বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩

মুক্ত সাংবাদিকতায় বর্তমানে যুক্ত হচ্ছে বহুমুখী চ্যালেজ্ঞ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ৩ মে, ২০২৬, ১২:০২ পূর্বাহ্ণ
মুক্ত সাংবাদিকতায় বর্তমানে যুক্ত হচ্ছে বহুমুখী চ্যালেজ্ঞ

প্রকাশ ঘোষ বিধান
মুক্ত সাংবাদিকতা বা স্বাধীন সাংবাদিকতা বর্তমানে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ডিজিটাল যুগে সঠিক তথ্য নিশ্চিত করা এবং পেশাগত নিরাপত্তা বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এখন গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
মুক্ত সাংবাদিকতা যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি হলেও, বর্তমানে এটি বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো আইনি, আর্থিক, সামাজিক এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে বিস্তৃত। মুক্ত সাংবাদিকতা বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে রাজনৈতিক চাপ থেকে শুরু করে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন সবই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতি বছর ৩ মে বিশ্বব্যাপী বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালিত হয়। ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় অনুমোদনের পর থেকে, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষা, গণমাধ্যমের ওপর হামলা প্রতিরোধ এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনে নিহত সাংবাদিকদের স্মরণ করে এই দিবসটি উদযাপন করা হয়। এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয় বরং মুক্ত ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পক্ষে এক শক্তিশালী বার্তা বহন করে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা, সেন্সরশিপ এবং হয়রানি বন্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি, গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন গণমাধ্যমের ভূমিকা তুলে ধরা হয়।
ক্ষমতার প্রভাব, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মেরুকরণের ফলে সাংবাদিকরা নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারছেন না। দাঙ্গা, বিক্ষোভ বা রাজনৈতিক সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা নিয়মিত পুলিশ, রাজনৈতিক কর্মী বা বিবাদমান পক্ষের হাতে শারীরিক হামলা, গুম, অপহরণ এমনকি হত্যার শিকার হচ্ছেন।
স্বাধীন সাংবাদিকতার বড় একটি অন্তরায় হলো দেশে বিদ্যমান বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণমূলক আইন। সংবিধান মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিলেও, বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হয়। স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বড় বাধা হলো ভয়ের সংস্কৃতি, যেখানে তথ্য প্রকাশ করলে নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা, গ্রেপ্তার, গুম বা অপহরণের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে ডিজিটাল বা সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইনের অপব্যবহার সাংবাদিকদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
অনেক ক্ষেত্রে সরকারি বা প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করলে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে চাপের সৃষ্টি করা হয়। সমালোচনামূলক সংবাদ প্রচার করলে অনেক সময় সংবাদমাধ্যমকে দেশবিরোধী তকমা দেওয়া হয় অথবা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা করা হয়।
সংবাদপত্রের মালিকরা অনেক সময় কর্পোরেট বা রাজনৈতিক স্বার্থে সংবাদ নিয়ন্ত্রণ করেন, যা মুক্ত সাংবাদিকতার জন্য বড় বাধা। অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন হওয়ায় তাদের ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনদাতারা তাদের স্বার্থে সংবাদ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। এছাড়া বিজ্ঞাপনের বাজারের ওপর নির্ভরতার কারণে অনেক সময় বস্তুনিষ্ঠ তথ্য প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক গণমাধ্যমের মালিকপক্ষ রাজনৈতিক বা ব্যবসায়ী সংগঠনের সাথে যুক্ত, যা সাংবাদিকদের নিরপেক্ষভাবে সংবাদ প্রকাশে বাধা দেয়।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বা দুর্নীতিবিরোধী সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা শারীরিক হামলা, অপহরণ বা এমনকি খুনের শিকার হচ্ছেন। এই নিরাপত্তাহীনতা অনেক ক্ষেত্রে সেলফ-সেন্সরশিপ বা স্ব-আরোপিত নিয়ন্ত্রণের জন্ম দিচ্ছে। হয়রানি বা ভয়ের কারণে অনেক সাংবাদিক নিজে সংবাদের অংশবিশেষ বাদ দিয়ে বা এড়িয়ে গিয়ে কাজ করেন, যাকে সেলফ-সেন্সরশিপ বা আত্মনিয়ন্ত্রণ বলা হয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং অনলাইন সংবাদপত্রের যুগে সঠিক ও ভুল সংবাদের পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত খবর প্রকাশের প্রতিযোগিতায় অনেক সময় তথ্যের সত্যতা যাচাই উপেক্ষিত হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তথ্য দিতে গড়িমসি করে, যা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় বড় বাধা। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মেরুকরণের ফলে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
অদক্ষ বা দলবাজ সাংবাদিকদের কারণে পেশার মর্যাদা প্রশ্নের মুখে পড়ছে। এসব অদক্ষ, দলবাজ ও অযোগ্যদের পেশায় প্রবেশের ফলে মানসম্মত সাংবাদিকতার অভাব সৃস্টি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অপপ্রচার এবং তথ্যের সত্যতা যাচাই ছাড়াই দ্রুত সংবাদ প্রচারের প্রবণতা মূলধারার সাংবাদিকতাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।
দৃশ্যমান আইনের পাশাপাশি অনেক সময় অদৃশ্য শক্তির ভয়ে সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না, যা সাংবাদিকতার জন্য একটি গভীর সংকট। উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাব নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য একটি বড় সমস্যা। নৈতিকতা ভুলে সংবেদনশীল বা ভুয়া সংবাদ পরিবেশনের প্রবণতা পেশার ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। অনেক সাংবাদিকই সঠিক ও নিয়মিত বেতন পান না, যা তাদের পেশাগত সততা বজায় রাখাকে কঠিন করে তোলে।
সংবাদমাধ্যমে রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রভাব নিরপেক্ষতা বজায় রাখাকে কঠিন করে তুলছে। বহুমুখী চ্যালেঞ্জের ফলে সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে নানাবিধ বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। তবে এই সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই সাংবাদিকতা এগিয়ে চলছে। সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশে মুক্ত সাংবাদিকতা টিকে থাকার জন্য তথ্যপ্রবাহের স্বচ্ছতা, আইনি সুরক্ষা এবং নৈতিক সাংবাদিকতা চর্চা অপরিহার্য। সে জন্য মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ রক্ষায় একটি কার্যকর আইনি সুরক্ষা কাঠামো এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Ads small one

