বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

উপকূলের মানুষ বাজেটে অগ্রাধিকার পাবে কি?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬, ১১:০৭ অপরাহ্ণ
উপকূলের মানুষ বাজেটে অগ্রাধিকার পাবে কি?

সচ্চিদানন্দ দে সদয়
বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প আজ বিশ্বজুড়ে আলোচিত। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সামাজিক সূচকে অগ্রগতিÑসব মিলিয়ে দেশ এগিয়ে চলেছে। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার মাঝেও এমন একটি জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা এখনো প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। তারা দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ। তাদের জীবন যেন এক অন্তহীন অনিশ্চয়তার নাম। একদিকে নদীভাঙন, অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাব। প্রতিটি দুর্যোগ তাদের জীবনকে নতুন করে বিপর্যস্ত করে দেয়। তারপরও তারা টিকে থাকে, ঘুরে দাঁড়ায়, আবারও নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টা করে। প্রতি বছর জাতীয় বাজেট ঘোষণার সময় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন কিংবা নগর অবকাঠামোর নানা পরিকল্পনা গুরুত্ব পায়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় অভিঘাত বহনকারী উপকূলীয় মানুষের জীবন-বাস্তবতা কতটা গুরুত্ব পায়, সেটি বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দেয়। কারণ বাস্তবতা হলো, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকায় বসবাসকারী লাখো মানুষ আজও নিরাপদ জীবন যাপনের মৌলিক নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত।

 

উপকূলের মানুষের জীবনের সঙ্গে দুর্যোগ শব্দটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, বুলবুল, ইয়াস কিংবা আম্ফানÑপ্রতিটি দুর্যোগের স্মৃতি এখনো তাদের জীবনে গভীর ক্ষত হয়ে রয়েছে। এসব দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে সরকার, বিভিন্ন সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবীরা দাঁড়িয়েছে, পুনর্গঠনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও টেকসই সমাধানের প্রশ্নটি অনেক ক্ষেত্রেই অনুত্তরিত থেকে গেছে। উপকূলের মানুষ জানে, দুর্যোগ কেবল একটি দিনের ঘটনা নয়। একটি ঘূর্ণিঝড় কয়েক ঘণ্টায় আঘাত হানে, কিন্তু তার ক্ষত বহন করতে হয় বছরের পর বছর। একটি বাঁধ ভেঙে গেলে শুধু ঘরবাড়ি নয়, কৃষিজমি, পুকুর, মাছের ঘের, গবাদিপশু, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যÑসবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক পরিবার ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করতে বাধ্য হয়। আবার অনেকেই জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হয়। ফলে দুর্যোগ শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক পরিবর্তনও ঘটায়। বিশেষ করে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা, কক্সবাজারসহ উপকূলীয় অঞ্চলের বহু মানুষ এখনো দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের ওপর নির্ভরশীল। কোথাও কোথাও সামান্য উচ্চ জোয়ারেই বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্ষাকালে মানুষের উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে যায়। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে নি¤œচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ের খবর এলেই তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কারণ তারা জানে, একটি দুর্বল বাঁধ মানেই হাজারো মানুষের জীবনের ঝুঁকি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদ-নদীতে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়া, লবণাক্ততার বিস্তার এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত উপকূলীয় জীবন ব্যবস্থাকে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একসময় যে জমিতে ধান উৎপাদন হতো, সেখানে এখন লবণাক্ততার কারণে ফসল উৎপাদন কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় সুপেয় পানির সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে। নারীরা ও শিশুরা নিরাপদ পানির জন্য দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে বাধ্য হয়। এ অবস্থায় জাতীয় বাজেটে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা সময়ের দাবি। কারণ এটি কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চলের সমস্যা নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন ও মানবিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী যদি প্রতিনিয়ত দুর্যোগের ঝুঁকিতে বসবাস করে, তাহলে সামগ্রিক উন্নয়ন কখনোই টেকসই হতে পারে না। প্রথমত, উপকূলীয় অঞ্চলের বেড়িবাঁধ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও টেকসই করতে হবে। অনেক বাঁধ নির্মাণ হয়েছে কয়েক দশক আগে। জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান বাস্তবতায় সেই বাঁধগুলো আর পর্যাপ্ত নয়। তাই বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে নতুন করে উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বাজেটে এ খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনের পরিবর্তে দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতির ওপর জোর দিতে হবে। একটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার পর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় যে অর্থ ব্যয় হয়, তার চেয়ে অনেক কম ব্যয়ে আগাম প্রস্তুতির মাধ্যমে বিপুল ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। এজন্য আশ্রয়কেন্দ্র বৃদ্ধি, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং স্থানীয় জনগণকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, জলবায়ু সহনশীল জীবিকা নিশ্চিত করতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি, মৎস্য ও পশুপালন খাতকে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য গবেষণা, প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। লবণসহিষ্ণু ফসল, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে মানুষের ঝুঁকি অনেকাংশে কমবে।

