সাকিবুর রহমান বাবলা
পৃথিবীর আকাশে এমন এক অদৃশ্য প্রহরী রয়েছে, যাকে আমরা চোখে দেখি না, অথচ যার ওপর নির্ভর করছে জীবনের নিরাপত্তা। সেই প্রহরীর নাম ওজোন স্তর। স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে অবস্থিত ওজোনের এই স্তর সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মির বড় একটি অংশ শোষণ করে মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ ও সামুদ্রিক জীবজগতকে সুরক্ষা দেয়। তাই ওজোন স্তরকে পৃথিবীর অদৃশ্য ছাতা বললেও অত্যুক্তি হয় না।
প্রতি বছর ১৬ সেপ্টেম্বর পালিত হয় আন্তর্জাতিক ওজোন স্তর সুরক্ষা দিবস। ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ (এ/আরইএস/৪৯/১১৪) এই দিবস ঘোষণা করে। দিনটি ১৯৮৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক মন্ট্রিয়ল প্রটোকল-এর স্মরণে নির্ধারিত।
ওজোন স্তর: তিনটি অক্সিজেন পরমাণু দিয়ে গঠিত (ও₃) ওজোন গ্যাসের একটি ঘন স্তর। এটি ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার উঁচুতে অবস্থান করে, যা পৃথিবীর প্রাকৃতিক সানস্ক্রিন বা সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করে। আর এই ওজোন স্তর ক্ষয়ের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল মানুষের তৈরি ক্লোরোফ্লোরোকার্বন, হ্যালন, কার্বন টেট্রাক্লোরাইডসহ বিভিন্ন ওজোন-ক্ষয়কারী পদার্থ। রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, অ্যারোসলসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি ও শিল্পপণ্যে এগুলোর ব্যাপক ব্যবহার হতো। এসব রাসায়নিক বায়ুম-লের ওপরের স্তরে পৌঁছে সূর্যের বিকিরণের প্রভাবে সক্রিয় ক্লোরিন ও ব্রোমিন মুক্ত করে, যা ওজোন অণু ধ্বংসের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।
বিশেষ করে অ্যান্টার্কটিকার ওপর ভয়াবহ ওজোন স্তর ক্ষয়ের ঘটনা বিজ্ঞানীদের সতর্ক করে দেয়। স্পষ্ট হয়ে ওঠেÑএটি কোনো এক দেশের সমস্যা নয়; এটি গোটা মানবজাতির সংকট। এই সংকট মোকাবিলায় ১৯৮৫ সালের ভিয়েনা কনভেনশন আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করে। এর দুই বছর পর ১৯৮৭ সালে আসে মন্ট্রিয়ল প্রটোকল। ওজোন-ক্ষয়কারী পদার্থ উৎপাদন ও ব্যবহার ধাপে ধাপে বন্ধ করার মাধ্যমে এটি পরিবেশ কূটনীতির ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ ওজোন-ক্ষয়কারী পদার্থের ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। ২০০৯ সালে বিশ্বের সব দেশ মন্ট্রিয়ল প্রটোকল অনুমোদন করে, যা আন্তর্জাতিক পরিবেশ সহযোগিতার ইতিহাসে এক বিরল সাফল্য। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে কিগালি সংশোধনীর মাধ্যমে হাইড্রোফ্লুওরোকার্বন (এইচএফসি) ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এইচএফসি সরাসরি ওজোন স্তর ধ্বংস না করলেও এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস। ফলে কিগালি সংশোধনী বাস্তবায়নের মাধ্যমে ওজোন সুরক্ষার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব হচ্ছে।
ওজোন সুরক্ষায় জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি, ওজোন সচিবালয় এবং বহুপক্ষীয় তহবিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধির সহায়তা দিয়ে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে রূপান্তর ত্বরান্বিত করা হচ্ছে। বাংলাদেশও এ বৈশ্বিক উদ্যোগের দায়িত্বশীল অংশীদার। বাংলাদেশ ২ আগস্ট ১৯৯০ মন্ট্রিয়ল প্রটোকলে যোগ দেয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংশোধনী অনুমোদনের পাশাপাশি ২০২০ সালের ৮ জুন কিগালি সংশোধনী অনুমোদন করে।
দেশে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ওজোন সেল গঠন করে ওজোন-ক্ষয়কারী পদার্থ নিয়ন্ত্রণ, বিকল্প প্রযুক্তির প্রসার এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পখাতে সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ চলছে। রেফ্রিজারেশন ও এয়ার কন্ডিশনিং খাতের দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে বাংলাদেশের জন্য পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে দ্রুত রূপান্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মন্ট্রিয়ল প্রটোকলের সাফল্যের কারণে ওজোন স্তর এখন ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে। বর্তমান বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, নীতিগুলো অব্যাহত থাকলে বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলে প্রায় ২০৪০ সালের দিকে, আর্কটিক অঞ্চলে ২০৪৫ সালের দিকে এবং অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলে ২০৬৬ সালের দিকে ওজোন স্তর ১৯৮০ সালের মাত্রার কাছাকাছি ফিরে আসতে পারে। এই সাফল্য প্রমাণ করেÑবিজ্ঞানকে গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক ঐক্য গড়ে তুললে বৈশ্বিক পরিবেশগত সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
ওজোন স্তর রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকার বা আন্তর্জাতিক সংস্থার নয়। নতুন ফ্রিজ বা এসি কেনার সময় ওজোন-নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি বেছে নিতে হবে। পুরোনো যন্ত্রের’ হিমায়ক গ্যাস’ যেন অসতর্কভাবে বায়ুম-লে না ছড়ায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ভোগ কমাতে হবে এবং পরিবেশবান্ধব পণ্য ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
ওজোন স্তর আমাদের চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এর সুরক্ষা ছাড়া পৃথিবীর জীবন মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই ১৬ সেপ্টেম্বর শুধু একটি দিবস পালনের দিন নয়; এটি বৈশ্বিক দায়িত্ব ও ঐক্যের কথা স্মরণ করার দিন। আসুন, সবাই মিলে ওজোন স্তর রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হই।