শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১৩ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১৩ আষাঢ় ১৪৩৩

জিয়াউর রহমানের ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬, ৮:৫৬ পূর্বাহ্ণ
জিয়াউর রহমানের ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার এবং প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ শনিবার (৩০ মে)। ১৯৮১ সালের এই দিনে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে দেশি-বিদেশি চক্রান্তে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের হাতে হত্যার শিকার হন তিনি।

জিয়াউর রহমানের ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি গত ২৫ মে থেকে ১ জুন পর্যন্ত আট দিনব্যাপী বিশেষ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ২৫ মে থেকে ১ জুন পর্যন্ত সারা দেশে বিশেষ পোস্টার প্রকাশ করা হচ্ছে এবং দলীয় নেতাকর্মীরা কালো ব্যাজ ধারণ করছেন। এছাড়া বিভিন্ন সংবাদপত্র ও অনলাইন পোর্টালে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হবে।

আজ শনিবার (৩০ মে) ভোর ৬টায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশের সব স্তরের দলীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা ও কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে বলেও জানিয়েছে বিএনপি।

একই দিন সকাল ১১টায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলের জাতীয় নেতারা এবং সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও জিয়ারত করবেন। জিয়ারত শেষে মাজার প্রাঙ্গণে জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের উদ্যোগে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।

এছাড়া দিবসটি উপলক্ষে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের প্রতিটি থানায় এবং দেশের অন্যান্য ইউনিটে অসচ্ছল ও দুঃস্থ মানুষের মাঝে কাপড়, চাল, ডালসহ খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।

একইভাবে দেশের সব জেলা, মহানগর ও অন্যান্য ইউনিটেও ৩০ মে ভোর ৬টায় দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা ও কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে। স্থানীয় সুবিধা অনুযায়ী আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল এবং দুঃস্থদের মাঝে খাদ্যসামগ্রী ও বস্ত্র বিতরণ কর্মসূচিও পালন করা হবে।

পরদিন ৩১ মে (রবিবার) বেলা ২টায় রাজধানীর রমনায় ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে বিএনপির উদ্যোগে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক ছিলেন। তিনি দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা। তার প্রতিষ্ঠিত বিএনপি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করেন। এজন্য তাকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের জনক বলা হয়। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশ নিয়ে গঠিত ‘সার্ক’ প্রতিষ্ঠারও স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন তিনি। জাতীয়তাবাদভিত্তিক একটি কালজয়ী রাজনৈতিক দর্শন প্রতিষ্ঠা করে গেছেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

তার প্রতিষ্ঠিত বিএনপি এখন পর্যন্ত পাঁচবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। সবশেষ গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে দলটি। শহীদ জিয়াউর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান বর্তমানে বিএনপির চেয়ারম্যান এবং নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রতি বছর দিনটি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী হিসেবে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ পালন করে আসছে।

Ads small one

হারিয়ে যাচ্ছে ‘ডেউয়া’, হারাচ্ছি খাঁটি পুষ্টি/ ‎তারিক ইসলাম

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬, ৩:০৯ অপরাহ্ণ
হারিয়ে যাচ্ছে ‘ডেউয়া’, হারাচ্ছি খাঁটি পুষ্টি/ ‎তারিক ইসলাম

তারিক ইসলাম

‎জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়ের কড়া রোদে গ্রামীণ মেঠোপথ ধরে হাঁটলে একসময় যে চেনা সুবাস নাকে আসত, তা এখন অনেকটাই স্মৃতির পাতায়। আম-কাঁঠালের এই মৌসুমে গ্রামীণ জনপদে কচিকাঁচাদের আরও একটি ফলের জন্য উন্মুখ অপেক্ষা থাকত-তা হলো টক-মিষ্টি স্বাদের ‘ডেউয়া’। অঞ্চলভেদে এটি ডেউফল, ঢেউয়া বা বঁড়হর নামেও পরিচিত। রূপ-রঙে বিদেশি ফলের মতো অতটা আকর্ষণীয় না হলেও, এর পুষ্টিগুণ ও ওষুধি ক্ষমতা অনন্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, জলবায়ু পরিবর্তন, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন আর বিদেশি ফলের আগ্রাসনে আমাদের চিরচেনা এই দেশি ফলটি আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।

‎দেখতে কিছুটা এবড়োথেবড়ো ও অসমান হলেও ডেউয়ার ভেতরের প্রতিটি কোয়া পুষ্টির একেকটি আধার। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, ডেউয়া ফলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম এবং পটাশিয়াম। প্রতি ১০০ গ্রাম ডেউয়ায় প্রায় ১৩৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি পাওয়া যায়, যা আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে দারুণ কার্যকরী।