উল্টো রথ: শিকড়ে ফেরার চিরন্তন আহ্বান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ৪:০১ অপরাহ্ণ
উল্টো রথ: শিকড়ে ফেরার চিরন্তন আহ্বান

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

শুক্রবার জগন্নাথ দেব মাসির বাড়ী থেকে নিজ গৃহে ফিরবেন। মানুষের জীবন মূলত এক অন্তহীন যাত্রা। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এই পথচলায় মানুষ কখনো সাফল্যের শিখরে ওঠে, কখনো ব্যর্থতার অতলে হারিয়ে যায়; কখনো অর্জনের আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়, আবার কখনো প্রাপ্তির মধ্যেও অপূর্ণতার বেদনা অনুভব করে। এই দীর্ঘ যাত্রায় মানুষ অনেক সময় নিজের শিকড়, নিজের মূল্যবোধ এবং নিজের আত্মিক পরিচয় থেকে দূরে সরে যায়। তাই সভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু ধর্মীয় উৎসবের জন্ম হয়েছে, যা মানুষকে শুধু আনন্দ দেয় না, বরং তাকে নিজের ভেতরে ফিরে তাকাতেও শেখায়।

 

শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের উল্টো রথ বা বাহুদা যাত্রা তেমনই একটি উৎসব। এটি কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; বরং প্রত্যাবর্তনের দর্শন, আত্মশুদ্ধির আহ্বান এবং শিকড়ে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য প্রতীক। রথযাত্রা সম্পর্কে কমবেশি সবাই জানেন। আষাঢ় মাসে জগন্নাথদেব, বলরাম ও সুভদ্রা রথে চড়ে শ্রীমন্দির থেকে গু-িচা মন্দিরে, অর্থাৎ ভক্তদের ভাষায় ‘মাসির বাড়ি’ যান। সেখানে নয় দিন অবস্থানের পর তাঁরা আবার নিজ আবাসে ফিরে আসেন। এই ফিরে আসার যাত্রাই উল্টো রথ বা বাহুদা যাত্রা। বাইরে থেকে দেখলে এটি দেবতার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতের ঘটনা মাত্র। কিন্তু ধর্মীয় দর্শন ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির আলোকে দেখলে এটি মানুষের নিজের শিকড়ে ফিরে আসার এক গভীর প্রতীক।

