সম্পাদকীয়/প্রসঙ্গ: মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও সামাজিক ঐক্য
সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার এবং তা দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক পদক্ষেপ আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করে। শ্যামনগরে বিজিবির ১৭ নীলডুমুর ব্যাটালিয়ন কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে আটককৃত প্রায় ৩২ কোটি টাকা মূল্যের বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য জনসম্মুখে ধ্বংস করা এবং জেলা পুলিশের উদ্যোগে খুলনা রেঞ্জের ডিআইজির উপস্থিতিতে সপ্তাহব্যাপী বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযানের ঘোষণা কেবল প্রশাসনিক তৎপরতা নয়; এটি মাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের জিরো টলারেন্স নীতিরই এক বাস্তব প্রতিফলন।
বাজেয়াপ্ত মাদকের দীর্ঘ তালিকার দিকে তাকালে সার্বিক চিত্রটি বেশ শঙ্কা জাগায়। বিপুল পরিমাণ ফেন্সিডিল, ইয়াবা, অ্যালকোহল ও হেরোইনের পাশাপাশি ক্রিস্টাল মেথ (আইস) কিংবা এলএসডির মতো প্রাণঘাতী ও অতি-উচ্চমূল্যের সিন্থেটিক মাদকের অনুপ্রবেশ নিশ্চিতভাবেই তরুণ সমাজকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সাতক্ষীরার সীমান্ত এলাকাগুলোকে চোরাচালানকারীরা দীর্ঘদিন ধরে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে। সীমান্ত রক্ষীদের দৃঢ়তার কারণে প্রায় ৫২ কোটি টাকার চোরাচালানি পণ্য উদ্ধার ও অপরাধীদের গ্রেপ্তার সম্ভব হলেও মূল জোগান থামানো এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
এই প্রেক্ষাপটে খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের পক্ষ থেকে পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতি, অনলাইন জুয়া রোধ এবং মাদকের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদেরসহ (এমনকি পুলিশ সদস্য হলেও) কঠোর শাস্তির আওতায় আনার ঘোষণা অত্যন্ত সময়োপযোগী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভ্যন্তরে ও বাইরে নিরপেক্ষভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হলে তা সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করবে।
তবে মাদক কেবল একটি একক আইনি বা সামাজিক অপরাধ নয়, এটি এক বহুমাত্রিক জটিল ব্যাধি। শুধু সীমান্ত টহল জোরদার করা বা বিশেষ অভিযান চালিয়ে সাময়িক সাফল্য অর্জন দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, যতক্ষণ না অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও সিন্ডিকেটের নেপথ্যের গডফাদারদের সমূলে উৎপাটিত করা যাচ্ছে। বিজিবির রিজিয়ন কমান্ডার এবং পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্যে যেমনটা গুরুত্ব পেয়েছেÑমাদক নির্মূলে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে সর্বাত্মক সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা অপরিহার্য। সাতক্ষীরাসহ সারা দেশকে মাদকমুক্ত করতে হলে পুলিশ ও বিজিবির ধারাবাহিক পেশাদার অভিযান এবং সর্বস্তরের জনগণের ঐক্যবদ্ধ জিরো টলারেন্স অবস্থানের কোনো বিকল্প নেই।







