বাংলাদেশের সামাজিক স্তরবিন্যাস: একটি সমাজ-নির্দেশিকা গ্রন্থ
বাবুল চন্দ্র সূত্রধর
জাতীয় অধ্যাপক ও সমাজ বিজ্ঞানী ড. রংগলাল সেন (১৯৩৩-২০১৪) বাংলাদেশে সমাজ বিজ্ঞানের বিকাশে রেখে গিয়েছেন অসামান্য অবদান। তাঁর মূল্যবান গ্রন্থসম্ভার এরই সাক্ষ্য বহন করে চলছে। এই গ্রন্থসম্ভারই তাঁকে যুগ যুগ ধরে বাঁচিয়ে রাখবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা জীবন সম্পন্ন হওয়ার পরও যতদিন সুস্থ ছিলেন, ততদিনই কলম চালিয়েছেন দুর্নিবার নেশায়। তাঁর লেখাপড়ার নিয়মটি ছিল একেবারে অধ্যবসায়ী পরীক্ষার্থীর মত। শুধু তাই নয়, দিনের ২৪টি ঘণ্ট্ইা কাটাতেন কঠোর ছকের অধীনে। আমার প্রত্যক্ষ শিক্ষক ছিলেন বিধায় তাঁকে খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিলো আমার।
সময় ও সুযোগ পেলে একটু পড়াশুনার চেষ্টা করি। তিন-চারদিন আগে বই পত্র গোছাতে গিয়ে হাতে পড়লো অধ্যাপক সেনের‘ বাংলাদেশের সামাজিক স্তরবিন্যাস’ নামক বিখ্যাতগ্রন্থটি। মনে পড়ে গেলো প্রায় তিন যুগ আগেকার কথা, যখন ছাত্র ছিলাম। বইটি আলাদা করে রাখি। পড়ে একবারও মনে হয়নি পুরোনো কোনো বই। সম্প্রতিকালে বাংলাদেশের যে সমাজ চিত্র আমরা প্রত্যক্ষ করি, তা উক্ত গ্রন্থে বর্ণিত চিত্রের চেয়ে খুব একটা ভিন্নতর বলেনি। মনে প্রেরণা জাগে বইটি সম্পর্কে কিছু লেখার। সামাজিক স্তরবিন্যাস ছিলো অধ্যাপক সেনের অত্যন্ত প্রিয় বিষয়গুলোর অন্যতম, এটি সমাজ বিজ্ঞানের অন্যতম মৌলিক প্রত্যয়ও বটে।
সামাজিক স্তর বিন্যাস ব্যবস্থার মাধ্যমেই সমাজের সামাজিক চেহারার সন্ধান মিলে। গ্রন্থটি প্রথমে বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হয় ভাষা শহীদ গ্রন্থমালার অন্যতমগ্রন্থ রূপে, ১৯৮৫ সালে। ২০০২ সালের দিকে ড. সেন এতে কিছু সংযোজন ও পরিমার্জনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। বাংলা একাডেমীর অনুমতি সাপেক্ষে পরে নিউ এজ পাবলিকেশনস থেকে দ্বিতীয় বারের মত এটি প্রকাশ লাভ করে, ২০০৩ সালে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, গ্রন্থটির ব্যাপক চাহিদার কারণে বাংলা একাডেমী থেকে ১৯৯৭ সালে ও নিউ এজ পাবলিকেশনস থেকে ২০০৬ সালে পুনর্মুদ্রিত হয়।
অগণতাান্ত্রিক ও স্বার্থবাদী সামাজিক স্তরবিন্যাস এবং এর পেছনে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতার ফলে সমাজে উঁচু-নীচু নানা শ্রেণী জন্ম লাভ করে। উঁচু শ্রেণীর লোকজন অধিকতর মাত্রায় সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা ভোগের মাধ্যমে সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি করে। রংগলাল সেনের অনেক লেখায় বিষয়টি সুস্পষ্ট ভাবে ওঠে এসেছে। তাঁর সুপরিচিত ও পাঠকনন্দিত গ্রন্থ ̒বাংলাদেশের সামাজিক স্তরবিন্যাস’-এ বিষয়টির বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়‘ সামাজিক