সাতক্ষীরার পরানদহে ভাড়াটিয়া বাহিনী নিয়ে জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগ
পত্রদূত রিপোর্ট: ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে হিন্দুদের বসত ভিটা ও ফসলীয় জমি দখলের চেষ্টা করা হয়েছে। সোমবার সকালে সাতক্ষীরার সাতক্ষীরা সদরের পরানদহ হরিতলায় এ ঘটনা ঘটে। জবরদখলের চেষ্টাকালে বাধা দিলে সংখালঘু সম্প্রদায়ের মানুষজনকে জীবননাশের হুমকি দেওয়া হয়।
সদর উপজেলার পরানদহা হরিতলা এলাকার মাখন লাল সরদার জানান, তাদের পূর্বপুরুষ কেদার সরদারের চার ছেলে ছিল। এদের মধ্যে রাজেন্দ্র সরকার ১৯৬৫ সালে স্বপরিবারে ভারতে চলে যান। তার ফেলে রেখে যাওয়া জমি ১৯৬৫ সালের ৮ এপ্রিল ভারতীয় নাগরিক ছুকু বিশ^াসের স্ত্রী সুশীলা বিবি ও ফকির বিশ^াস একটি অনিবন্ধিত বিনিময় দলিলমূলে পরানদহ ও জগন্নাথপুর মৌজায় তিন একর ৭৪ শতক জমি দাবি করে আসছিলেন।
ওই জমির মধ্যে মোকলেম গাজী সাড়ে তিন বিঘা জমি সুশীলা বিবির কাছ থেকে খরিদ করেন। একই ব্যক্তির কাছ থেকে রহমান ও মজিদ সাড়ে ১৬ শতক জমি কেনেন। বিনিময় দলিলের বৈধতা না থাকলেও ঝামেলা এড়াতে ও বসবাসের সুবিধার্থে রাজেন্দ্র সরকারের ভাই অঘোর সরকার, তার ছেলে অধীর সরদার, সুধীর সরদার, ঘনশ্যাম সরদার বিনিময় দলিল মূলে দাবিদার সুশীলা বিবি ও শুকুর আলীর স্ত্রী সামছুন্নাহার বেগমের কাছ থেকে ১৯৬৮, ১৯৭০, ১৯৭৯ ও ১৯৮০ সালে চারটি দলিল মূলে সাড়ে ৬৫ শতক জমি কিনে ভোগ দখল করতে থাকেন।
ফকির বিশ^াস ও তার ছেলে আবু বক্কর এ দেশে না থকেলেও তার দুই মেয়ে ওয়ারেশ সূত্রে পিতার সব সম্পত্তির মালিক হিসেবে দাবি করতে থাকে তাদের ছেলে শুকুর আলী ও হযরত আলী। বিনিময় দলিল বৈধ না হওযায় এসএ রেকর্ড ও বিআরএস রেকর্ডে ওই জমি অঘোর সরদার, সুরেন্দ্রনাথ সরদার, অধীর সরদার, সুধীর সরদার, কার্তিক সরদার ও কৃষ্ণপদ সরদার, ভদ্রমোহন, কৃষ্ণপদ ও নিরাপদ সরদারসহ কয়েকজনের নামে হয়। বর্তমানে ওই জমিতে পাট, পটল, কঢ়ুরমুখি ও ওলসহ বিভিন্ন ধরণের সবজি তাদের লাগিয়েছেন তারা।
মাখন লাল সরদার আরো জানান, ভারতে বসবাসকারি রাজেন্দ্র সরদারের কাছ থেকে (বিনিময় দলিলের জমি) ১৯৬৭ সালে ৩৯ শতক জমি সোলে ও ডিক্রি মুলে কিনেছেন মর্মে দাবি করেন জগন্নাথপুর গ্রামের সোনা কাজীর ছেলে খোকন কাজী। এ ছাড়াও কিছু জমি বন্দক হিসেবে দাবি করেন পরানদহের তমিজউদ্দিন মিস্ত্রীসহ কয়েকজন। ফলে সহকারি কমিশনারের (ভূমি) আদালতে বিনিময় দলিল সম্পূর্ণ বাতিল বলে গণ্য হয়।
এরপরও অনিবন্ধিত বিনিময় দলিলমূলে ফকির বিশ^াসের নাতি শুকুর আলী বিশ^াস তাদের রেকডীয় ৩৫ শতক জমি দাবি করে আসছিল ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর। গত বছর তাদের কাটা ধান শুকুর আলীর লোকজন জোরপূর্বক লুট করে নিয়ে যাওয়ার সময় বাধা দিলে মারপিটের ঘটনা ঘটে। উভয়পক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে থানায় বসাবসি হয়। আদালতের আদেশ ছাড়া শুকুর আলী ও তাদের লোকজনদের ওই জমিতে যাওয়া যাবে না বলে আপোষনামায় উল্লেখ করা হয়।
