সাতক্ষীরা উন্নয়ন সমন্বয় ফোরামের ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন: জেলার উন্নয়নে ১৬ দফা
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সম্ভাবনাময় জেলা সাতক্ষীরার উন্নয়নকে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে যুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনের বক্তারা বলেন, প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা সাতক্ষীরা দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে এই জেলাকে দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) সকাল ১১টায় রাজধানীর পান্থপথে সাতক্ষীরা জেলা সমিতি, ঢাকার কার্যালয়ে সাতক্ষীরা উন্নয়ন সমন্বয় ফোরামের আয়োজনে “দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সাতক্ষীরার উন্নয়ন: জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তবতা” শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন ফোরামের সভাপতি ইকবাল মাসুদ।
সাতক্ষীরা উন্নয়ন সমন্বয় ফোরামের প্রধান উপদেষ্টা আফসার আলীর সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন সাতক্ষীরা জেলা সমিতি ঢাকার সভাপতি প্রকৌশলী আবুল কাশেম, সাতক্ষীরা উন্নয়ন সমন্বয় ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা বকুলুজ্জামান এবং যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক স.ম মেহেদী হাসান। এসময় ১৬ দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
১. সুন্দরবন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন: বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রতীক সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে পর্যটন ও পরিবেশ সংরক্ষণে একটি বিশেষায়িত ‘সুন্দরবন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ (সুন্দরবন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি) গঠন করা জরুরি।
২. খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপন: সাতক্ষীরার বিখ্যাত হিমসাগর আম, লিচু, কুল, টমেটো, পেয়ারা ও মধুর অপচয় রোধ এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে আধুনিক ফুড প্রসেসিং শিল্প স্থাপন প্রয়োজন।
৩. সাতক্ষীরা-শ্যামনগর মহাসড়ক উন্নয়ন: দীর্ঘদিনের অবহেলার শিকার এই মহাসড়কের নির্মাণকাজ দ্রুত সম্পন্ন করে জনদুর্ভোগ লাঘব করতে হবে।
৪. মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ জোন: ‘সাদা সোনা’ খ্যাত বাগদা চিংড়িসহ রুই, কাতলা, ভেটকি ও পারশে মাছ সংরক্ষণ ও রপ্তানির জন্য একটি আধুনিক ফিশ প্রসেসিং জোন প্রতিষ্ঠা জরুরি।
৫. সীমান্ত সড়ক নির্মাণ: মাদক নিয়ন্ত্রণ, চোরাচালান ও সীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা জোরদারে সীমান্ত এলাকায় স্থায়ী সড়ক নির্মাণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
৬. ভোমরা স্থলবন্দরের আধুনিকায়ন: দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভোমরা স্থলবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করে দ্রুত ও কম খরচে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে।
৭. রেলপথ সংযোগ স্থাপন: নাভারন থেকে ভোমরা স্থলবন্দর ও সাতক্ষীরা শহরের মধ্যে রেল যোগাযোগ স্থাপন এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।
৮. বাস টার্মিনাল স্থানান্তর: যানজট নিরসন ও পরিবেশ রক্ষায় শহরের কেন্দ্রস্থলের পুরাতন বাস স্ট্যান্ড দ্রুত বাইপাস সংলগ্ন লাভসায় স্থানান্তর করা প্রয়োজন (বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে প্রক্রিয়াধীন)।
৯. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা: দেবহাটা উপজেলায় একটি আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি।
১০. টেকসই মহাপরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান): উপকূলীয় জেলা হিসেবে বন্যা ও জলোচ্ছাসের ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন জরুরি।
১১. টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ: প্রতিবছর বাঁধ ভেঙে জনপদ প্লাবিত হওয়ার সমস্যা রোধে স্থায়ী ও শক্তিশালী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে।
১২. বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ: শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালিগঞ্জসহ উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার কারণে সুপেয় পানির সংকট নিরসনে বড় আকারের ‘রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং’ প্রকল্প এবং ডিস্ট্রিবিউশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
১৩. স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন: উপকূলীয় উপজেলার হাসপাতালগুলো সংস্কার, শূন্য পদে জনবল নিয়োগ এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করতে হবে।
১৪. সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আধুনিকায়ন ও ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টার স্থাপন: ৫০০ শয্যার হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা, সব বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ এবং ক্যান্সার রোগীদের জন্য একটি বিশেষায়িত রিসার্চ সেন্টার ও উন্নত ডায়াগনস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
১৫. নীলডুমুর ও মুন্সিগঞ্জকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে উন্নয়ন: সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার হিসেবে এই এলাকাগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের ইকো-ট্যুরিজম জোন গড়ে তোলা, হোটেল-মোটেল নির্মাণ এবং আকাশপথে যোগাযোগের জন্য হেলিপ্যাড বা শর্ট টেক-অফ রানওয়ে (এসটিওএল) স্থাপন করা যেতে পারে।
১৬. আধুনিক ক্রীড়া কমপ্লেক্স ও জিমনেসিয়াম স্থাপন: তরুণ প্রজন্মকে মাদক ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে দূরে রাখতে এবং দক্ষ ক্রীড়াবিদ তৈরির লক্ষ্যে একটি মাল্টিপারপাস স্পোর্টস কমপ্লেক্স নির্মাণ করা প্রয়োজন।
বক্তারা বলেন, সাতক্ষীরার এসব যৌক্তিক দাবিগুলো বাস্তবায়িত হলে শুধু এই জেলার উন্নয়নই নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও পর্যটন খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। প্রেসবিজ্ঞপ্তি






