মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩

ড. ইউনূসকে করের ৬৬৬ কোটি টাকা দিতে বলা হাইকোর্টের রায় প্রকাশ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:৩৪ অপরাহ্ণ
ড. ইউনূসকে করের ৬৬৬ কোটি টাকা দিতে বলা হাইকোর্টের রায় প্রকাশ

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধ করতে বলা হাইকোর্টের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট।

সোমবার (১২ অক্টোবর) বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের স্বাক্ষরের পর ১৫ ও ৩২ পৃষ্ঠার পৃথক রায় দুটি প্রকাশিত হয়েছে।

এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধ করতে হবে বলে রায় দেন হাইকোর্ট। এ সংক্রান্ত রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারিকৃত রুল খারিজ করে বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।

আদালতে ড. ইউনূসের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন ও ব্যারিস্টার ফিদা এম কামাল।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৪ অক্টোবর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা দেওয়ার রায় স্বতঃপ্রণোদিতভাবে প্রত্যাহার করে নেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় প্রত্যাহার করেন। একইসঙ্গে প্রধান বিচারপতির কাছে এ মামলার নথি পাঠানো হয়।

পরে নতুন বেঞ্চে মামলাটি শুনানির জন্য পাঠানো হয়। পুনর্মূল্যায়নের পর ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭—এই করবর্ষের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের কাছে প্রদেয় কর দাবি ঘিরে গ্রামীণ কল্যাণ ২০১৭ সালে পৃথক দুটি রিট দায়ের করা হয়। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে আদালত রায় রুল দেন। সে রুল খারিজ করে রায় ঘোষণা করলেন হাইকোর্টের নতুন এ বেঞ্চ।

ফলে রিট খারিজ হওয়ায় আয়কর বাবদ গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে ওই অর্থ আদায় করতে পারবে এনবিআর—বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

Ads small one

বেঁচে থাকার তাগিদে নিঃসন্তান নাছিমার সংগ্রাম

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩৫ অপরাহ্ণ
বেঁচে থাকার তাগিদে নিঃসন্তান নাছিমার সংগ্রাম

আজহারুল ইসলাম সাদী: একজন বিধবা নারীর সামাজিক প্রতিকূলতা, একাকীত্ব ও পরিবার সামলানোর নিরন্তর লড়াইয়ের গল্প আমাদের সমাজে বিরল নয়। প্রিয়জনকে হারানোর শোকের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা যুক্ত হলে সেই সংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে ওঠে। আর নারীটি যদি হন নিঃসন্তান, তবে তাঁর মানসিক ও সামাজিক দুঃখ- দুর্দশা যেন সব সীমা ছাড়িয়ে যায়।

সন্তানহীন বিধবা নারীদের জীবনসংগ্রাম আমাদের সমাজের এক রূঢ় বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা নির্দিষ্ট দক্ষতা না থাকায় তাঁদের অধিকাংশকেই দিনমজুরি, গৃহপরিচারিকার কাজ কিংবা ছোটখাটো ব্যবসার মতো স্বল্প আয়ের পথ বেছে নিতে হয়। ধর্মীয় ও উত্তরাধিকার আইনের নানা জটিলতায় সন্তান না থাকায় অনেকেই স্বামীর সম্পত্তির পূর্ণ অধিকার থেকে বঞ্চিত হন; আত্মীয়দের অনাদরে অনেককে ভিটেমাটি ত্যাগ করতে হয়। অসুস্থ হলে দেখাশোনা বা চিকিৎসার খরচ জোগানোর মতোও কেউ থাকে না।

এমনই এক সংগ্রামমুখর জীবনের মুখোমুখি সাতক্ষীরা শহরের কাটিয়া এলাকার নবনূর প্রাথমিক বিদ্যালয় ও জেলা কারাগারের মধ্যবর্তী স্থানে বসবাসকারী মধ্যবয়সী নারী নাছিমা খাতুন।
ছয় ভাই ও ছয় বোনের মধ্যে অন্য বোনদের মতো নাছিমারও বিয়ে হয়েছিল। তাঁর একটি সন্তান হলেও অল্প বয়সেই সে মারা যায়। পরবর্তীতে স্বামীকেও হারান তিনি। নিমিষেই নিঃসঙ্গ ও বিধবা হয়ে পড়েন নাছিমা।

