভিন্নস্থান থেকে আগত হাজার হাজার মানুষের মধ্যে যাদের শহরে আত্মীয়স্বজন ছিল তারা তাদের বাড়িতে উঠতেন। দক্ষিণের মানুষের থাকা খাওয়া ছিল নৌকার মধ্যে। এছাড়াও আরো বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য তখনকার একমাত্র সিনেমা হল লাবনী, পরে সঙ্গীতা, নিউমার্কেটের অস্থায়ী সিনেমা হলে সারা রাত ব্যাপি এক টিকিটে ২-৩টি ছবি দেখার ব্যবস্থা করা হতো। এছাড়া যাত্রা চলতো সারারাত। ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষের রাত কাটানোর ব্যবস্থা হয়ে যেত এভাবেই। এরপরও পার্কে, পুরাতন বাসস্টান্ডে এবং বিভিন্ন বাসা বাড়ির সামনের বারান্দায়ও মানুষ রাত কাটাতো।

 

সাতক্ষীরার ঐতিহ্যের এই মেলা আশির দশকের শুরু দিক থেকেই তার জৌলুস হারাতে থাকে রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের চাঁদাবাজির কারণে। তারপরও শুরুটা উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় হলেও শেষটা হতো ভালোভাবেই। তবে শহরে একের পর এক বাড়ি ঘর দোকান পাট মার্কেট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের কারণে মেলার স্থান অনেকটা সংকীর্ণ হতে শুরু করলেও মানুষের মধ্যে উৎসাহ উদ্দীপনা কমেনি। মেলার ধারাবাহিকতা ছিল ঠিকই। কিন্তু ২০০২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মেলা উপলক্ষে সাতক্ষীরা স্টেডিয়ামে বসা সার্কাস প্যান্ডেল এবং শহরের রকসি সিনেমা হলে বোমা হামলায় ৩জন নিহত এবং অর্ধ শতাধিক আহতের ঘটনার পর এই মেলা তার জৌলুস হারায়। কয়েক বছর বন্ধ থাকে। এরই মধ্যে অল্প সময়ে চিরচেনা সেই সাতক্ষীরা শহরের চেহারা সম্পূর্ণভাবে পাল্টে যায়। পূর্বে সেই মেলার স্থানগুলো এখন বাড়ি ঘর দোকানপাট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণ হয়ে গেছে।

(পুনঃপ্রকাশ)

স্বচ্ছ সমাজের প্রত্যাশায়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:০১ পূর্বাহ্ণ
স্বচ্ছ সমাজের প্রত্যাশায়

