মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

সুন্দরবনের বাঘ-বিধবা: কেমন আছেন তারা?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:১৯ পূর্বাহ্ণ
সুন্দরবনের বাঘ-বিধবা: কেমন আছেন তারা?

মো. মামুন হাসান

সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। জীববৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশগত গুরুত্বের কারণে এই বন বাংলাদেশের অনন্য সম্পদ। তবে সুন্দরবনের আরেকটি বাস্তবতা রয়েছে, যা এর নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আড়ালে অনেকটাই অদৃশ্য থেকে যায়। বন ও মানুষের সম্পর্ক এখানে সব সময় সহাবস্থানের নয়। জীবিকার প্রয়োজনে বনে যাওয়া মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর সংঘাত কখনো কখনো কেড়ে নেয় একটি পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটিকে। আর সেই মৃত্যুর পর যে নারীরা স্বামীহারা হয়ে সন্তান ও পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রামে নামেন, স্থানীয় সমাজে তাঁদের পরিচয় হয় বাঘবিধবা হিসেবে।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ও গাবুরার মতো সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় এমন নারীর সংখ্যা কম নয়। তাঁদের জীবন কেবল স্বামী হারানোর বেদনায় থেমে থাকে না। শোকের সঙ্গে যুক্ত হয় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক অবজ্ঞা, কুসংস্কার এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক যন্ত্রণা। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই নারীদের জীবনসংগ্রাম জাতীয় পর্যায়ের নীতি ও গণমাধ্যমের আলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

সম্প্রতি নেচার গ্রুপের হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস কমিউনিকেশনস সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণা সুন্দরবনের বাঘবিধবাদের এই বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী ও গাবুরা এলাকায় পরিচালিত গবেষণায় বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানো নারীদের সামাজিক অবস্থান, কুসংস্কার, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক যন্ত্রণা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলার কৌশল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, বাঘবিধবাদের জীবিকা সংগ্রাম কেবল অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত রয়েছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কলঙ্ক।

এই কলঙ্কের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের লোকবিশ্বাস। সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় বাঘের আক্রমণকে কখনো কখনো অতীতের পাপের শাস্তি কিংবা অলৌকিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এমন বিশ্বাসের কারণে স্বামী হারানো নারীদেরও অনেক সময় দুর্ভাগ্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তাঁদের জীবনের স্বাভাবিক আচরণ পর্যন্ত সামাজিক সন্দেহের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে একজন নারী স্বামী হারানোর পর যে শোক, নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যান, তার সঙ্গে যুক্ত হয় সমাজের তৈরি আরেকটি অদৃশ্য দেয়াল।

এখানেই সংকটটি আরও গভীর। একজন বনজীবী যখন বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান, তখন কেবল একটি জীবনই শেষ হয় না, একটি পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও ভেঙে পড়ে। স্বামী হারানো নারীকে একদিকে সন্তানদের দায়িত্ব নিতে হয়, অন্যদিকে জীবিকার নতুন পথ খুঁজে নিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের শিক্ষা, দক্ষতা ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকে। ফলে স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁদের সামনে যে জীবন তৈরি হয়, সেটি এক দীর্ঘ অনিশ্চয়তার জীবন।

এই অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত হয় মানসিক আঘাত। গবেষণায় বাঘবিধবাদের মধ্যে গভীর শোক, বিষণ্নতা এবং পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেসের মতো মানসিক সমস্যার উপসর্গের কথা উঠে এসেছে। প্রিয়জনকে ভয়াবহভাবে হারানোর অভিজ্ঞতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং আর্থিক সংকট একসঙ্গে একজন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। অথচ আমাদের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় এই বিশেষ ধরনের মানসিক ও সামাজিক সংকটের জন্য আলাদা কোনো কাঠামো খুব একটা দৃশ্যমান নয়।

বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চল নিয়ে প্রকাশিত আরও কিছু গবেষণাতেও বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানো নারীদের সামাজিক বাস্তবতা উঠে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, সামাজিক কুসংস্কার ও পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর কারণে তাঁদের জীবন অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে। তবে একই সঙ্গে গবেষণাগুলো একটি আশাব্যঞ্জক দিকও দেখিয়েছে। যথাযথ সহযোগিতা, সংগঠিত উদ্যোগ এবং জীবিকার সুযোগ পেলে এসব নারী নিজেদের জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারেন। তাঁরা শুধু নিজেদের পরিবারকে টিকিয়ে রাখেন না, অন্য নারীদেরও স্বনির্ভর হওয়ার পথ দেখান।

এই জায়গাটিই আমাদের নীতিনির্ধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। বাঘবিধবাদের কেবল অসহায় মানুষ হিসেবে দেখলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। তাঁরা সহায়তা পাওয়ার পাশাপাশি নিজেদের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে পরিবার ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। প্রয়োজন তাঁদের সেই সক্ষমতাকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং উপযুক্ত সুযোগ তৈরি করা।

প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র এই নারীদের জন্য কী করছে। সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ নিঃসন্দেহে জরুরি। রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ এবং সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু বাঘ সংরক্ষণের মানবিক মূল্যও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। একটি বন ও তার বন্যপ্রাণী রক্ষার দায়িত্ব যেমন রাষ্ট্রের, তেমনি সেই বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

প্রথম প্রয়োজন বাঘবিধবাদের একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করা। তাঁদের প্রকৃত সংখ্যা, অবস্থান, আর্থসামাজিক পরিস্থিতি, সন্তানদের অবস্থা এবং জীবিকার ধরন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকলে কার্যকর নীতি প্রণয়ন কঠিন। বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজকল্যাণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে এ উদ্যোগ নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, কুসংস্কার ও সামাজিক কলঙ্ক দূর করতে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সচেতনতা কার্যক্রম প্রয়োজন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, সাংবাদিক এবং নাগরিক সমাজকে এই কাজে যুক্ত করা যেতে পারে। কারণ আইন বা সরকারি সহায়তা একা সামাজিক মানসিকতা পরিবর্তন করতে পারে না।

তৃতীয়ত, বাঘবিধবাদের পুনর্বাসনে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে গুরুত্ব দিতে হবে। আর্থিক সহায়তা তাঁদের জীবিকার সংকট কিছুটা কমাতে পারে, কিন্তু স্বামী হারানোর গভীর মানসিক আঘাত নিরসনে প্রয়োজন কাউন্সেলিং ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সহায়তা। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা, বিকল্প জীবিকা ও সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

সবচেয়ে বড় কথা, স্থানীয় পর্যায়ে ইতিমধ্যে যেসব সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান বাঘবিধবাদের নিয়ে কাজ করছে, তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। তাঁদের কার্যকর উদ্যোগগুলোকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বৃহত্তর পরিসরে নেওয়া গেলে এই নারীদের জীবনমান উন্নয়নে বাস্তব পরিবর্তন আনা সম্ভব।

সুন্দরবন রক্ষা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। কিন্তু সুন্দরবন রক্ষার অর্থ শুধু বন, নদী ও বাঘকে রক্ষা করা নয়। এই বনের সঙ্গে যাঁদের জীবন ও জীবিকা জড়িয়ে আছে, তাঁদেরও রক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানো নারীদের জীবনকে করুণা নয়, অধিকার ও মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতে হবে। বাঘবিধবা কোনো অভিশপ্ত পরিচয় নয়। এটি একটি ভয়াবহ মানবিক অভিজ্ঞতার ফল। তাঁদের প্রতি সমাজের সন্দেহ নয়, প্রয়োজন সহমর্মিতা। অবহেলা নয়, প্রয়োজন সামাজিক নিরাপত্তা। সাময়িক সহায়তা নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও স্বনির্ভরতার সুযোগ।

