মো. মামুন হাসান
একটি বাড়ি। উঠানে হয়তো এখন অন্য কারও বসবাস। পুকুরটি আছে, কিন্তু তার নাম বদলে গেছে। গ্রামের সেই পথটিও আছে, শুধু পথের মানুষগুলো নেই। কোথাও পুরোনো একটি মন্দির, কোথাও জমিদারবাড়ির ভগ্ন দেয়াল, কোথাও কোনো পরিবারের স্মৃতি হয়ে টিকে থাকা একটি গাছ। অথচ এসব জায়গার সঙ্গে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে বসবাসকারী কোনো মানুষের জীবনের গভীর সম্পর্ক থাকতে পারে।
১৯৪৭ সালের দেশভাগ শুধু একটি ভূখন্ডকে ভাগ করেনি, অসংখ্য মানুষের ঠিকানা, স্মৃতি ও শিকড়কেও দুই দেশের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে। খুলনা, বাগেরহাট, যশোর ও সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের বহু পরিবার তখন ভারতে চলে যায়। তাদের সন্তান, নাতি নাতনি ও পরবর্তী প্রজন্ম আজ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও শহরে বসবাস করছেন। তাদের কাছে বাংলাদেশের এই অঞ্চল হয়তো এখন একটি দেশের নাম নয়, বরং একটি হারিয়ে যাওয়া বাড়ির ঠিকানা।
সেখানেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের নতুন এক পর্যটন সম্ভাবনা। নাম হতে পারে ডায়াসপোরা ট্যুরিজম। তবে এটিকে আমরা প্রচলিত পর্যটনের চোখে দেখলে ভুল করব। এটি শুধু পর্যটক আনার পরিকল্পনা নয়। এটি মানুষকে তার শিকড়ের কাছে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ। এটি স্মৃতিকে পর্যটন পণ্যে রূপ দেওয়ার শিল্প। এটি হতে পারে ইতিহাস, আবেগ, অর্থনীতি এবং আন্তদেশীয় সম্পর্কের এক অনন্য সেতু।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যে এই শক্তিকে বুঝতে শুরু করেছে। ঘানা তাদের প্রবাসী জনগোষ্ঠীকে পূর্বপুরুষের ভূমিতে ফিরিয়ে আনতে ইয়ার অব রিটার্ন এবং বিয়ন্ড দ্য রিটার্ন এর মতো উদ্যোগ নিয়েছে। আয়ারল্যান্ড তাদের বংশোদ্ভূত মানুষের কাছে পূর্বপুরুষের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণে পরিণত করেছে। ভারত প্রবাসী ভারতীয়দের মাধ্যমে তাদের পরিচিতদের দেশ ভ্রমণে উৎসাহিত করতে চলো ইন্ডিয়া উদ্যোগ নিয়েছে। অর্থাৎ পৃথিবীর অনেক দেশ বুঝতে পেরেছে, মানুষের শিকড়ও একটি পর্যটন সম্পদ।
বাংলাদেশও পারে। আর সেই পরীক্ষার জন্য খুলনা, বাগেরহাট, যশোর ও সাতক্ষীরা হতে পারে দেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় একটি ডায়াসপোরা ট্যুরিজম করিডর। ভাবুন, কলকাতা থেকে একটি পরিবার যশোরে আসছে। পরিবারের প্রবীণ সদস্য জানেন, তাঁর বাবা একসময় এই জেলার কোনো একটি গ্রামে থাকতেন। সঙ্গে থাকা নাতি হয়তো জানে শুধু গল্পটুকু। পর্যটন যদি সেই গল্পকে খুঁজে বের করার সুযোগ তৈরি করে, তাহলে ভ্রমণটি আর সাধারণ ভ্রমণ থাকে না। হয়ে ওঠে রুটস জার্নি।