‎কেন খাদ্যতালিকায় ডেউয়া রাখা জরুরি?
‎হজম ও লিভারের সুরক্ষায়: কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে ও যকৃতের (লিভার) কার্যকারিতা বাড়াতে ডেউয়া ঐতিহ্যগতভাবেই অত্যন্ত কার্যকরী।

‎ওজন ও মেদ নিয়ন্ত্রণে: শরীরের অতিরিক্ত মেদ বা চর্বি ঝরাতে (লিপোলাইসিস প্রক্রিয়ায়) ডেউয়ার রস দারুণ উপকারী।

‎রুচি ফেরাতে: দীর্ঘ রোগভোগের পর বা প্রচন্ড গরমে মুখের অরুচি কাটাতে ডেউয়া ভর্তা বা চাটনির জুড়ি নেই।
‎ত্বক ও চুলের যতœ: উচ্চ মাত্রার অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট অকালে চুল পাকা রোধ করে এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়।
‎বিগত কয়েক দশকে দেশের ফল চাষের ধরনে এক বিশাল বাণিজ্যিক রূপান্তর এসেছে। নার্সারি ও চাষিদের বড় অংশই এখন বিদেশি ড্রাগন ফল, মাল্টা, কিংবা রামবুটান চাষে ঝুঁকছেন। অধিক ও দ্রুত মুনাফার আশায় গ্রামীণ ঝোপঝাড় কেটে সাবাড় করা হচ্ছে, যার প্রথম শিকার হচ্ছে ডেউয়া, গাব বা আতার মতো দেশি গাছগুলো।

‎বর্তমানে রাজধানীর কাঁচাবাজার কিংবা সুপারশপগুলোতে থরে থরে সাজানো বিদেশি ফলের ভিড়ে ডেউয়া খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অথচ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে এই ফলের বাণিজ্যিক চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ (যেমন: জ্যাম, জেলি বা ক্যান্ডি তৈরি) নিয়ে ব্যাপক গবেষণা ও বিপণন হচ্ছে।

‎দেশি ফলের এই বিলুপ্তি কেবল আমাদের খাদ্যতালিকা থেকে একটি নাম মুছে যাওয়া নয়, বরং আমাদের জীববৈচিত্র্য ও লোকজ চিকিৎসার এক অপূরণীয় ক্ষতি। এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
‎উন্নত জাতের উদ্ভাবন: বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইঅজও) বা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যদি ডেউয়ার কলম ও দ্রুত ফলনশীল জাত তৈরি করে কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়, তবে এর বাণিজ্যিক চাষ সম্ভব।

‎ছাদ কৃষিতে অন্তর্ভুক্তি: বর্তমানের জনপ্রিয় ‘ছাদ কৃষি’র তালিকায় ডেউয়াকে অন্তর্ভুক্ত করতে ছাদবাগানিদের সরকারি-বেসরকারিভাবে উৎসাহিত করা যেতে পারে।

‎তরুণ প্রজন্মে সচেতনতা: নতুন প্রজন্মের কাছে দেশি ফলের পুষ্টিগুণ তুলে ধরতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘দেশি ফল উৎসব’-এর আয়োজন করা প্রয়োজন।

‎বিদেশি ফলের চাকচিক্যের মোহে পড়ে আমরা যেন আমাদের মাটির খাঁটি পুষ্টিকে ভুলে না যাই। আসুন, বাড়ির পরিত্যক্ত কোণে, ফসলের আইলে বা ছাদবাগানে অন্তত একটি হলেও ডেউয়া গাছের চারা রোপণ করি। আমাদের সুস্থতা আর প্রকৃতির ভারসাম্য-উভয় রক্ষার্থেই দেশি ফলকে ফিরিয়ে আনতে হবে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায়।
‎‎লেখক: তারিক ইসলাম, ‎সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।

তহশীল অফিস: নাগরিকের আরও কাছে পৌঁছাতে হবে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬, ৩:০৪ অপরাহ্ণ
তহশীল অফিস: নাগরিকের আরও কাছে পৌঁছাতে হবে