 

চতুর্থত, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। উপকূলের বহু এলাকায় লবণাক্ততার কারণে সুপেয় পানির সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবাহিত রোগের ঝুঁকি। তাই বাজেটে নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের জন্য পৃথক কর্মসূচি থাকা প্রয়োজন। পঞ্চমত, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য পুনর্বাসন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এমন অনেক এলাকা রয়েছে, যেখানে মানুষ বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব অঞ্চলের পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। পুনর্বাসন মানে শুধু একটি ঘর নির্মাণ নয়; এর সঙ্গে জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোও যুক্ত। এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। উপকূলের মানুষকে কেবল দুর্যোগের শিকার হিসেবে দেখা যাবে না। তারা দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। চিংড়ি শিল্প, মৎস্যসম্পদ, কৃষি উৎপাদন এবং সুন্দরবন কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকা-ে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। তাই তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা মানে জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করা। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে ন্যায্য দাবি তুলে ধরছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকেও অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেই অর্থের কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় জনগণের বাস্তব প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও প্রত্যাশিত সুফল সাধারণ মানুষ পায় না। এ ক্ষেত্রে জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় বাজেটের মূল দর্শন হওয়া উচিত কাউকে পেছনে ফেলে না রাখা।

 

সেই বিবেচনায় উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া ন্যায়সঙ্গত এবং প্রয়োজনীয়। কারণ তারা এমন এক সংকটের মুখোমুখি, যার জন্য তারা নিজেরা দায়ী নয়। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তারা বহন করছে সবচেয়ে বেশি, অথচ এর জন্য তাদের অবদান সবচেয়ে কম। উপকূলের মানুষের চাওয়া খুব বেশি নয়। তারা নিরাপদে ঘুমাতে চায়। একটি ঝড়ের পূর্বাভাস শুনে আতঙ্কিত হতে চায় না। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে চায়। তারা চায়, রাষ্ট্র তাদের দুর্ভোগকে উপলব্ধি করুক এবং উন্নয়নের মূল ধারায় তাদের যথাযথ স্থান দিক। বাংলাদেশের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন উপকূলের মানুষও নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারবে। তাই সময় এসেছে বাজেটে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য বিশেষ ও কার্যকর বরাদ্দ নিশ্চিত করার। দুর্যোগের পর সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন দুর্যোগের আগেই সুরক্ষার ব্যবস্থা। ত্রাণ নয়, প্রয়োজন টেকসই সমাধান। প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন বাস্তবায়ন।জাতীয় বাজেটের পাতায় যদি উপকূলের মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ যথাযথ গুরুত্ব পায়, তাহলে সেটি শুধু একটি অঞ্চলের উন্নয়ন নয়; বরং একটি জলবায়ু-সহনশীল, মানবিক ও টেকসই বাংলাদেশের ভিত্তি নির্মাণ করবে। আর সেটিই হওয়া উচিত আগামী দিনের রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। লেখক: সংবাদকর্মী

Ads small one

ঢাকায় রমিজ হত্যা মামলায় নজরুল ইসলাম কারাগারে, রিমান্ড শুনানি আজ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১:৪৪ পূর্বাহ্ণ
ঢাকায় রমিজ হত্যা মামলায় নজরুল ইসলাম কারাগারে, রিমান্ড শুনানি আজ