যশোরের কোনো গ্রাম হতে পারে একটি পরিবারের রুটস ডেস্টিনেশন। বাগেরহাটের কোনো পুরোনো স্থাপনা হতে পারে পূর্বপুরুষের স্মৃতির অংশ। খুলনার কোনো নদীপাড় হয়ে উঠতে পারে হারিয়ে যাওয়া শৈশবের গল্পের জায়গা। সাতক্ষীরার কোনো গ্রাম হতে পারে কয়েক প্রজন্ম পর ফিরে আসা একটি পরিবারের আবেগের ঠিকানা।
আর সুন্দরবন? সুন্দরবন হতে পারে এই পুরো ট্যুরিজম সার্কিটের আন্তর্জাতিক আকর্ষণ। একদিকে ঐতিহ্য, অন্যদিকে প্রকৃতি। মাঝখানে খাবার, সংস্কৃতি, নদী, গ্রামীণ জীবন এবং পারিবারিক ইতিহাস। অর্থাৎ একজন ডায়াসপোরা পর্যটক একই সফরে নিজের অতীত এবং বাংলাদেশের প্রকৃতি দুটোই আবিষ্কার করতে পারেন।
এখানে একটি নতুন ধারণা চালু করা যেতে পারে, ফাইন্ড ইউর রুটস বাংলাদেশ। প্রবাসী বা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কেউ তার পরিবারের পুরোনো ঠিকানা, গ্রামের নাম, পূর্বপুরুষের নাম বা পারিবারিক তথ্য দিলে স্থানীয় পর্যায়ে গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়, স্থানীয় প্রশাসন ও পর্যটন পেশাজীবীরা মিলে তার শিকড় খুঁজে দিতে পারেন। পাওয়া গেলে সেই পরিবারের জন্য তৈরি হতে পারে একটি বিশেষ হেরিটেজ ট্রেইল।
ভাবুন, একজন ভারতীয় নাগরিক জানতে পারলেন তাঁর দাদার বাড়ি ছিল সাতক্ষীরার একটি গ্রামে। তিনি বাংলাদেশে এলেন। স্থানীয় একজন প্রশিক্ষিত গাইড তাকে সেই বাড়ি, পুকুর, পুরোনো বাজার, ধর্মীয় স্থাপনা, নদী এবং আশপাশের মানুষের গল্প শোনালেন। স্থানীয় একটি পরিবার তাকে দুপুরের খাবার খাওয়ালো। একজন কারুশিল্পী তাকে গ্রামের তৈরি পণ্য উপহার দিলেন। সন্ধ্যায় তিনি সুন্দরবনের পথে গেলেন।
এই একটি ভ্রমণে অর্থ ব্যয় হলো পরিবহন, আবাসন, খাবার, গাইড, কারুশিল্প, স্থানীয় পণ্য এবং বিনোদনে। অর্থাৎ একজন পর্যটক শুধু একটি হোটেলের আয় বাড়ালেন না, স্থানীয় অর্থনীতির বহু মানুষের আয় তৈরি করলেন।
এখানেই ডায়াসপোরা ট্যুরিজমের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি। তবে এর চেয়েও বড় লাভ অর্থের বাইরে। ১৯৪৭ সালে যে সীমান্ত মানুষের যাতায়াত থামিয়ে দিয়েছিল, পর্যটন সেই সীমান্তের বাস্তবতা অস্বীকার না করেও মানুষের স্মৃতি ও সংস্কৃতির একটি শান্তিপূর্ণ সেতু তৈরি করতে পারে। আজকের প্রজন্মের ভারতীয় বংশোদ্ভূত একজন মানুষ যদি তার পূর্বপুরুষের বাড়ি দেখতে বাংলাদেশে আসেন, আর বাংলাদেশের একজন মানুষ যদি তার সঙ্গে সেই ইতিহাস ভাগ করে নেন, সেখানে তৈরি হয় এক ধরনের পিপল টু পিপল ডিপ্লোম্যাসি। এটি রাষ্ট্রীয় কূটনীতির বাইরে মানুষের কূটনীতি। আর এখানেই খুলনা অঞ্চলের সম্ভাবনা অন্যরকম। আমরা এতদিন পর্যটনকে দেখেছি গন্তব্য দিয়ে। এখন দেখতে হবে গল্প দিয়ে।
বাগেরহাট শুধু ষাটগম্বুজ মসজিদের শহর নয়। যশোর শুধু একটি জেলা নয়। খুলনা শুধু সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার নয়। সাতক্ষীরা শুধু সীমান্ত জেলা নয়। এগুলো অসংখ্য মানুষের স্মৃতি, অভিবাসন, সংস্কৃতি এবং পারিবারিক ইতিহাস বহন করে চলা জীবন্ত আর্কাইভ। এই আর্কাইভকে যদি পর্যটন পণ্যে রূপ দেওয়া যায়, তাহলে তৈরি হতে পারে একেবারে নতুন বাজার।
