সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩
সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

অনির্বাণ নজরুল: ইতিহাসের অলংকার নয়, এক জ্বলন্ত মশাল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬, ১১:২২ অপরাহ্ণ
অনির্বাণ নজরুল: ইতিহাসের অলংকার নয়, এক জ্বলন্ত মশাল

নজরুলবর্ষে-

শেখ সিদ্দিকুর রহমান

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং প্রমিলা দেবীর বিয়ে ও তাদের দাম্পত্য জীবনের শুরুর অধ্যায়টি ছিল একাধারে এক সাহসী প্রেমের আখ্যান এবং তৎকালীন সমাজবাস্তবতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। ১৯২৪ সালের এপ্রিল মাসে কুমিল্লায় তাদের বিয়ের পর নজরুল যখন প্রমিলা দেবীকে নিয়ে কলকাতায় সংসার পাতার সিদ্ধান্ত নেন, তখন এক চরম সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক বিড়ম্বনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল এই দম্পতিকে। তৎকালীন কলকাতার রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থায় এক মুসলিম যুবক ও এক হিন্দু তরুণীর পরিণয়কে সহজভাবে গ্রহণ করার মতো উদারতা খুব একটা ছিল না। ফলে কলকাতায় একটি উপযুক্ত মাথা গোঁজার ঠাঁই বা বাসা খোঁজার ক্ষেত্রে তাদের যে ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তা ইতিহাসের এক বেদনাবিধুর অধ্যায়।
সাম্প্রদায়িক মানসিকতা ও বাসা খোঁজার বিড়ম্বনা

কলকাতায় এসে নজরুল ও প্রমিলা দেবী প্রথম যে সংকটে পড়েন, তা হলো বাড়িওয়ালাদের চরম সাম্প্রদায়িক গোঁড়ামি ও কুসংস্কার। কবি হিসেবে নজরুল তখন যথেষ্ট পরিচিত এবং জনপ্রিয়, কিন্তু যখনই কোনো বাড়িওয়ালা জানতে পারতেন যে ভাড়াটিয়া একজন মুসলমান এবং তার স্ত্রী হিন্দু পরিবারের মেয়ে, তখনই তারা বাসা ভাড়া দিতে সোজা অস্বীকৃতি জানাতেন। হিন্দু প্রধান এলাকার বাড়িওয়ালারা একজন মুসলমান যুবককে ঘর ভাড়া দিতে রাজি ছিলেন না। অন্যদিকে, মুসলিম প্রধান এলাকার রক্ষণশীল সমাজও একজন হিন্দু রমণীকে ঘরের বউ হিসেবে মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে চরম অনুদারতা দেখাত। প্রমিলা দেবীর মা গিরিবালা দেবীও এই বিয়ের পক্ষে থাকায় নিজের আত্মীয়স্বজন ও সমাজ কর্তৃক চরমভাবে লাঞ্ছিত ও বহিষ্কৃত হয়েছিলেন।

 

কলকাতায় এসে এই তিনজনের ছোট পরিবারটি যখনই কোনো বাড়ির খোঁজ পেত, সমাজের তথাকথিত ‘জাত’ যাওয়ার ভয়ে বাড়িওয়ালারা দরজায় তালা ঝুলিয়ে দিতেন। নজরুল তখন বাংলার বুকে সাম্যের গান গাইছেন, কিন্তু কলকাতার বুকে নিজের স্ত্রীর মাথা গোঁজার একটুখানি ঠাঁই মেলাতে তাকে লড়তে হচ্ছিল সমাজের অদৃশ্য এক সাম্প্রদায়িক দেয়ালের বিরুদ্ধে।”
হুগলি ও কৃষ্ণনগরে নির্বাসন

