আর্সেনিকের থাবায় দুই গ্রাম, দুই দশকে প্রাণ গেল অর্ধশত মানুষের
প্রতিদিন বিষপান, তবুও বিকল্প নেই
মিলন বিশ্বাস: সাতক্ষীরার তালা উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণকাটি ও সংলগ্ন এলাকায় আর্সেনিকের ভয়াবহতা এখন চরম পর্যায়ে। গত ২০ বছরে বিশুদ্ধ পানির অভাবে এবং আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করে এই এলাকায় অন্তত ৫০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। দেশের ইতিহাসে সর্বপ্রথম এই কৃষ্ণকাটি গ্রামেই আর্সেনিক শনাক্ত হয়েছিল, কিন্তু দুই দশক পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি; বরং প্রতিবছরই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এই এলাকার মানুষের শরীরে আর্সেনিকের বিষক্রিয়া স্পষ্ট। হাতে ও পায়ের তালুতে বাদামি ছাপ, বুকে-পিঠে ‘স্পটেড পিগমেনটেশন’ এবং অনেকের শরীরে গুটিগুটি ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। বিষক্রিয়ার ফলে পুরুষেরা রোদে গিয়ে পরিশ্রম করতে পারছেন না, শরীরের ভেতরে জ্বালাপোড়া ও অসহ্য যন্ত্রণা তাদের নিত্যসঙ্গী। দীর্ঘমেয়াদী এই সংক্রমণ অনেকের ক্ষেত্রে ক্যান্সারে রূপ নিচ্ছে। এছাড়া আঙুল বেঁকে যাওয়া, অসাড়তা এবং পচন ধরার মতো ভয়াবহ উপসর্গ নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন অনেকে।
ভুক্তভোগী রুমানা বেগমের করুণ কাহিনী পুরো গ্রামের চিত্র তুলে ধরে। আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে তার স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়িসহ পরিবারের সাত সদস্য মারা গেছেন। বর্তমানে সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটছে তার।
একইভাবে নাজমা বেগম হারিয়েছেন তার স্বামী, ছেলে, দেবর ও শ্বশুরকে। নিজে ২২ বছর ধরে এই মরণব্যাধি বয়ে বেড়াচ্ছেন। অর্থের অভাবে উন্নত চিকিৎসা তো দূরের কথা, ডাক্তারের পরামর্শ দেওয়া পুষ্টিকর খাবার জোগাড় করতেও হিমশিম খাচ্ছেন এই মানুষগুলো।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও বিভিন্ন এনজিওর উদ্যোগে সুপেয় পানির প্ল্যান্ট স্থাপন করা হলেও সেগুলো বছরের পর বছর অকেজো হয়ে পড়ে আছে। নিয়মানুযায়ী প্রতি বছরে দুইবার টিউবওয়েলের পানি পরীক্ষা করার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। সরকারিভাবে সরবরাহকৃত পানির প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার কোনো দেখা মেলেনি। ফলে নিরুপায় হয়ে মানুষ লাল চিহ্নিত টিউবওয়েলের ‘বিষাক্ত’ পানিই পান করছে।
আর্সেনিকের এই ভয়াবহ ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে শিশুদের ওপর। এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে অকেজো ওয়াটার প্ল্যান্টগুলো সচল করা এবং সরকারিভাবে পাইপলাইনের মাধ্যমে সুপেয় পানির ব্যবস্থা না করলে এই মৃত্যুমিছিল থামানো সম্ভব হবে না।
স্থানীয় বাসিন্দা জাকির মোড়ল আক্ষেপ করে বলেন, টিউবওয়েলে লাল রঙ দিয়ে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তৃষ্ণা মেটাতে আর কোনো বিকল্প নেই। আমরা জেনেশুনেই প্রতিদিন বিষ পান করছি।
জালালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম. মফিদুল হক লিটু জানান, আমার ইউনিয়নে ব্যাপক আর্সেনিকের প্রভাবে বিশেষ করে কৃষ্ণকাটি ও শ্রীমন্তকাঠি গ্রামের মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কৃষ্ণকাটি গ্রামের আনসার মোড়লের একই পরিবারের সাত জন মারা গিয়েছে। বিভিন্ন এনজিও কিছু ট্যাংকি বিতরণ করেছিল। সেই ট্যাংকিতে বৃষ্টির পানি ধরে কিছু সংখ্যক মানুষ পান করে। কিন্তু বৃষ্টির পানি দুই তিন মাসের বেশি পান করা যায় না।
পাইপ লাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের একটি প্রকল্প কৃষ্ণকাটি গ্রামে পাস হয়েছে। দীর্ঘদিন আগে প্রকল্পটি পাস হওয়ার পরেও এখনো বাস্তবায়ন হয়নি কেন হচ্ছে না তা আমাদের অজানা। দ্রুত এই প্রকল্পটির কাজ করা হলে এই এলাকার মানুষ আর্সেনিকের প্রকোপ থেকে বাঁচতে পারবে।
আর্সেনিকের প্রভাবে যে রোগগুলো দেখা দিয়েছে সরকার স্পেশালভাবে এখানে কোন চিকিৎসা দেয় না। মাঝে মাঝে এনজিও আসে কিছু ঔষুধ পত্রের ব্যবস্থা করে তাছাড়া তেমন কোন ব্যবস্থা বা চিকিৎসা এখানে দেয়া হয় না। বিষয়টি বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে, কিন্তু এখনো স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। মানুষ এখনো নিরাপদ পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
এ সকল বিষয়ে সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন ডা: আব্দুস সালাম বলেন, আর্সেনিক খুব মারাত্মক একটি রোগ। আর্সেনিক হলে সাধারণত হাত-পা বাঁকা হয়ে যাওয়া সহ যেটার পরিণতি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। সাধারণত আর্সেনিক আক্রান্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত করে ডায়গনোসিস করে বিনামূল্যে সরকারিভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয় । তালায় জালালপুর যে অঞ্চলে আক্রান্ত হয়েছে সেখানে পুনরায় খবরাখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।