স্তরবিন্যাস, অসমতা, এবংসচলতার তত্ত্ব ও প্রত্যয়’ -এ বর্ণিত ধারণা সমূহের তাত্ত্বিক কাঠামো অঙ্কন করে এসবের মার্কসীয় ও ওয়েবারীয় দৃষ্টিভঙ্গী উপস্থাপন করা হয়েছে। বিশেষত, সামাজিক স্তর বিন্যাসের উদ্ভব ও বিকাশ তথা ঐতিহাসিক পটভূমি, প্রাচ্য-প্রতীচ্যে স্তরবিন্যাসের বিভিন্ন ধরনের প্রকাশিতরূপ, স্তর বিন্যাসের মাত্রা প্রভৃতি সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে।
দ্বিতীয় অধ্যায় ‘বাংলাদেশের সামাজিক স্তর বিন্যাসের সূচনা ও প্রাক-মুসলিমযুগে দাস-সামন্ত তন্ত্রের প্রথম পর্যায়ে এর স্বরূপ’ -এ বাংলায় কিভাবে সামাজিক স্তর বিন্যাস উৎপত্তি লাভ করে এবং মুসলিমদের আগমনের পূর্বে অর্থাৎ হিন্দু-বৌদ্ধ যুগে সামাজিক স্তর বিন্যাসের ব্যবস্থাটিকি অবস্থায় ছিল, তা আলোচিত হয়েছে। বর্ণ ব্যবস্থাকে স্তর বিন্যাসের মূল সূচক হিসেবে চিহ্নিত করে ড. সেন লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের সমাজেবর্ণ ব্যবস্থার বিকাশের দিক থেকে গুপ্ত যুগছিল সূচনা পর্ব, পালদের আমল হল বিস্তৃতিকাল আর সেন যুগ হল সুনির্দিষ্ট পর্যায়। গুপ্ত যুগেই বাংলাদেশের ব্রাহ্মণেতর জাতিসমূহ দত্ত, পাল, মিত্র, বর্মণ, দাস, ভদ্র, সেন, দেব, ঘোষ, কু-ু, পালিত, নাগ, চন্দ, দাম ইত্যাদি উপাধি ধারণ করে। … বর্ণ বিন্যাসের সাথে রাষ্ট্রের ঘনিষ্ট সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। বস্তত প্রাচীন বাংলার সমাজে ক্ষমতার কাঠামোর স্বরূপ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এ সম্পর্কটি বিবেচনা করতে হয়।” তিনি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বাংলার সামাজিক স্তরবিন্যসের প্রত্যয়টিকে ‘দাসপ্রথা ও সামন্তবাদের আবিস্কার’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
তৃতীয় অধ্যায় ‘মুসলিম শাসনামলে দাস-সামন্ততন্ত্রের দ্বিতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশের সামাজিক স্তরবিন্যাস’-এ বর্ণিত হয়েছে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দাস ও সামন্ততন্ত্রের ধারাবাহিকতায় বাংলা অঞ্চলে সামাজিক স্তরবিন্যাসের ধরন ও প্রকৃতি। লেখক বলেছেন, ‘বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বাংলার মুসলিম সমাজে চারটি গোষ্ঠীলক্ষ্য করা যায়। প্রধমটিতে রয়েছেন বহিরাগত আমীর-ওমরাহ। তারা মূলত নগরবাসী, কিংবা নগরের আশে পাশে সপরিবারে বসবাস করতেন। দ্বিতীয় আগন্থক মুসলিম জনগোষ্ঠী, যারা বাংলায় বিয়ে-শাদী করে বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি বিস্তার করেন। তৃতীয়, বাংলার ধর্মান্তরিত মুসলমানরা- এরা মূলত গ্রামের বাসিন্দা এবং চতুর্থ, মিশ্র মুসলমান- যাদের পিতা বা মাতার কেউ হিন্দু ছিলেন।’ এ সময়ে নানা উপাদানের প্রভাবে বিশেষত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে স্তরবিন্যাসে নানা উত্থান-পতনের মাত্রা পরিলক্ষিত হয় বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