কলকাতার এই তীব্র বিড়ম্বনা, অপমান ও আবাসন সংকটের কারণেই নজরুল শেষ পর্যন্ত কলকাতায় স্থায়ী হতে না পেরে শহর ছাড়তে বাধ্য হন। কলকাতার দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে মুক্তি পেতে এবং প্রমিলা দেবীর শান্তিতে বসবাসের জন্য তিনি বেছে নেন কলকাতার বাইরের মফস্বল শহরগুলোকে। কলকাতা থেকে দূরে হুগলিতে গিয়ে তারা একটি বাসা ভাড়া নেন। সেখানেও দারিদ্র্য এবং সামাজিক কানাঘুষা তাদের পিছু ছাড়েনি, তবে কলকাতার সেই প্রকাশ্য বিড়ম্বনার চেয়ে তা ছিল কিছুটা সহনীয়। পরবর্তীতে তারা নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরের এক চুনকাম-খসে-পড়া সস্তা বাড়িতে আশ্রয় নেন। এই কৃষ্ণনগরেই নজরুল তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা কিছু কবিতা ও গান রচনা করেছিলেন, যা ছিল মূলত এই সামাজিক বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এক একটি অগ্নিস্ফূলিঙ্গ। নজরুল ও প্রমিলার এই বিড়ম্বনা কেবল একটি বাসা না পাওয়ার গল্প ছিল না; এটি ছিল মূলত তৎকালীন বাঙালি সমাজের তীব্র সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার এক জীবন্ত দলিল। যে কবি সারাজীবন হিন্দু-মুসলমানের মিলন চেয়েছেন, “মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান” লিখেছেন তাঁকে নিজের ব্যক্তিগত জীবনেই প্রথম ঘর বাঁধার সময় এই সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের সবচেয়ে বড় আঘাতটি সইতে হয়েছিল। কিন্তু সমস্ত সামাজিক ও আবাসন বিড়ম্বনাকে তুচ্ছ করে প্রমিলা দেবী আমৃত্যু নজরুলের পাশে থেকে তাঁর সৃষ্টিশীলতার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হয়ে ছিলেন। নজরুল যখন কলকাতায় প্রমীলাকে নিয়ে বাসা পাচ্ছিলেন না হিন্দু-মুসলমান দম্পতি বলে তখনই তাঁর কলম থেকে বের হয়েছিল এই আগুন। তিনি তাঁর সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থেও মানুষ কবিতায় লিখেছিলেনÑ

গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান,
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।…

কবি দেখিয়ে দিলেন- মসজিদের মোল্লা মন্দিরের পুরহিত দুজনেই ভুখা মানুষকে তাড়িয়ে দেয়। অথচ দুজনেই দাবি করে তারা “খোদা/ভগবানের ঘর” পাহারা দিচ্ছে। নজরুল লিখেছেন, “খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা ? সব দ্বার খোলা রবে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা।” আর প্রথম লাইন ছিল “গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান”।

কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর চার সন্তানের নামকরণে শুধু স্নেহ নয়, তাঁর সাহিত্যিক মনন, আধ্যাত্মিক ভাবনা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চেতনারও প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি এমন নাম বেছে নিয়েছিলেন, যেখানে আরবি-ফারসি ও সংস্কৃত দুই ধারার শব্দের অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়।

চার ছেলের নাম ও তার প্রেক্ষাপট সংক্ষেপে : কৃষ্ণ মুহাম্মদ: (জন্মের কিছুদিন পরই মারা যায়) “কৃষ্ণ” হিন্দুধর্মের অন্যতম প্রধান দেবতার নাম। “মুহাম্মদ” ইসলাম ধর্মের মহানবীর নাম। এই দুটি নাম একত্রে রেখে নজরুল বোঝাতে চেয়েছিলেন ধর্ম মানুষের বিভেদের নয়, মিলনের প্রতীক। তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য প্রকাশ এটি। অরিন্দম খালেদ (বুলবুল) (১৯২৬-১৯৩০)“অরিন্দম” একটি সংস্কৃত শব্দ, অর্থ শত্রুবিজয়ী। “খালেদ” আরবি শব্দ, অর্থ চিরস্থায়ী বা অমর। পরিবারের সবার কাছে তিনি “বুলবুল” নামেই পরিচিত ছিলেন। মাত্র চার বছর বয়সে গুটিবসন্ত-এ তাঁর মৃত্যু নজরুলের জীবনে গভীর শোক নিয়ে আসে। পরে সেই স্মৃতিতে কবি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ বুলবুল-এর নামকরণ করেন।