বর্তমানে বয়োবৃদ্ধ বিধবা মাকে নিয়ে আলাদা বসবাস করছেন মধ্যবয়সী নাছিমা। সংসার চালানো ও মায়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে প্রতিদিন সংগ্রাম করতে হচ্ছে তাঁকে। জীবনধারনের তাগিদে তিনি একটি ভ্যানগাড়িতে ভ্রাম্যমাণ দোকান তৈরি করেছেন। শহরের সন্ধ্যার মিল বাজারে সেই ভ্যানে বিভিন্ন ধরনের ভাজাপোড়া খাবার বিক্রি করেন। এ ছাড়া কাটিয়া এলাকার খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির একটি ডিলারের বিক্রয়কেন্দ্রেও কাজ করেন তিনি। এ দুটি কাজ থেকে অর্জিত সামান্য আয় দিয়েই চলে মা-মেয়ের সংসার।

তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে সংসার চালানো এবং মায়ের শারীরিক নানা জটিলতার কারণে নিয়মিত ওষুধ কিনতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে নাছিমাকে। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে বিধবা জীবনযাপন করলেও এখন পর্যন্ত তাঁর ভাগ্যে জোটেনি একটি বিধবা ভাতার কার্ড।

নাছিমা খাতুনের মতো সমাজের এমন প্রান্তিক ও অসচ্ছল নারীদের সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দিতে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

 

বিশ্ব মান দিবস: মানসম্মত উৎপাদন, নিরাপদ ব্যবহার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩৩ অপরাহ্ণ
বিশ্ব মান দিবস: মানসম্মত উৎপাদন, নিরাপদ ব্যবহার

সাকিবুর রহমান বাবলা

প্রতিবছর ১৪ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব মান দিবস। পণ্য ও সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়নে মানদ-ের গুরুত্ব তুলে ধরাই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য। আধুনিক বিশ্বে উৎপাদন, প্রযুক্তি, যোগাযোগ, জ্বালানি ও পরিবেশ সুরক্ষাসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক মানের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

বিশ্ব মান দিবসের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও প্রমিতকরণ ব্যবস্থার বিকাশ। ১৯৪৬ সালের ১৪ অক্টোবর লন্ডনে ২৫টি দেশের প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণের জন্য একটি সমন্বিত সংস্থা গঠনের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছান। সেই ঐতিহাসিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক মান সংস্থাÑআইএসও। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক মানের গুরুত্ব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বাড়াতে ১৯৭০ সাল থেকে ১৪ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব মান দিবস পালন শুরু হয়।

বর্তমানে বিশ্বের তিনটি প্রধান আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণকারী সংস্থাÑআন্তর্জাতিক মান সংস্থা, আন্তর্জাতিক ইলেক্ট্রোটেকনিক্যাল কমিশন এবং আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নÑযৌথভাবে দিবসটি উদযাপন করে। বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক মান প্রণীত হয়। তাঁদের এই অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং মানভিত্তিক উন্নয়নের গুরুত্ব তুলে ধরা দিবসটির অন্যতম তাৎপর্য।

মান বা স্ট্যান্ডার্ড বলতে কোনো পণ্য, সেবা, প্রক্রিয়া কিংবা ব্যবস্থার গুণগত বৈশিষ্ট্য, নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নির্ধারণের স্বীকৃত মানদ-কে বোঝায়। একটি পণ্য দেখতে আকর্ষণীয় হলেই তা মানসম্মত হয় না; সেটি নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, কার্যকর এবং নির্ধারিত গুণগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের ফলে বিভিন্ন দেশের উৎপাদক ও সেবাদাতারা অভিন্ন প্রযুক্তিগত নির্দেশনা মেনে কাজ করতে পারেন। এতে পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখা, উৎপাদন ব্যয় ও অপচয় কমানো, প্রযুক্তিগত সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে নি¤œমানের বা অনিরাপদ পণ্যের কারণে ভোক্তাদের ক্ষতির ঝুঁকি কমে। ফলে মানদ- শুধু শিল্প ও বাণিজ্যের বিষয় নয়; এটি জননিরাপত্তা, ভোক্তা অধিকার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