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে এমন একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম তহশীল অফিস, যেখানে মানুষ আনন্দ নিয়ে নয়, প্রয়োজনের তাগিদে যায়। জমির খাজনা পরিশোধ, ভূমি উন্নয়ন কর, খতিয়ান সংক্রান্ত তথ্য, রেকর্ড সংশোধন কিংবা জমির মালিকানা সংক্রান্ত নানা কাজে সাধারণ মানুষকে এই অফিসের দ্বারস্থ হতে হয়। ভূমি মানুষের জীবনের সঙ্গে, জীবিকার সঙ্গে এবং অস্তিত্বের সঙ্গে ও তপ্রোতভাবে জড়িত। তাই ভূমি-সংক্রান্ত যে কোনো সমস্যা মানুষের জন্য কেবল প্রশাসনিক জটিলতা নয়, এটি মানসিক উদ্বেগ ও নিরাপত্তা হীনতারও কারণ। অথচ যে প্রতিষ্ঠানটি মানুষের এই উদ্বেগ দূর করার কথা, দেশের বহু স্থানে সেই তহশীল অফিসই আজ সাধারণ মানুষের কাছে কান্না, দীর্ঘশ্বাস ও হতাশার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

 

একজন কৃষক সকালবেলা বাড়ি থেকে বের হন খাজনা দিতে। একজন বৃদ্ধা নারী স্বামীর রেখে যাওয়া জমির কাগজপত্র ঠিক করতে আসেন। একজন দিনমজুর নিজের সামান্য ভিটেমাটির রেকর্ড হালনাগাদ করার জন্য অফিসে আসেন। তাদের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। তারা শুধু চান, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী দ্রুত ও সঠিক সেবা পেতে। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি সাধারণ কাজের জন্য দিনের পর দিন অফিসে ঘুরতে হচ্ছে। কখনো কর্মকর্তা নেই, কখনো প্রয়োজনীয় কাগজের তালিকা স্পষ্ট নয়, কখনো আবার ফাইল এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে ঘুরছে। ফলে একটি ছোট কাজও হয়ে ওঠে বড় ভোগান্তির কারণ।

 

গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে তহশীল অফিস মানেই যেন অনিশ্চয়তার এক দীর্ঘ করিডোর। সকালে গিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসতে হয়, তবুও কাজ সম্পন্ন হয় না। এতে শুধু সময়ের অপচয় হয় না, অর্থনৈতিক ক্ষতিও হয়। একজন কৃষক বা দিনমজুরের জন্য একটি কর্মদিবসের মূল্য অনেক। অফিসে আসার কারণে তার সেদিনের আয় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সরকারি সেবা নিতে গিয়েই তাকে আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, তহশীল অফিসকে ঘিরে গড়ে ওঠা দালালচক্র।

 

দেশের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, কিছু মধ্যস্বত্বভোগী অফিসের আশপাশে অবস্থান করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে। তারা বোঝায় যে তাদের সাহায্য ছাড়া কোনো কাজ হবে না। অনেক ক্ষেত্রে সেবাপ্রার্থীরা ভয়, অজ্ঞতা বা দীর্ঘসূত্রতার কারণে এসব দালালের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হন। এতে একদিকে জনগণের অর্থ অপচয় হয়, অন্যদিকে সরকারি ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়।

 

আরও দুঃখজনক হলো, বিভিন্ন সময়ে কিছু অসাধু তহশীলদার ও সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগও উঠে আসে। সরকারি ফি নির্ধারিত থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। খাজনা গ্রহণ, ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ প্রদান, জমির নথিপত্র যাচাই কিংবা বিভিন্ন কাগজপত্র দ্রুত সরবরাহের ক্ষেত্রে অবৈধ সুবিধা আদায়ের অভিযোগ নতুন নয়। অনেকেই বলেন, সরকারি ফি দেওয়ার পরও কাজের গতি বাড়াতে আলাদা অর্থ খরচ করতে হয়। যদিও সবাই এমন নয়, তবে কিছু অসাধু ব্যক্তির কর্মকা- পুরো প্রশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।

 

এই অনৈতিক লেনদেনের সবচেয়ে বড় শিকার দরিদ্র মানুষ। একজন কৃষক, একজন বিধবা নারী কিংবা একজন বয়স্ক মানুষ যখন নিজের প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য হন, তখন তা শুধু দুর্নীতি নয়; এটি তার নাগরিক অধিকারের ওপরও আঘাত। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক মানুষের মধ্যে এমন ধারণা জন্মেছে যে ‘টাকা ছাড়া সরকারি অফিসে কাজ হয় না।’ এই ধারণা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কারণ রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে গেলে উন্নয়নের প্রকৃত সুফলও ম্লান হয়ে যায়। তবে সমস্যার সব দায় শুধুমাত্র মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও ন্যায়সঙ্গত হবে না।

 