সরকার চাইলে চার জেলার জন্য একটি ডায়াসপোরা ট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করতে পারে। ভারতসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের এই অঞ্চলের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত পরিবারগুলোর জন্য ডিজিটাল প্রচারণা চালানো যেতে পারে। মাই অ্যানসেস্ট্রাল হোম, রিটার্ন টু রুটস, ওয়াক থ্রু ফ্যামিলি হিস্ট্রি, হেরিটেজ উইকেন্ড কিংবা রুটস ফেস্টিভ্যাল এর মতো পর্যটন প্যাকেজ তৈরি করা যেতে পারে।
এমনকি সীমান্তবর্তী অঞ্চলকে ঘিরে ভারত ও বাংলাদেশের পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মধ্যে যৌথ আলোচনা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং ঐতিহ্য গবেষণা কার্যক্রম চালু করা সম্ভব। এতে পর্যটন শুধু পর্যটক অর্থনীতি তৈরি করবে না, তৈরি করবে দীর্ঘমেয়াদি আন্তদেশীয় সম্পর্ক।
আর একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। ডায়াসপোরা ট্যুরিজম শুধু ভারতে চলে যাওয়া মানুষদের জন্য নয়। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশি ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের জন্যও এটি একটি বিশাল সম্ভাবনাময় বাজার।
প্রবাসীরা যদি বছরে একবারও বলেন, “এবার দেশে গিয়ে শুধু আত্মীয়ের বাড়ি নয়, নিজের শিকড়ও দেখে আসব”, তাহলে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প একটি সম্পূর্ণ নতুন গ্রাহক শ্রেণি পেতে পারে। আমাদের পর্যটন বিপণন তাই একদিন হয়তো শুধু ভিজিট বাংলাদেশ বলবে না। বরং বলবে, ফাইন্ড ইউর বাংলাদেশ। কারণ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পর্যটন সম্পদ হয়তো এখনো কোনো পাহাড়, সমুদ্র কিংবা বন নয়। কোনো এক বৃদ্ধের স্মৃতিতে থাকা গ্রামের নাম। কোনো পুরোনো দলিলে লেখা একটি ঠিকানা। কোনো হারিয়ে যাওয়া বাড়ির গল্প কিংবা ১৯৪৭ সালে যে মানুষটি চলে গিয়েছিলেন, তাঁর নাতির মনে আজও বেঁচে থাকা একটি প্রশ্ন।
“আমার দাদার বাড়ি কোথায় ছিল?” সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেওয়ার দিনই হয়তো বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প একটি নতুন দরজা খুলবে। শুধু পর্যটক আসবে না। ফিরে আসবে স্মৃতি। ফিরে আসবে সম্পর্ক। আর শিকড়কে কেন্দ্র করে তৈরি হবে নতুন আয়, নতুন কর্মসংস্থান এবং নতুন আন্তদেশীয় বন্ধুত্ব।
কখনো কখনো পর্যটন মানুষকে নতুন জায়গায় নিয়ে যায়। আর ডায়াসপোরা ট্যুরিজম মানুষকে তার পুরোনো জায়গায় ফিরিয়ে আনে। বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ভবিষ্যৎ পর্যটনের সবচেয়ে বড় গল্পটি হয়তো সেখানেই।
লেখক: মো. মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।