বিশ্ব মানব পাচারবিরোধী দিবস ২০২৬ : প্রতারণার ফাঁদে বন্দী, মানব পাচার রোধে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ
সাকিবুর রহমান বাবলা
মানব পাচার একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ সংগঠিত অপরাধ এবং মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয়েছে বহু আগেই, কিন্তু আধুনিক বিশ্বে মানব পাচার সেই দাসত্বেরই নতুন ও আরও জটিল রূপ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জাতিসংঘের ভাষায়; মানব পাচার হলো প্রতারণা, প্রলোভন, জবরদস্তি, বলপ্রয়োগ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে শোষণের উদ্দেশ্যে নিয়োগ, পরিবহন, আশ্রয়দান বা স্থানান্তর করা। এই শোষণ হতে পারে জোরপূর্বক শ্রম, যৌন শোষণ, গৃহদাসত্ব, অঙ্গপাচার, ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করা কিংবা অপরাধমূলক কর্মকা-ে ব্যবহার করার মাধ্যমে।
মানব পাচারের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ভুক্তভোগীদের অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়টি সামনে আনতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০১৩ সালে ৩০ জুলাইকে বিশ্ব মানব পাচারবিরোধী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য- Trapped Behind the Scam বা “প্রতারণার ফাঁদে বন্দী” মানব পাচারের একটি নতুন ও দ্রুত বিস্তারমান রূপের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, যেখানে আন্তঃদেশীয় অপরাধচক্র চাকরি ও উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে বিদেশে নিয়ে গিয়ে অনলাইন প্রতারণা, আর্থিক জালিয়াতি ও সাইবার অপরাধে জোরপূর্বক সম্পৃক্ত করছে।
বর্তমানে এ অপরাধ কেবল সীমান্ত অতিক্রম করে মানুষ স্থানান্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে তথাকথিত “সাইবার স্ক্যাম কমপাউন্ড”-এ অসংখ্য মানুষকে আটকে রেখে অনলাইন প্রতারণা পরিচালনা করতে বাধ্য করা হচ্ছে। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সংঘটিত প্রতারণামূলক কর্মকা-ের কারণে ২০২৩ সালে আনুমানিক ১৮ থেকে ৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয় উল্লেখ করেছে।
বর্তমানে বিশ্বেজুড়ে আন্তর্জাতিক অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ২৮ কোটিরও বেশি। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ওখঙ ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা IOM-এর বহুল উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৫ কোটি মানুষ আধুনিক দাসত্বের বিভিন্ন রূপের শিকার। নারী, শিশু, অভিবাসী শ্রমিক এবং সংঘাতপীড়িত অঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুরুষদের জোরপূর্বক শ্রম এবং অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকা-ে ব্যবহারের ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও বিভিন্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনিয়মিত ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে মানব পাচারকারী চক্র ও অবৈধ দালাল নেটওয়ার্ক বহু মানুষকে বিদেশে পাঠিয়ে শোষণ, নির্যাতন, আইনি জটিলতা, জীবনের ঝুঁকি এবং আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। একসময় নারী ও শিশুরা এ অপরাধের প্রধান শিকার হলেও বর্তমানে বিদেশগামী তরুণ শ্রমশক্তিও আন্তর্জাতিক মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান চক্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশি অভিবাসী বা প্রবাসীর সংখ্যা প্রায় ১.৩-১.৫ কোটি। মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে বাংলাদেশে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬ প্রণয়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, জাতীয় কর্মপরিকল্পনা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জোরদারকরণ এবং ভুক্তভোগীদের সহায়তা ও পুনর্বাসনের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে সরকার বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন ২০১৩ এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানব পাচার প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো জাতিসংঘের পালের্মো প্রোটোকল। এই প্রোটোকল মানব পাচারের আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা নির্ধারণ, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং অপরাধীদের বিচারের জন্য একটি বৈশ্বিক কাঠামো প্রদান করেছে। UNODC, IOM, ILO এবং UNICEF বিশ্বব্যাপী প্রতিরোধ, উদ্ধার, পুনর্বাসন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
মানব পাচার একটি অনৈতিক ও অমানবিক কার্যক্রম, যা মানুষের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তাকে ক্ষুণœ করে। এটি রোধে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজ জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আইনি সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অপরাধচক্রের নেটওয়ার্ক উন্মোচনে সহায়তা করে। সাইবার প্রতারণা ও অনলাইন জালিয়াতির ফাঁদ এড়াতে তরুণ প্রজন্মসহ বিদেশগামীদের মাঝে ডিজিটাল লিটারেসি বা প্রযুক্তিসচেতনতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে।
একই সঙ্গে পাচার থেকে উদ্ধার হওয়া ভুক্তভোগীদের দীর্ঘমেয়াদী ট্রমা কাটাতে মনোসামাজিক কাউন্সেলিং এবং নিবিড় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। কার্যকর প্রতিরোধ ও সুরক্ষার জন্য সচেতনতা সৃষ্টি, নিরাপদ অভিবাসন, কর্মসংস্থান এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। তাই বিদেশে যাওয়ার আগে সরকারি অনুমোদিত সংস্থার মাধ্যমে তথ্য যাচাই এবং সন্দেহজনক দালালদের বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা একান্ত প্রয়োজন।
২০২৬ সালের বিশ্ব মানব পাচারবিরোধী দিবসের প্রতিপাদ্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রতারণার আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানব পাচারের নতুন রূপ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি জটিল ও বিপজ্জনক। প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণা ও আন্তঃদেশীয় অপরাধচক্রের বিস্তারের এই সময়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, সীমান্ত-অতিক্রমী বিচারিক সমন্বয়, আধুনিক তদন্ত ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগই পারে এ অপরাধ মোকাবিলা করতে। প্রতারণার ফাঁদে বন্দী প্রতিটি মানুষের মুক্তি, সুরক্ষা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করাই হোক বিশ্ব মানব পাচারবিরোধী দিবস ২০২৬-এর অঙ্গীকার।