 

পৌরাণিক কাহিনিতে বলা হয়, ভক্তদের সান্নিধ্য গ্রহণ এবং আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষার জন্য জগন্নাথদেব গু-িচা মন্দিরে গমন করেন। নির্ধারিত সময় শেষে তিনি আবার শ্রীমন্দিরে ফিরে আসেন। এই প্রত্যাবর্তন যেন একটি চিরন্তন সত্যকে সামনে আনেÑজীবনে যত দূরেই যাওয়া হোক, শেষ পর্যন্ত ফিরে আসতে হয় নিজের মূল ঠিকানায়। মানুষের ক্ষেত্রেও তাই। কর্মজীবন, প্রতিযোগিতা, অর্থ-সম্পদ কিংবা ভোগবাদের মোহে আমরা যত দূরেই ছুটে যাই না কেন, একসময় আমাদের ফিরে আসতে হয় পরিবার, সমাজ, সংস্কৃতি এবং আত্মিক মূল্যবোধের কাছে।

 

উড়িষ্যার পুরীধামে উল্টো রথযাত্রা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশে পরিণত হয়েছে। লাখো মানুষ সেখানে একত্রিত হন। জগন্নাথদেবের নন্দীঘোষ, বলরামের তালধ্বজ এবং সুভদ্রার দর্পদলন রথ ভক্তদের টানে আবার শ্রীমন্দিরের পথে এগিয়ে চলে। এই রথের দড়িতে হাত রাখার জন্য মানুষের যে আবেগ, তা কেবল অলৌকিক আশীর্বাদের প্রত্যাশা নয়; বরং ঈশ্বরের সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে নতুন করে অনুভব করার আকাক্সক্ষা। রথ টানার সময় ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, জাতি-গোত্রের সব বিভাজন যেন মুহূর্তেই বিলীন হয়ে যায়। এই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñধর্মের প্রকৃত শক্তি বিভাজনে নয়, মিলনে।

 

বাংলাদেশেও উল্টো রথযাত্রার ঐতিহ্য বহু পুরোনো। ঢাকার শাঁখারীবাজার, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, রাজশাহী, দিনাজপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোরসহ দেশের নানা প্রান্তে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে উল্টো রথ উদ্যাপিত হয়। সাতক্ষীরার বিভিন্ন মন্দির, বিশেষ করে কাটিয়া, আশাশুনি ও আশপাশের এলাকায় এই উৎসবকে ঘিরে ভক্তদের বিপুল সমাগম ঘটে। বহু স্থানে কয়েক দিনের মেলা বসে। মাটির খেলনা, বাঁশ-বেতের সামগ্রী, হস্তশিল্প, মিষ্টান্ন, স্থানীয় কৃষিপণ্যÑসব মিলিয়ে এটি গ্রামীণ অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

 

ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতি, লোকঐতিহ্য এবং সামাজিক সম্প্রীতিরও এক প্রাণবন্ত প্রকাশ ঘটে।এই সম্প্রীতির বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি আমাদের বহুত্ববাদী সমাজের একটি ইতিবাচক দিক। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে ঐতিহ্য বাংলাদেশ বহন করে, উল্টো রথ তারও একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। উৎসবের প্রস্তুতিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রথ পরিষ্কার করা হয়, দেবমূর্তিকে নতুন বস্ত্রে সজ্জিত করা হয়, বিশেষ পূজা, আরতি ও ভোগ নিবেদন করা হয়। অনেকে উপবাস পালন করেন, মানত করেন, দান-ধ্যান করেন। ভোর থেকেই ভক্তরা রথ টানার অপেক্ষায় মন্দির প্রাঙ্গণে সমবেত হন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, রথের দড়িতে স্পর্শ করার মধ্য দিয়ে পুণ্য অর্জন হয়। কিন্তু এই বিশ্বাসের বাইরেও একটি সামাজিক শিক্ষা রয়েছেÑএকটি মহৎ কাজে সবার অংশগ্রহণই সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে।