নিজস্ব প্রতিনিধি: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় কারওয়ান বাজার এলাকায় এক শিক্ষার্থীকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলামকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
একই সঙ্গে তাঁর রিমান্ড আবেদনের ওপর শুনানির জন্য বুধবার দিন ধার্য করা হয়েছে। মঙ্গলবার ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদের আদালত এ আদেশ দেন বলে নিশ্চিত করেছেন প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) আরিফ রেজা।
এর আগে সোমবার রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে নজরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে তাঁকে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী রমিজ উদ্দিন আহমেদ রূপ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তেজগাঁও জোনাল টিমের পরিদর্শক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম আসামির সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। তবে মঙ্গলবার তিনি আদালতে উপস্থিত না থাকায় বিচারক রিমান্ড শুনানির জন্য বুধবার দিন ধার্য করেন।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট কারওয়ান বাজার এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রমিজ উদ্দিন রূপ। বিকেলবেলা মেট্রোরেল স্টেশনের কাছে আসামিদের ছোড়া গুলি তাঁর ডান চোখে লাগে। আন্দোলনকারীরা রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে কাঁঠালবাগানের একটি হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় নিহত রূপের বাবা এ কে এম রকিবুল আহম্মেদ তেজগাঁও থানায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২২৩ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

 

জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্যসংকটে সুন্দরবনের বাঘ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১:৪০ পূর্বাহ্ণ
জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্যসংকটে সুন্দরবনের বাঘ

নিজস্ব প্রতিনিধি: আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস উপলক্ষে সুন্দরবনে বাঘ সংরক্ষণে নানা উদ্যোগের কথা জানিয়েছে বন বিভাগ। বনে ‘বাঘের কেল্লা’ নির্মাণ ও ক্যামেরা ট্র্যাপের মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও স্থানীয় বাসিন্দা ও গবেষকেরা বলছেন, মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র এখনো উদ্বেগজনক।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন এবং খালের নাব্য হ্রাসের ফলে মিঠাপানির উৎস শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে হরিণসহ তৃণভোজী প্রাণীদের সংখ্যা কমায় বাঘের খাদ্যশৃঙ্খলে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের বনজীবী নুর ইসলাম ও হরিনগর এলাকার জেলে আকবর আলী জানান, আগের মতো বনে হরিণ বা বাঘের বিচরণ এখন আর দেখা যায় না। তা ছাড়া বনদস্যু ও চোরাশিকারিদের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় বন্যপ্রাণী শিকারের ঘটনা ঘটছে। শিকারের কারণে বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনে বাঘের বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ায় বাঘ মাঝেমধ্যেই লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে, যা মানুষ-বাঘ সংঘাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে সাতক্ষীরা উপকূলে বাঘের আক্রমণে ১৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশই কাঠুরে, জেলে ও মৌয়াল।

জাতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. এম মনিরুল এইচ বলেন, বাঘকে শুধু একটি প্রাণী হিসেবে দেখলে হবে না। বাঘ সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের শীর্ষ শিকারি। লবণাক্ততা বাড়া ও মিঠাপানির অভাবের পাশাপাশি মানুষের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ বাঘের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তাই পরিবেশ ও স্থানীয়দের জীবিকাÑ সব মিলিয়েই সমন্বিত সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিতে হবে।
বন বিভাগের তথ্যমতে, ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সুন্দরবনে ৬২টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা সুলজ কুমার দ্বীপ বলেন, “মিঠাপানির সংকট দূর করতে বনের ভেতরে কৃত্রিম পুকুর খনন করা হয়েছে। চোরাশিকার প্রতিরোধে টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপে বাঘের সংখ্যা কিছুটা বেড়ে বর্তমানে প্রায় ১২৫টিতে পৌঁছেছে।”

 

 

 

 

 

চিকিৎসকের অবহেলায় যমজ সন্তানের মায়ের জীবন সংকটাপন্ন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ
চিকিৎসকের অবহেলায় যমজ সন্তানের মায়ের জীবন সংকটাপন্ন