বাস্তবতা হলো, অনেক তহশীল অফিসে জনবল সংকট রয়েছে। একজন কর্মকর্তাকে বিপুলসংখ্যক মানুষের সেবা দিতে হয়। অনেক অফিসে পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই, বসার জায়গা নেই, প্রযুক্তিগত সুবিধা সীমিত। ফলে সেবার গতি ব্যাহত হয়। কিন্তু জনবল সংকট কিংবা অবকাঠামোগত দুর্বলতা কোনোভাবেই দুর্ব্যবহার, হয়রানি কিংবা অনিয়মের অজুহাত হতে পারে না। গত কয়েক বছরে ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, ই-নামজারি, ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণসহ বিভিন্ন আধুনিক সেবা চালু হয়েছে।

 

এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু গ্রামীণ বাস্তবতায় এখনো অনেক মানুষ ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত নন। ফলে তাদের সরাসরি অফিসে যেতে হয়। আর সেখানেই যদি তারা হয়রানির শিকার হন, তাহলে ডিজিটাল উদ্যোগের সুফল পূর্ণমাত্রায় পৌঁছায় না। ভূমি নিয়ে বিরোধ বাংলাদেশের অন্যতম বড় সামাজিক সমস্যা। পারিবারিক কলহ, দীর্ঘদিনের মামলা-মোকদ্দমা, এমনকি অনেক সহিংস ঘটনার পেছনেও জমি-সংক্রান্ত জটিলতা কাজ করে।

 

এই অবস্থায় তহশীল অফিসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সঠিক তথ্য, স্বচ্ছ নথিপত্র এবং দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা গেলে অনেক বিরোধেরই প্রাথমিক সমাধান সম্ভব। কিন্তু যখন সেখানে অস্বচ্ছতা ও অনিয়ম দেখা দেয়, তখন সমস্যার গভীরতা আরও বাড়ে। রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু বড় বড় সেতু, মহাসড়ক কিংবা দালানকোঠা নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সাধারণ মানুষ সরকারি সেবা সহজে ও সম্মানের সঙ্গে পায়। একজন কৃষকের কাছে রাষ্ট্রের মুখ হলো তহশীল অফিস, ইউনিয়ন পরিষদ, হাসপাতাল কিংবা থানা। সেখানে যদি তিনি ভালো ব্যবহার পান, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি তার আস্থা বাড়ে।

 

আর যদি অবহেলা ও হয়রানির শিকার হন, তাহলে তার মনে ক্ষোভ জন্মায়। তাই সময় এসেছে তহশীল অফিসকে ঘিরে বিদ্যমান সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার। প্রতিটি অফিসে সেবার ধাপ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সরকারি ফি দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শন করতে হবে। দালালমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নিয়মিত মনিটরিং, আকস্মিক পরিদর্শন এবং কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে।

 

একই সঙ্গে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করতে হবে, যাতে জনগণ প্রকৃত সেবা পায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারি অফিসে সেবাপ্রার্থীদের প্রতি মানবিক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। একজন মানুষ যখন কোনো সমস্যার সমাধানের আশায় অফিসে আসেন, তখন তাকে সম্মান দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি হাসিমুখ, একটি সঠিক দিকনির্দেশনা কিংবা একটি আন্তরিক আচরণ অনেক বড় সমস্যার সমাধান করতে পারে। তহশীল অফিস কোনো কান্নার আতুরঘর হওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

 

এটি মানুষের সেবা, আস্থা ও ন্যায়বিচারের কেন্দ্র হওয়ার কথা। কিন্তু যখন মানুষ সেবা নিতে গিয়ে হয়রানি, দালালচক্র ও অনৈতিক লেনদেনের শিকার হয়, তখন সেই অফিস কান্নার আতুরঘরে পরিণত হয়। তাই এখনই সময় এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের। তহশীল অফিসকে জনগণের ভোগান্তির প্রতীক নয়, বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনসেবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে পরিণত করতে হবে।

 

যেদিন একজন কৃষক, একজন বিধবা নারী কিংবা একজন সাধারণ নাগরিক কোনো ভয়, অনিশ্চয়তা বা অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই তহশীল অফিস থেকে সেবা নিয়ে সন্তুষ্ট মনে বাড়ি ফিরতে পারবেন, সেদিনই বলা যাবেÑতহশীল অফিস আর কান্নার আতুরঘর নয়; এটি সত্যিকার অর্থে জনগণের সেবার ঠিকানায় পরিণত হয়েছে। তখনই ভূমি প্রশাসনের প্রতি মানুষের হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস ফিরে আসবে, আর রাষ্ট্রও তার নাগরিকের আরও কাছে পৌঁছে যাবে।

লেখক: সাংবাদিক

 

