জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা: উপকূলীয় জনপদে নিঃসঙ্গ দিন কাটছে প্রবীণদের
আসাদুজ্জামান সরদার: সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের হাওলাদার বাড়ির জলোচ্ছ্বাসের ফলে সৃষ্ট খালপাড়ের ছোট এক খুপরি ঘরের সামনে চুপচাপ বসে থাকেন সত্তরোর্ধ্ব শাহজাহান ও তাঁর ষাটোর্ধ্ব স্ত্রী রাবেয়া বেগম। চারিদিকে শুধু বিশাল জলরাশি কিন্তু লবণাক্ততা কারণে সে কোন কাজেই লাগে না। জীর্ণ আশ্রয়ে বসে এই জলরাশির পানে চেয়ে থাকেন রাবেয়া বেগম, পাশে বার্ধক্যে নুয়ে পড়া তাঁর স্বামী।
একসময় এই বাড়িতে শাহজাহান-রাবেয়া দম্পতির ছিল কানায় কানায় ভরা সংসার। দুই বিঘা জমির সবুজ আমবাগান, ধানক্ষেত আর পরিপাটি বসতঘর আর সবকিছু নিয়েই ছিল আনন্দময় জীবন।
কিন্তু ২০২০ সালের মে মাসে সবকিছু তছনছ করে দিয়ে যায় সুপার সাইক্লোন ‘আম্পান’। প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুঁড়িকাহুনিয়া ও হাওলাদার বাড়ি সংলগ্ন বাধ ভেঙে খোলপেটুয়া আর কপোতাক্ষের নোনা জল ঢুকে অল্প সময়ের মধ্যে ভাসিয়ে নিযে যায় তাঁদের বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা স্বপ্নের সংসার। টানা কয়েক বছর ধরে ঘরবাড়িতে চলেছে নিয়মিত জোয়ার-ভাটা। ভিটেমাটি, ফসলি জমি থেকে শুরু করে মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু গ্রাস করেছে প্রমত্তা খোলপেটুয়া।
আম্পান তাঁদের কাছ থেকে শুধু ঘরবাড়ি, আমবাগান আর ফসলি জমিই কেড়ে নেয়নি; কেড়ে নিয়েছে স্বজনদের সান্নিধ্যও। নদীভাঙন আর নোনা পানির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবে ভিটেমাটি হারিয়ে কাজের খোঁজে এলাকা ছেড়েছে তাঁদের জোয়ান ছেলেরা, সঙ্গে নিয়ে গেছে পোতা-পুতিœ হুমায়ুন কবির, মরিয়াম আর আফরোজাকেও। অসুস্থ রাবেয়া বেগম অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, পোতা-পুতিœদের জন্য খারাপ লাগবে না? কষ্ট হয় না? কিন্তু কি করবো, কাজের খোজে তারা দুরে চলে গেছে কিন্তু এই বয়সে আমরা কোথায় যাবো?’’

অথচ আগে সবকিছু ছিল, স্বজনেরা ছিল, এখন কেউ নেই। মাসের পর মাস একা একা রান্না-বাড়া করি।
একাকী জীবনের সঙ্গী প্রবীণ শাহজাহান আলী দীর্ঘশ্বাস ফেলে আক্ষেপ করে বলেন, “ওর বাপের (রাবেয়া) প্রায় তিন-চার শত বিঘা জমি ছিল। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো সেই মেয়ে আজ নোনা জলের তোড়ে নিঃস্ব। অসুস্থতার কারণে এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারি না। ছেলে যেটুকু দেয়, তাতে সংসার চলে না; খেয়ে না-খেয়ে দিন কাটে। ক’দিন আগে বাজারে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম, অন্য লোকেরা বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেছে। কি আর করবো, এই একাকী জীবন আর ভালো লাগে না। এখন শুধু মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি।
রাবেয়া-শাহজাহান দম্পতির এই গল্প কেবল কোনো একক পরিবারের করুণ কাহিনী নয়; এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের হাজার হাজার বিলুপ্তপ্রায় পরিবারের এক বিষাদময় বাস্তবতা।
জলবায়ু সংকট ও মাটিতে লবণক্ততা
পরিবেশ গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের বর্তমান সংকটের মূলে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদী অভিঘাত। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ধারাবাহিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রভাব। এসব কারণে এঅঞ্চলের মাটির উর্বরতা ও মিষ্টি পানির উৎসগুলো ক্রমান্বয়ে লবণাক্ত হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের ‘মাটির লবণাক্ততা মানচিত্র ২০২৪’-এর তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় অঞ্চলের ১৭ লাখ ৩ হাজার ৭৫৯ হেক্টর আবাদযোগ্য জমির মধ্যে ১১ লাখ ৫৫ হাজার ৯৮০ হেক্টর জমি মারাত্মক লবণাক্ত হয়ে পড়েছে (প্রায় ৬৮ শতাংশ)।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) সাতক্ষীরা আঞ্চলিক কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শামসুন নাহার রতœা এ বিষয়ে উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরে বলেন, “সাধারণত বর্ষা মৌসুমে লবণাক্ততার তীব্রতা কম থাকে। তবে শুষ্ক মৌসুমে, বিশেষ করে নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে শুরু করে জুন মাস পর্যন্ত মাটির ও পানির লবণাক্ততা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ২০১৯ সালে সাতক্ষীরার খোলপেটুয়া নদীতে লবণাক্ততার মাত্রা যেখানে ২২ থেকে ২৫ ডেসিসিমেন্স/মিটার ছিল, ২০২৬ সালে তা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে সর্বোচ্চ ৫০ থেকে ৫৫ ডেসিসিমেন্সে পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পুরো উপকূলীয় পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, উজানের নদীর প্রবাহ ও নাব্যতা হ্রাস পাওয়ার কারণে সাগরের নোনা পানি ভেতরে চলে আসছে। এর পাশাপাশি অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ অঞ্চলের মাটির তলদেশ থেকে লবণাক্ত পানি উপরের স্তরে উঠে আসছে। এর ফলে কৃষিজমিতে একাধিক ফসল ফলানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে, যা কৃষকদের মাছ বা চিংড়ি ঘেরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর ফলে অন্যান্য কৃষিজ উৎপাদন হুমকির মুখে পড়বে।
জাতীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্থানান্তরের রূপরেখা
ভৌগোলিক নাজুকতার কারণে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত বন্যা, তীব্র ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও দ্রুত বিস্তারমান লবণাক্ততার মুখোমুখি হচ্ছে। নাজুক সামাজিক কাঠামোর কারণে এসব দুর্যোগ প্রাণহানি ও অবকাঠামো ধ্বংসের পাশাপাশি লাখ লাখ মানুষকে ভিটেমাটি হারিয়ে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য করছে। সরকারি হিসাবে কেবল ২০২০ সালের সুপার সাইক্লোন ‘আম্ফান’-এর সময়েই দেশের উপকূলীয় এলাকার প্রায় ২৫ লাখ মানুষকে ঘর ছাড়তে হয়েছিল।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এবং বাংলাদেশ সরকারের তথ্যে দেখা গেছে, বন্যা, নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশের ভেতরেই বর্তমানে ৪৯ লাখ ৬০ হাজার মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। আর বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে সতর্ক করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দ্রুত টেকসই পদক্ষেপ না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ জলবায়ু-অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ছুঁয়ে ফেলবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের একক বৃহত্তম মানবিক ও সামাজিক প্রভাব হতে যাচ্ছে এই ‘বাস্তুচ্যুতি ও অভিবাসন’। সাতক্ষীরার গাবুরা বা প্রতাপনগর থেকে ভিটেমাটি হারিয়ে সাতক্ষীরা পৌরসভার বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলো মূলত এই বৈশ্বিক ও জাতীয় সংকটেরই প্রত্যক্ষ শিকার।

