একজন সাংবাদিকের জীবন ও মৃত্যু/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সকালের পত্রিকায় আমরা খবর পড়ি। টেলিভিশনের পর্দায় দেখি দুর্ঘটনা, দুর্নীতি, নদীভাঙন, নির্বাচন, কৃষকের কান্না কিংবা কোনো শিশুর সাফল্যের গল্প। কিন্তু খুব কম মানুষই ভাবিÑএই খবরটি কে সংগ্রহ করল? কীভাবে করল? কতটা ঝুঁকি নিয়ে করল? সংবাদটি ছাপা হওয়ার আগের গল্পটি সাধারণত অদৃশ্যই থেকে যায়। অথচ সেই অদৃশ্য গল্পের কেন্দ্রে থাকেন একজন সাংবাদিকÑযার জীবন সংগ্রামের, দায়বদ্ধতার, অনিশ্চয়তার এবং প্রায়শই নীরব আত্মত্যাগের। সাংবাদিকতার মূল শক্তি সত্য।
আর সত্যের পথ কখনোই সহজ নয়। একজন সাংবাদিক যখন কলম ধরেন, তখন তিনি কেবল একটি পেশার দায়িত্ব পালন করেন না; তিনি রাষ্ট্র, সমাজ এবং মানুষের কাছে একটি নৈতিক অঙ্গীকার করেন। সেই অঙ্গীকারের মূল্য কখনো চাকরি হারিয়ে, কখনো মামলা মাথায় নিয়ে, কখনো হামলার শিকার হয়ে, আবার কখনো জীবন দিয়েও পরিশোধ করতে হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকদের জীবন আরও কঠিন।
রাজধানীর আলো থেকে দূরে, সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে, প্রায় নামমাত্র সম্মানীতে তারা প্রতিদিন মানুষের কথা তুলে ধরেন। কোথাও নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারানো কৃষকের আর্তনাদ, কোথাও চিংড়িঘেরে বিষপ্রয়োগ, কোথাও বন উজাড়, কোথাও দুর্নীতিÑএসব খবর তারাই প্রথম তুলে আনেন। অথচ তাদের অধিকাংশের নেই নিয়মিত বেতন, স্বাস্থ্যবিমা, জীবনবিমা কিংবা পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষা। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের একজন সাংবাদিকের দিন শুরু হয় ভোরে, শেষ হয় গভীর রাতে। একটি মোটরসাইকেল, একটি ক্যামেরা, একটি মোবাইল ফোন আর সত্যের প্রতি অটল বিশ্বাসÑএই সম্বল নিয়েই তিনি ছুটে বেড়ান।
বর্ষার কাদা, প্রখর রোদ, ঝড়-বৃষ্টি কিংবা গভীর রাতÑকোনো কিছুই তার পথ রোধ করতে পারে না। কারণ তিনি জানেন, তিনি না গেলে হয়তো ঘটনাটি আর কেউ দেখবে না। এই ছুটে চলার পথেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। বাংলাদেশে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। সেই তালিকায় সাংবাদিকও আছেন। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে, কোনো ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ছুটতে গিয়ে কিংবা গভীর রাতে বাড়ি ফেরার পথে অনেক সাংবাদিক দুর্ঘটনার শিকার হন। তাদের মৃত্যু খুব বেশি আলোচিত হয় না।
কয়েক দিন শোক, কিছু স্মৃতিচারণ, তারপর নীরবতা। কিন্তু যে পরিবার একজন উপার্জনক্ষম মানুষকে হারায়, তাদের কাছে সেই শোক সারাজীবনের। এই বাস্তবতার একটি বেদনাদায়ক প্রতীক হয়ে আছেন আশাশুনির সাংবাদিক মু. বাহাবুল হাসনাইন বাবুল। তিনি শুধু একজন সাংবাদিক ছিলেন না; ছিলেন একজন আলোকচিত্রী, উদ্যোক্তা এবং মানুষের আস্থার ঠিকানা। একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার পর জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।
তার মৃত্যু আমাদের শুধু একজন মানুষকে হারানোর বেদনা দেয়নি; মনে করিয়ে দিয়েছে, মফস্বলের সাংবাদিকরা কতটা অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করেন। সাংবাদিকের কাজ শুধু সংবাদ লেখা নয়; সমাজের আয়না হওয়া। যখন কোনো অসহায় মানুষ বিচার পান না, তখন সাংবাদিকের প্রতিবেদন তার পক্ষে কথা বলে। যখন কোনো দুর্নীতি আড়াল করার চেষ্টা হয়, তখন সাংবাদিকের অনুসন্ধান সত্যকে সামনে আনে। যখন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষ অসহায় হয়ে পড়ে, তখন সাংবাদিকের ক্যামেরা রাষ্ট্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি অনেক সময় একা হয়ে পড়েন। আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে অনেকেই মনে করেন, মোবাইল ফোনে ভিডিও করলেই সাংবাদিকতা হয়ে যায়। বাস্তবতা ভিন্ন। প্রকৃত সাংবাদিকতা মানে তথ্য যাচাই, উভয় পক্ষের বক্তব্য নেওয়া, জনস্বার্থ বিবেচনা করা এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা। গুজব ছড়ানো সহজ; সত্য প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। আর সেই কঠিন কাজটিই করেন প্রকৃত সাংবাদিক। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑআমরা কি সাংবাদিকদের প্রাপ্য সম্মান দিই? আমরা কি ভাবি, যিনি আমাদের জন্য ঝুঁকি নেন, তার নিজের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত?
দুর্ঘটনায় আহত হলে তার চিকিৎসার দায়িত্ব কে নেবে? মৃত্যুর পর তার সন্তানের পড়াশোনা কীভাবে চলবে? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।বাংলাদেশে সাংবাদিকদের জন্য একটি শক্তিশালী কল্যাণ তহবিল, বাধ্যতামূলক জীবনবিমা এবং স্বাস্থ্যবিমার ব্যবস্থা সময়ের দাবি। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের নিরাপদ যাতায়াত, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং ন্যায্য সম্মানী নিশ্চিত করা জরুরি। সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোরও উচিত মাঠে কাজ করা সাংবাদিকদের শুধু সংবাদদাতা হিসেবে নয়, প্রতিষ্ঠানের মূল শক্তি হিসেবে মূল্যায়ন করা। সমাজেরও একটি দায়িত্ব রয়েছে।
আমরা প্রায়ই সাংবাদিকদের সমালোচনা করি, কিন্তু তাদের শ্রমকে মূল্যায়ন করি না। ভুল হলে সমালোচনা অবশ্যই হবে, কিন্তু সৎ সাংবাদিকতার প্রতি সম্মানও থাকতে হবে। কারণ একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ছাড়া কোনো গণতান্ত্রিক সমাজ টিকে থাকতে পারে না। একজন সাংবাদিক যখন মৃত্যুবরণ করেন, তখন তার ডেস্কে হয়তো অসমাপ্ত একটি প্রতিবেদন পড়ে থাকে, ক্যামেরায় থেকে যায় কিছু অপ্রকাশিত ছবি, ডায়েরিতে লেখা থাকে নতুন অনুসন্ধানের পরিকল্পনা।
মৃত্যু তার জীবন থামিয়ে দেয়, কিন্তু তার স্বপ্ন থামাতে পারে না। সেই স্বপ্ন বেঁচে থাকে সহকর্মীদের মধ্যে, নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের মধ্যে এবং সমাজের বিবেকের মধ্যে। সত্যিকার অর্থে একজন সাংবাদিকের পরিচয় তার পদবিতে নয়, তার সততায়। তিনি কত বড় প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন, সেটি নয়; তিনি কতটা নির্ভীকভাবে সত্য লিখেছেন, সেটিই ইতিহাস মনে রাখে।আজ যখন আমরা কোনো প্রয়াত সাংবাদিককে স্মরণ করি, তখন শুধু একজন ব্যক্তিকে স্মরণ করি না; আমরা স্মরণ করি একটি মূল্যবোধকে। সেই মূল্যবোধের নামÑসত্য, সাহস, মানবিকতা এবং দায়বদ্ধতা।
সাংবাদিকের মৃত্যু আমাদের কাঁদায়। কিন্তু তার জীবন আমাদের শেখায়Ñসত্যের পথে চলা কখনো সহজ নয়, তবুও সেই পথ ছাড়া সভ্য সমাজের আর কোনো বিকল্প নেই। তাই এখন সময় এসেছে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবার। শোককে নীতিতে, শ্রদ্ধাকে কর্মে এবং স্মৃতিকে দায়িত্বে রূপান্তর করতে হবে। কারণ একটি কলম থেমে গেলে শুধু একজন মানুষ হারিয়ে যান না; সমাজ হারায় তার প্রশ্ন করার সাহস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি এবং সত্যের প্রতি আস্থা। শেষ পর্যন্ত মানুষ নয়, তার কর্মই বেঁচে থাকে।
একজন সৎ সাংবাদিকের কলম হয়তো একদিন থেমে যায়, কিন্তু তার লেখা সমাজের বিবেককে জাগিয়ে রাখে। সংবাদপত্রের হলুদ হয়ে যাওয়া পাতায়, মানুষের স্মৃতিতে এবং ইতিহাসের নীরব অধ্যায়ে তিনি বেঁচে থাকেন। একজন সাংবাদিকের জীবন তাই কেবল পেশার গল্প নয়; এটি দায়িত্ব, ত্যাগ, সাহস এবং মানবিকতার এক অনন্ত কাব্য। আর তার মৃত্যু আমাদের কাছে একটি প্রশ্ন রেখে যায়Ñযারা প্রতিদিন আমাদের জন্য সত্য খুঁজে বেড়ান, তাদের জন্য আমরা কী করেছি?
লেখক: সংবাদকর্মী









