আন্তর্জাতিক ক্লাউডেড লেপার্ড দিবস: অরণ্যের রহস্যময় মেঘচিতাকে রক্ষার আহ্বান
সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রতি বছর ৪ আগস্ট পালিত হয় আন্তর্জাতিক ক্লাউডেড লেপার্ড দিবস। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনাঞ্চলে বসবাসকারী বিরল ও ঝুঁকিপূর্ণ বন্য বিড়ালজাতীয় প্রাণী ক্লাউডেড লেপার্ড বা মেঘচিতার সংরক্ষণ সম্পর্কে বৈশ্বিক সচেতনতা সৃষ্টি করাই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য। ২০১৮ সালে যুক্তরাজ্যের কেন্টে অবস্থিত হাওলেটস ওয়াইল্ড অ্যানিমাল পার্কের উদ্যোগে দিবসটির সূচনা হয়। এ উদ্যোগে নেতৃত্ব দেন বন্যপ্রাণী পরিচর্যাকারী লরেন অ্যামোস ও ড্যান কেম্প এবং সহযোগিতা করে দ্য অ্যাসপিনাল ফাউন্ডেশন। প্রথম আয়োজনেই আলোচনা সভা, গাইডেড ট্যুর এবং জনসচেতনতামূলক নানা কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মেঘচিতা পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় বন্য বিড়ালগুলোর একটি। এর বৈজ্ঞানিক নাম Neofelis nebulosa. নামের শেষে ‘লেপার্ড’ থাকলেও এটি সাধারণ চিতাবাঘের কোনো উপপ্রজাতি নয়; বরং মার্জার পরিবারের একটি স্বতন্ত্র ও প্রাচীন বংশধারা। প্রাণীটির গায়ে মেঘের মতো বড় বড় ধূসর-কালো ছোপ থাকায় এর নাম হয়েছে ক্লাউডেড লেপার্ড বা মেঘচিতা। এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে একে ‘অরণ্যের ভূত’ বলেও অভিহিত করা হয়, কারণ এটি অত্যন্ত লাজুক, নিশাচর এবং মানুষের চোখের আড়ালে থাকতে পছন্দ করে।
বিজ্ঞানীদের মতে, মেঘচিতা আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে ব্যতিক্রমধর্মী বিড়ালজাতীয় প্রাণীদের একটি। শরীরের আকারের তুলনায় এর ক্যানাইন দাঁত পৃথিবীর সব জীবিত বিড়ালজাতীয় প্রাণীর মধ্যে সবচেয়ে বড়। এদের চোয়াল প্রায় ১০০ ডিগ্রি পর্যন্ত খুলতে পারে, যা প্রাগৈতিহাসিক সেবার-টুথ বাঘের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। একই সঙ্গে এটি অসাধারণ বৃক্ষআরোহী প্রাণী। বিশেষ ধরনের গোড়ালির গঠনের কারণে মেঘচিতা গাছের কা- বেয়ে মাথা নিচের দিকে নেমে আসতে পারে এবং দীর্ঘ লেজ ব্যবহার করে ভারসাম্য বজায় রাখে।
বর্তমানে পৃথিবীতে মেঘচিতার দুটি স্বীকৃত প্রজাতি রয়েছে। মেনল্যান্ড ক্লাউডেড লেপার্ড হিমালয়ের পাদদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ চীনের বনাঞ্চলে বিস্তৃত। অন্যদিকে সুন্দা ক্লাউডেড লেপার্ড বোর্নিও ও সুমাত্রা দ্বীপে বাস করে। এরা মূলত চিরহরিৎ বন, পাহাড়ি বনাঞ্চল, ম্যানগ্রোভ এবং ঘন রেইনফরেস্টের বাসিন্দা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,০০০ মিটার উচ্চতার বনাঞ্চলেও এদের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশেও মেঘচিতার অস্তিত্ব রয়েছে, যদিও তা অত্যন্ত বিরল। পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সিলেট অঞ্চলের মিশ্র চিরহরিৎ বনাঞ্চলে ক্যামেরা ট্র্যাপের মাধ্যমে এদের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। দেশের বনভূমি সংকুচিত হওয়া এবং আবাসস্থল বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার কারণে এদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ ২০০৮ সাল থেকে ক্লাউডেড লেপার্ডকে ‘ঠঁষহবৎধনষব’ বা ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ধারণা করা হয়, বর্তমানে বন্য পরিবেশে ১০ হাজারেরও কম প্রাপ্তবয়স্ক মেঘচিতা টিকে আছে এবং কোনো একক উপ-জনসংখ্যায় এক হাজারের বেশি পূর্ণবয়স্ক সদস্য নেই। বন উজাড়, অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য, আবাসস্থল ধ্বংস এবং খ-িত হয়ে যাওয়া এদের অস্তিত্বের প্রধান হুমকি। অতীতে কিছু অঞ্চলে এর চামড়া ও হাড়ের চাহিদা থাকায় অবৈধ শিকারও বেড়েছে।
মেঘচিতা শুধু একটি আকর্ষণীয় প্রাণী নয়; এটি বনজ বাস্তুতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খাদ্যশৃঙ্খলের মধ্য ও উচ্চস্তরের শিকারি হিসেবে এটি বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। তাই সংরক্ষণবিদরা একে ‘ফ্ল্যাগশিপ স্পিসিস’ হিসেবে বিবেচনা করেন। মেঘচিতার সংখ্যা কমে যাওয়া মানে সংশ্লিষ্ট বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়া।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মেঘচিতা সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জোরদার হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চট্টগ্রাম-লুসাই ট্রান্সবাউন্ডারি বিগ ক্যাট প্রকল্প সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলে মেঘচিতার আবাসস্থল সংরক্ষণ, বন্যপ্রাণী করিডোর রক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় কাজ করছে। একই সঙ্গে জিনোম গবেষণা, ক্যামেরা ট্র্যাপ পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণভিত্তিক সংরক্ষণ কার্যক্রম নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক ক্লাউডেড লেপার্ড দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, এশিয়ার অরণ্যের এই অনন্য প্রাণীকে রক্ষা করা শুধু একটি প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখার বিষয় নয়; বরং সমগ্র বনজ বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণেরও অপরিহার্য দায়িত্ব। মেঘচিতাকে বাঁচাতে হলে বন সংরক্ষণ, অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য প্রতিরোধ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করতে হবে। তাহলেই অরণ্যের এই রহস্যময় প্রহরী ভবিষ্যতেও এশিয়ার বনভূমিতে বিচরণ করতে পারবে।









