সচ্চিদানন্দ দে সদয়
একসময় সাংবাদিকতা ছিল একটি কঠিন, দায়িত্বশীল এবং জন স্বার্থনির্ভর পেশা। সংবাদ সংগ্রহ করতে একজন প্রতিবেদককে দিনের পর দিন মাঠে থাকতে হতো, তথ্য যাচাই করতে হতো, একাধিক পক্ষের বক্তব্য নিতে হতো, তারপর সংবাদ প্রকাশিত হতো। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। আজ একটি স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সংযোগ এবং একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট থাকলেই মুহূর্তের মধ্যে যে কেউ ছবি, ভিডিও বা লেখা প্রকাশ করতে পারেন। ফলে একটি বহুল প্রচলিত কথা এখন প্রায়ই শোনা যায়-“ঘরে ঘরে সাংবাদিক।”প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি ঘরে ঘরে সাংবাদিক তৈরি হয়েছে? নাকি ঘরে ঘরে তৈরি হয়েছে তথ্য প্রকাশের মাধ্যম? এই দুইয়ের পার্থক্য বোঝা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। সাংবাদিকতা কখনোই শুধু ছবি তোলা, ভিডিও ধারণ করা বা ফেসবুকে একটি পোস্ট দেওয়ার নাম নয়। সাংবাদিকতা হলো সত্য অনুসন্ধানের শিল্প, দায়িত্বশীল তথ্য পরিবেশনের অঙ্গীকার এবং জনস্বার্থ রক্ষার এক নিরন্তর সংগ্রাম। একজন প্রকৃত সাংবাদিকের প্রথম পরিচয় তাঁর সততা, দ্বিতীয় পরিচয় তাঁর নিরপেক্ষতা এবং তৃতীয় পরিচয় তাঁর জবাবদিহি। তিনি জানেন, একটি ভুল সংবাদ শুধু একজন ব্যক্তির নয়, একটি পরিবার, একটি প্রতিষ্ঠান এমনকি একটি রাষ্ট্রেরও অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারে।অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অনেকেই যাচাই-বাছাই ছাড়াই তথ্য ছড়িয়ে দেন। কেউ ভাইরাল হওয়ার আশায়, কেউ ব্যক্তিগত প্রতিশোধের কারণে, আবার কেউ না বুঝেই গুজব প্রচারে অংশ নেন। একটি পুরোনো ভিডিও নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করা, একটি সম্পাদিত ছবি দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা কিংবা একটি অসম্পূর্ণ তথ্যকে পূর্ণ সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা এখন নিত্যদিনের ঘটনা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মিথ্যা তথ্যের গতি সত্যের চেয়ে অনেক বেশি।ডিজিটাল যুগ নাগরিক সাংবাদিকতার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে-এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। দুর্ঘটনা, অগ্নিকা-, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা দুর্নীতির প্রাথমিক তথ্য অনেক সময় সাধারণ মানুষের মাধ্যমেই প্রথম সামনে আসে। এতে প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পায় এবং সংবাদ মাধ্যমও দ্রুত ঘটনাস্থলের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। অর্থাৎ নাগরিকের অংশগ্রহণ সংবাদকে আরও প্রাণবন্ত ও গতিশীল করেছে।কিন্তু নাগরিক সাংবাদিকতা এবং পেশাদার সাংবাদিকতা এক জিনিস নয়। একজন নাগরিক একটি ঘটনার সাক্ষী হতে পারেন, কিন্তু সেই ঘটনার সত্যতা যাচাই, কারণ অনুসন্ধান, সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য গ্রহণ, আইনগত ও সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ এবং জনস্বার্থের আলোকে সংবাদ উপস্থাপন করাই পেশাদার সাংবাদিকের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, নৈতিকতা, অভিজ্ঞতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ। আজ আরেকটি ভয়াবহ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কিছু ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয়কে পেশা নয়, প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। একটি অনলাইন পোর্টাল খুলে, একটি পরিচয়পত্র বানিয়ে কিংবা একটি ইউটিউব চ্যানেল চালু করেই নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিচ্ছেন। এরপর সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে গিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন, অবৈধ সুবিধা আদায় কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের অভিযোগও প্রায়ই শোনা যায়। কয়েকজনের এই অনৈতিক কর্মকা-ের দায় শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় প্রকৃত সাংবাদিকদের। ফলে সমাজে সাংবাদিকতার প্রতি এক ধরনের অবিশ্বাস তৈরি হচ্ছে। মানুষ যখন দেখেন একজন কথিত সাংবাদিক কোনো প্রতিষ্ঠানে গিয়ে অযৌক্তিক দাবি করছেন, তখন তাঁরা পুরো সাংবাদিক সমাজকেই একই চোখে দেখতে শুরু করেন। অথচ প্রকৃত সাংবাদিকরা দিনের পর দিন ঝুঁকি নিয়ে, সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে থেকেও সত্য প্রকাশের জন্য কাজ করে চলেছেন। তাঁদের সঙ্গে অসাধু ব্যক্তিদের এক কাতারে দাঁড় করানো অন্যায়। এই পরিস্থিতির জন্য শুধু ভুয়া সাংবাদিকদের দায়ী করলে হবে না। সংবাদ মাধ্যমকেও আত্মসমালোচনা করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতায় যাচাই-বাছাইয়ের ঘাটতি দেখা যায়। কখনো কখনো শিরোনামকে আকর্ষণীয় করতে গিয়ে মূল তথ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হয়। আবার রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক প্রভাবের অভিযোগও জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। তাই গণমাধ্যমের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন করা।রাষ্ট্রের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজি, প্রতারণা কিংবা ভুয়া পরিচয়ের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে প্রকৃত সাংবাদিকরা ভয়ভীতি বা হয়রানি ছাড়া স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম কোনো বিলাসিতা নয়; এটি রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবারেও ডিজিটাল সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি। শিশু-কিশোরদের শেখাতে হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া প্রতিটি তথ্য সত্য নয়। কোনো সংবাদ শেয়ার করার আগে তার উৎস যাচাই করতে হবে। একজন দায়িত্বশীল নাগরিক কখনো গুজব ছড়াতে পারেন না। তথ্য প্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি মানুষের হাতে অভূতপূর্ব শক্তি তুলে দিয়েছে। কিন্তু শক্তির সঠিক ব্যবহার না হলে তা সমাজের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। ক্যামেরা হাতে থাকলেই যেমন সবাই আলোকচিত্রী হন না, তেমনি মোবাইল ফোন হাতে থাকলেই সবাই সাংবাদিক হয়ে যান না। সাংবাদিকতা একটি নৈতিক অঙ্গীকার, একটি পেশাগত শৃঙ্খলা এবং সর্বোপরি সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতার নাম।আজ আমাদের প্রয়োজন সাংবাদিকের সংখ্যা বাড়ানো নয়; প্রয়োজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা বৃদ্ধি করা। প্রয়োজন এমন গণমাধ্যম, যা ক্ষমতার নয়, সত্যের পক্ষে দাঁড়াবে; জনপ্রিয়তার নয়, জনস্বার্থের কথা বলবে; গুজবের নয়, তথ্যের ওপর আস্থা রাখবে।’ঘরে ঘরে সাংবাদিক’-এই কথাটি যদি সচেতন নাগরিকের অংশগ্রহণকে বোঝায়, তবে তা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু যদি এর অর্থ হয় যাচাইহীন তথ্যের বন্যা, ভুয়া পরিচয়ের বিস্তার এবং পেশাগত নৈতিকতার অবক্ষয়, তবে তা সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। প্রযুক্তি আমাদের হাতে তথ্য পৌঁছে দিয়েছে, কিন্তু সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব এখনো সৎ, দক্ষ ও নীতিবান সাংবাদিকদের কাঁধেই রয়ে গেছে।তাই সময়ের দাবি একটাই-ঘরে ঘরে মোবাইল থাকুক, তথ্যপ্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়ুক, নাগরিকের অংশগ্রহণ বাড়ুক; কিন্তু সাংবাদিকতার মান, মর্যাদা ও নৈতিকতা যেন কোনোভাবেই বিসর্জন না যায়। কারণ একটি দায়িত্বশীল সংবাদ মাধ্যমই পারে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে, দুর্নীতিকে উন্মোচন করতে এবং সমাজকে সত্যের পথে পরিচালিত করতে। ঘরে ঘরে তথ্যপ্রেরক তৈরি হতে পারে, কিন্তু ঘরে ঘরে সাংবাদিক তৈরি হয় না; সাংবাদিক তৈরি হয় সততা, দক্ষতা, ত্যাগ ও সত্যের প্রতি অবিচল নিষ্ঠার মাধ্যমে। লেখক: সংবাদকর্মী