সুন্দরবনের বাঘ বাঁচুক, বন বাঁচুক। একই সঙ্গে সুন্দরবনের প্রান্তিক মানুষগুলোর জীবনও নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ হোক। প্রকৃতি সংরক্ষণ তখনই সত্যিকার অর্থে মানবিক হবে, যখন বন্যপ্রাণী রক্ষার সঙ্গে মানুষের জীবন ও অধিকারকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।

লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

Ads small one

নোনা জলে মানচিত্র হারাচ্ছে উপকূল: লোকসংস্কৃতির বিনাশ ও স্থায়ী সমাধানের দাবি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০১ পূর্বাহ্ণ
নোনা জলে মানচিত্র হারাচ্ছে উপকূল: লোকসংস্কৃতির বিনাশ ও স্থায়ী সমাধানের দাবি

আসাদুজ্জামান সরদার: সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদের জীবন থেকে স্বজন হারানোর বেদনা এবং গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী বাস্তুচ্যুতির হৃদয়বিদারক চিত্রের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই পর্ব। ভৌগোলিক নাজুকতা, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার কারণে প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে এখানকার মানচিত্র। জলবায়ু উদ্বাস্তু মানুষের এই স্রোত এবং অরক্ষিত ভূগোলের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আজ উপকূলের মানুষ স্থায়ী টেকসই বাঁধ ও দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসনের দাবি জানাচ্ছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বাস্তুসংস্থানের বিনাশ
পরিবেশকর্মী ও গবেষক পিযুষ বাউলিয়া পিন্টু উপকূলীয় সংকটের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে বলেন, “এই অঞ্চলে পরবর্তী সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুরু হয়; বিশেষ করে সিডর থেকে শুরু করে আইলা, তারপরে আম্পান, ইয়াস, বুলবুল এবং মোট ১১-১২টা দুর্যোগ গত পাঁচ-সাত বছরের ভিতরে এই উপকূলে আঘাত হেনেছে। উপকূলে অপরিকল্পিত চিংড়ি ঘের করার কারণে এবং অপরিকল্পিত স্লুইসগেট নির্মাণের ফলে বাঁধগুলো এতটাই দুর্বল হয়ে গেছে যে, সামান্য আঘাতে বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পুরো কৃষি জমি লবণপানিতে প্লাবিত হয়েছে। এর ফলে এই অঞ্চলের মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে বিভিন্ন জায়গায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।”


তিনি আরও জানান, উপকূলী এলাকার দুর্গাবাটি, হরিণনগর, সিংহড়তলী, গাবুরা ও জেলেখালী, প্রতাপনগরের হালদার বাড়ি, পদ্মপুকুরের বন্যতলার মতো অনেক এলাকা নদী ভাঙতে ভাঙতে বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। জীবিকার তাগিদে মানুষ বাধ্য হয়ে এমন পেশায় নামছে যা সে জানে নাÑযেমন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ভ্যান কেনা। কিন্তু সেই ঋণ শোধ করতে না পেরে ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য অঞ্চলে চলে যেতে হচ্ছে।

 

 

হারিয়ে যাচ্ছে লোকসংস্কৃতি ও অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি ও হচ্ছে মানবাধিকার লঙ্ঘন
মানবাধিকারকর্মী ও স্বদেশের নির্বাহী পরিচালক মাধব চন্দ্র দত্ত বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট যেসব ক্ষতি বা হারানো সম্পদ সহজে অর্থে পরিমাপ করা যায় না, সেগুলোকে আন্তর্জাতিক পরিভাষায় অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি বলা হয়। এর ফলে মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, স্বকীয় পরিচয়, মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন, প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য এবং সামাজিক মেলবন্ধন চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। তবে বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলন কিংবা সরকারি ক্ষতিপূরণ নীতিমালায় কেবল ভেঙে যাওয়া রাস্তাঘাট, বাঁধ বা নষ্ট হওয়া ফসলের মতো দৃশ্যমান আর্থিক ক্ষতির হিসাব করা হয়; কিন্তু মানুষের মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক এই অপূরণীয় ক্ষতিগুলো নীতিমালার কাঠামোর বাইরেই রয়ে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের দায় কম থাকা সত্ত্বেও আমরা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাচ্ছি না ।

