জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে সাতক্ষীরা জেলা এখন এক চরম বাস্তবতার মুখোমুখি। বারবার আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততার আগ্রাসন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকাকে প্রতিদিন বিপন্ন করছে। সম্প্রতি কপোতাক্ষ নদের তীরে ৫ হাজার ম্যানগ্রোভ ও ৮০০ নিম গাছের চারা রোপণ, ‘কমিউনিটি অ্যাকশন ফর ক্লাইমেট জাস্টিস’ প্রকল্পের সমাপনী সভা এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু সপ্তাহকে কেন্দ্র করে শ্যামনগরে তরুণদের ‘ক্লাইমেট স্ট্রাইক’-এর খবরগুলো উপকূলের একই অখ- বাস্তবতার চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরে।
প্রতাপনগরের রুইয়ারবিলে কপোতাক্ষ নদের পাড়ে ম্যানগ্রোভ চারা রোপণের উদ্যোগটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল কেবল পরিবেশের ভারসাম্যই রক্ষা করে না, বরং তা নদীভাঙন প্রতিরোধে একটি প্রাকৃতিক ও শক্ত প্রাচীর হিসেবে কাজ করে। বেসরকারি সংস্থা ‘উত্তরণ’-এর এ পদক্ষেপে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে যে, টেকসই সুরক্ষার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা ও উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।
তবে কেবল চারা রোপণই শেষ কথা নয়; সেই চারাগুলোকে টিকিয়ে রেখে পূর্ণাঙ্গ বনে রূপান্তর করাই আসল চ্যালেঞ্জ। প্রায়শই দেখা যায়, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এমন অনেক প্রশংসনীয় উদ্যোগ ভেস্তে যায়। ঠিক এই জায়গাতেই আলোকপাত করা হয়েছে সাতক্ষীরায় অনুষ্ঠিত জলবায়ু ন্যায়বিচার সংক্রান্ত সমাপনী অনুষ্ঠানে। বক্তারা যথার্থই বলেছেনÑপ্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও জলবায়ুঝুঁকি মোকাবিলা ও স্থানীয়দের সুরক্ষার কাজ থেমে থাকা চলবে না। সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, গণমাধ্যম এবং তরুণ সমাজকে একযোগে এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে।
শ্যামনগরের পদ্মপুকুরে তরুণদের ক্লাইমেট স্ট্রাইক আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর এই দুর্বিষহ পরিবেশগত সংকটের পেছনে তাদের নিজেদের দায় সামান্যই। জলবায়ু অর্থায়ন, ন্যায্য রূপান্তর এবং পরিবেশগত ন্যায়বিচারের দাবি আজ আর কেবল বৈশ্বিক মঞ্চের আলোচনার বিষয় নয়, তা উপকূলের তৃণমূল যুবসমাজের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে। এই তরুণরা স্থানীয় সুরক্ষার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছে, যা এক আশাব্যঞ্জক দিক।
জলবায়ু সংকটের হাত থেকে উপকূলকে বাঁচাতে হলে টুকরো টুকরো উদ্যোগের পাশাপাশি প্রয়োজন সমন্বিত কৌশলগত পরিকল্পনা। ম্যানগ্রোভ সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা, নদীর বাঁধ টেকসই করা এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের স্থানীয় ও বৈশ্বিক দাবিগুলোকে জোরদার করার ক্ষেত্রে সরকার, এনজিও এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কার্যকর অংশীদারিত্বই হতে পারে একমাত্র পথ। দুর্যোগের অপেক্ষা না করে উপকূল রক্ষায় এখন থেকেই ধারাবাহিক ও টেকসই পদক্ষেপে জোর দেওয়ার সময় এসেছে।