নাসরিন সুলতানা
রাষ্ট্র আজ সন্তানদের নিয়ে বিব্রত, চিন্তিত ও অসহায়ত্বের কবলে পড়েছে। কিন্তু আমরা কি উপলব্ধি করছি এ সবের জন্য সবার আগে পরিবারই সবকিছুর জন্য দায়ী। বাবা মায়ের ভুমিকা কি সেটা আগে জানতে ও বুঝতে হবে।বাবা মা কে হতে হবে সৎ ও উন্নত চিন্তার অধিকারী। সন্তানদের আমরা এ্যাকাডেমিক বই ছাড়া কোন সাহিত্য, ধর্ম, রাজনীতি, সংস্কৃতি, বৈজ্ঞানিক, কল্পকাহিনী বা ইতিহাস পড়তে উৎসাহিত করছি কি? বরং অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন করে ভাবছি সন্তানকে উন্নত জীবন উপহার দিতে পারছি। তাকে বাইক, ফোন ,প্রচুর হাত খরচের টাকা, নিত্য পোশাক, বাহিরের নামীদামী হোটেলের খাবার সরবরাহ করে ভাবছি সমাজে আমাদের ও সন্তানের একটা পরিচিতি ও মর্যাদা গড়ে উঠছে। ফেসবুকে এই আমরা বাবা-মায়েরা এসবের ছবি পোস্ট করে জানান দিচ্ছি আমার টাকা আছে, আমার বড় ব্যবসা আছে,আমি বড় পোষ্টে চাকরি করছি। এসব দেখে সন্তানরাও ঠিক একই মানসিকতা নিয়ে বড় হচ্ছে। সে বাবা মায়ের টাকা নিয়ে বন্ধুদের মাঝে নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করে যা অন্য হত দরিদ্র বন্ধুদের মাঝে ঈর্ষার জন্ম দিচ্ছে আর তাদের মাঝে অজান্তেই বৈরিতার সৃষ্টি হচ্ছে।অভিবাবকরাই সন্তানের মাঝে এ বোধ সৃষ্টি করতে পারছে না যে সবাই মানুষ। মানুষ মানেই সহমর্মিতা, মানুষ মানেই মানবিকতা, মানুষ মানেই মানুষ সহ এ পৃথিবীর সকল সৃষ্টিকে ভালোবাসা আর মানুষ মানেই কেবল ভোগ না। নিজের যা কিছু আছে তা দেখানোর নয় বরং তা স্বাভাবিক জীবনের একটা অংশ হিসেবে গ্রহণ করা। সন্তানদের মাঝে আমরা এটা সৃষ্টি করতে পারছি না আমাদের যা কিছু আছে তার একটা অংশের দাবিদার আমাদের আশেপাশের অনেকেই যারা দুর্ভাগ্যক্রমে অসহায়, দুস্থ। বরং তারা সেটাকে উপভোগ করে আর প্রকাশ করতে ব্যস্ত থাকে আমি ধনীর দুলাল বা দুলালী। এতে করে সমাজে হিংসা, লোভ, বিদ্বেষ ইত্যাদি সর্বদা বিস্তার ঘটছে। এরপর আসে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও আইন প্রয়োগের যথার্থ প্রয়োগ। কিন্তু সবার আগে অভিবাবকদের নিজেদের সচেতন হতে হবে যাতে সন্তান একটা সুন্দর মনস্তত্ত্বিক চেতনা নিয়ে নিজেকে মেলে ধরতে পারে পরিবারে, সমাজে সর্বোপরি রাষ্ট্রে। কোন সন্তানের মৃত্যু আর দেখতে চাই না, কোন সন্তান যেন আর ধর্ষিত না হয় বা বলাৎকারের স্বীকার না হয় বা কোন সন্তান যেন আত্মহত্যা আর না করে সেইসাথে মানসিক বিপর্যয় নিয়ে জীবনে বেঁচে না থাকে। কোন মাকে যেন সন্তানের মৃত্যুর কষ্টে বলতে না হয় আমি কি নিয়ে বাঁচবো বা বিচার চাই না, দেশ ধ্বংস হয়ে যাক। এগুলো কারোরই কাম্য নয়। আমরা অভিভাবকেরা দায়িত্বশীল হই, নিজেদের ভুলটা উপলব্ধি করার চেষ্টা করি আর সন্তান হারানোতে সকল মায়ের দুঃখে দুঃখিত হই।