 

আজকের পৃথিবীতে মানুষের জীবনে গতি বেড়েছে, কিন্তু শান্তি কমেছে। প্রযুক্তি আমাদের হাতে পুরো পৃথিবী এনে দিয়েছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই মানুষকে নিজের পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো বন্ধুর ভিড়ে প্রকৃত সম্পর্কগুলো ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। ভোগবাদ ও প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি মানুষকে ক্রমেই আত্মকেন্দ্রিক করে তুলছে। এই বাস্তবতায় উল্টো রথ যেন নতুন করে প্রশ্ন তোলেÑআমরা কোথায় যাচ্ছি? আমাদের এই যাত্রার শেষ গন্তব্য কোথায়? উল্টো রথের মূল দর্শন এখানেই। এটি মানুষকে শেখায়, কেবল সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াই জীবন নয়; প্রয়োজন হলে পেছনেও ফিরে তাকাতে হয়।

 

নিজের ভুলকে স্বীকার করতে হয়, শিকড়কে স্মরণ করতে হয়, সম্পর্ককে নতুন করে মূল্য দিতে হয়। যে সমাজ তার ইতিহাস ভুলে যায়, যে মানুষ নিজের সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে, সে কখনোই টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না। তাই প্রত্যাবর্তন মানে পিছিয়ে যাওয়া নয়; বরং নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করে আবার নতুন করে এগিয়ে চলা। উল্টো রথের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো বিনয়। ঈশ্বর নিজেই যখন মানুষের মাঝে আসেন, আবার সময় হলে নিজ আবাসে ফিরে যান, তখন মানুষেরও উচিত অহংকার ত্যাগ করা।

 

ক্ষমতা, অর্থ কিংবা খ্যাতি কোনো কিছুই স্থায়ী নয়। স্থায়ী হলো মানুষের কর্ম, মূল্যবোধ এবং মানবিকতা। ধর্মীয় উৎসবের প্রকৃত তাৎপর্য এখানেইÑমানুষকে আরও বিনয়ী, সহনশীল এবং মানবিক করে তোলা। দুঃখজনক হলেও সত্য, আধুনিকতার প্রবল স্রোতে অনেক ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। শহরকেন্দ্রিক জীবন, প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদন এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের কারণে অনেক তরুণ-তরুণী উল্টো রথের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য সম্পর্কে তেমন জানেন না। অনেকের কাছে এটি কেবল একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রা। অথচ এর ভেতরে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের দর্শন, সংস্কৃতি ও মানবিক শিক্ষার অমূল্য ভা-ার।

 

এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে রাষ্ট্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সমাজের সচেতন মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের জানানো উচিত। স্থানীয় প্রশাসন ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। একই সঙ্গে গবেষণা, তথ্যসংরক্ষণ ও প্রকাশনার উদ্যোগও বাড়াতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই ঐতিহ্যের প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারে।

 

বাংলাদেশের সংস্কৃতির অন্যতম শক্তি তার বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। এখানে ঈদ, দুর্গাপূজা, বুদ্ধপূর্ণিমা, বড়দিন কিংবা রথযাত্রাÑপ্রতিটি উৎসবই কোনো না কোনোভাবে মানুষের মিলনের উপলক্ষ হয়ে ওঠে। এই ঐতিহ্য রক্ষা করা আজ সময়ের দাবি। কারণ, বিভাজনের পৃথিবীতে সম্প্রীতির প্রতিটি উৎসবই মানবতার জন্য আশার আলো। উল্টো রথ আমাদের আরেকটি গভীর সত্য শেখায়Ñপ্রত্যাবর্তন কখনো পরাজয় নয়। বরং নিজের ভেতরে ফিরে আসাই সবচেয়ে বড় বিজয়। মানুষ যখন নিজের বিবেক, মানবিকতা ও নৈতিকতার কাছে ফিরে আসে, তখনই তার প্রকৃত মুক্তি ঘটে। জগন্নাথদেবের শ্রীমন্দিরে ফিরে আসা তাই কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি প্রতীক হয়ে ওঠে মানুষের আত্মজাগরণের।

