শিকড় কাটা প্রগতি: প্রযুক্তি আসুক, তবে মানবিকবিদ্যাকে খুন করে নয়
তারিক ইসলাম
রাষ্ট্র বা সমাজের আধুনিকায়নের প্রধান শর্ত যদি হয় শিক্ষার রূপান্তর, তবে সেই রূপান্তরের অভিমুখ কোন দিকে, তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। সম্প্রতি দেশের উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে এক চরম উদ্বেগজনক সিদ্ধান্তের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের মতো মৌলিক ও ঐতিহ্যবাহী অনার্স কোর্সগুলো বাতিল করে সম্পূর্ণভাবে এআই (অৎঃরভরপরধষ ওহঃবষষরমবহপব), সাইবার সিকিউরিটি, আউটসোর্সিং ও অন্যান্য প্রযুক্তি-নির্ভর বিষয় চালুর রূপরেখা তৈরি হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত ‘স্মার্ট’ এবং ‘বাজারমুখী’ মনে হলেও, গভীর বিশ্লেষণে এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক ভয়াবহ সাংস্কৃতিক ও মেধাভিত্তিক দেউলিয়াত্বের রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিশ্ববিদ্যালয় কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা কেবলই ‘চাকরিজীবী তৈরির কারখানা’ নয়; এটি জ্ঞান সৃষ্টি, মুক্তচিন্তা এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রসূতিগৃহ। আউটসোর্সিং বা সাইবার সিকিউরিটির মতো বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের দ্রুত আয়ের পথ দেখাতে পারে, যা সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য হয়তো লোভনীয়। কিন্তু একটি রাষ্ট্র কি কেবল জিডিপি (এউচ) দিয়ে পরিমাপ করা যায়?
বাংলা কেবল একটি ভাষা নয়, এটি আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি, জাতিগত সত্তা ও সৃজনশীলতার আধার। একে বাদ দেওয়া মানে নিজের শিকড়কে কেটে ফেলা।
ইতিহাস মানুষকে অতীত ও বর্তমানের মেলবন্ধন শেখায়। ইতিহাসহীন জাতি অন্ধের মতো চলে, যারা বারবার পুরোনো ভুলের পুনরাবৃত্তি করে।
দর্শন মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, ভালো-মন্দের তফাত বোঝায় এবং নৈতিকতার মানদন্ড গড়ে দেয়।
এই বিষয়গুলোকে উচ্চশিক্ষা থেকে নির্বাসনে পাঠানো মানে একটি সংবেদনশীল ও বিবেকবান সমাজ ব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেওয়া। আমরা হয়তো একদল প্রযুক্তি-দক্ষ ‘শ্রমিক’ পাব, কিন্তু একটি আদর্শ ‘মানুষ’ বা ‘সমাজ’ গড়ার কারিগর চিরতরে হারিয়ে ফেলব।
বিশ্বজুড়ে এখন সবচেয়ে বড় বিতর্ক কী নিয়ে? তা হলো-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অও-এর নৈতিক ব্যবহার। প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হচ্ছে, তার অপব্যবহারের ঝুঁকি তত বাড়ছে।
একটি এআই অ্যালগরিদম যেন মানববিদ্বেষী বা বৈষম্যমূলক না হয়, তা নির্ধারণের জন্য প্রযুক্তিবিদের চেয়ে একজন সমাজবিজ্ঞানী বা দার্শনিকের প্রজ্ঞা বেশি প্রয়োজন। সাইবার অপরাধ প্রতিরোধের জন্য শুধু কোডিং জানাই যথেষ্ট নয়, অপরাধীর মনস্তত্ত্ব ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বুঝতে ইতিহাসের পাঠ আবশ্যক।
উন্নত বিশ্ব যেখানে বিজ্ঞান ও কলার সমন্বয়ে ‘ঝঞঊঅগ’ (ঝপরবহপব, ঞবপযহড়ষড়মু, ঊহমরহববৎরহম, অৎঃং, ধহফ গধঃযবসধঃরপং) মডেলের দিকে ঝুঁকছে, সেখানে আমরা মানবিকবিদ্যাকে পুরোপুরি উপড়ে ফেলার মতো বিপরীতমুখী ও আত্মঘাতী পথে হাঁটছি।
সংস্কার হোক সমন্বিত, ধ্বংসাত্মক নয়।সময়ের প্রয়োজনে প্রযুক্তির সংযোজন অবশ্যই অনস্বীকার্য। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, নতুনকে জায়গা দিতে গিয়ে পুরনো স্তম্ভগুলোকে ভেঙে ফেলতে হবে। আমাদের প্রয়োজন ছিল একটি দূরদর্শী শিক্ষানীতি:
সমন্বয়: বাংলা, ইতিহাস বা দর্শনের অনার্স কোর্সগুলো বহাল রেখে তার সাথে বাধ্যতামূলকভাবে ‘ডিজিটাল হিউম্যানিটিজ’, ‘এআই ইথিক্স’ কিংবা ফ্রিল্যান্সিং-এর মৌলিক কারিগরি কোর্স যুক্ত করা যেত।
বাজারের স্থায়িত্ব: মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তির বাজার অত্যন্ত পরিবর্তনশীল। আজকের যে প্রযুক্তির জন্য আমরা পাগল, পাঁচ বছর পর তা হয়তো সেকেলে হয়ে যাবে। কিন্তু ইতিহাস, দর্শন ও সাহিত্যের উপযোগিতা চিরন্তন। কেবল নির্দিষ্ট প্রযুক্তি শেখা একটি প্রজন্ম বাজারের সামান্য পরিবর্তনেই খেই হারিয়ে ফেলবে।
ইতিহাস ও দর্শনহীন সমাজ হয়ে পড়ে স্মৃতিশক্তিহীন ও বিবেকহীন। আর নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা না থাকলে সেই সমাজ আত্মপরিচয়হীন এক জনসমষ্টিতে পরিণত হয়। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে গতিশীল ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে পারে, কিন্তু জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলে সাহিত্য ও শিল্প।
বাজারের অন্ধ স্্েরাতে গা ভাসিয়ে আমরা যেন আমাদের মেধা ও মননের আত্মাকে বিসর্জন না দিই। নীতিনির্ধারকদের প্রতি অনুরোধ-প্রযুক্তিকে অবশ্যই বরণ করুন, তবে তা মানবিকবিদ্যাকে কবর দিয়ে নয়, বরং তার পরিপূরক হিসেবে। ভারসাম্যপূর্ণ উচ্চশিক্ষাই কেবল একটি প্রগতিশীল ও আত্মমর্যাদাশীল জাতি উপহার দিতে পারে। লেখক: তারিক ইসলাম, সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি







