আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস: মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য জ্ঞানের আলোকবর্তিকা
সাকিবুর রহমান বাবলা
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে উন্নয়ন, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং টেকসই সমৃদ্ধির কথা বলা হলেও বাস্তবতা হলোÑএখনও কোটি কোটি মানুষ পড়তে, লিখতে কিংবা দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় তথ্য বুঝতে সক্ষম নন। প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার এবং ডিজিটাল অর্থনীতির যুগেও সাক্ষরতা মানবজাতির অন্যতম মৌলিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই প্রতি বছর ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো ১৯৬৬ সালে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ঘোষণা করে এবং ১৯৬৭ সাল থেকে দিবসটি বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসছে। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য কেবল মানুষকে অক্ষরজ্ঞান দেওয়া নয়; বরং সাক্ষরতাকে মানবমুক্তি, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং উন্নয়নের শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কারণ সাক্ষরতা এমন একটি ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে ব্যক্তি নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়, তথ্য বিশ্লেষণ করতে শেখে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ায় এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।
এ বছর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের প্রতিপাদ্য ‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’। দিবসটির ৬০তম বার্ষিকী উপলক্ষে এই প্রতিপাদ্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। কারণ আজকের বিশ্বে সাক্ষরতা শুধু ব্যক্তি উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, টেকসই জীবনযাপন, পরিবেশ সংরক্ষণ, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বিশ্বব্যাপী সাক্ষরতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হলেও চ্যালেঞ্জ এখনও বিশাল। ইউনেস্কোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালেও প্রায় ৭৩ কোটি ৯০ লাখ যুবক-যুবতী ও প্রাপ্তবয়স্ক মৌলিক সাক্ষরতা দক্ষতা থেকে বঞ্চিত। একই সঙ্গে প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ৪ জন ন্যূনতম পাঠদক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ২০২৩ সালে বিশ্বে প্রায় ২৭ কোটি ২০ লাখ শিশু ও কিশোর-কিশোরী বিদ্যালয়ের বাইরে ছিল। এসব পরিসংখ্যান শুধু শিক্ষা খাতের দুর্বলতা নয়, বরং ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সাক্ষরতার বৈষম্য এখনও উদ্বেগজনক। দক্ষিণ এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকার বহু দেশে প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতার হার বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় কম। অন্যদিকে নরওয়ে, ফিনল্যান্ড ও উজবেকিস্তানের মতো দেশগুলো প্রায় শতভাগ সাক্ষরতার মাধ্যমে দেখিয়েছে যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার, মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কীভাবে একটি জাতিকে জ্ঞানভিত্তিক সমাজে রূপান্তর করতে পারে। বিপরীতে নাইজার, চাদ ও মালির মতো দেশগুলো এখনও দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য এবং শিক্ষার সীমিত সুযোগের কারণে পিছিয়ে রয়েছে।
সাক্ষরতার প্রশ্নে লিঙ্গ বৈষম্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্বব্যাপী নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর বড় অংশই নারী। অনেক দেশে দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, সামাজিক কুসংস্কার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সীমিত প্রবেশাধিকার মেয়েদের শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সাক্ষরতার উন্নয়নকে কেবল শিক্ষা কার্যক্রম হিসেবে নয়, বরং নারী ক্ষমতায়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করার আন্দোলন হিসেবেও দেখতে হবে।
বর্তমান সময়ে সাক্ষরতার সংজ্ঞাও বদলে যাচ্ছে। একসময় সাক্ষরতা বলতে শুধু পড়া ও লেখা বোঝানো হলেও এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল সাক্ষরতা, তথ্য সাক্ষরতা, গণমাধ্যম সাক্ষরতা এবং আর্থিক সাক্ষরতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন লেনদেন, ডিজিটাল সেবা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির যুগে তথ্য যাচাই, ভুয়া খবর শনাক্তকরণ এবং নিরাপদ ডিজিটাল ব্যবহারও সাক্ষরতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তাই নতুন প্রজন্মকে শুধু বিদ্যালয়মুখী শিক্ষা নয়, বরং বাস্তব জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় বহুমাত্রিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাক্ষরতা অর্জনের যাত্রা আশাব্যঞ্জক হলেও এখনও অনেক পথ বাকি। স্বাধীনতার পর দেশের সাক্ষরতার হার ছিল অত্যন্ত নি¤œ। ধারাবাহিক সরকারি উদ্যোগ, প্রাথমিক শিক্ষার সম্প্রসারণ, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মসূচি এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের ফলে বর্তমানে সাক্ষরতার হার প্রায় ৭৮ থেকে ৭৯ শতাংশের মধ্যে পৌঁছেছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। তবে শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্য, নারীদের তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা, চর, হাওড়, পাহাড়ি অঞ্চল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষাবঞ্চনা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
বাংলাদেশে ব্র্যাক, জাগো ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একইভাবে ইউনেস্কো, ইউনিসেফ, গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশন এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাপী সাক্ষরতা উন্নয়নে কার্যকর অবদান রাখছে। ডিজিটাল শিক্ষা, মোবাইলভিত্তিক শেখার ব্যবস্থা, অনলাইন লাইব্রেরি এবং বিকল্প শিক্ষার সুযোগ নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। তবে প্রযুক্তির সুবিধা যাতে কেবল শহর বা সচ্ছল জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি আমাদের উন্নয়ন দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে শিক্ষাকে প্রতিষ্ঠা করার আহ্বান। কারণ সাক্ষর মানুষ শুধু নিজের জীবনই বদলায় না, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকেও এগিয়ে নিয়ে যায়। জলবায়ু সংকট, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বিভাজন এবং প্রযুক্তিগত রূপান্তরের এই সময়ে সাক্ষরতা হচ্ছে সেই শক্তি, যা মানুষকে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে, পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে এবং একটি দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করে।
সুতরাং আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের মূল বার্তা হওয়া উচিতÑকোনো মানুষ যেন জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত না থাকে। শিক্ষা ও সাক্ষরতায় বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে লাভজনক সামাজিক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ একটি সাক্ষর জনগোষ্ঠীই পারে বৈষম্য কমাতে, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে এবং মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য একটি আরও সুন্দর ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে।









