ইছামতির বুকে রেজাউলের ৩০ বছর: প্রতিটি সূর্যোদয় জাগিয়ে রাখে ঘুরে দাঁড়ানোর জেদ
Oplus_131072
দেবহাটা প্রতিনিধি: ভোরের আলো ফোটার আগেই নিস্তরঙ্গ ইছামতি নদীর পাড়ে দেখা যায় এক জোড়া চলিষ্ণু পা। কাঁধে জাল আর চোখে আগামীর স্বপ্ন নিয়ে নদীর কর্দমাক্ত পানিতে নামেন রেজাউল ইসলাম। সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার বসন্তপুর গ্রামের মৃত বাহাদুর সরদারের ছেলে রেজাউলের কাছে এই নদী কেবল জলধারা নয়, টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
গত তিন দশক ধরে ইছামতির জোয়ার-ভাটায় নিজের ভাগ্য বুনে চলেছেন তিনি। স্ত্রী, দুই সন্তান আর বৃদ্ধ মাকে নিয়ে গড়া পাঁচ সদস্যের সংসারের ঘানি টানছেন একা হাতে। নদীর উত্তাল ঢেউ আর প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করে নেট জালে সংগ্রহ করেন বাগদা চিংড়ির পোনা ও অন্যান্য ক্ষুদ্র জলজ সম্পদ।
রেজাউলের দিন শুরু হয় নদীর নোনা পানিতে ভিজে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল টেনে যে পোনা মেলে, তা বাছাই করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। এই সামান্য আয়ে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর দশা। তবুও হার মানেননি তিনি। নিজের অপূর্ণ সাধগুলো সন্তানদের মাধ্যমে পূর্ণ করতে চান। বড় ছেলে এখন কলেজে পড়ছেন, আর মেয়েটি যাচ্ছে স্কুলে। তাঁদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে গিয়ে প্রায়ই হিমশিম খেতে হয় এই সংগ্রামী পিতাকে।
নিজের জীবনযুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে রেজাউলের। ছলছল চোখে ইছামতির দিগন্তের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, “এই নদীই আমাদের অন্নদাতা। যা পাই, তা দিয়েই কোনোমতে সংসার চলে। দিন দিন নদীতে পোনা কমে যাচ্ছে, কষ্ট বাড়ছে। কিন্তু ছেলেমেয়েদের মানুষ করার স্বপ্নটাই আমাকে প্রতিদিন এই হাঁটু সমান পানিতে নামতে সাহস দেয়।”
স্থানীয়রা জানান, বসন্তপুর গ্রামের আরও অনেক পরিবার রেজাউলের মতো ইছামতি নদীর ওপর নির্ভরশীল। তবে জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীর নাব্যতা সংকটে পোনার প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় তাঁদের জীবন-জীবিকা এখন খাদের কিনারায়।
রেজাউল ইসলামের এই নিরন্তর লড়াই কেবল একজন মানুষের টিকে থাকার গল্প নয়; এটি উপকূলীয় অঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবনচিত্র, যেখানে প্রতিটি সূর্যাস্ত নিয়ে আসে আগামীর অনিশ্চয়তা, আর প্রতিটি সূর্যোদয় জাগিয়ে রাখে ঘুরে দাঁড়ানোর জেদ।