‘ঔপনিবেশিক বৃটিশ আমলে সামন্ত-ধনতান্ত্রিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সামাজিক স্তরবিন্যাস’ শীর্ষক চতুর্থ অধ্যায়ে সামন্ততন্ত্রের ভেতর থেকে উদ্ভূত ধনতন্ত্রের আওতায় (যাকে আধা সামন্ততন্ত্র ও আধা ধনতন্ত্র বলা যায়) সামাজিক স্তরবিন্যাসের স্বরূপ আলোচনা করা হয়েছে। ড. সেনের কথায়, ‘‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, পত্তনীপ্রথ, খাজনা ও প্রজাস্বত্ত¦ আইনের প্রভাবে উনিশ শতকে বাংলার কৃষি সমাজে যে উলম্বী ধরনের সামাজিক স্তরবিন্যাস বিকাশ লাভ করে, তার একটি বাস্তব চিত্র হলোÑ জমিদারীর আয়তন ভেদে জমিদাররা ছিল প্রধানত দুটি স্তরে বিভক্ত; স্তরবিন্যাসের উচ্চমঞ্চের একদিকে ছিল গুটিকয়েক বড় জমিদার, অন্যদিকে ছিল সংখ্যাগরিষ্ট ক্ষুদে জমিদার। স্থায়ীইজারা দান ও অব্যাহত পত্তনী প্রথার ফলে ক্রম-প্রসারমান একটি বহুস্তর বিশিষ্ট মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠী। খাজনা ও প্রজাস্বত্ব আইন সত্ত্বেও রায়তদের ভেতর প্রচ- পার্থক্য সমন্বিত এক বিরাট কৃষক জনগোষ্ঠী। স্তর বিন্যাসের সর্বনি¤েœ একটি ভূমিহীন কৃষি-শ্রমিক শ্রেণীর সৃষ্টি।”
পরবর্তীতে বৃটিশ আমলের শেষ দিক পর্যন্ত সামাজিক স্তর বিন্যাসের অবস্থা কেমন ছিল, তা এ অধ্যায়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পঞ্চম অধ্যায় ‘পাকিস্তান আমলে পুঁজিবাদী পর্যায়ে বাংলাদেশের সামাজিক স্তর বিন্যাস’- এ নতুন ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার অধীনে সামাজিক স্তর বিন্যাস এক নবতররূপ পরিগ্রহ করে। সরকারের নীতিমালা ও পৃষ্টপোষকতায় শুরু হয় নি:স্বকরণের এক নগ্ন প্রক্রিয়া। ড. সেন লিখেছেন, ‘‘১৯৫১ সালে ভূমিহীনের সংখ্যা ছিল শতকরা ১৪.৩ ভাগ, যা ১৯৬১ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ১৭.৫ ভাগে দাঁড়ায়; এবং ১৯৬৭-৬৮ সালে এর পরিমাণ শতকরা ২০ ভাগে উন্নীত হয়। উক্ত ধনবাদী ধারায় সৃষ্ট গ্রামের বিত্তবান শ্রেণীর হাতে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভুত হয়।
১৯৬০-৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের গ্রামীণ জনসংখ্যার মধ্যে শতকরা ৫২ ভাগ পরিবার ও জনসংখ্যার শতকরা ৪০ ভাগ ছিল সম্পূর্ণ দরিদ্র। আর ঐ সময় গ্রামীণ জনসংখ্যার মধ্যে পরিবার হিসেবে শতকরা ১০ ভাগ ও জনসংখ্যার শতকরা ৫ ভাগ ছিল চূড়ান্ত দরিদ্র। কিন্তু ১৯৬৮-৬৯ সালে এটি বেড়ে সম্পূর্ণ দরিদ্র পরিবারের শতকরা হার দাঁড়ায় ৮৪ ভাগে, গরীব জনসংখ্যা হয় শতকরা ৭৬ ভাগ। তেমনি চূড়ান্ত দরিদ্র পরিবারের শতকরা হার প্রায় শতকরা ৩৫ ভাগে পৌছায়, যা মোট জনসংখ্যার ২৫ ভাগ।”ষষ্ঠ অধ্যায় ‘স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের পুজিবাদী পর্যায়ে সামাজিক স্তরবিন্যাস’- এ বাংলাদেশের স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পর থেকে সামাজিক স্তরবিন্যাসের গতি-প্রকৃতি বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
