আন্তর্জাতিক অনুবাদ দিবস: ভাষার সেতু, জ্ঞানের শক্তি
সাকিবুর রহমান বাবলা
ভাষা মানুষের পরিচয়, সংস্কৃতি, জ্ঞান ও অনুভূতি প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু পৃথিবীর মানুষের ভাষা এক নয়। এই বহুভাষিক বাস্তবতায় এক ভাষার মানুষের কাছে অন্য ভাষার জ্ঞান, সাহিত্য, বিজ্ঞান, আইন ও সংস্কৃতি পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম প্রধান সেতু হলো অনুবাদ। তাই প্রতি বছর ৩০ সেপ্টেম্বর পালিত আন্তর্জাতিক অনুবাদ দিবস কেবল অনুবাদকদের সম্মান জানানোর দিন নয়; এটি ভাষাগত বৈচিত্র্য, পারস্পরিক বোঝাপড়া, অন্তর্ভুক্তি ও ভাষার অধিকারের গুরুত্ব স্মরণ করারও একটি বৈশ্বিক উপলক্ষ।
৩০ সেপ্টেম্বরের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে খ্রিস্টীয় ধর্মযাজক ও অনুবাদক সেন্ট জেরোমের স্মৃতি। তিনি বাইবেলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ গ্রিক ও হিব্রু উৎস থেকে লাতিন ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন এবং অনুবাদকদের পৃষ্ঠপোষক সাধু হিসেবে পরিচিত। তাঁর মৃত্যু হয় ৪২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। এ কারণেই দিনটি অনুবাদ পেশার সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অনুবাদ ফেডারেশন (এফআইটি) ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনটি ১৯৯১ সালে ৩০ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক অনুবাদ দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ২৪ মে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৭১/২৮৮ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ৩০ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক অনুবাদ দিবস ঘোষণা করে। জাতিসংঘের মতে, অনুবাদ, দোভাষী সেবা ও পরিভাষা ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন জাতির মধ্যে যোগাযোগ, বোঝাপড়া, সহযোগিতা, উন্নয়ন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক অনুবাদ দিবসের প্রতিপাদ্য ‘ভাষাগত বৈচিত্র্য ও ভাষার অধিকার’। এর উপশিরোনাম ‘বোধগম্য হওয়ার শক্তি’। প্রতিপাদ্যটি অনুবাদ, দোভাষী সেবা ও পরিভাষাকে ভাষাগত অন্তর্ভুক্তির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে তুলে ধরছে। আর এবারের আয়োজনে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে আদিবাসী ও সংখ্যালঘু ভাষার অধিকার, ভাষা সংরক্ষণ, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং প্রযুক্তির ভূমিকা। ইউনেস্কো ও ট্রান্সলেশন কমন্সের যৌথ আয়োজনে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ অনলাইনে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নীতি, সম্প্রদায়ের উদ্যোগ এবং অনুবাদ প্রযুক্তি কীভাবে ভাষাগত বৈচিত্র্যকে রক্ষা ও শক্তিশালী করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হবে। আয়োজনটি আদিবাসী ভাষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক দশক (২০২২–২০৩২)-এর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত।
একসময় অনুবাদ মূলত অভিধান, ব্যাকরণ ও দক্ষ অনুবাদকের জ্ঞাননির্ভর কাজ ছিল। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কম্পিউটার-সহায়ক অনুবাদ, মেশিন ট্রান্সলেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অনুবাদ মেমোরি, পরিভাষা ব্যবস্থাপনা, স্পিচ-টু-টেক্সট, স্বয়ংক্রিয় সাবটাইটেল, ডাবিং, ওসিআর এবং রিয়েল-টাইম ভয়েস ট্রান্সলেশন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত অনুবাদের সুযোগ বাড়িয়েছে। বিপুল পরিমাণ লেখা অল্প সময়ে অনুবাদ করা, বিভিন্ন ভাষায় ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি এবং কম-সম্পদসম্পন্ন ভাষার জন্য নতুন প্রযুক্তি তৈরি করার সম্ভাবনাও সৃষ্টি হয়েছে। তবে প্রযুক্তি সব ক্ষেত্রে মানুষের বিকল্প নয়। আইন, চিকিৎসা, মানবাধিকার, কূটনীতি, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়ে অর্থ, প্রেক্ষাপট, পরিভাষা ও মানবিক অনুভূতির যথার্থতা নিশ্চিত করতে দক্ষ মানব অনুবাদক ও দোভাষীর ভূমিকা এখনও গুরুত্বপূর্ণ। এফআইটি’ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি মানব ভাষা-পেশাজীবীদের গুণমান, নৈতিকতা ও অন্তর্ভুক্তি রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