 

কাজী সব্যসাচী: “সব্যসাচী” শব্দটি মহাভারত-এ অর্জুন-এর একটি উপাধি; অর্থ যিনি দুই হাতেই সমান দক্ষ। নজরুল আশা করেছিলেন, তাঁর ছেলে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হবে। পরবর্তীকালে কাজী সব্যসাচী একজন খ্যাতিমান আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। কাজী অনিরুদ্ধ: “অনিরুদ্ধ” সংস্কৃত শব্দ; অর্থ অপ্রতিরোধ্য, যাকে রোধ করা যায় না।হিন্দু পুরাণে অনিরুদ্ধ শ্রীকৃষ্ণ-এর পৌত্র। এই নামেও নজরুল শক্তি, অগ্রযাত্রা ও উদার সাংস্কৃতিক চেতনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

 

নজরুলের সন্তানদের নাম আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, তিনি কেবল কবিতায় নয়, নিজের পারিবারিক জীবনেও ধর্মীয় সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তাঁর কাছে মানুষের পরিচয় ছিল মানবতা; ধর্ম ছিল ভালোবাসা ও সৌন্দর্যের মিলনক্ষেত্র। তাই তাঁর সন্তানদের নাম আজও বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতীক হিসেবে স্মরণ করা হয়। লেখক : সাবেক ব্যাংকার, গবেষক।

 

Ads small one

তালায় কারিতাসের সমন্বয় সভা ও বস্ত্র বিতরণ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:২৮ পূর্বাহ্ণ
তালায় কারিতাসের সমন্বয় সভা ও বস্ত্র বিতরণ

তালা প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার তালায় বেসরকারি সংস্থা কারিতাসের উদ্যোগে ষান্মাসিক সমন্বয় সভা ও প্রবীণদের মাঝে বস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৭ সেপ্টেম্বর সকালে কারিতাস তালা কার্যালয়ে সমন্বয় সভা আয়োজিত হয়।
সংস্থার আইডিপিডিসি প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত সমন্বয় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন কারিতাস খুলনা অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক আলবিনো নাথ। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন তালা উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম ও তালা সদর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রাজ্জাক। একই দিন বিকেলে তালার বালিয়া দাশপাড়ায় ১৬ জন প্রবীণ নারী ও পুরুষের মাঝে বস্ত্র বিতরণ করেন সংস্থাটির নেতৃবৃন্দ।

যুব অধিকার পরিষদ জেলার সভাপতি আজিবুর, সাধারণ সম্পাদক পলাশ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:২৫ পূর্বাহ্ণ
যুব অধিকার পরিষদ জেলার সভাপতি আজিবুর, সাধারণ সম্পাদক পলাশ

সংবাদদাতা: বাংলাদেশ যুব অধিকার পরিষদ সাতক্ষীরা জেলা শাখার নতুন আংশিক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ৭ সেপ্টেম্বর সংগঠনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সভাপতি নাদিম হাসান ও সাধারণ সম্পাদক মুনতাজুল ইসলাম এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আগামী ১ বছরের জন্য এ কমিটির অনুমোদন দেন।
নবগঠিত কমিটিতে মো. আজিবুর রহমানকে সভাপতি, আজমির হোসেন পলাশকে সাধারণ সম্পাদক এবং আব্দুল শাহজীকে সাংগঠনিক সম্পাদক মনোনীত করা হয়েছে।
কমিটির অন্যান্য পদে সহ-সভাপতি হিসেবে মো. আজমির হোসেন ও মো. রায়হান সরদার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মো. মাজহারুল ইসলাম ও এম এ আল আমিনের নাম ঘোষণা করা হয়। ঘোষিত কমিটিকে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে জেলা কমিটির পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রস্তুত করে কেন্দ্রে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্যসুরক্ষা কি নাগরিকের অধিকার?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:২১ পূর্বাহ্ণ
স্বাস্থ্যসুরক্ষা কি নাগরিকের অধিকার?