এরপর গোলাম হোসেনের ছেলে আবুল হোসেনে বিশ^াস, আব্দুস সালাম বিশ^াস, শুকুর আলী মোল্লা, হযরত আলীসহ ১০জন বাদি হয়ে গত ২৫ জানুয়ারি তাকে (মাখন) সুধীর সরকার, লক্ষণ সরকারসহ ১৯জনের বিরুদ্ধে সাতক্ষীরার সদর সিভিল সহকারি জজ আদালতে ৪৯/২৬ নং মামলা দায়ের করেন। আগামি ৬ ডিসেম্বর বিবাদীপক্ষের জবাব দেওয়ার জন্য দিন ধার্য রয়েছে।
মাখন লাল সরদার আরো জানান, তাদের দখলীয় ও রেকডীয় ৩৩৯ ও ৩৪০ দাগের ৩৫ শতক জমি শুকুর আলী ও তার ছেলে সায়েম ও নাতি প্রান্ত দখল নেওয়ার চেষ্টা করলে এ নিয়ে থানা, ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয়ভাবে বসাবসি হয়। রেকর্ডের বাইরে যেয়ে জমি কেউ মালিকানা দাবি করলে তা সঠিক হবে না মর্মে শিবপুর ইউপি চেয়ারম্যানসহ থানা থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপরও ৩৫ শতক জমির পরিবর্তে তারা আট লাখ টাকা দাবি করে আসছিল। বাধ্য হয়ে তারা রবিবার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্্েরট আদালতে শুকুর আলীসহ ৫ জনের নাম উল্লেখ করে ১৪৫ ধারায় একটি পিটিশন মামলা করেন। এ খবর জানতে পেরেই শুকুর আলী, সামাদ, সায়েম ও প্রান্তের নেতৃত্বে সোমবার সকাল ৭টার দিকে ৫০/৬০ জন লাঠিয়াল বাহিনী একজন আমিন নিয়ে এসে জমির নিশানা করতে আসে। তারা বাধা দিলে জীবননাশের হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে সাংবাদিক ও স্থানীয় লোকজন চলে আসায় লাঠিয়াল বাহিনীর সদস্যরা চলে যায়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সার্ভেয়র শিয়ালডাঙা গ্রামের মিজানুর রহমান জানান, ওই জমি দাবি করে শুকুর আলীর লোকজন আদালতে মামলা করেছে তা তিনি জানতেন না। শুকুর আলীর ছেলে রবিবার রাতে তাকে মাপার জন্য বলে। তিনি তড়িঘড়ি করে মাপ দিয়েই চলে যাচ্ছেন।
জগন্নাথপুর গ্রামের শুকুর আলী বলেন, ফকির বিশ^াসের ওয়ারেশ হিসেবে তিনি ৩৫ শতক জমি পাবেন মাখন লাল সরদার ও তাদের শরীকদের কাছে। বিনিময় দলিল বৈধতা পায়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সম্প্রতি তারা ওই জমি নিয়ে দেওয়ানী মামলা করেছেন। এরপরও বিভিন্ন পর্যায়ে বসবসি করে জমি বা টাকা না পাওয়ায় সোমবার সকালে আমিন দিয়ে মেপে জমি দখলে নিতে এসেছেন।
ডশবপুর ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ আবুল কালাম জানান, এসএ ও বর্তমান রেকর্ড অনুযায়ি ওই জমি অঘোর সরদার ও তার ভাই ও তাদের ওয়ারেশদের। শুকুর আলীর পক্ষে কাগজপত্রের কোন বৈধতা নেই। দেওয়ানী মামলা করার পর সোমবার যেভাবে লোকজন নিয়ে হিন্দুদের জমি দখল করার চেষ্টা করা হয়েছে তা মেনে নেওয়া যায় না।
সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাসুদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে কর্তব্যরত অফিসার উপপরিদর্শক পিংকি রানী বিশ^াস জানান, মাখন লাল সরদারের দায়ের করা পিটিশন মামলার কপি কার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে সেটা জানালে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া জবরদখলের চেষ্টা নিয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ করতে হবে।