উপসংহারে এসে বাংলাদেশের সামাজিক শ্রেণী সমূহ চিহ্নিত করার প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়। চিহ্নিত আটটি শ্রেণী হল, ‘‘ক. শিল্প শ্রমিক শ্রেণী, খ. বিরাট সংখ্যক গ্রামীণ সর্বহারা, গ, কৃষক, ঘ. শহরের বস্তিবাসী, ঙ. মধ্যবিত্ত বা মধ্য স্তরের জনসমষ্টি, চ. বুর্জোয়া, ছ. জোতদার।” অত:পর তিনি সামাজিক স্তরবিন্যাসের আলোকে বাংলাদেশের জনসমষ্টির তিনটি স্তর নিরূপণ করে যে মূল্যবান দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেছেন তা সকল স্তরের গবেষক ও চিন্তাবিদের জন্য অবশ্য পঠিতব্য বলে আমার মনে হয়: ‘‘বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৮৭ জন নি¤œস্তরে, শতকরা ৮ জন মধ্যস্তরে ও শতকরা ৫ জন উচ্চস্তরে অবস্থান করছে।
বর্তমান বাংলাদেশে যে অর্থনীতি, শিল্পনীতি, ভূমিনীতি ও উন্নয়ন-কৌশল চালু আছে তার মাধ্যমে মাত্র ঐ ৫ ভাগ লোকই উপকৃত হচ্ছে। …অতএব বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণ সাধনে যারা সত্যিকার আগ্রহী তাদেরকে অবশ্যই উক্ত সামাজিক স্তরবিন্যাসের বাস্তব চিত্র বিবেচনায় রেখে এমন মৌলিক পরিবর্তনের কথা ভাবতে হবে, যার ফলে ঐ ধরনের বৈষম্যমূলক সমাজ- ব্যবস্থার চিরতরে অবসান ঘটে এবং এর পরিবর্তে একটি শোষণহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানেই রাজনীতির সাথে উন্নয়ন পদ্ধতির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক বিদ্যমান।”
গ্রন্থের আলোচনা পদ্ধতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ভূমিকাংশে ড. সেন বলেছেন, ‘যে কোন দেশের সামাজিক স্তর বিন্যাস ঐতিহাসিকভাবে বিকশিত হওয়ার কারণে আমি বাংলাদেশের সামাজিক স্তর বিন্যাসকে উৎপাদন ব্যবস্থা তথা মৌলিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আলোকে বিন্যস্ত করেছি।” তাইতো গ্রন্থের আলোচনায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা ও সহায়তায় কিভাবে সামাজিক স্তর বিন্যাসের ধারা ও ধরন প্রকাশিত হয়েছে, তা অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
তাই মনে করি যে, গ্রন্থটি সকলের পাঠকরা প্রয়োজন। বিশেষ করে যারা সুষম উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, মানবাধিকার, মানবসম্পদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, কিংবা নৈতিক ও সমতা ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করেন বা অন্তত ভাবনা চিন্তা করেন, তাদের নিকট বইটি দিক-নির্দেশক হিসেবে কাজ করতে পারে।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী ও গবেষক