 

 

তিনি আরো বলেন, প্রতাপনগর ও গাবুরার মতো এলাকাকে বাঁচাতে হলে জিও ব্যাগ নয়, সিসি ব্লকের তৈরি স্থায়ী টেকসই বাঁধ নির্মাণ জরুরি। একই সাথে যারা জমিজমা হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন, তাঁদের খাস জমিতে পুনর্বাসন এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে মানচিত্র থেকে এই উপকূলীয় ইউনিয়নগুলো একদিন চিরতরে হারিয়ে যাবে।

পরিবেশ সংগঠক পিযুষ বাউলিয়া পিন্টু ও স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ অঞ্চলের নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতিÑপৌষ-পার্বণ, নৌকা বাইচ, কবিগান এবং বনজীবী সংস্কৃতির ‘বনবিবি পূজা’ কিংবা মনসার ভেলা ভাসানোর মতো লোকজ ঐতিহ্যগুলো আজ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। অতীতে বাওয়ালি, মৌয়াল ও জেলেরা সুন্দরবনে যাওয়ার আগে বিপদ-আপদ থেকে বাঁচতে অসাম্প্রদায়িক ‘বনবিবির পূজা’ ও বিশেষ গান গাইত। কিন্তু মানুষ পেশা ও এলাকা পরিবর্তন করায় নতুন প্রজন্মের কাছে এসব ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে।

দাতিনাখালী এলাকার ভক্ত মুন্ডা বলেন, “মানুষ যখন পেটের তাগিদে সংক্ষুব্ধ হয়, তখন আর গান-বাজনা বা সংস্কৃতির চর্চা থাকে না। আম্পান আর ইয়াসের পর মানুষ বেঁচে থাকার চিন্তায় এত বেশি মগ্ন যে উৎসব-পার্বণের আনন্দ উবে গেছে। প্রতিবেশীদের মধ্যকার সেই সামাজিক বন্ধন বা অকৃত্রিম সহমর্মিতাও দিন দিন বিলুপ্ত হচ্ছে।

গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী তরুণরা ও অভিবাসনের চিত্র
আইলা ও আম্পানের মতো একের পর এক আঘাত এবং তীব্র লবণাক্ততাই এই অভ্যন্তরীণ স্থায়ী ও অস্থায়ী অভিবাসনের মূল অনুঘটক। আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘রিসার্চগেট’ ও ‘গ্লোবাল এনভারমেন্টাল চেঞ্জ’-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগর ও কয়রা অঞ্চল থেকে প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পরিবার স্থায়ীভাবে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়েছে। অন্যদিকে, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (ঝজউও) সমীক্ষা বলছে, উপকূলীয় এলাকার প্রায় ৬২ শতাংশ জমি ক্ষতিকর লবণাক্ততায় আক্রান্ত হওয়ায় সনাতন কৃষি সম্পূর্ণ ব্যহত হয়েছে, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন ও শহরমুখী অভিবাসনের পথ বেছে নিতে বাধ্য করছে।


স্থায়ী টেকসই বাঁধ ও দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসনের দাবি
গাবুরা ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ ও নদীভাঙনের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকা থেকে মানুষের ক্রমাগত শহরমুখী হওয়ার কারণে গ্রামগুলোতে প্রবীণদের অনুপাত আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। টেকসই নদীবাঁধ, বিকল্প জীবনজীবিকা এবং পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার অভাবে জলবায়ুঝুঁকিতে থাকা এই জনপদগুলো ধীরে ধীরে ‘প্রবীণদের নিঃসঙ্গ দ্বীপে’ পরিণত হচ্ছে।