 

আজ যখন সমাজ নানা সংকট, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে, তখন উল্টো রথের এই দর্শন নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। আমাদের প্রয়োজন আরও বেশি মানবিক হওয়া, আরও বেশি সহনশীল হওয়া এবং নিজের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করা। কারণ, শিকড় যত শক্তিশালী হবে, ভবিষ্যতের পথচলাও তত দৃঢ় হবে। উল্টো রথ তাই কেবল রথের চাকা ঘোরার উৎসব নয়। এটি মানুষের হৃদয়ের চাকা ঘুরিয়ে দেওয়ার আহ্বান। এটি মনে করিয়ে দেয়Ñযাত্রা যত দীর্ঘই হোক, একদিন না একদিন সবাইকে ফিরে আসতে হয়। সেই ফিরে আসা যদি হয় সত্য, মানবিকতা, আত্মবিশ্বাস এবং ঈশ্বরচেতনার পথে, তবে জীবনই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় তীর্থযাত্রা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

গাজী নজরুল ইসলামকে শ্যামনগরে অবাঞ্চিত ঘোষণা, ধর্ষণের অভিযোগে আইনের আওতায় আনার দাবি 

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ১:২৫ অপরাহ্ণ
গাজী নজরুল ইসলামকে শ্যামনগরে অবাঞ্চিত ঘোষণা, ধর্ষণের অভিযোগে আইনের আওতায় আনার দাবি 

 

 

সাতক্ষীরা-৪ সংসদীয় আসনের (শ্যামনগর) জামায়াত দলীয় এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে শ্যামনগরে অবাঞ্চিত ঘোষণা করা হয়েছে। বুধবার বেলা ১১ টায় শ্যামনগরের সচেতন নাগরিক সমাজের ব্যানারে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে বক্তারা এমন দাবি জানান। এর আগে পৌরসদরের জেসি কমপ্লেক্স চত্বর থেকে উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত শত শত নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণে একটি মিছিল পৌর সদরের বিভিন্ন সড়ক পরিদ দক্ষিণ করে। বিক্ষোভ মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা এ সময় হাতে ঝাড়ু ও জুতা নিয়ে নজরুল ইসলামের ছবিতে আঘাত করতে থাকে। বিক্ষোভ মিছিল শেষে

উপজেলা বিএনপি’র সাবেক আহবায়ক আলহাজ্ব সুলাইমান কবিরের সভাপতিত্বে উপজেলা প্রেসক্লাব চত্বরে আয়োজিত পথসভায় অংশগ্রহণ করেন বিক্ষুব্ধ জনতা। এসময় বক্তারা কাজী নজরুল ইসলামকে ধর্ষক আখ্যা দিয়ে একটা আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। একই সাথে অবাঞ্চিত ঘোষণা করার পাশাপাশি বক্তারা গাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় সংসদ থেকে বহিষ্কারের দাবি জানান।

বক্তারা বলেন ১৩ তারিখে ঘটনাটি ঘটলেও গাজী নজরুল ইসলাম কৌশলে তা ধামাচাপা দিতে চাইছিল। কিন্তু তার ড্রাইভার দাবিকৃত টাকা না পেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিওগুলো ভাইরাল করে দিলে কৌশলের অংশ হিসেবে শুরুতেই এআই প্রযুক্তির সৃষ্টি বলে দাবি করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ফ্যাক্ট চেক প্রতিষ্ঠানগুলো ভিডিও চিত্রের সত্যতা নিশ্চিত করার পর কাজী নজরুল ইসলাম এবং তার সহযোগীরা ওই তরুণীকে বিয়ের নাটক সাজিয়েছে।

পদে পদে জালিয়াতি এবং মিথ্যাচারের আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগে বক্তারা গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের মাধ্যমে শরীয়ত মোতাবেক পরিচালিত হওয়ার দাবি করা রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ জামায়েত ইসলামীর আদর্শ প্রদর্শনের আহ্বান জানান।