হক মো. ইমদাদুল, জাপান

একজন মানুষ অসুস্থ হলে শুধু তাঁর শরীরটাই অসুস্থ হয় না; অসুস্থ হয়ে পড়ে তাঁর সংসারের অর্থনীতি, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং অনেক সময় পুরো পরিবারের নিরাপত্তাবোধ। চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়, ঋণ করতে হয়, জমি বা সম্পদ বিক্রি করতে হয়, এমনকি সন্তানের পড়াশোনা বা পরিবারের প্রয়োজনীয় ব্যয়ও বন্ধ হয়ে যায়। অথচ অসুস্থ হওয়া কোনো মানুষের পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত নয়। তাহলে অসুস্থতার আর্থিক ঝুঁকির পুরো দায় কি একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবারের ওপরই বর্তাবে?

এই প্রশ্নটি ব্যক্তিগত হলেও এর উত্তর সব সময় ব্যক্তির হাতে থাকে না। কারণ স্বাস্থ্য কেবল চিকিৎসার বিষয় নয়; এটি একটি দেশের শ্রমশক্তি, উৎপাদনশীলতা, দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। একজন কর্মক্ষম মানুষ দীর্ঘদিন অসুস্থ হয়ে পড়লে শুধু তাঁর পরিবার নয়, তাঁর কর্মক্ষেত্র এবং বৃহত্তর অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই জায়গাতেই জাপানের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জাপান এক দিনে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। ১৯২২ সালে Health Insurance Lwa প্রণয়ন, ১৯২৭ সালে তার পূর্ণ বাস্তবায়ন, ১৯৩৮ সালে ‘কোকুমিন কেনকো হোকেন’Ñব্যবস্থার সূচনা এবং পরবর্তী কয়েক দশকের সংস্কারের মধ্য দিয়ে দেশটি ধীরে ধীরে এগিয়েছে। ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়েও প্রায় ৩ কোটি মানুষÑতৎকালীন জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশÑস্বাস্থ্যবিমার আওতার বাইরে ছিল। ১৯৫৮ সালে National Health Insurance Lwa ব্যাপকভাবে সংশোধন করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৬১ সালের এপ্রিল থেকে জাপানের সব পৌরসভায় ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে ‘কোকুমিন কাইহোকেন’, অর্থাৎ সবার জন্য স্বাস্থ্যবিমাÑব্যবস্থার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।

আজ প্রশ্নটি তাই আরও প্রাসঙ্গিকÑজাপান যদি কয়েক দশক আগে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, বাংলাদেশ কেন এখনো এমন একটি কার্যকর স্বাস্থ্যসুরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে পারছে না, যেখানে অসুস্থতা মানেই একটি পরিবারের আর্থিক বিপর্যয় নয়?

জাপানের অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলোÑদেশটি স্বাস্থ্যকে কেবল ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে দেখেনি; বরং ধীরে ধীরে এটিকে সামাজিক দায়িত্ব ও রাষ্ট্রীয় নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে। জাপানের বর্তমান স্বাস্থ্যবিমা কাঠামো মূলত দুটি বড় ধারার ওপর গড়ে উঠেছে। একদিকে রয়েছে Social Insurance.