বিশ্বে মানসম্মত ও উচ্চমানের পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে জার্মানি বিশেষভাবে পরিচিত। বৈশ্বিক সমীক্ষা, যেমন মেড ইন কান্ট্রি ইনডেক্স অনুযায়ী, ‘মেড ইন জার্মান’ লেবেলটি গুণগত মান, স্থায়িত্ব ও নির্ভরযোগ্যতার জন্য বিশ্বজুড়ে সুনাম অর্জন করেছে। এ ছাড়া, সুইজারল্যান্ড ঘড়ি, চকলেট, ওষুধ ও সূক্ষ্ম প্রকৌশলবিদ্যা; জাপান উন্নত প্রযুক্তি, গাড়ি ও ইলেকট্রনিক্স; এবং যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও মহাকাশ গবেষণার সরঞ্জামের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। তবে পণ্যের মান সংশ্লিষ্ট পণ্য, প্রস্তুতকারক ও মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপরও নির্ভরশীল।

আন্তর্জাতিক মান প্রণয়নে বিশেষজ্ঞদের স্বেচ্ছাসেবী অবদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের জ্ঞান, গবেষণা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তৈরি মানদ- বিভিন্ন দেশের মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতা বাড়ায়। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতা হ্রাস পায় এবং পণ্য ও সেবার গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়।

২০২৬ সালে দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য ‘উন্নত বিশ্বের জন্য সম্মিলিত অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি’। এবারের বিশেষ গুরুত্ব জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৭Ñসাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি। পরিচ্ছন্ন ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির নিরাপদ, দক্ষ ও সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মানদ- অপরিহার্য। এসব মান জ্বালানি অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতা, প্রযুক্তিগত সামঞ্জস্য ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা বাড়ায় এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, পরিবেশদূষণ হ্রাস ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, শিল্পায়ন, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পণ্যের মান নির্ধারণ, পরীক্ষণ, সনদ প্রদান এবং মানসম্পর্কিত সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দেশের মান অবকাঠামোকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করে। অন্যদিকে ভেজাল পণ্য প্রতিরোধ বা আধুনিক ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
তবে মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব কেবল নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের নয়। উৎপাদককে মানসম্মত পণ্য তৈরি করতে হবে, ব্যবসায়ীকে সঠিক তথ্য দিতে হবে, ভোক্তাকে সচেতনভাবে পণ্য নির্বাচন করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে মানদ-ের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রসারে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ এবং পরীক্ষণব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

বিশ্ব মান দিবসের তাৎপর্য তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানসম্মত উৎপাদন, নিরাপদ ভোগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং টেকসই উন্নয়নের অঙ্গীকারকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্যের আলোকে আন্তর্জাতিক মানের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রসার, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্য অর্জন আরও বাস্তবসম্মত হবে। সম্মিলিত উদ্যোগ, দায়িত্বশীল উৎপাদন ও মানভিত্তিক উন্নয়নের মাধ্যমেই গড়ে উঠতে পারে নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও টেকসই বিশ্ব।

 

মাইকেলের বর্ণাঢ্য জীবন নিয়ে কয়েক পংক্তি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:২১ অপরাহ্ণ
মাইকেলের বর্ণাঢ্য জীবন নিয়ে কয়েক পংক্তি

জিএম এমদাদ

উনিশ শতকের বাংলায় জন্মে ছিলেন বহু খ্যাতিমান বাঙ্গালী- তাদের কেউ, দেশকে এগিয়ে দিয়েছেন আধুনিকতার পথে, কেউ এগিয়ে দিয়েছেন বাংলাভাষা এবং সাহিত্যকে, কেউ সূত্রপাত করেছে ধর্ম সংস্কারের, কেউবা সংগীত এবং পর্যটনকে এগিয়ে দিয়ে আজও অমর হয়ে আছেন কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে মাইকেল মধুসূদন দত্তের মতো বর্ণাঢ্য চরিত্রের আর কেউই ছিলেন না। যে তার একটি রচনাও পড়েনি, সেও শুনেছে তার নাম। বনফুলের নাটকে অথবা প্রমথনাথ বিশীর মাইকেল জবিনের রুপরেখায় যে মাইকেলকে আমরা দেখি, সত্যি বলতে কি তা আমাদের অবাকই করে।

