বজ্রধ্বনি ও সাতক্ষীরার অরক্ষিত জনপদ/ আখলাকুর রহমান
আখলাকুর রহমান
‘শুনলে বজ্রধ্বনি, ঘরে যাই তখনই’-খনা যখন তাঁর চিরন্তন বচনে এই সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছিলেন, তখন বাঙালির বিজ্ঞানচেতনা হয়তো আজকের মতো ল্যাবরেটরির কাচে বন্দি ছিল না, কিন্তু প্রকৃতির মেজাজ চেনার এক মায়াময় প্রজ্ঞা তাঁদের ছিল। আজ ২৮শে জুন, আন্তর্জাতিক বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবস। জলবায়ু পরিবর্তনের এই চরম সংকটের দিনে ক্যালেন্ডারের এই তারিখটি আমাদের কাছে কেবলই এক লৌকিক আয়োজন হয়ে আসে, অথচ খোদ জাতিসংঘের জলবায়ু বিজ্ঞানীরা এই বজ্রপাতকে অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে প্রতি এক ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়ার কারণে বজ্রপাতের আশঙ্কা প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। আজ এই দিবসের আলোয় যখন আমাদের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল, বিল আর নদীপাড়ের প্রান্তিক মানুষের দিকে তাকাই, তখন প্রকৃতির এই রুদ্র রূপকে এক অনিবার্য মরণফাঁদ বলে মনে হয়।
বাঙালি সাহিত্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমাদের ঔপন্যাসিকরা প্রকৃতির এই রুদ্রলীলাকে মানুষের নিয়তির সাথে বারেবারে এক সুতোয় বেঁধেছেন। কালজয়ী কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ উপন্যাসের সেই অমোঘ ট্র্যাজেডির কথা কি আমরা ভুলতে পারি? ঝুমুর দলের নর্তকী বসন্ত যখন নিতাইয়ের জীবনের সমস্ত আলো কেড়ে নিয়ে অকাল বসন্তেই বিদায় নিল, তার আগে সেই কালবোশেখীর রাতে আকাশ চিরে নেমে আসা বজ্রপাত যেন তাদের নিয়তিরই এক নিষ্ঠুর অট্টহাসি ছিল।
আবার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’তে কিংবা রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে ঝড়ের রাতের যে বর্ণনা, তা কেবল রোমান্টিকতা নয়, প্রকৃতির এক আদিম ও অমোঘ শক্তির জানান দেয়। বজ্রপাত তো আসলে কোনো আকস্মিক দৈব দুর্ঘটনা নয়, এটা আমাদের প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করার এক চরম প্রতিশোধ। সাতক্ষীরার সীমান্তঘেঁষা গ্রামগুলোতে আজ অপরিকল্পিতভাবে তালগাছসহ সব বড় বড় গাছ কেটে সাবাড় করা হয়েছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে মাঠের কৃষক আর মৎস্যজীবীদের। খোলা বিলে বা মৎস্য ঘেরে কাজ করার সময় একটু অসচেতনতার কারণেই প্রতি বছর কতশত তাজা প্রাণ ঝরে যাচ্ছে, কত সোনার সংসার মুহূর্তের মধ্যে ছাই হয়ে যাচ্ছে।
আইনের শুষ্ক বিধি বা লিফলেট বিলি করে প্রকৃতির এই মরণকামড় থেকে মানুষকে বাঁচানো যাবে না, এর জন্য প্রয়োজন আমাদের মজ্জাগত অভ্যাসের আমূল পরিবর্তন। খনার সেই প্রাচীন সূত্রকে আজ আমাদের আধুনিক জীবনের বর্ম বানাতে হবে; আকাশে মেঘের প্রথম গুড়গুড়ানি শুনলেই সমস্ত অবহেলা দূরে ঠেলে নিরাপদ আশ্রয়ে বা পাকা দালানের নিচে চলে যাওয়াটাই বেঁচে থাকার একমাত্র পথ। ইসলামে বজ্রপাতকে আল্লাহর মহিমার এক পরম নিদর্শন ও সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এই সময়ে বিশেষ দোয়া পড়ার নির্দেশ রয়েছে, যা মানুষের মনকে শান্ত ও সচেতন করে।
স্থানীয় প্রশাসনের উচিত কেবল কাগজে-কলমে দিবস পালন না করে প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে, বিশেষ করে আমাদের সাতক্ষীরার ঘের অঞ্চল ও কৃষিমঠে বজ্রপাত নিরোধক দন্ড স্থাপন এবং ব্যাপক হারে তালগাছ রোপণের এক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। এই আন্তর্জাতিক দিবসে আমরা সর্বস্তরের মানুষ একটাই প্রতিজ্ঞা করি, প্রকৃতির নিয়মকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং নিজস্ব সচেতনতাকে ঢাল বানিয়ে আমরা এই অদৃশ্য মরণ আঘাত থেকে আমাদের প্রিয়জনদের রক্ষা করবই।
লেখা : আখলাকুর রহমান, উদ্যোক্তা ও স্বপ্নদ্রষ্টা : আসিফা