কর্মসংস্থানভিত্তিক স্বাস্থ্যবিমা-শাকাই হোকেন), অন্যদিকে রয়েছে National Health Insurance-কোকুমিন কেনকো হোকেন)। যারা অন্য কোনো সরকারি স্বাস্থ্যবিমার আওতায় পড়েন না, তাদের সাধারণত National Health Insurance-এর আওতায় আনা হয়। এই ব্যবস্থার ফলে চিকিৎসার পুরো ব্যয় সাধারণত রোগীকে একা বহন করতে হয় না। বয়স ও নির্দিষ্ট শর্ত অনুযায়ী রোগীকে চিকিৎসা ব্যয়ের একটি অংশ নিজে বহন করতে হয়Ñসাধারণভাবে ৭০ বছরের নিচে ৩০ শতাংশ, ৭০ থেকে ৭৪ বছর বয়সে ২০ শতাংশ এবং ৭৫ বছর বা তার বেশি বয়সে ১০ শতাংশ। অবশ্য আয় ও অন্যান্য পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যতিক্রম রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে High-Cost Medical Expense System‘কোগাকু রিয়োইয়োহি সেইদো’। অর্থাৎ নির্দিষ্ট শর্তে কোনো ব্যক্তির চিকিৎসা ব্যয় নির্ধারিত সীমার বেশি হয়ে গেলে তাঁর নিজের বহন করতে হওয়া অর্থের পরিমাণও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। এই কাঠামোর পেছনের দর্শনটি খুব গুরুত্বপূর্ণÑএকটি গুরুতর অসুস্থতা যেন একজন মানুষের সারা জীবনের সঞ্চয়, পরিবারের সম্পদ কিংবা সন্তানের ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করে না দেয়। এখানে চিকিৎসা পাওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি চিকিৎসা নিতে গিয়ে আর্থিকভাবে সর্বস্বান্ত না হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে বাংলাদেশের বাস্তবতায় স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ের একটি বড় অংশ এখনো সরাসরি মানুষের নিজের পকেট থেকে আসে। ফলে অসুস্থতার সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয়ের ভয়ও যুক্ত হয়ে যায়। একজন দরিদ্র বা নি¤œ-মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে রোগ নির্ণয়ের পর প্রথম প্রশ্ন অনেক সময় হয়Ñ‘চিকিৎসা কোথায় পাব?’ নয়, বরং ‘টাকা কোথা থেকে আসবে?’

চিকিৎসার খরচ দৃশ্যমান; কিন্তু অসুস্থতার কারণে হারিয়ে যাওয়া আয় অনেক সময় তার চেয়েও বড় ক্ষতি। পরিবারের উপার্জনক্ষম একজন মানুষ দীর্ঘদিন কাজ করতে না পারলে একদিকে চিকিৎসার ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে আয় কমে যায়Ñএকসঙ্গে তৈরি হয় দ্বিমুখী আর্থিক চাপ।

জাপানের স্বাস্থ্যসুরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখানেই। স্বাস্থ্যবিমার আওতাভুক্ত কোনো কর্মী কর্মস্থলের বাইরে অসুস্থতা বা আঘাতের কারণে কাজ করতে অক্ষম হলে এবং নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে অসুস্থতাজনিত ভাতা পেতে পারেন। এর জন্য হাসপাতালে ভর্তি থাকা আবশ্যক নয়। সাধারণত প্রথম তিন দিন অপেক্ষাকাল এবং চতুর্থ দিন থেকে নির্ধারিত শর্তে ভাতা দেওয়া হয়। এর পরিমাণ আগের ১২ মাসের গড় সামাজিক বিমার হিসাবের জন্য নির্ধারিত মাসিক পারিশ্রমিক-এর ভিত্তিতে দৈনিক প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হতে পারে এবং একই অসুস্থতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১ বছর ৬ মাস পর্যন্ত পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, জাপানের Health Insurance এর হিহোকেনশাÑবিমাকৃত ব্যক্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত যোগ্য বিদেশি কর্মীরাও নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে এই সুবিধা পেতে পারেন। অর্থাৎ, এটি শুধু জাপানি নাগরিকদের জন্য নয়; মূল বিষয় হলো স্বাস্থ্যবিমার আওতাভুক্ত থাকা এবং প্রয়োজনীয় যোগ্যতা পূরণ করা।