যে মাইকেল বাঙ্গালী হয়ে বাংলা ভুলে যান, ইংরেজীতে কবিতা লেখেন; যে মাইকেল একই সঙ্গে ডিকটেশন দেন, তিনটি কাব্যের, যে মাইকেল এক মোহর দিয়ে চুল ছাঁটিয়ে গর্ব করেন; যে মাইকেল স্ব-সমাজ ত্যাগ করে খ্রীষ্ট ধর্ম গ্রহণ করে; যে মাইকেল ব্যারিষ্টার হয়ে আয় করেন প্রচুর, কিন্তু ব্যয় করেন তার চেয়েও বেশি, যে মাইকেল দু’দু’জন ইংরেজ নারীর সঙ্গে প্রেম করে তাদের বিয়ে করেন; যে মাইকেল নিজে মাতাল হন ও অন্যকে মাতাল করেন; যে মাইকেল একই সঙ্গে মহাকাব্য লেখেন, সনেট লেখেন, নাটক লেখেন, একেবারে নতুন ছন্দ নির্মাণ করেন। জানা যায়, মাইকেলের পিতা আদৌ এটা চাননি যে, ধর্ম্ম যাজক হওয়ার শর্তে মাইকেল বিশপস্ কলেজে ভর্তি হন। তাই তিনি সেখানে পুত্রকে ভর্তি করান মাসে ৬৬ টাকা বেতন দেওয়ার অঙ্গীকার করে।

 

দিয়েও ছিলেন প্রায় তিন বছর। আশাছিল প্রায়চিত্ত করে পুত্র একদিন ফিরে আসতে পারে হিন্দু ধর্মের পরিধিতে কিন্তু পুত্র হিন্দু ধর্মের তুলনায় খ্রীষ্ট ধর্ম্মের এমন কিছু উদারাতা ও আধুনিকতা লক্ষ্য করেছিলেন যে, খ্রীষ্ট ধর্মকে শ্রেষ্ট বলে বিশ্বাস করেছিলেন। তাছাড়া তিনি খ্রীষ্ট ধর্ম ও ইউরোপীয় সভ্যতাকে সম্ভবত এক করে দেখে ছিলেন। ফলে তিনি আর হিন্দু ধর্মে ফিরে আসার কথা ভাবেননি। এতে পিতা তাকে সম্পত্তিচ্যুত করার ভয় দেখান কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়নি।

 

১৮৪৭ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে পিতা-পুত্রের বিরোধ এমনই দানা বাঁধল যে, রাজ নারায়ন পুত্রকে টাকা দেওয়া বন্ধ করলেন এবং মাইকেলের বিশপস্ কলেজের ত্যাগ করতে পারতেন কিন্তু অসময়ে কলেজ ছাড়তে হলো বলে অতঃপর তিনি চাকরীর আশায় কলকাতায় নয়, ধারে কাছের কোন জায়গাতেও নয়, যাত্রা করলেন একেবারে সুদূর মাদ্রাজে ১৮৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে। মাইকেলের বন্ধু ভাগ্যও ভালো ছিল। বেশ কয়েকজন বন্ধু ছিলেন তাঁর। তাঁদের সঙ্গে মাইকেলের সম্পর্ক ছিল গলায় গলায় কিন্তু তার স্বভাব এমন ছিলনা যে, তিনি কাউকে পরিবার বা হাঁড়ির খবর বললেন। তাছাড়া স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে যখন তার পারিবারিক জীবন গড়ে ওঠে। সেই গুরুত্বপূর্ণ সময়ের ১২ বছর তিনি কাটিয়েছেন বন্ধুদের দৃষ্টি সীমার অনেক দূরে মাদ্রাজে ও ইউরোপে।

 

মাইকেলের বাবা-মা মাঝ বয়সেই মারা যান। মধু সূদনের কোন ভাই-বোন ছিলনা। তার পিতৃকূলের আত্মীয়রা বসবাস করতেন যশোরের সাগরদাঁড়ি গ্রামে। আর পিতা মাতার সঙ্গে তিনি বাস করতেন কলকাতায়। তার উপর তিনি মাত্র ১৯ বছর বয়সে খ্রীষ্টান হলেন তখন তার পরিবার এবং আত্মীয় স্বজন এমনকি সমাজ থেকে তিনি ছিটকে পড়লেন অনেক দূরে। তাছাড়া ২৪ থেকে ৩২ বছর বয়স অবধি তিনি দৈহিকভাবেও বাস করেন বন্ধু বান্ধব এবং সমাজ থেকে অনেক দূরে মাদ্রাজে। সেই মাদ্রাজেই জীবনের প্রথম চাকরি করেন। প্রেম করে বিয়ে করেন। সেখানেই জন্ম নেয় তার চার সন্তান। সেই সন্তান ও তাদের মায়ের সাথে মাইকেলের সম্পর্ক ও ছিন্ন হয় এই মাদ্রাজে।