মো. জাবের হোসেন: যমজ সন্তান প্রসবের পর জরায়ুতে গর্ভফুলের (ফুল) অংশবিশেষ রেখেই প্রসূতিকে ছাড়পত্র দেওয়ার চরম অভিযোগ উঠেছে তালা সার্জিক্যাল ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে। পর্যাপ্ত তদারকি ও চিকিৎসার গাফিলতিতে প্রসূতি রিমা খাতুন (১৮) প্রসব-পরবর্তী মারাত্মক রক্তক্ষরণে (সেকেন্ডারি পিপিএইচ) আক্রান্ত হয়েছেন। এতে ইতোমধ্যে তাঁর এক নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে এবং বর্তমানে রিমা নিজেও জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন। গত ৫ জুলাই সাতক্ষীরার তালা উপজেলার মেলা বাজারে অবস্থিত তালা সার্জিক্যাল ক্লিনিকে এই ঘটনা ঘটে।
মেডিকেল রিপোর্টের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রসবের পর গর্ভফুল বা প্রসবসংক্রান্ত উপাদান সম্পূর্ণ অপসারণ না করেই প্রসূতিকে ছাড়পত্র দেয় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। ফলে জরায়ুতে অবশিষ্ট অংশ থেকে ক্রমাগত রক্তক্ষরণ হতে থাকে এবং তিনি মারাত্মক রক্তস্বল্পতায় (অ্যানিমিয়া) ভোগেন। পরবর্তীতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জরুরি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর জরায়ু পরিষ্কার ও রক্ত সঞ্চালন করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রসবের পর প্রসূতির জরায়ু সঠিকভাবে পরীক্ষা না করে ছেড়ে দেওয়া চরম চিকিৎসাগত অবহেলা, যা রোগীর জীবন বিপন্ন করতে পারতো।
রিমা খাতুনের বাবা শুকুর আলী সরদার লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় গত ৪ জুলাই তাঁর মেয়ে রিমা ও জামাতা মো. সেলিম খাঁ পরামর্শের জন্য তালা সার্জিক্যাল ক্লিনিকে যান। পরদিন ৫ জুলাই শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ভর্তি করা হয়। ক্লিনিকটির স্বত্বাধিকারী বিধান বাবুর পরামর্শে স্বাভাবিক প্রসবের (নরমাল ডেলিভারি) উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিধান নিজে উপস্থিত থেকে এক নার্সকে দিয়ে এপিসিওটমি (সাইট কাটা) ও সেলাইয়ের কাজ করান। ওই দিনই রিমা দুটি যমজ পুত্রসন্তানের জন্ম দেন।
জন্মের পরপরই নবজাতকরা অসুস্থ হয়ে পড়লে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে তাদের খুলনা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে পাঠায়। অন্যদিকে ৭ জুলাই রিমা খাতুনকে ক্লিনিক থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হলে তিনিও খুলনায় সন্তানদের কাছে চলে যান। সেখানে পৌঁছানোর পরদিন রিমা মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেখানকার চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানান, তাঁর জরায়ুতে গর্ভফুলের অংশ রয়ে গেছে। পরে জরুরি চিকিৎসার মাধ্যমে জরায়ু পরিষ্কার করা হয়।
রিমার স্বামী সেলিম খাঁ আক্ষেপ করে বলেন, “ডাক্তারের বদলে ক্লিনিক মালিক নিজে উপস্থিত থেকে নার্সকে দিয়ে চিকিৎসা করিয়েছেন। এই ভুল চিকিৎসার জন্যই আমার স্ত্রীর আজ এই অবস্থা, আর আমাদের একটি সন্তানও মারা গেছে। আমরা এই ঘটনার বিচার চাই।”
এদিকে ২৫ জুলাই সকালে তালা সার্জিক্যাল ক্লিনিকে গেলে কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে ব্যাপক অসঙ্গতি দেখা যায়। প্রসূতির চিকিৎসায় গাফিলতির চিত্রটি সেখানে পরোক্ষভাবে উঠে আসে। স্বত্বাধিকারী বিধান কখনো নিজেকে ‘মালিক’ আবার কখনো ‘ম্যানেজার’ পরিচয় দেওয়ায় কারণ জানতে চাইলে ম্যানেজার মশিউর রহমান দাবি করেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে আমরা মানসিকভাবে চাপের মধ্যে রয়েছি, তাই হয়তো তিনি এমন বলছেন।”
জানা গেছে, বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হলে প্রসূতির পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ সাত হাজার টাকা দিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে প্রসূতির পরিবার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
অন্যদিকে, প্রসবের কাজে যুক্ত নার্স রিমা খাতুন পুরো বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। এছাড়া ছাড়পত্র দেওয়ার পর রোগীর জীবনঝুঁকির কথা জেনেও কেন তাঁর কোনো খোঁজ নেওয়া হয়নি—সে প্রশ্নের কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেনি ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ।