সাতক্ষীরায় টানা বর্ষণে ভাসছে জনপদ, চরম ভোগান্তিতে নি¤œ আয়ের মানুষ
জিএম আমিনুল হক: গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে সাতক্ষীরা জেলায় মারাত্মক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামÑসবত্রই এখন পানির থৈ থৈ অবস্থা। রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি, বাজার, ফসলের ক্ষেত্র ও মৎস্য ঘের তলিয়ে একাকার হয়ে গেছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া নি¤œ আয়ের মানুষেরা।
আবহাওয়া অফিসের হিসাব অনুযায়ী, গত চার দিনে সাতক্ষীরায় ২৮০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। নিষ্কাশন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ায় জমা পানি নামতে পারছে না।
সাতক্ষীরা পৌরসভার পলাশপোল, কাটিয়া, ইটাগাছা, বকচরা ও খুলনা রোড এলাকার প্রধান সড়কগুলোতে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি। দোকানে পানি ঢুকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
উপজেলাগুলোর পরিস্থিতিও একই রকম। তালা, কলারোয়া, দেবহাটা, কালিগঞ্জ, আশাশুনি ও শ্যামনগরের নিচু এলাকা পুরোপুরি প্লাবিত। বিশেষ করে উপকূলীয় আশাশুনি ও শ্যামনগরে জোয়ার ও বৃষ্টির যৌথ চাপে বহু ঘরবাড়ি ও চিংড়ি ঘের তলিয়ে গেছে।
সাতক্ষীরা সদরের ফয়জুল্যাপুর গ্রামের মাছচাষী মমিনুর রহমান আক্ষেপ করে জানান, তিন বিঘা জমির ঘের পানিতে ভেসে গিয়ে তাঁর সব বিনিয়োগ নষ্ট হয়ে গেছে। ধুলিহর বেড়বাড়ী গ্রামের ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা সোনাভান বিবি ঘরের চাল ফুটো হয়ে পানি পড়ার করুণ অভিজ্ঞতার কথা জানান। তাঁর ঘরে রান্না করার মতো কোনো সামগ্রী নেই।
টানা বৃষ্টির কারণে দিনমজুর, রিকশা-ভ্যানচালক ও নির্মাণশ্রমিকদের কাজ পুরোপুরি বন্ধ। শহরের ভ্যানচালক আলী হোসেন জানান, চার দিন ধরে আয় বন্ধ থাকায় পরিবার নিয়ে তিনি অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। একই ভোগান্তির কথা জানান তালায় গৃহপরিচারিকার কাজ করা রেহেনা বেগম। আশ্রয়কেন্দ্র ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলো বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের তীব্র সংকটে ভুগছে।
কৃষি বিভাগের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, জেলায় প্রায় ১২ হাজার হেক্টর আমন ধানের জমি প্লাবিত হয়েছে। মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, শত শত ঘেরের বাঁধ ভেঙে বিপুল পরিমাণ সাদা মাছ ও চিংড়ি ভেসে গেছে।
জলাবদ্ধতার ফলে ডায়রিয়া, চর্মরোগ ও জ্বরের প্রকোপ বাড়ছে। সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে প্রতিদিনই ভর্তি হচ্ছেন বিপুল রোগী। সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব উপজেলায় মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
জেলা প্রশাসন থেকে ইতিমধ্যে ৪০ মেট্রিক টন চাল ও ৮ লাখ টাকা উদ্ধার সহায়তায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, অনেক দুস্থ পরিবার এখনো কোনো ত্রাণ সহায়তা পায়নি।
পরিবেশবিদদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়া এবং খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ থাকার কারণেই এই স্থায়ী জলাবদ্ধতা। সংকট নিরসনে স্থায়ী ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের জোরালো দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।