গাবুরা ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য ফরিদা পারভীন স্থানান্তরের মূল কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, “গাবুরা থেকে মানুষের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রধান অনুঘটক হলো জলবায়ু পরিবর্তনÑবিশেষ করে ধারাবাহিক নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও তীব্র ঘূর্ণিঝড়। পাশাপাশি এলাকায় আয়ের উৎস অত্যন্ত সীমিত। আগে যেখানে ধান চাষের মৌসুমে ২০ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান হতো, সেখানে নোনা পানির মাছ বা চিংড়ি চাষে মাত্র ১ জন শ্রমিক দিয়েই কাজ চলে যায়। ফলে বাকি ১৯ জন মানুষ পুরোপুরি কর্মহীন হয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।”

তিনি আরও যুক্ত করেন, “বিশেষ করে হতদরিদ্র পরিবারগুলো জীবিকার সন্ধানে সবচেয়ে বেশি স্থানান্তরিত হচ্ছে। সাধারণত তরুণ ছেলে-বউ ও নাতি-নাতনিরা কাজের খোঁজে শহরমুখী হয়, আর বৃদ্ধ বাবা-মায়েরা গ্রামে একাকী থেকে যান। প্রবীণদের নিজস্ব আয়-রোজগার না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে সন্তানরা তাঁদের বোঝা মনে করে রেখে যায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গাবুরার প্রতি ১০টি পরিবারের মধ্যে প্রায় ২টি পরিবারই এলাকা ছেড়ে স্থানান্তরিত হয়েছেÑযার মধ্যে নদী তীরবর্তী ও দুর্গম মধ্যবর্তী অঞ্চলের মানুষের হার সবচেয়ে বেশি।”

ত্রাণ ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের বিষয়ে তিনি বলেন, “দূর্যোগের পর সরকার ও সংস্থার পক্ষ থেকে যেসব ত্রাণ বরাদ্দ আসে, আমরা তা প্রকৃত দুস্থদের মাঝে বণ্টন করি। কিন্তু প্রতিটি দুর্যোগের পর কেবল কিছু ত্রাণ বা সাময়িক সহায়তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।

সমাধানে করণীয়
সাতক্ষীরা জলবায়ু পরিষদের আহ্বায়ক আশেক-ই-এলাহী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কেবল কোনো পরিবেশগত সংকট নয়; এটি স্পষ্টতই মানবাধিকার লঙ্ঘন। জলবায়ুজনিত লবণাক্ততা ও দুর্যোগের কারণে এলাকার কর্মক্ষম মানুষ কাজ না পেয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। ফলে গ্রামগুলোতে চাষাবাদের জন্য তরুণ ও কর্মক্ষম মানুষ পাওয়া যাচ্ছে না; যাঁদের পাওয়া যাচ্ছে, তাঁরা মূলত প্রবীণ ও বৃদ্ধ।

তিনি আরও বলেন, ৬০-৭০ বছরের এই প্রবীণ মানুষ ও নারীদের ওপর পরিবারের দায়িত্বের চাপ মারাত্মকভাবে বেড়ে যাওয়ায় তাঁরা চরম নিরাপত্তাহীনতা ও অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এই সংকট মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তাব হলোÑকৃষি খাতে তরুণদের ধরে রাখতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে সহজ শর্তে ঋণ ও উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, আন্তর্জাতিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যারা দায়ী, তাদের কাছ থেকে যে ক্ষতিপূরণ বা তহবিল আদায় করা হবে; তার প্রধান অংশ এই অঞ্চলের প্রবীণ ও কৃষিবান্ধব সমাজ গঠনে ব্যয় করাই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান কাজ।

এ বিষয়ে মনের বন্ধু-র সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলর সোনিয়া আক্তার পুষ্প বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কর্মক্ষম যুবকরা শহরমুখী হওয়ায় বাড়িতে থাকা নারী ও প্রবীণদের ওপর মারাত্মক মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। স্বামী বা পরিবারের প্রধান ব্যক্তি দূরে থাকায় নারীদের একাকীত্ব, অনিশ্চয়তা ও হতাশার পাশাপাশি বৃদ্ধ বাবা-মায়েরাও চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।


