সম্পাদকীয়/ ইলিশ: অধরাই থাকছে মধ্যবিত্তের স্বাদ
সাতক্ষীরা শহর ও শহরতলীর হাট-বাজারগুলোতে এখন ইলিশের পসরা। অলিগলিতে চলছে মাইক বাজিয়ে ইলিশ বিক্রির জোর প্রচার। কিন্তু বাজারে প্রচুর সরবরাহ থাকলেও দাম সাধারণ মানুষের সাধ্যের বহু বাইরে। ভরা মৌসুমে নদীর ইলিশ যেখানে কম দামে পাওয়ার কথা, সেখানে উল্টো চড়া দামে নাকাল হতে হচ্ছে ক্রেতাদের। কেনাবেচায় হাঁকডাক থাকলেও সাধারণ ও নি¤œআয়ের মানুষের জন্য বাজারের দৃশ্যটি এখন শুধুই দীর্ঘশ্বাসের।
সাতক্ষীরার বাজারে ভারতীয় গুজরাটি ইলিশের এই ব্যাপক উপস্থিতি এক নতুন ও বিস্ময়কর বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলেছে। একসময় বাংলাদেশের ইলিশ ভারতসহ বিশ্ববাজারে রপ্তানি হতো, আর এখন চাহিদা মেটাতে ভারত থেকে কয়েক শ মেট্রিক টন ইলিশ আমদানি করতে হচ্ছে। জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে দীর্ঘ তিন দশক ইলিশের উৎপাদন বাড়লেও গত কয়েক অর্থবছরে তা ধারাবাহিকভাবে কমেছে। প্রধানত জাটকা নিধন বন্ধে কঠোর আইনের অভাব, নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস ও দূষণকে ইলিশের এই সংকটের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে সংকট কেবল উৎপাদনের ঘাটতিতেই সীমাবদ্ধ নেই; সমস্যা গভীর করেছে স্থানীয় বাজার ব্যবস্থার নৈরাজ্য ও কারসাজি। অভিযোগ রয়েছে, ভারত থেকে তুলনামূলক কম দামে আনা গুজরাটি ইলিশকে পদ্মার বা বরিশালের ইলিশ বলে চালিয়ে দিয়ে ক্রেতাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। আমদানিকৃত ইলিশ বাজারে সরবরাহ বাড়ালেও তার কোনো সুফল সাধারণ ভোক্তা পাচ্ছেন না। অতি মুনাফালোভী সিন্ডিকেটের হাতবদলে মাছের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
ভরা মৌসুমে ইলিশ সাধারণ মানুষের পাতে পৌঁছাতে না পারাটা কেবল বাজার ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা নয়, বরং সার্বিক তদারকির অভাবকেও নির্দেশ করে। ভারতীয় মাছকে দেশি ইলিশ বলে বিক্রির মতো অসাদুপায় বন্ধে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত বাজার অভিযান জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে ইলিশের অভয়ারণ্য রক্ষা, জাটকা নিধন বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে এনে রূপালী ইলিশের প্রাকৃতিক উৎপাদন বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপে জোর দিতে হবে। নতুবা মাইকের প্রচারেই সীমাবদ্ধ থাকবে ইলিশের খবর, আর সাধারণ মানুষের জন্য এই জাতীয় মাছটি চিরতরে রূপ নেবে এক দুঃস্বপ্নে।