সমাজে আরেক শ্রেণীর বাবা-মা আছেন যারা সন্তানকে অর্থের লোভে আত্মহত্যার দিকে ধাবিত করেন। কিছু নি¤œবিত্ত অভিবাবক অর্থের লোভে মেয়ে সন্তানকে ধনী পরিবারের বখাটে, নেশাখোর সন্তানের সাথে বিয়ে দেন ,অনেক সময় বয়সে ছয়গুন বড় বয়সী বৃদ্ধের সাথে ঘর বাঁধতে দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্ত্রী হিসেবে বা বিপতিœক বৃদ্ধের ঘরে পাঠান সেবা যতেœর জন্য বৈধ বিবাহের মাধ্যমে বা সাময়িক আনন্দের জন্য নিশ্চিতমনে পাঠিয়ে দেন। এতে করে সে মেয়ে সন্তানটি না পায় শারীরিক সুখ, না পায় স্ত্রীর মর্যাদা, না পায় তার কল্পনার স্বর্গের সংসার। বরং প্রতিনিয়ত কপালে জোটে মারধোর, সতীনের গালিগালাজ, আগের পক্ষের সন্তানদের অপমান ও নির্যাতন। একসময় দেখা যায় নেশাখোর স্বামীর ঘর থেকে বা বৃদ্ধ স্বামীর মৃত্যুতে অল্প বয়সে বিধবা হয়ে ছিটকে পড়েছে কল্পনার সংসার থেকে। সন্তানটির জায়গা হয়না সমাজের কোথাও। তখন নিজের ও সন্তানের পেটের ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে বেছে নেয় অনৈতিক পথ যার প্রক্ষিতে সমাজের পরিবেশ হয়ে পড়ছে ভীষণ রকমই দূষিত, পঙ্কিল,অপবিত্র, কলঙ্কিত ও অশুদ্ধ বা কোন পথ না পেয়ে জীবনকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে নিচ্ছে কোন এক অভিমানে। আরেক ধরনের লোভ এখন সমাজকে ভয়ংকরভাবে থাবা মেরেছে যেটা সৃষ্টি হয়েছে মূলত ধর্মীয় অজ্ঞানতার কারণে ।ধর্মের সংজ্ঞার সঠিক ব্যাখ্যার অভাব বা উপলব্ধির অভাবে অনেক অভিভাবক সন্তানকে কেবলই ধর্মের শিক্ষাদানরে জন্য মাদ্রাসাতে পাঠিয়ে থাকেন। জীবনের যে এক বিশাল দিগন্ত , বিশালতা ও অসীম পরিধি আছে তা থেকে সন্তানরা অন্ধকারে থাকছে। জীবন হয়ে পড়ৎেছ স্বল্প পরিসরে বদ্ধ ঠিক খাঁচার পাখিটির মতো। তারা বলাৎকারের স্বীকার হচ্ছে, জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে, আত্মহত্যার পথ বেঁচে নিচ্ছে নতুবা রাষ্ট্রের প্রতি হিংসাত্মক মনোভাবাপন্ন হয়ে পড়ছে। এতে করে সমাজ ও রাষ্ট্র ভাংগনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র এখনই যদি সচেতন না হয় তাহলে হয়তো খুব অচিরেই দেশটি প্রাচীন যুগে ফিরে যাবে। যে যুগে হয়তো পশুর মতো মানুষ একে অপরকে কেবলই হত্যা করবে, হিংসাত্মক আনন্দে মেতে উঠবে আর নিজের আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টায় লিপ্ত থাকবে। সেখানে থাকবে না কোন আবেগ, বিশ্বাস, ভালোবাসা ও জীবনের প্রতি আগ্রহ। এমনকি ধনী ও শিক্ষিত পরিবারের সন্তানরাও বাবা মায়ের ইচ্ছার স্বীকার হয় পরিবার, সমাজ, ধর্ম ও রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের কারনে। তাই এই অন্ধকারের অবসান ঘটাতে পারে কেবলই বাবা মা যারা একমাত্র ভালোবাসার ও নিরাপদ আশ্রয় কোমলমতি সন্তানদের।