এই মানসিক সংকট কাটিয়ে উঠতে তিনি কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছেন:
জীবন ও জীবিকার তাগিদে বারবার যেন দূরে চলে যেতে না হয়, সেজন্য স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। নিয়মিত যোগাযোগ ও মানসিক ভরসা দিতে হবে। পরিবারের যে সদস্যটি দূরে অবস্থান করছেন, তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং মানসিকভাবে সবসময় পাশে থাকার ভরসা দিতে হবে।

দুর্যোগের ধাক্কা সামলে উঠতে কমিউনিটি পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি। এছাড়া মানসিক সমস্যাকে কুসংস্কার বা অবহেলা না করে সঠিক চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
সাতক্ষীরার আশাশুনি ও গাবুরার এই ক্ষয়িষ্ণু বাস্তবতা নিছক কোনো স্থানীয় সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি। আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে প্রকৃত অ-অর্থনৈতিক ক্ষতির ক্ষতিপূরণ আদায় এবং জাতীয় পর্যায়ে স্থায়ী টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে প্রতাপনগরের হাওলাদার বাড়ির মতো শত শত ভিটেমাটি শুধু নোনা জলে তলিয়েই যাবে না, হারিয়ে যাবে একটি জনপদের শতবর্ষী ইতিহাস ও অস্তিত্ব। (দুই পর্বের শেষ পর্ব প্রতিবেদনটি ইন্টারনিউজের আর্থ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের ফেলোশিপের অন্তর্ভুক্ত)।

আশাশুনির বন্যতলায় ফের নদীভাঙন, ঝুঁকিতে প্রতাপনগর

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৩১ অপরাহ্ণ
আশাশুনির বন্যতলায় ফের নদীভাঙন, ঝুঁকিতে প্রতাপনগর

Oplus_131072

সাড়ে ৩০০ ফুট বাঁধে ভাঙন, রাতভর স্বেচ্ছাশ্রমে রক্ষার চেষ্টা
বিএম আলাউদ্দীন, আশাশুনি: সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বন্যতলা এলাকায় ফের নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে ঝোড়ো হাওয়া ও নদীর উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে বেড়িবাঁধের প্রায় সাড়ে ৩০০ ফুট অংশ ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এতে প্রতাপনগর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ জনপদ, ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও মৎস্যঘের প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নতুন করে দুর্যোগের শঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এলাকার হাজারো মানুষ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে ভাঙন শুরু হলে মাইকিং করে এলাকাবাসীকে সতর্ক করা হয়। খবর পেয়ে হাজারো মানুষ ঘটনাস্থলে ছুটে এসে বসতভিটা ও জনপদ রক্ষায় বালুর বস্তা ও জিও ব্যাগ দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে ডাম্পিং শুরু করেন। রাতের আঁধারেও স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা চলে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ভাঙন ঠেকানো না গেলে নদীর ভাটার টানে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ আরও বিস্তৃত হতে পারে। এতে প্রতাপনগরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। অতীতে বেড়িবাঁধ ভেঙে জনপদ প্লাবিত হওয়ার অভিজ্ঞতার কারণে নতুন করে বড় ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ভাঙন প্রতিরোধে ডাম্পিংয়ের ব্যবস্থা করার কথা থাকলেও ঝুঁকিপূর্ণ অংশে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ কাজে ব্যবহারের জন্য হাজার হাজার জিও ব্যাগ প্রস্তুত রাখা হলেও সেগুলো সময়মতো কাজে লাগানো হয়নি বলে দাবি তাঁদের।

বন্যতলার ভাঙন পরিস্থিতি সম্পর্কে আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শ্যামানন্দ কুন্ডু বলেন, “ভাঙনের খবর পেয়েছি। খুব খারাপ অবস্থা। আমি সঙ্গে সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। জেলা প্রশাসক মহোদয়কে জানিয়েছি। এ ছাড়া শ্যামনগর ইউএনওকেও জানিয়েছি। স্থানীয়রা স্বেচ্ছাশ্রমে জিও ব্যাগ দিয়ে ডাম্পিংয়ের কাজ করছেন।”

