ক্ষণিকের বিকৃত আনন্দ, আজীবনের ধ্বংস/ এম.এম হায়দার আলী
এম.এম হায়দার আলী
পৃথিবীতে একটি শিশুর হাসির চেয়ে পবিত্র আর কিছু নেই। সেই হাসির ভেতর লুকিয়ে থাকে আগামী দিনের স্বপ্ন, একটি পরিবারের আশা, একটি জাতির ভবিষ্যৎ। অথচ মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বিকৃত লালসা যখন সেই নিষ্পাপ শৈশবকে নির্মম ভাবে ছিন্নভিন্ন করে দেয়, তখন শুধু একটি শিশু নয়, রক্তাক্ত হয় মানবতা, আহত হয় সভ্যতা, কেঁদে ওঠে একটি জাতির বিবেক।
সম্প্রতি দেশের বহুল আলোচিত শিশু শিক্ষার্থী রামিসা হত্যা মামলায় বিচারিক ইতিহাসে খুব স্বল্প দিনেই সংশ্লিষ্ট আদালতের বিজ্ঞ বিচারক ঘাতক স্বামী ও তার পাপের সঙ্গী হিসেবে, সমাজের আরো ১০জন নারীর মতো আপনজন ছেড়ে একটু সুখ-শান্তির আশায় স্বামীর সংসারে আসা স্ত্রীর বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে। আইন তার কাজ করেছে।
ন্যায় বিচারের পাল্লা ভারী হয়েছে। কিন্তু আদালতের এই রায় কি ফিরিয়ে দিতে পারবে সেই শিশুর হারিয়ে যাওয়া নির্ভাবনাময় শৈশব? মুছে দিতে পারবে তার আতঙ্কে ভরা রাতগুলো? শুকিয়ে যাওয়া চোখের জল কি আবার শিশুসুলভ হাসিতে রূপ নেবে? একই সাথে আরো একটি প্রশ্নও আমাদের তাড়া করে,ক্ষণিকের বিকৃত আনন্দের জন্য সেই যুবক কী পেল? যে মানুষটি কয়েক মুহূর্তের লালসার কাছে নিজের বিবেক, মানবতা ও বিবেচনাবোধ বিসর্জন দিয়েছিল, আজ সে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি। তার সামনে অন্ধকার, পেছনে অনুশোচনা। হয়তো কারাগারের নির্জন কক্ষে বসে আজ সে বুঝতে পারছে, কয়েক মুহূর্তের বিকৃত কামনা একটি জীবন নয়, বহু জীবনকে ধ্বংস করে দিতে পারে। কিন্তু সেই উপলব্ধি আর কোনো জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে না।
আজ হয়তো তার মা প্রতিটি রাতে ছেলের মুখটি মনে করে নীরবে কাঁদছেন। বাবা সমাজের মানুষের চোখ এড়িয়ে চলছেন। ভাই-বোনেরা পরিচয় দিতে সংকোচ বোধ করছে। একটি অপরাধের বোঝা পুরো পরিবারকে সারাজীবন বহন করতে হচ্ছে। তারা অপরাধী নয়, তবুও শাস্তির ভার তাদের কাঁধেও এসে পড়েছে। কিন্তু সবচেয়ে গভীর ক্ষত বহন করছে সেই শিশু এবং তার পরিবার। যে শিশুটি একদিন নিশ্চিন্তে খেলত, হাসত, স্বপ্ন দেখত, সে হয়তো আজ মানুষের মুখ দেখতেও ভয় পায়।
তার মায়ের বুকের ভেতর প্রতিদিন নতুন করে রক্তক্ষরণ হয়। কোনো আদালতের রায়, কোনো কঠোর শাস্তি, কোনো ফাঁসির দড়ি সেই মায়ের বুকের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। আমরা প্রায়ই কঠোর শাস্তির দাবি তুলি, এবং কঠোর শাস্তি অবশ্যই অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধুই শাস্তি কি যথেষ্ট? যদি আমাদের পরিবারে নৈতিক শিক্ষা না থাকে, যদি সন্তানদের মানবিকতা শেখানো না হয়, যদি সমাজ নীরব থাকে, যদি মাদক, অশ্লীলতা ও নৈতিক অবক্ষয় অবাধে ছড়িয়ে পড়ে, তবে নতুন অপরাধী তৈরি হতে সময় লাগবে না। একটি শিশু শুধু একটি পরিবারের সন্তান নয়; সে পুরো সমাজের দায়িত্ব।
তাই শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু পুলিশের, আদালতের কিংবা সরকারের কাজ নয়,এটি আমাদের প্রত্যেকের নৈতিক দায়িত্ব। পরিবারে মূল্যবোধের শিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানবিক চরিত্র গঠন, ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসনের চর্চা, দ্রুত বিচার এবং অপরাধের বিরুদ্ধে আপোষহীন সামাজিক অবস্থান, এসব একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলেই পরিবর্তনের পথ তৈরি হবে। মনে রাখতে হবে, একটি ধর্ষণ কেবল একজন মানুষের শরীরকে আঘাত করে না; এটি ভেঙে দেয় বিশ্বাস, হত্যা করে শৈশব, আহত করে মানবিকতা।
আর একটি বিকৃত সিদ্ধান্ত কেবল একজন অপরাধীর জীবন শেষ করে না; কান্নায় ভাসিয়ে দেয় দুটি পরিবার, লজ্জায় নত করে একটি সমাজকে। তাই আসুন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে কোনো শিশুর কান্না আর বিচার চেয়ে আদালতের দরজায় পৌঁছাবে না, যেখানে প্রতিটি শিশু নির্ভয়ে খেলবে, হাসবে, বড় হবে। কারণ একটি শিশুর নিরাপদ শৈশবই একটি সভ্য, মানবিক ও আলোকিত জাতির সবচেয়ে বড় পরিচয় বলে আমার এমনটি মনে হয়।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট









