বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস: চিকিৎসার সুস্থ ভবিষ্যৎ নির্মাণে ফার্মাসিস্টের ভূমিকা
সাকিবুর রহমান বাবলা
২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস। ওষুধের নিরাপদ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে নতুন ওষুধের গবেষণা, উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, রোগীকে পরামর্শ প্রদান, জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকট মোকাবিলাÑফার্মাসিস্টদের ভূমিকা আজ আর কেবল ওষুধ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যপেশাজীবীর পাশাপাশি ফার্মাসিস্টরাও রোগীর নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যফল উন্নয়নের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
২০২৬ সালের বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থতর ভবিষ্যতের জন্য ফার্মাসিস্টদের ক্ষমতায়ন’। আন্তর্জাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল ফেডারেশন (এফআইপি) নির্ধারিত এই প্রতিপাদ্য পরিবর্তনশীল স্বাস্থ্যচাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফার্মাসিস্টদের দক্ষতা, স্বীকৃতি, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে। জনসংখ্যাগত পরিবর্তন, অসংক্রামক রোগের বিস্তার, ডিজিটাল স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি ও জলবায়ুজনিত চাপের যুগে ফার্মাসিস্টদের সক্ষমতা বাড়ানোকে স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করার অন্যতম উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে এফআইপি। সংগঠনটি ১৯১২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে স্মরণ করে ২৫ সেপ্টেম্বরকে বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয় এফআইপি কাউন্সিল। ২০০৯ সালে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত এফআইপি কংগ্রেসে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ২০২০ সাল থেকে ২৫ সেপ্টেম্বরের উদযাপনকে আরও বিস্তৃত করে ‘বিশ্ব ফার্মেসি সপ্তাহ’ চালু করা হয়। ২০২৬ সালে বিশ্ব ফার্মেসি সপ্তাহ পালিত হচ্ছে ১৯ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর। এতে শুধু ফার্মাসিস্ট নয়, ফার্মাসিউটিক্যাল বিজ্ঞানী, ফার্মেসি টেকনিশিয়ান এবং সহযোগী কর্মীদের অবদানও শ্রদ্ধাভরে তুলে ধরা হচ্ছে।
একজন রোগীর জন্য সঠিক ওষুধ নির্বাচন, সঠিক মাত্রা, সঠিক সময়ে গ্রহণ এবং ওষুধের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে যথাযথ তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে একাধিক ওষুধ ব্যবহার করলে তাদের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ঝুঁকিও বিবেচনা করতে হয়। এসব ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্ট রোগীর ওষুধ-নিরাপত্তার প্রধান রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেন।
কমিউনিটি ফার্মেসি, হাসপাতাল, ক্লিনিক্যাল সেবা, ওষুধ শিল্প, গবেষণাগার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিÑসব ক্ষেত্রেই ফার্মাসিস্টদের দায়িত্বের পরিধি বিস্তৃত। রোগীকে ওষুধ ব্যবহারের নিয়ম বোঝানো, চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন যাচাই, ওষুধের নিরাপদ সংরক্ষণ, প্রতিকূল প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলায় সচেতনতা তৈরিতেও তাদের অবদান অনস্বীকার্য। এফআইপি-এর ২০২৬ সালের প্রচারণায় বলা হয়েছে; ফার্মাসিস্টদের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগাতে সহায়ক আইন ও নীতি, টেকসই অর্থায়ন, স্বাস্থ্যব্যবস্থায় তাদের যথাযথ সংযুক্তি এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা প্রয়োজন।
ফার্মেসি মূলত স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি সমন্বিত ক্ষেত্র। নতুন ওষুধের অণু শনাক্তকরণ, ফর্মুলেশন উন্নয়ন, কার্যকারিতা ও স্থায়িত্ব পরীক্ষা, ডোজ-ফর্ম তৈরি, ক্লিনিক্যাল গবেষণা এবং বাজারে আসার পর ওষুধের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে ফার্মাসিস্ট ও ফার্মাসিউটিক্যাল বিজ্ঞানীরা মূল ভূমিকা পালন করেন।
তারা নির্ধারিত মান ও গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাক্টিস (জিএমপি) অনুসরণ করে বৃহৎ পরিসরে ওষুধ উৎপাদন করেন। কাঁচামাল ও প্রস্তুত ওষুধের গুণগত মান পরীক্ষাগারে যাচাই, উৎপাদন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে মান নিশ্চিতকরণ, ওষুধের নিবন্ধন, অনুমোদন ও নীতিমালা অনুশীলনেও তারা যুক্ত থাকেন। এর পাশাপাশি ওষুধের যথাযথ তাপমাত্রা, পরিবহন, সংরক্ষণ এবং ব্যবহার-পরবর্তী বিরূপ প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ (ফার্মাকোভিজিল্যান্স) তাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। অর্থাৎ, ফার্মাসিস্টরা কেবল ওষুধের সঙ্গে কাজ করেন না; তারা ওষুধের গুণগত মান, নিরাপত্তা, উৎপাদন দক্ষতা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব নিশ্চিত করেন।
আধুনিক ওষুধশিল্পের বিকাশ শিল্পবিপ্লব, রসায়নবিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং বৃহৎ পরিসরে মানসম্মত উৎপাদন প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে রাসায়নিক শিল্প ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রসারের ফলে ওষুধ উৎপাদন ধীরে ধীরে হাতে তৈরি থেকে শিল্পভিত্তিক রূপ নেয়।
ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় একটি অবিস্মরণীয় নাম। ১৯০১ সালে কলকাতায় তাঁর উদ্যোগে ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস ওয়ার্কস’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা এই অঞ্চলের দেশীয় উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রথম আধুনিক ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশে আধুনিক ফার্মেসি শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটিই দেশে ফার্মেসি শিক্ষার প্রথম প্রধান কেন্দ্র। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৮ সালে এমফার্ম এবং ১৯৯৫ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ অনুষদের রূপ পায়। ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে এখানে পাঁচ বছর মেয়াদি ‘ব্যাচেলর অব ফার্মেসি প্রোফেশনাল’ প্রোগ্রাম চালু রয়েছে।
বর্তমানে ফার্মাসিস্টদের কর্মক্ষেত্র শুধু ওষুধ কারখানায় সীমাবদ্ধ নয়। ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প, হাসপাতাল, কমিউনিটি ফার্মেসি, ড্রাগ রেগুলেটরি সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, এপিআই শিল্প ও কসমেটিকস শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে ওষুধের উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানি, বিক্রয়, মজুত, সংরক্ষণ, বিতরণ ও মান নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘ওষধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩’ কার্যকর রয়েছে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস উল্লেখযোগ্য। স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের ২০২৪-২৫ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারা বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ উৎপাদক, যাদের ২০২৫ অর্থবছরে সমন্বিত টার্নওভার ছিল প্রায় ৯১.৪৫ বিলিয়ন টাকা এবং বাজার অংশীদারত্ব প্রায় ১৭.৪১ শতাংশ। অন্যদিকে, বৈশ্বিক পরিম-লেও ওষুধ শিল্পের আকার সুবিশালÑযেখানে জনসন অ্যান্ড জনসন, ফাইজার, এলি লিলি কিংবা রোশের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিলিয়ন ডলার রাজস্ব অর্জনের মাধ্যমে বিশ্ব স্বাস্থ্যসেবায় ভূমিকা রাখছে।
ফার্মেসির ভবিষ্যৎ কেবল নতুন ওষুধ তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল স্বাস্থ্য, ডেটা অ্যানালিটিক্স, ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা, জিনভিত্তিক চিকিৎসা, বায়োলজিক্যাল ওষুধ এবং টেলিহেলথের প্রসার ফার্মাসিস্টদের কাজের ক্ষেত্র দ্রুত বদলে দিচ্ছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি, বার্ধক্যজনিত স্বাস্থ্যচাহিদা এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ফার্মাসিস্টদের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। এজন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক পেশাগত প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও রোগীকেন্দ্রিক সেবার মানসিকতা।
বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস কেবল একটি পেশাজীবী গোষ্ঠীকে সম্মান জানানোর দিন নয়; এটি নিরাপদ ওষুধ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, রোগীর অধিকার ও টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার তাগিদ দেয়। ‘সুস্থতর ভবিষ্যতের জন্য ফার্মাসিস্টদের ক্ষমতায়ন’Ñ২০২৬ সালের এই প্রতিপাদ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একজন দক্ষ ও দায়িত্বশীল ফার্মাসিস্টের ওপরই নির্ভর করে রোগীর নিরাপত্তা ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার মান। তাই ফার্মাসিস্টদের শিক্ষা, গবেষণা, পেশাগত মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা মানে একটি বৈজ্ঞানিক ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি মজবুত করা।






