উপকূলের মানুষ বাজেটে অগ্রাধিকার পাবে কি?
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প আজ বিশ্বজুড়ে আলোচিত। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সামাজিক সূচকে অগ্রগতিÑসব মিলিয়ে দেশ এগিয়ে চলেছে। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার মাঝেও এমন একটি জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা এখনো প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। তারা দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ। তাদের জীবন যেন এক অন্তহীন অনিশ্চয়তার নাম। একদিকে নদীভাঙন, অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাব। প্রতিটি দুর্যোগ তাদের জীবনকে নতুন করে বিপর্যস্ত করে দেয়। তারপরও তারা টিকে থাকে, ঘুরে দাঁড়ায়, আবারও নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টা করে। প্রতি বছর জাতীয় বাজেট ঘোষণার সময় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন কিংবা নগর অবকাঠামোর নানা পরিকল্পনা গুরুত্ব পায়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় অভিঘাত বহনকারী উপকূলীয় মানুষের জীবন-বাস্তবতা কতটা গুরুত্ব পায়, সেটি বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দেয়। কারণ বাস্তবতা হলো, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকায় বসবাসকারী লাখো মানুষ আজও নিরাপদ জীবন যাপনের মৌলিক নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত।
উপকূলের মানুষের জীবনের সঙ্গে দুর্যোগ শব্দটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, বুলবুল, ইয়াস কিংবা আম্ফানÑপ্রতিটি দুর্যোগের স্মৃতি এখনো তাদের জীবনে গভীর ক্ষত হয়ে রয়েছে। এসব দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে সরকার, বিভিন্ন সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবীরা দাঁড়িয়েছে, পুনর্গঠনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও টেকসই সমাধানের প্রশ্নটি অনেক ক্ষেত্রেই অনুত্তরিত থেকে গেছে। উপকূলের মানুষ জানে, দুর্যোগ কেবল একটি দিনের ঘটনা নয়। একটি ঘূর্ণিঝড় কয়েক ঘণ্টায় আঘাত হানে, কিন্তু তার ক্ষত বহন করতে হয় বছরের পর বছর। একটি বাঁধ ভেঙে গেলে শুধু ঘরবাড়ি নয়, কৃষিজমি, পুকুর, মাছের ঘের, গবাদিপশু, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যÑসবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক পরিবার ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করতে বাধ্য হয়। আবার অনেকেই জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হয়। ফলে দুর্যোগ শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক পরিবর্তনও ঘটায়। বিশেষ করে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা, কক্সবাজারসহ উপকূলীয় অঞ্চলের বহু মানুষ এখনো দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের ওপর নির্ভরশীল। কোথাও কোথাও সামান্য উচ্চ জোয়ারেই বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্ষাকালে মানুষের উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে যায়। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে নি¤œচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ের খবর এলেই তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কারণ তারা জানে, একটি দুর্বল বাঁধ মানেই হাজারো মানুষের জীবনের ঝুঁকি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদ-নদীতে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়া, লবণাক্ততার বিস্তার এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত উপকূলীয় জীবন ব্যবস্থাকে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একসময় যে জমিতে ধান উৎপাদন হতো, সেখানে এখন লবণাক্ততার কারণে ফসল উৎপাদন কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় সুপেয় পানির সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে। নারীরা ও শিশুরা নিরাপদ পানির জন্য দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে বাধ্য হয়। এ অবস্থায় জাতীয় বাজেটে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা সময়ের দাবি। কারণ এটি কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চলের সমস্যা নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন ও মানবিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী যদি প্রতিনিয়ত দুর্যোগের ঝুঁকিতে বসবাস করে, তাহলে সামগ্রিক উন্নয়ন কখনোই টেকসই হতে পারে না। প্রথমত, উপকূলীয় অঞ্চলের বেড়িবাঁধ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও টেকসই করতে হবে। অনেক বাঁধ নির্মাণ হয়েছে কয়েক দশক আগে। জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান বাস্তবতায় সেই বাঁধগুলো আর পর্যাপ্ত নয়। তাই বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে নতুন করে উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বাজেটে এ খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনের পরিবর্তে দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতির ওপর জোর দিতে হবে। একটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার পর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় যে অর্থ ব্যয় হয়, তার চেয়ে অনেক কম ব্যয়ে আগাম প্রস্তুতির মাধ্যমে বিপুল ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। এজন্য আশ্রয়কেন্দ্র বৃদ্ধি, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং স্থানীয় জনগণকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, জলবায়ু সহনশীল জীবিকা নিশ্চিত করতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি, মৎস্য ও পশুপালন খাতকে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য গবেষণা, প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। লবণসহিষ্ণু ফসল, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে মানুষের ঝুঁকি অনেকাংশে কমবে।
চতুর্থত, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। উপকূলের বহু এলাকায় লবণাক্ততার কারণে সুপেয় পানির সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবাহিত রোগের ঝুঁকি। তাই বাজেটে নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের জন্য পৃথক কর্মসূচি থাকা প্রয়োজন। পঞ্চমত, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য পুনর্বাসন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এমন অনেক এলাকা রয়েছে, যেখানে মানুষ বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব অঞ্চলের পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। পুনর্বাসন মানে শুধু একটি ঘর নির্মাণ নয়; এর সঙ্গে জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোও যুক্ত। এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। উপকূলের মানুষকে কেবল দুর্যোগের শিকার হিসেবে দেখা যাবে না। তারা দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। চিংড়ি শিল্প, মৎস্যসম্পদ, কৃষি উৎপাদন এবং সুন্দরবন কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকা-ে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। তাই তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা মানে জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করা। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে ন্যায্য দাবি তুলে ধরছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকেও অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেই অর্থের কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় জনগণের বাস্তব প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও প্রত্যাশিত সুফল সাধারণ মানুষ পায় না। এ ক্ষেত্রে জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় বাজেটের মূল দর্শন হওয়া উচিত কাউকে পেছনে ফেলে না রাখা।
সেই বিবেচনায় উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া ন্যায়সঙ্গত এবং প্রয়োজনীয়। কারণ তারা এমন এক সংকটের মুখোমুখি, যার জন্য তারা নিজেরা দায়ী নয়। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তারা বহন করছে সবচেয়ে বেশি, অথচ এর জন্য তাদের অবদান সবচেয়ে কম। উপকূলের মানুষের চাওয়া খুব বেশি নয়। তারা নিরাপদে ঘুমাতে চায়। একটি ঝড়ের পূর্বাভাস শুনে আতঙ্কিত হতে চায় না। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে চায়। তারা চায়, রাষ্ট্র তাদের দুর্ভোগকে উপলব্ধি করুক এবং উন্নয়নের মূল ধারায় তাদের যথাযথ স্থান দিক। বাংলাদেশের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন উপকূলের মানুষও নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারবে। তাই সময় এসেছে বাজেটে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য বিশেষ ও কার্যকর বরাদ্দ নিশ্চিত করার। দুর্যোগের পর সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন দুর্যোগের আগেই সুরক্ষার ব্যবস্থা। ত্রাণ নয়, প্রয়োজন টেকসই সমাধান। প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন বাস্তবায়ন।জাতীয় বাজেটের পাতায় যদি উপকূলের মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ যথাযথ গুরুত্ব পায়, তাহলে সেটি শুধু একটি অঞ্চলের উন্নয়ন নয়; বরং একটি জলবায়ু-সহনশীল, মানবিক ও টেকসই বাংলাদেশের ভিত্তি নির্মাণ করবে। আর সেটিই হওয়া উচিত আগামী দিনের রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। লেখক: সংবাদকর্মী