এখানেই বাংলাদেশের জন্য বড় প্রশ্নটি সামনে আসে। একজন শ্রমিক, কর্মচারী কিংবা নি¤œ-মধ্যবিত্ত পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি দীর্ঘদিন অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার ব্যয়ের পাশাপাশি বন্ধ হয়ে যাওয়া আয়ের সুরক্ষা কতটা রয়েছে? স্বাস্থ্যসুরক্ষা যদি শুধু চিকিৎসার বিল কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু অসুস্থতার কারণে একটি পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে গেলে তাদের পাশে দাঁড়ানোর কার্যকর ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে সেই স্বাস্থ্যসুরক্ষা কতটা পূর্ণাঙ্গ? কারণ স্বাস্থ্যসুরক্ষার প্রকৃত অর্থ শুধু রোগের চিকিৎসা নয়; অসুস্থতার কারণে একটি পরিবার যেন অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে না পড়ে, সেই নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অগ্রগতি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। শিশুমৃত্যু কমেছে, মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, টিকাদান কর্মসূচির বিস্তার ঘটেছে এবং ১৯৯৮ সাল থেকে কমিউনিটি ক্লিনিক গ্রামীণ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।

কিন্তু স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার আর্থিক সুরক্ষাÑএই দুটি এক বিষয় নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের Universal Health Coverage বা UHC Service Coverage Index মাত্র ৫৪/১০০। একই সময়ে ৪১.৭ শতাংশ মানুষÑপ্রায় ৭ কোটিÑনিজের পকেট থেকে স্বাস্থ্যব্যয় করার কারণে আর্থিক সংকট -এর মুখোমুখি হয়েছে। এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে WHO এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ২০২৬-২০৩৫ সময়ের জন্য একটি UHC Roadmap তৈরির কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। এই পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে অসংখ্য পরিবারের বাস্তব জীবন। ধরা যাক, একটি পরিবারের বাবা ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন। মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, ছেলে এখনো বেকার। পরিবারের সঞ্চয় দিয়ে প্রথম কয়েক মাস চিকিৎসা চলল। এরপর সঞ্চয় শেষ হয়ে গেল। শুরু হলো ধারদেনা। তারপর হয়তো জমি বিক্রি, আত্মীয়ের সাহায্য কিংবা উচ্চ সুদের ঋণ। চিকিৎসা চললেও পরিবারটি অর্থনৈতিকভাবে কয়েক বছর পিছিয়ে গেল। এই ধরনের ঘটনা শুধু কল্পিত কোনো দৃশ্য নয়; বাংলাদেশে স্বাস্থ্যব্যয়ের আর্থিক চাপের বাস্তবতার সঙ্গে এর মিল রয়েছে। আর এই চাপ ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। কারণ বাংলাদেশে হৃদরোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ অসংক্রামক রোগ এখন মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশের জন্য দায়ী। এসব রোগের অনেকগুলোই দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং নিয়মিত ওষুধের প্রয়োজন তৈরি করে।

বিশ্বব্যাংকের World Development Indicators-G WHO Global Health Expenditure Database-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মোট Current Health Expenditure-এর প্রায় ৭৯ শতাংশ মানুষের নিজস্ব পকেটের ব্যয় থেকে এসেছে। এখানে বিষয়টি পরিষ্কার করা জরুরিÑএর অর্থ এই নয় যে মানুষ তার আয়ের ৭৯ শতাংশ চিকিৎসায় ব্যয় করেছে। অর্থ হলো, দেশের মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশ সরাসরি মানুষের নিজস্ব পকেট থেকে এসেছে। এটি স্বাস্থ্যসুরক্ষার কাঠামোগত দুর্বলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। সমস্যাটি তাই শুধু ‘হাসপাতাল কম’Ñএখানে থেমে থাকে না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা ও মান, ওষুধ ও ডায়াগনস্টিক সেবার প্রাপ্যতা, বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরতা, স্বাস্থ্যবিমার সীমিত বিস্তার এবং সামাজিক সুরক্ষার দুর্বলতা।