 

এখানেই গড়ে উঠে তার বিবাহ বহির্ভূত প্রণয় সম্পর্ক। মাদ্রাজ ছাড়া তিনি ইউরোপেও বাস করেন সাড়ে চার বছর। সে জন্য সাহিত্যের কারণে তিনি বিখ্যাত লোক হলেও তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন খুব কম লোকেই, এবং সে জন্য সবার কাছে ব্যক্তি তিনি ছিলেন কমবেশি অপরিচিত। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন, নদী সামনের দিকে সোজা চলতে চলতে হঠাৎ বাঁক নেয় তখন সেই বাঁকটাকেই বলতে হয মর্ডান। বাংলায় বলা যাক আধুনিক। এই আধুনিকতা সময় নং, বরং মর্জি নিয়ে।

জীবনানন্দ দাশের মতেও এই মর্জিটাই আসল। তিনি আধুনিকতাকে গন্ডিবদ্ধ না করে এর আপেক্ষিকতা স্বীকার করে নিয়েছেন। কারণ এক অর্থে আধুনিক শব্দটাই আপেক্ষিক। একে অতিক্রম করেই জীবনানন্দ দাশ উচ্চারণ করেন; বাংলা কাব্যে বা কোন দেশের কাব্যে আধুনিকতা শুধু জীবনানন্দ দদ দাশ উচ্চারণ করেন; বাংলা কাব্যে বা কোন দেশের কাব্যে আধুনিকতা শুধু আজকের কবিতায় আছে, অন্যত্র নয়-এ কথা ঠিক নয়। এ বিচার বিশ্লেষণেও মধুসুধন আধুনিক। বস্তুতঃপ্রতি যুগেই নতুন কবিকে পরনো ঐতিহ্যের বিরুদ্ধ্যে বিদ্রোহ করতে হয় সন্ধ্যান করতে হয় নতুন পথের, এবং নতুন ঐতিহ্য গড়ে তোলার।

 

বলা বাহুল্য মধুসূদনের একটা বড় গুণ বা বৈশিষ্ট ছিল কেবল খাওয়া দাওয়া ও আচার আচরণে সীমাবদ্ধ, কিন্তু দাতের খোশামোদ করা তিনি একেবারেই বরদাস্ত করতে পারতেন। ইংরেজদের অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে ও তিনি সরাসরি প্রতিবাদ করতেন। রেখে ঢেকে কোন কথা বলতেন না। একটা ঘটনার কথা বলি, বিশপস কলেজে একটা নিয়ম ছিল ইংরেজ ছাত্ররা এক রকম চাকানো টুপি পরতেন, যাকে কলেজ ক্যাপ বলা হত। দেশী ছাত্রদের জন্যে কিন্তু ঐ ধরনের টুপি যাবহার নিষিদ্ধদ ছিল। মধু-সুখন এই নিষেধ মানলেন না বরং তার জবাব ছিল একই কলেজের ছাত্রদের দই নিয়ম কিছুতেই চলতে পারে না।

 

দেশী হোক বিদেশী হোক একই ধরনের পোষাক সবাই ব্যবহার করবে। এই পর্যন্তই ছিল মধু সূদনের সামাজিক আচরণগত বিদ্রোহ। শিক্ষকতা ছাড়া সাংবাদিকতাও করেছিলেন মাইকেলমধু সূদন। পত্রিকার সঙ্গে তার প্রথম যোগাযোগ কবিতা প্রকাশের উদ্দ্যেশে। এ যোগাযোগ ঘটেছিল ম্যাড্রাস সার্কুলেটরের সঙ্গে কিন্তু সাংবাদিকতায় তিনি জড়িয়ে পড়েন ভিন্ন পথে। মাইকেল তার প্রথম কাব্য’ক্যাপটিড’ লেডি’ জপিয়ে দেনার দায়ে জড়িয়ে পড়েছিলেন। গৌর দাস বসাককে লেখা একাধিক চিঠিতে তিনি তা উল্লেখ করেছেন। তার এই চটি বইটি ছেপে দিয়েছিলেন যিনি তার নাম অ্যাবেল গেন সিনকিন্স। মাইকেলের কাছে প্রাপ্য দেশদু’শ টাকার জন্য সিমকিলের ব্যবসা লাটে উঠার অবস্থা হয়নি কারণ তার একটি নয়, তিন তিনটে প্রেস ছিল মাদ্রাজ নগরীতে। তাছাড়া তিনি একাধিক সাপ্তাহিক পত্রিকারও মালিক ছিলেন কিন্তু সফল ব্যবসায়ী হিসাবে তিনি পাওনা আদায়ের ব্যাপারে পারদর্শী ছিলেন। সিমকিন্স ‘ইউরোশিয়ান’ নামে একটা নতুন পত্রিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। তখনসে দায়িত্ব পান মাইকেল মধুসূদন।