এদিকে, নদীভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছেন এলাকাবাসী। তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত পর্যাপ্ত জিও ব্যাগ দিয়ে ডাম্পিং ও ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত করা না হলে প্রতাপনগর আবারও ভয়াবহ প্লাবনের মুখে পড়তে পারে।

 

সম্পাদকীয়/উপকূলের জলবায়ু উদ্বাস্তু ও প্রবীণদের মানবিক সংকট

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:২২ অপরাহ্ণ
সম্পাদকীয়/উপকূলের জলবায়ু উদ্বাস্তু ও প্রবীণদের মানবিক সংকট

জলবায়ু পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী ও নির্মম অভিঘাত বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জনপদকে কীভাবে এক গভীর সামাজিক ও মানবিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগরের সাম্প্রতিক চিত্র তা প্রমান করে। সুপার সাইক্লোন ‘আম্পান’-এর নোনা জলের তোড়ে হারিয়ে যাওয়া ভিটেমাটি, ধসে পড়া গ্রামীণ অর্থনীতি এবং ক্রমাগত মাটির উর্বরতা হ্রাসের ফলে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে এই অঞ্চলের অসংখ্য পরিবার।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরার নদীর পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা যেখানে ২০১৯ সালে ২২ থেকে ২৫ ডেসিসিমেন্স ছিল, ২০২৬ সালে তা ৫০ থেকে ৫৫ ডেসিসিমেন্সে রূপ নিয়েছে। সাগরের নোনা পানির ক্রমাগত অনুপ্রবেশ ও মাটির তলার পানি লবণাক্ত হয়ে পড়ার কারণে উপকূলের বিপুল আবাদযোগ্য জমি অনাবাদী হয়ে পড়ছে। ফলে কৃষিভিত্তিক ঐতিহ্যগত জীবিকা হারিয়ে হাজার হাজার পরিবার চরম আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়তে বাধ্য হচ্ছে।

জীবিকার তাগিদে তরুণ ও কর্মক্ষম প্রজন্ম গ্রাম ছেড়ে জেলা শহরের বস্তি কিংবা দূরদূরান্তে পাড়ি জমাচ্ছে। এই স্থানান্তরের সবচেয়ে করুণ শিকার হচ্ছেন প্রবীণরা ও শারীরিকভাবে অসমর্থ নারীরা। সন্তান ও স্বজনদের হারানো ভিটেমাটিতে রেখে যেতে বাধ্য হওয়ায় প্রবীণরা আজ চরম একাকীত্ব, শারীরিক অসুস্থতা ও পুষ্টিহীনতার মুখোমুখি। জীর্ণ খুপরিতে বসে প্রবীণদের বেঁচে থাকার এই লড়াই কোনো একক পরিবারের বিচ্ছিন্ন গল্প নয়; বরং বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের কারণে স্থানান্তরিত কোটি মানুষের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার এক প্রতিচ্ছবি।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ জলবায়ু-অভিবাসীর সংখ্যা বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু উপকূলীয় এই বাস্তবতায় কেবল তথ্য-উপাত্তের হিসেব যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন টেকসই ও সুনির্দিষ্ট জাতীয় উদ্যোগ।

উপকূলের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় সুপেয় পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, লবণাক্ততা-সহনশীল কৃষি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ এবং ভাঙনপ্রবণ এলাকায় মজবুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি, প্রবীণদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু উদ্বাস্ত রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সংকটের খেসারত দিতে গিয়ে আমাদের প্রবীণদের জীবন যেন নিঃসঙ্গতা ও অবহেলায় ফুরিয়ে না যায়Ñরাষ্ট্র ও সমাজকে এই বিষয়ে এখনই সর্বাধিক গুরুত্ব ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।