বাংলাদেশের আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো বিশাল অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার। কৃষক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, স্বনিযুক্ত ব্যক্তি এবং অনিয়মিত আয়ের মানুষের বড় একটি অংশ কোনো প্রচলিত কর্মসংস্থানভিত্তিক স্বাস্থ্যবিমার কাঠামোর মধ্যে নেই। ফলে অসুস্থতা শুধু চিকিৎসার খরচ তৈরি করে না; অনেক সময় উপার্জনের পথও বন্ধ করে দেয়।

এই জায়গায় জাপানের কর্মসংস্থানভিত্তিক স্বাস্থ্যবিমা কাঠামো সরাসরি বসিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশের শ্রমবাজার, আয় কাঠামো, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং সামাজিক বাস্তবতা ভিন্ন। কিন্তু কঠিন মানেই অসম্ভব নয়। বাংলাদেশকে তার নিজস্ব বাস্তবতার ভিত্তিতে এমন একটি স্বাস্থ্য-ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে শ্রমিক, কৃষক, স্বনিযুক্ত ব্যক্তি, নি¤œ-আয়ের পরিবার এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে একটি কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে।

জাপানের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যবিমা কাঠামো নয়; বরং স্বাস্থ্যকে রাষ্ট্রীয় সামাজিক সুরক্ষার একটি মৌলিক অংশ হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। Universal Health Coverage-এর অর্থ শুধু মানুষের জন্য হাসপাতালের দরজা খোলা রাখা নয়। প্রয়োজনীয় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসার ব্যয় যেন মানুষকে আর্থিক সংকটে না ফেলেÑএটিও UHC-এর মৌলিক অংশ।

বাংলাদেশের বর্তমান UHC Roadmap ২০২৬-২০৩৫-এর আলোচনাতেও এই বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছেÑসবার জন্য স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ, ধীরে ধীরে সুরক্ষা সম্প্রসারণ, একটি সমন্বিত অর্থায়ন কাঠামো, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার একটি নির্ধারিত প্যাকেজ, জবাবদিহি ও সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এখানে জাপানের আরেকটি শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণÑস্বাস্থ্যসুরক্ষাকে শুধু চিকিৎসার ব্যয় কমানোর নীতি হিসেবে দেখলে হবে না; অসুস্থতার কারণে মানুষের আয় বন্ধ হয়ে গেলে তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার কথাও ভাবতে হবে।

বাংলাদেশের পক্ষে হয়তো একবারে একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা কাঠামো তৈরি করা সম্ভব নয়। কিন্তু ধাপে ধাপে এগোনো সম্ভব। সীমিত সম্পদ প্রথমে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ও উচ্চঝুঁকির স্বাস্থ্যসেবায় ব্যবহার করা যেতে পারে। যেসব সরকারি কর্মসূচি ইতিমধ্যে ভালো ফল দিচ্ছে, সেগুলো আরও কার্যকর ও বিস্তৃত করা যেতে পারে। শ্রমিক, কৃষক, স্বনিযুক্ত ও নি¤œ-আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা বা সমন্বিত ঝুঁকি-পুল তৈরি করা যেতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, স্বাস্থ্যকে শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান, সমাজকল্যাণ, স্থানীয় সরকার, করব্যবস্থা এবং সামাজিক সুরক্ষা নীতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। কারণ অসুস্থতা একজন মানুষের শরীরে শুরু হলেও তার প্রভাব পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং জাতীয় অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।

সুতরাং বাংলাদেশের প্রয়োজন জাপানের ব্যবস্থা হুবহু অনুকরণ করা নয়; প্রয়োজন জাপানের মতো দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার, নীতির ধারাবাহিকতা এবং স্বাস্থ্যকে সামাজিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি করা।