 

সেই থেকেই সাংবাদিকতায় মাইকেলের হাতে খড়ি। তার চমৎকার নাটিকা ‘রিজিয়া’ তিনি লিখতে শুরু করেছিলেন। এই প্রত্রিকা পাতায়। কৃতিত্বের সাথে প্রায় এক বছর ইউরেশিয়ান পত্রিকা সম্পাদনা করার পর মাইকেল ম্যাড্রাস ক্রনিকেল এর-এবা সম্পাদক নিযুক্ত হন। প্রায় আড়াই বছর তিনি এই পত্রিকার সম্পাদনা করেন। এছাড়া তিনি ১৮৫৫ সালের এপ্রিল থেকে মাদ্রাজের প্রথম দৈনিক ‘স্পেক্টেটর’ পত্রিকার দেশীয় সম্পাদক নিযুক্ত হন। সে পত্রিকা পরিচালনা করতে গিয়েও তিনি যথেষ্ট কৃতিত্ব দেখান। পিতার মৃত্যুর প্রায় এক বছরপর মাইকেল সে খবর পেয়েছিলেন বসাকের চিঠি থেকে। অনেকদিন যোগাযোগ না থাকায় গৌরদাস জানতেন না মাইকেলের ঠিকানা। তাই চিঠিটি তিনি পাঠিয়েছিলেন কৃষ্ণ মোহন বন্দোপদ্যায়ের হাত দিয়ে।

 

চিঠিটি পড়ে মাইকেল জানতে পারেন যে, তার আত্মীয়রা মিলে তার পৈত্রিক সম্পত্তি দখল করার জন্য লড়াই করছেন কিন্তু কবি সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন না। তার কারণ প্রধানত অর্থনৈতিক। মাদ্রাজ থেকে কলকাতায় যাওয়া রিতিমতো খরচের ব্যাপার পরিবারের খরচ ও কলকাতায় তার নিজের খরচ তাও তাকেই বহন করতে হবে। কলকাতায় গিয়ে সম্পত্তিটা বিক্রি করে দিলে এই তাবৎ ব্যয় উঠে আসবে কিনা কে জানে। ভেবে চিন্তে তাও তিনি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। মধু সূদন সম্ভবত ভেবে ছলেন মাত্র কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের জন্য যাবেন সেখানে কিন্তু কার্যকালে সেটা এতই দীর্ঘ হয়েছিল যে, তার ভাগ্যে আর মাদ্রাজে ফিরে আসা হয়নি। সেখানে তার ভাষায় চমৎকার ইংরেজ স্ত্রী এবং চারটি সন্তান থাকা স্বত্তেও।

মাইকেল যে কয়েক বছর ধরে হেনরিয়েটার সঙ্গে গোপন প্রণয়, সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন সে খবর এসময় জানাজানি হয়ে যায়। যা হোক রেবেকাকে নিয়ে মাদ্রাজে যে, সুখী পরিবার কবি গতে তুলেছিলেন সে খবর এসময় জানাজানি হয়ে যায়। তার গোপন প্রণয়ের খবর এসময় তা ভেঙ্গে তছনছ হয়ে যায়। কলকাতায় এসে বছর আড়াই অপেক্ষা করার পরও যখন সে সম্পর্ক জোড়া লাগানোর তখন মাইকেল ঘর বাঁধার জন্য কলকাতায় আসার আহবান জানালেন হেনরিয়েটাকে। অতঃপর ১৫ বছর তারা স্বামী স্ত্রী হেনরিয়েটা মারা যান স্বয়ং মাইকেল মারা যাওয়ার তিনদিন আগে।

লেখক : জি, এম, এমদাদ, শিক্ষক, কলামিস্ট, গীতিকার , কপিলমুনি-৯২/৮২, খুলনা