এ সময় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী অ্যাডভোকেট আশেক এলাহী মুন্না, উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি আবু সাঈদ, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম দুলু, গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম, পদ্মপুকুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমজাদুল ইসলাম, উপজেলা মহিলা দলের সভাপতি নুরজাহান পারভীন ঝর্ণা প্রমুখ।

প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা বলেন একটা অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন রীতিমতো ধর্ষণের সমান অপরাধ। মহান জাতীয় সংসদের একজন প্রবীণ সদস্য হিসেবে নজরুল ইসলামের এ ঘটনা পবিত্র সংসদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে। মহান জাতীয় সংসদের পবিত্রতা রক্ষা এবং শিশু সুরক্ষা আইনের যথাযথ প্রয়োগ প্রদর্শনের অংশ হিসেবে অবিলম্বে কাজী নজরুল ইসলামকে জাতীয় সংসদ থেকে বহিষ্কারের পাশাপাশি আইনের আওতায় এনে ধর্ষণকাণ্ডের বিচার করতে হবে। বক্তারা আরো বলেন ১৭ই জুন বিয়ের কথা বলে ২১ তারিখ বিকালে কাবিনের ঘটনা তার জালিয়াতি ও মিথ্যাচারকে প্রমাণ করে ঠিক আছে দিয়েছে। এমতাবস্থায় অবিলম্বে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

এছাড়া নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের মাধ্যমে নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে জামায়েত ইসলামীর অবস্থান স্পষ্ট করতে আমিরেৎ জামায়েত ডাক্তার শফিকুর রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তারা।

সম্পাদকীয়/ প্রসঙ্গ: ডেঙ্গু সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ৩:০০ পূর্বাহ্ণ
সম্পাদকীয়/ প্রসঙ্গ: ডেঙ্গু সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

বর্ষার স্থায়িত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খুলনার পাইকগাছায় হঠাৎ করেই ডেঙ্গু রোগীর প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসের তুলনায় জুলাই মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ করে এডিস মশাবাহিত এই রোগের বিস্তার স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মতে, বাসাবাড়ির আঙিনায় কিংবা আশপাশে জমে থাকা পরিষ্কার পানি—যেমন পরিত্যক্ত পাত্র, টায়ার, ড্রেন ও ডাবের খোসাই এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে। এ ছাড়া উপজেলার বাইরে থেকেও আক্রান্ত রোগী আসার কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সচেতনতামূলক প্রচার চালানো সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। চিকিৎসকদের বক্তব্য স্পষ্ট—ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা এবং মশারির ব্যবহার প্রাথমিক ও কার্যকর প্রতিরোধক।
তবে বাস্তবতা হলো, কেবল সচেতনতামূলক বার্তা কিংবা পরামর্শ প্রদান করে এমন জনস্বাস্থ্য সংকট পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষের নিজস্ব সচেতনতার পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সমন্বিত সমন্বয় এখানে অত্যন্ত জরুরি।
পাইকগাছার বর্তমান পরিস্থিতি যেন মহামারীর দিকে মোড় না নেয়, সে জন্য অবিলম্বে কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। তা হলোÑ পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোর উদ্যোগে পাইকগাছার প্রতিটি ওয়ার্ডে অবিলম্বে কার্যকর ওষুধ প্রয়োগ (ফগিং ও লার্ভিসাইড স্প্রে) শুরু করতে হবে। ড্রেন, বদ্ধ জলাশয় ও জমে থাকা পানির স্থানগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়মিত পরিষ্কার করার ব্যবস্থা নিতে হবে। জ্বর হলেই যেন রোগীরা হাসপাতালে এসে পরীক্ষা করান, সে লক্ষ্যে চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য রাখা এবং গ্রামপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের নজরদারি বাড়াতে হবে। কাজের তাগিদে বা ভ্রমণের কারণে যারা বাইরে থেকে উপজেলায় আসছেন, তাঁদের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি জটিল রূপ নেওয়ার আগেই সমন্বিত ও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রশাসনিক তৎপরতা এবং জনসচেতনতাÑএই দুইয়ের সমন্বয় ছাড়া পাইকগাছাকে ডেঙ্গুমুক্ত রাখা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে জোর দেবেনÑএমনটাই প্রত্যাশা।