 

সৃষ্টিশীল মানুষ তৈরী করাই হোক শিক্ষার প্রাথমিক লক্ষ্য

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৪৯ পূর্বাহ্ণ
সৃষ্টিশীল মানুষ তৈরী করাই হোক শিক্ষার প্রাথমিক লক্ষ্য

বাবুল চন্দ্র সূত্রধর
সম্প্রতি এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে, এ নিয়ে সর্বত্রই নানা ধরনের আলোচনা চলছে । পাশের হার, জিপিএ, শিক্ষাক্রম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের মান, শিক্ষার্থীর মেধা- কত ধরনের আলোচনা যে হচ্ছে, এর কোন ইয়ত্তা নেই। যারা ভাল ফলাফল করেছে তারা পক্ষে আবার যারা খারাপ ফলাফল করেছে তারা নানা ধরনের নেতিবাচক বিষয় তুলে ধরছে। এমনকি, একটি প্রতিষ্ঠানের খুব ভাল ফলাফল র্কর্তৃপক্ষের নিকট ‘অস্বাভাবিক’ মনে হওয়ায় কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয়েছে। যারা কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জন করেছে, তাদের মান বা স্বচ্ছতা নিয়েও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক তথ্য বা মন্তব্য পাওয়া যায়।
আবার, বিগত কয়েক মাস ধরে শিক্ষানীতি নিয়ে নানা মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। পাঠ্যসূচীতে কি কি বিষয় নতুনভাবে যুক্ত হতে পারে, কি কি বিষয় চলমান পাঠ্যসূচী থেকে বাদ পড়তে পারে, পরীক্ষা পদ্ধতি কেমন হতে পারে ইত্যাদি নানা বিষয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। এসব আলোচনা বা সমালোচনার একট বড় অংশে পরিলক্ষিত হয় বস্তগত হিসাব-নিকাশ, কর্মক্ষেত্রের উপযোগিতা, আর্থিক উন্নয়ন, সামাজিক মর্যাদা এবং অনুরূপ আরোও অনেক কিছু। অর্থাৎ, জীবনের প্রতিষ্ঠা বলতে সাধারণ বিচারে যা আসে তার সমাহারকেই ধরা হয় শিক্ষা লাভের আসল উদ্দেশ্য হিসেবে। তবে যেহেতু শিক্ষার মান নিয়ে কথা বলা হচ্ছে, তাই বস্তুগত বিষয়াদি সাথে আরোও কিছু উপাদান বিবেচনায় চলেই আসে। এখানে সেসব উপাদানের কথাই বলা হচ্ছে যেগুলো একজন শিক্ষার্থীর আদর্শিক চেতনা তথা বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণা ও চিন্তাচেতনাকে সুসমৃদ্ধ করে থাকে। নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে কোন কোন লক্ষ্যকে প্রাধান্য দিয়ে পরিকল্পনা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে, সেটা সময়মত বুঝা যাবে।
শিক্ষাক্রম বা পাঠ্যসূচী নিয়ে কিছু কথা না বললেই হয না। বর্তমানে বিভিন্ন শ্রেণীতে যে পাঠক্রম চালু রয়েছে তা বহন করার ক্ষমতা শিক্ষার্থীর নেই, একথা বলাই বাহুল্য। এর একটি সাক্ষাৎ প্রমাণ হচ্ছে কোচিং সেন্টারের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি। নগর বা শহরাঞ্চল তো বটেই, গ্রামে পর্যন্ত কোচিং সেন্টারের রমরমা বাণিজ্য চলছে। এ জন্য কি কোচিং সেন্টারের উদ্যোক্তারাদেরকে দায়ী করা যায়? আমার জবাব হচ্ছে ‘না’। আমাদের দেখতে হবে উদ্যোক্তাদের এহেন পরিবেশ তৈরী করে দিল কে, কারা ও কিভাবে?
বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর ভাল ফলাফল মানেই আগে গৃহশিক্ষক এবং/ অথবা কোচিং, বিদ্যালয় পরের ভাবনা। আর উচ্চ বিদ্যালয়ের দ্বারে প্রবেশমাত্রই বিষয়ভিত্তিক আলাদা আলাদা শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠান। কোচিং-সংস্কৃতির এক প্রধান বৈশিষ্ঠ্য হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ঐ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে। আবার, শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরুর প্রথম দিকেই বিষয়ভিত্তিক গাইড বই কেনার জন্য শিক্ষকরা পরামর্শ ও তাগিদ দিয়ে থাকেন। একজন এসএসসি পরীক্ষার্থীর টেবিলের বইয়ের স্তুপ দেখলে আমি কিছৃটা ভয়ই পেয়ে যাই। এভাবে ছাত্রদেরকে অসহায় ও পরনির্ভর করে তোলা হচ্ছে; তাদের সৃষ্টিশীল মেধায় অঙ্কুরেই কুঠারাঘাত করা হচ্ছে। তাদের আত্মোপলব্ধি, উদ্ভাবনী চিন্তা, সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কিত বাস্তব জ্ঞান- এগুলো বিকশিত হওয়ার পথ সঙ্কীর্ণ হয়ে পড়ছে।
সহজ কথায়, শিক্ষা ব্যবস্থাকে দেখতে হবে একটি সর্বাত্মক প্রপঞ্চ হিসেবে। কর্মসংস্থান ভাল হোক, তার চেয়েও ভাল হোক শিক্ষার্থীর নৈতিক আদর্শের ভিত। এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য শিক্ষাসূচীকে করে তুলতে হবে জীবনমুখী। নিজের সমাজ ও সর্ংস্কৃতিতে শিক্ষার্থীরা সচরাচর যা দেখে এবং যা যেভাবে দেখা উচিৎ, তার ওপর ভিত্তি করেই পাঠদানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এজন্যই তো প্রখ্যাত ফরাসী সমাজ-দার্শনিক জ্যাঁ জ্যাক রুশো বলেছেন, ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে শিশুর সহজাত প্রবৃত্তির বিকাশ সাধন’। সমাজ ও সংস্কৃতি থেকে বিকশিত সহজাত প্রবৃত্তি সর্বদাই মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে কথা বলে, কাজ করে।
পাঠ্যসূচী কখনো মানুষের জীবনের সার্বিক দিক অন্তর্ভৃক্ত করতে পারে না। এসএসসি’র বর্তমান কোর্সগুলোকে যদি দ্বিগুণ বা ত্রিগুণও করা হয়, তবুও শিক্ষার্থীর জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক শিক্ষা বাকী থেকে যাবে। অশিক্ষিত গৃহবাসীকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য কোন প্রশিক্ষণ নিতে হয় না। কোন বোতাম কিভাবে টিপলে কি ফল হবে এটি সে আপনা থেকেই শিখে ফেলে। একজন শিক্ষার্থী যাতে সহজাতভাবে ও স্বাধীনভাবে চিন্তা করার উপযুক্ত পরিবেশ পেতে পারে, সেরূপ ক্ষেত্র প্রস্তুত করা জরুরী। শিক্ষার্থী যেন কোনোভাবেই নিজেকে পরনির্ভর বা অসহায় মনে না করে, সে বিষয়টিও গুরুতে¦র সাথে ভাবা দরকার। স্বাধীন চিন্তা থেকেই আসে সৃষ্টিশীলতা ও দায়িত্ববোধ, যা শিক্ষার্থীকে সামাজিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করে তুলতে পারে। বাবুল চন্দ্র সূত্রধর, মানবাধিকারকর্মী ও গবেষক