‘মডারেট ইসলাম’ নাকি কুরআন-সুন্নাহর ইসলাম: একজন মুসলিমের অবস্থান কোথায় ?
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহ তাআলার সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত হলো ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ, ভারসাম্যপূর্ণ ও চিরন্তন জীবনব্যবস্থা। এটি কেবল কিছু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয়; বরং মানুষের বিশ্বাস, ইবাদত, নৈতিকতা, পরিবার, অর্থনীতি, সমাজ, বিচার ও রাষ্ট্র পরিচালনাসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহপ্রদত্ত দিকনির্দেশনার সমন্বিত রূপ। তাই ইসলামের পরিচয় নির্ধারিত হবে কেবল কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে; কোনো যুগের রাজনৈতিক অভিধা, সামাজিক প্রবণতা কিংবা বাহ্যিক বিশেষণের মাধ্যমে নয়। মহান আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকেই তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সূরা আল-মায়িদা: ৩)
এই আয়াত ইসলামের পূর্ণতা, পরিপূর্ণতা ও চূড়ান্ততার অকাট্য ঘোষণা। ওহির ধারায় দ্বীনের মৌলিক ভিত্তি সম্পন্ন হয়েছে; ফলে ইসলামের মৌলিক পরিচয়ে নতুন কোনো ধর্মীয় রূপ, সংস্করণ বা বিশেষণ সংযোজনের ভিত্তি কুরআন ও সহিহ সুন্নাহয় পাওয়া যায় না।
সমসাময়িক বাংলাদেশ জামাতে ইসলামী গণমাধ্যমে ও নীতিনির্ধারণী আলোচনায় তারা দাবি করছে যে তারা “মডারেট ইসলামী দল। কিন্তু কুরআন ও হাদিস কিংবা সাহাবায়ে কেরামের যুগের পরিভাষায় ইসলামের এমন কোনো স্বতন্ত্র পরিচয় বা শ্রেণিবিন্যাসের অস্তিত্ব নেই। মুসলমানের পরিচয় একটি তিনি মুসলিম, আর তাঁর জীবনব্যবস্থার নাম ইসলাম।
মহান আল্লাহ বলেন, “তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য কর।” (সূরা আলে ইমরান: ৩২) আরও বলেন, “রাসুল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ কর এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক।” (সূরা আল-হাশর: ৭) এই আয়াতসমূহ স্পষ্টভাবে শিক্ষা দেয় যে, একজন মুসলিমের চূড়ান্ত মানদ- মানুষের মতামত, রাজনৈতিক দর্শন কিংবা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নয়; বরং আল্লাহর কিতাব ও রাসুলুল্লাহ -এর সুন্নাহ। হযরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ বলেছেন: যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কোনো নতুন বিষয় বা কাজ সংযোজন করবে, যা ইসলামের অংশ নয়, তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়; বরং তা প্রত্যাখ্যাত।” অন্য এক হাদিসে তিনি বলেন, “আমি তোমাদের মধ্যে এমন দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যতক্ষণ তোমরা তা দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে, ততক্ষণ কখনো পথভ্রষ্ট হবে না—আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নাহ।” (আল-মুয়াত্তা; আল-মুস্তাদরাক)
এই শিক্ষা থেকেই যুগে যুগে ইসলামী আলেমগণ দ্বীনের মৌলিক বিষয়সমূহে ভিত্তিহীন সংযোজন, বর্জন কিংবা পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন এবং কুরআন-সুন্নাহকেই ইসলামী চিন্তা ও চর্চার একমাত্র নির্ভরযোগ্য মানদ- হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের বক্তব্যে “মডারেট ইসলাম”-এর কথা বারবার বলতেছে, আমার প্রশ্ন হলো ইসলাম কি কোনো নতুন বিশেষণ বা সংস্করণের মুখাপেক্ষী? মুসলমানদের বিশ্বাস, ইসলাম আল্লাহপ্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ দীন। কোরআন ও সুন্নাহর বিধানই ইসলামের একমাত্র মানদ-। পবিত্র কোরআনে সুদকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে, আর ইসলামী অর্থব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে যাকাত ও সুদমুক্ত লেনদেনের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। একইভাবে নারীর পর্দা আল্লাহ তাআলার ফরজ বিধান।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বাস্তবে সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করছে এবং নারীদের অবাধ মেলামেশা ও পর্দার বিধান সম্পর্কেও এমন অবস্থান নিচ্ছে, যা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রাজনৈতিক কর্মকা- যে কোনো দলের অধিকার। তবে ইসলামের নামে রাজনীতি করলে সেই দলের নীতি, বক্তব্য ও কর্মসূচি কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে পর্যালোচিত ও সমালোচিত হওয়াও স্বাভাবিক। ইসলামের পরিচয় রাজনৈতিক কৌশলের ভাষায় নয়; কোরআন ও সুন্নাহর ভাষাতেই হওয়া উচিত। মদিনায় রাসুলুল্লাহ যে আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেখানে ইবাদত, ন্যায়বিচার, অর্থনীতি, পারিবারিক জীবন, সামাজিক দায়িত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনা সবই ছিল আল্লাহর বিধানের অধীন। ইসলামকে কেবল ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই ছিল নববী মিশনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মহান আল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইসলামে পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।” (সূরা আল-বাকারা: ২০৮)। লেখক: গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ সাবেক ছাত্রনেতা ও উদ্যোক্তা







