সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রতি বছর ২৮ জুন পালিত হয় আন্তর্জাতিক বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবস। প্রকৃতির অমোঘ শক্তির সামনে অসতর্কতা প্রাণঘাতী হতে পারে, তবে সচেতনতা ও বৈজ্ঞানিক প্রস্তুতি জীবন বাঁচাতে একটু হলেও সহায়ক। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে বজ্রপাতের সংখ্যা ও তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম।
বিশ্বের সর্বাধিক বজ্রপাত প্রবণ দেশ হিসেবে ব্রাজিল পরিচিত। অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার লেক মারাকাইবো অঞ্চল পৃথিবীর সবচেয়ে বজ্রপাত-প্রবণ এলাকা হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বজ্রপাত-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, এ দেশে প্রতি বছর গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ জনেরও বেশি মানুষ বজ্রপাতে প্রাণ হারান, সেই সঙ্গে আহত হন অনেকে। হতাহতদের একটি বড় অংশই কৃষক, জেলে এবং মাঠে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষ। আর পশু পাখি তো অগুনিত।
বিজ্ঞানীদের মতে, বজ্রপাত সাধারণত ভূমির সবচেয়ে উঁচু ও বিদ্যুৎ পরিবাহী বস্তুকে আঘাত করে। এ কারণে তালগাছকে প্রাকৃতিক বজ্রনিরোধক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর দীর্ঘ, সোজা ও দৃঢ় কাঠামো বজ্রপাতকে আকর্ষণ করে এবং বিদ্যুৎকে দ্রুত মাটিতে পৌঁছে দিতে সহায়তা করে। ফলে উন্মুক্ত মাঠে মানুষ ও গবাদিপশুর ঝুঁকি অনেকটা কমে যায়। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ ও দুর্যোগ প্রশমনে তালগাছ রোপণ একটি কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগ হতে পারে।
বাংলাদেশ সরকার বজ্রপাতকে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আগাম সতর্কবার্তা প্রদান, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও বিত্তবান ব্যক্তিরাও এ কাজে সম্পৃক্ত হচ্ছেন। গবেষণা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞানই আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। তাই বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আবহাওয়াবিজ্ঞান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পরিধি আরও বিস্তৃত করতে হবে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, “আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে বিদ্যুতের ঝলক, যা তোমাদের ভয় ও আশার সঞ্চার করে” (সূরা আর-রূম: ২৪)। এই বাণী আমাদের সতর্কতা, জ্ঞানার্জন ও দায়িত্বশীল আচরণের শিক্ষা দেয়।
বজ্রপাত সম্পূর্ণরূপে রোধ করা সম্ভব না হলেও সচেতনতা, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ এবং সম্মিলিত সামাজিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গঠনে এ বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।