বাংলাদেশ এখন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে, যখন স্বাস্থ্য খাতকে শুধু নতুন হাসপাতাল নির্মাণ, চিকিৎসক নিয়োগ কিংবা ওষুধ সরবরাহের হিসাব দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়। স্বাস্থ্যকে দেখতে হবে জাতীয় অর্থনীতি, শ্রমবাজার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং দারিদ্র্য হ্রাসের সঙ্গে যুক্ত একটি মৌলিক অবকাঠামো হিসেবে।

জাপান যখন ১৯৬১ সালে সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা কভারেজ প্রতিষ্ঠার দিকে পৌঁছায়, তখন দেশটি আজকের সমৃদ্ধ জাপান ছিল না। যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক বৈষম্যের মধ্য দিয়েই তাকে এগোতে হয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্র একটি মৌলিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলÑঅর্থের অভাবে একজন মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবে না।

বাংলাদেশের সামনেও এখন সেই ধরনের একটি নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রশ্ন রয়েছে। প্রশ্নটি শুধু ‘জাপানের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বাংলাদেশে কপি করা যাবে কি না’Ñতা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের বাস্তবতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী আমরা কবে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করব, যেখানে অসুস্থ হওয়া মানেই একটি পরিবারের আর্থিক বিপর্যয় নয়? একটি দেশের উন্নয়ন শুধু মাথাপিছু আয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিংবা বড় অবকাঠামো নির্মাণ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। দেখতে হয়Ñএকজন শ্রমিক অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য তাকে ঋণ করতে হয় কি না; একজন কর্মচারী দীর্ঘদিন কাজে যেতে না পারলে তার পরিবার আয়হীন হয়ে পড়ে কি না; একজন প্রবীণ মানুষকে চিকিৎসার জন্য জীবনের শেষ সঞ্চয়টুকু খরচ করতে হয় কি না।

স্বাস্থ্যসুরক্ষার প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন একজন অসুস্থ মানুষ অন্তত এই নিশ্চয়তাটি অনুভব করতে পারেনÑ‘আমি চিকিৎসা পাব, আর আমার অসুস্থতার কারণে আমার পরিবারও অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়বে না।’

অসুস্থতা হয়তো একজন মানুষের ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য। কিন্তু সেই অসুস্থতার কারণে একটি পরিবার যদি দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে যায়, সন্তানের শিক্ষা বন্ধ হয়ে যায় কিংবা বহু বছরের সঞ্চয় এক মুহূর্তে শেষ হয়ে যায়Ñতখন সেটি আর শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা থাকে না; সেটি রাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর সক্ষমতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশের প্রয়োজন তাই শুধু আরও হাসপাতাল নয়; প্রয়োজন এমন একটি স্বাস্থ্য-সামাজিক নিরাপত্তার দর্শন, যেখানে চিকিৎসার অধিকার, অসুস্থতার সময় আর্থিক সুরক্ষা এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাÑএই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা হবে না। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষা কোনো অলৌকিক ব্যবস্থা নয়। এটি তৈরি হয় দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার, ধারাবাহিক নীতি, সুশাসন, জনগণের অংশগ্রহণ এবং দায়িত্বশীল অর্থায়নের মাধ্যমে।

জাপান তার নিজস্ব ইতিহাস ও বাস্তবতার মধ্য দিয়ে সেই পথ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের পথ অবশ্যই বাংলাদেশেরই হতে হবে। কিন্তু পথ তৈরির আগে একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজনÑস্বাস্থ্য কি কেবল যার টাকা আছে তার অধিকার, নাকি এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক নিরাপত্তার অংশ? কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু চিকিৎসা পাওয়া বা না-পাওয়ার নয়। প্রশ্ন হলোÑঅসুস্থ হওয়ার পরও একজন মানুষ কতটা নিরাপদে বাঁচতে পারেন। আর সেই নিরাপত্তাই শেষ পর্যন্ত একটি উন্নত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতার পাশাপাশি তার মানবিকতারও সবচেয়ে বড় পরিচয়।

হক মো. ইমদাদুল, লেখক, সংগ্রাহক ও গবেষক