বর্ষার শুভ্র দূত: অনন্য রূপের চালতা ফুল/ তারিক ইসলাম
তারিক ইসলাম
প্রকৃতিতে আষাঢ়ের আগমন মানেই রিমঝিম বৃষ্টির গান আর চারপাশের সবুজের সমারোহ। বর্ষার এই চিরচেনা রূপের মাঝে অবহেলিত অথচ দারুণ এক সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে বসে চালতা গাছ। আমাদের গ্রামীণ জনপদে চালতা অত্যন্ত পরিচিত একটি ফল হলেও, এর ফুলের রূপ-মাধুর্য নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয় না। অথচ বর্ষার শুরুতে যখন চালতা ফুল ফোটে, তখন তার শুভ্রতা আর গঠনশৈলী যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমীকে মুগ্ধ করতে বাধ্য।
চালতা গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Dillenia indica|. এটি মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের একটি আদি বৃক্ষ। বর্ষার প্রথম বৃষ্টি স্পর্শ করার পর থেকেই চালতা গাছের ডালে ডালে গোল গোল সবুজ কুঁড়ি দেখা দিতে শুরু করে। আর সেই কুঁড়ি ফেটে যখন ফুলটি আত্মপ্রকাশ করে, তখন চারপাশ যেন এক স্নিগ্ধ আলোয় ভরে ওঠে।
চালতা ফুলের এই স্নিগ্ধ ও বিষণ্ন রূপ সবচেয়ে সুন্দরভাবে ধরা দিয়েছিল রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের চোখে। প্রকৃতির নশ্বরতা আর শাশ্বত সুন্দরের মেলবন্ধন বোঝাতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন-
“আমি চলে যাবো বলে, চালতা ফুল কি আর ভিজিবে না শিশিরের জলে, নরম গন্ধের ঢেউয়ে?”মানুষ চলে যায়, কিন্তু প্রকৃতি তার নিয়মেই রূপের পসরা সাজিয়ে রাখে। কবির এই আক্ষেপ মিশ্রিত জিজ্ঞাসা মনে করিয়ে দেয়, চালতা ফুল আর তার মিষ্টি সুবাস আমাদের যান্ত্রিক জীবনের আড়ালেও কতটা নীরবে জড়িয়ে আছে প্রকৃতির চিরন্তন সৌন্দর্যের সাথে।
চালতা ফুলের গঠন অন্য দশটা ফুল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ফুলগুলো বেশ বড় আকৃতির এবং নিচের দিকে মুখ করে ঝুলে থাকে। এর পাঁচটি বড়, পুরু ও সাদা রঙের পাপড়ি থাকে, যা দেখতে অনেকটা চামচের মতো বাঁকানো। ফুলের ঠিক মাঝখানে থাকে হলদে-সবুজ রঙের পরাগধানী এবং তার উপরে চাকার স্পোকের মতো ছড়িয়ে থাকে সাদা রঙের গর্ভকেশর। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সবুজ পাতার ক্যানভাসে কেউ যেন পরম যতেœ সাদা শ্বেতপাথরের কোনো শিল্পকর্ম ঝুলিয়ে রেখেছে।
চালতা ফুলের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর আয়ুষ্কাল। ফুলটি ফোটে মূলত ভোরের আলো ফোটার আগে, আর দুপুরের কড়া রোদ পড়ার আগেই এর পাপড়িগুলো ঝরে পড়ে। এই স্বল্পস্থায়ী মায়াবী সৌন্দর্যের কারণেই হয়তো এটি কবি-হৃদয়কে এতটা আলোড়িত করেছিল।
একসময় বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে, পুকুরপাড়ে বা ঝোপঝাড়ে প্রচুর চালতা গাছ দেখা যেত। বর্ষার সকালে ঝরে পড়া চালতা ফুলের পাপড়ি কুড়ানোর আনন্দ জড়িয়ে ছিল আমাদের শৈশবের স্মৃতিতে। কিন্তু নগরায়ণ আর নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে আজ আমাদের চারপাশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে এই দেশীয় ঐতিহ্যবাহী গাছটি।
চালতা গাছ কেবল সৌন্দর্য ছড়ায় না, এটি আমাদের বাস্তুতন্ত্রের (ঊপড়ংুংঃবস) জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফুল মৌমাছি ও প্রজাপতিকে আকৃষ্ট করে পরাগায়নে সাহায্য করে, আর টক-মিষ্টি ফল কাঠবিড়ালি, পাখি ও বন্য প্রাণীদের অন্যতম প্রধান খাদ্য।
প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা এবং আমাদের নিজস্ব উদ্ভিদ বৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখতে চালতা গাছের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কংক্রিটের এই নগরীতে বা গ্রামীণ বনায়নে আমরা যদি এই দেশীয় গাছগুলোকে ফিরিয়ে না আনি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো শুধু জীবনানন্দের কবিতার লাইনেই ‘রূপসী বাংলার’ এই শুভ্র দূতকে খুঁজে বেড়াবে। বর্ষার এই মায়াবী রূপকে বাঁচাতে আমাদের বাড়ির আনাচে-কানাচে ও পতিত জমিতে চালতার মতো দেশীয় গাছ রোপণের এখনই সময়।
লেখক: তারিক ইসলাম, সভাপতি সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।