ভাষা বোঝার সুযোগ না থাকলে শিক্ষা, চিকিৎসা, বিচার, সরকারি সেবা কিংবা নাগরিক অংশগ্রহণ অনেক মানুষের জন্য কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ফলে অনুবাদ শুধু শব্দের রূপান্তর নয়; এটি তথ্য ও সেবায় প্রবেশাধিকারের মাধ্যম। একটি ভাষার মানুষকে অন্য ভাষার জ্ঞান ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি অনুবাদ প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু ভাষাভাষী মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগও বাড়াতে পারে।
বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার ভাষা থাকলেও শিক্ষা, প্রশাসন ও প্রযুক্তির জগতে হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি ভাষারই শক্তিশালী উপস্থিতি দেখা যায়। ইউনেস্কোর তথ্যমতে, পৃথিবীতে প্রচলিত প্রায় ৭,০০০ ভাষার মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ ভাষাই আজ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। উপযুক্ত চর্চা ও ব্যবহারের অভাবে অসংখ্য ভাষা মূলধারা থেকে দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে। অথচ একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে কেবল কিছু শব্দ মুছে যাওয়া নয়; এর সাথে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায় একটি মানবগোষ্ঠীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও যুগানুযুগ ধরে সঞ্চিত অমূল্য জ্ঞানভা-ার।
বাংলা ভাষার সঙ্গে অনুবাদের সম্পর্ক দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইংরেজি অনুবাদ আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে বাংলা সাহিত্যকে পরিচিত করার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছে। একইভাবে বাংলা ভাষায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ রচনা অনূদিত হয়েছে। ফলে অনুবাদ বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জ্ঞানভা-ারকে বিস্তৃত করেছে এবং বাংলা সাহিত্যকেও আন্তর্জাতিক পরিসরে পৌঁছানোর সুযোগ দিয়েছে।
বাংলাদেশে বাংলা একাডেমিসহ বিভিন্ন শিক্ষা, গবেষণা, প্রকাশনা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান অনুবাদচর্চায় ভূমিকা রাখছে। অনুবাদক কবীর চৌধুরী বিশ্বসাহিত্যের বহু গুরুত্বপূর্ণ রচনা বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। পাশাপাশি সমকালীন অনেক অনুবাদক বাংলা সাহিত্যকে বিদেশি ভাষায় এবং বিশ্বের সাহিত্যকে বাংলায় উপস্থাপনের কাজ করে চলেছেন।
আন্তর্জাতিক অনুবাদ দিবস তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñভাষার বৈচিত্র্য কোনো বাধা নয়; সঠিক অনুবাদ ও দোভাষী সেবা সেই বৈচিত্র্যকে পারস্পরিক বোঝাপড়ার শক্তিতে পরিণত করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তি এই কাজকে দ্রুততর করছে, আর মানবিক দক্ষতা তার অর্থ, প্রেক্ষাপট ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করছে। ভাষার অধিকার, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণে অনুবাদকে তাই কেবল একটি পেশা হিসেবে নয়, মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও বোঝাপড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে দেখা জরুরি।