১০ মহরম ত্যাগ, ন্যায় ও মানবতার এক অবিনশ্বর ইতিহাস

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬, ২:৪৯ অপরাহ্ণ
১০ মহরম ত্যাগ, ন্যায় ও মানবতার এক অবিনশ্বর ইতিহাস

এম.এম হায়দার আলী

ইসলামের ইতিহাসে ১০ মহরম বা আশুরা এমন একটি দিন, যা মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে গভীর শোক, আত্মত্যাগ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে চিরস্মরণীয়। ৬১ হিজরির ১০ মহরম (১০ অক্টোবর ৬৮০ খ্রিস্টাব্দ) ইরাকের কারবালার প্রান্তরে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবার ও অল্পসংখ্যক সঙ্গীরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে শাহাদাত বরণ করেন। ইতিহাসে এই ঘটনাই “কারবালার ট্র্যাজেডি” নামে পরিচিত।

কারবালার ঘটনা কেবল একটি যুদ্ধের ইতিহাস নয়; এটি অন্যায়, জুলুম ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সত্যের বিজয়ের প্রতীক। সংখ্যায় অল্প হলেও ইমাম হুসাইন (রা.) আপোষ করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, অন্যায়ের কাছে মাথা নত করার চেয়ে সত্যের পথে জীবন উৎসর্গ করা অধিক মর্যাদার। সে সময় মুসলিম বিশ্বের শাসক ইয়াজিদের প্রতি আনুগত্যের শপথ গ্রহণের জন্য ইমাম হুসাইন (রা.)-এর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু তিনি মনে করতেন, অন্যায় ও অবিচারের সঙ্গে আপস করা ইসলামের মৌলিক আদর্শের পরিপন্থী। তাই তিনি মদিনা থেকে মক্কা এবং পরে কুফার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

 

পথে কারবালায় তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে অবরুদ্ধ করা হয়। ইতিহাস বর্ণনা করে, টানা কয়েক দিন ফোরাত নদীর পানি থেকেও তাঁদের বঞ্চিত রাখা হয়। তীব্র তৃষ্ণা, অনাহার ও প্রতিকূলতার মধ্যেও ইমাম হুসাইন (রা.) এবং তাঁর সঙ্গীরা সত্যের পথ থেকে সরে আসেননি। অবশেষে ১০ মহরম তিনি, তাঁর পরিবারের সদস্য এবং বিশ্বস্ত সঙ্গীরা একে একে শাহাদাত বরণ করেন। এই নির্মম ঘটনার স্মৃতি আজও বিশ্ব মুসলিমকে শোকাহত করে। বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা আশুরার দিনকে বিভিন্নভাবে স্মরণ করেন। অনেকে রোজা রাখেন, দোয়া ও ইবাদতে সময় অতিবাহিত করেন এবং কারবালার শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করেন।

 

ইসলামি ঐতিহ্যে সহিহ হাদিসে বর্ণিত রয়েছে যে, আশুরার রোজা রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার রোজা রাখতেন এবং পরবর্তীতে ৯ ও ১০ মহরম অথবা ১০ ও ১১ মহরম রোজা রাখার উৎসাহ দিয়েছেন, যাতে অন্য ধর্মাবলম্বীদের রীতি থেকে ভিন্নতা বজায় থাকে।

কারবালার শিক্ষা আজও সমান ভাবে প্রাসঙ্গিক। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে দাঁড়ানো, সত্যকে আঁকড়ে ধরা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার যে আদর্শ ইমাম হুসাইন (রা.) রেখে গেছেন, তা যুগে যুগে মানুষকে অনুপ্রাণিত করে আসছে। ক্ষমতা বা ব্যক্তিগত স্বার্থের কাছে নীতিকে বিসর্জন না দেওয়ার এক অনন্য উদাহরণ কারবালার ঘটনা। বর্তমান বিশ্বে যখন যুদ্ধ, সংঘাত, বৈষম্য, দুর্নীতি ও অবিচার নানা রূপে মানব সমাজকে বিপর্যস্ত করছে, তখন কারবালার বার্তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকাই একজন মানুষের সর্বোচ্চ মর্যাদা।

 

১০ মহরম তাই শুধু শোকের দিন নয়; এটি আত্মত্যাগ, নৈতিকতা, ধৈর্য, সাহস ও মানবতার এক চিরন্তন প্রেরণার দিন। কারবালার প্রান্তরে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগ মানব সভ্যতার ইতিহাসে এমন এক আলোকবর্তিকা, যা অন্যায়ের অন্ধকারে ন্যায়ের পথ দেখিয়ে যাবে অনন্তকাল এমনটি আশা আমি অধমের।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
মোবাইলঃ ০১৯৭৯ ১৩৬০৯৮