জেলা শহরে বাড়ছে বাস্তুচ্যুত মানুষের চাপ ও বস্তিতে মানবেতর জীবন
সাতক্ষীরা পৌরসভা ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘উত্তরণ’-এর যৌথ সমীক্ষা অনুযায়ী, পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে জেলা শহরে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
সমীক্ষার তথ্যমতে, সাতক্ষীরা পৌরসভায় ২২ বছরে প্রকৃতিক দুযোর্গের কারনে ১০ হাজার ১৩৩টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। এদের মধ্যে ৮৪ শতাংশই নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও তীব্র লবণাক্ততার শিকার হয়ে ভিটেমাটি হারিয়ে শহরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। বিশেষ করে ২০০০ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যবর্তী দশকে সবচেয়ে বেশি স্থানান্তর ঘটে, যা শহরটির ৯ নম্বর ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন বস্তিতে ঘনবসতি তৈরি করেছে। নোনা জল আর নদী ভাঙনের হাত থেকে বাঁচতে শহরে আসা এই জলবায়ু উদ্বাস্তুরা বর্তমানে অপরিসর কাঁচা ঘর, নোংরা ও প্লাবিত রাস্তাঘাট এবং ভঙ্গুর স্যানিটেশন ব্যবস্থার মধ্যে বস্তিতে চরম মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন।
নোনা জলের দীর্ঘশ্বাস ও নারীর জীবন
আশাশুনির হাওলাদার বাড়ির দৃশ্যপট যেমন করুণ, প্রতিবেশী শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নের বাস্তবতাও সমান নিষ্ঠুর। উপকূলীয় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানীয় জলের হাহাকার এবং মারাত্মক লবণাক্ততা এখানকার নারীদের জীবনকে চরম বিপন্ন করে তুলেছে।

গাবুরার ৬০ বছর বয়সী ফজিলা খাতুন তাদেরই একজন। স্বামী হারা এই নারী পক্ষাঘাতগ্রস্ত । ছেলে মেয়েরা কাজের সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে। অসুস্থ শরীরে চরম কষ্টে কষ্টে দিন কাটে এই নারীর।
ফজিলা খাতুন জানান, আগে আমরা কৃষিকাজ করে খেতাম, কিন্তু এখন চতুর্দিকে শুধু লবণ আর লবণ। ধান চাষ তো দূরের কথা, একটা শাকসবজির গাছও বাঁচে না। খাবার পানির জন্য আমাদের মাইলকে মাইল হাঁটতে হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই অদৃশ্য ক্ষতি সামাজের বিভিন্ন জাতী গোষ্ঠী, বয়স ভিত্তিক নারী ও পুরুষের উপর ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেলছে। যেমন-পুরুষেরা কাজের সন্ধানে এলাকা ছাড়ায় নারীদের ওপর পারিবারিক দায়িত্ব ও একাকীত্বের বোঝা বহুগুণ বেড়ে গেছে। অন্যদিকে, চেনা জীবিকা হারিয়ে পুরুষরাও সামাজিক আত্মপরিচয় সংকটে ভুগছেন, যা অনেক ক্ষেত্রে মানসিক অবসাদ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
(দুই পর্বের প্রথম পর্ব প্রতিবেদনটি ইন্টারনিউজের আর্থ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের ফেলোশিপের অন্তর্ভুক্ত)।








