শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩

তালায় ৮ দলীয় ফুটবল টুর্ণামেন্ট প্রথম রাউন্ডের শেষ খেলায় অনুষ্ঠিত

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৯:৪৯ অপরাহ্ণ
তালায় ৮ দলীয় ফুটবল টুর্ণামেন্ট প্রথম রাউন্ডের শেষ খেলায় অনুষ্ঠিত

তালা প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার তালায় হাজরাকাটি আদর্শ যুব সংঘের ৮ দলিয় ফুটবল টুর্ণামেন্টর প্রথম রাউন্ডের শেষ খেলা অনুষ্টিত হয়েছে। শক্রবার (২৪ এপ্রিল) বিকালে তালা উপজেলার খলিলনগর ইউনিয়নের হাজরাকাটি আদর্শ যুব সংঘের আয়োজনে হাজরাকাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে খেলা অনুষ্টিত হয়।

খেলায় কৈয়ে ফুটবল একাডেমি খুলনা ও খেজুরবুনিয়া আদর্শ যুব সংঘ ফুটবল একাদশ তালা খেলায় অংশগ্রহণ করে। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, তরুণ সমাজ সেবক গাজী মোহাম্মদ উজ্জ্বল হোসাইন। হাজরাকাটি আদর্শ যুব সংঘের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক জাহাঙ্গীর হাসানের সভাপতিত্বে ও মাষ্টার অলিউর বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, তালা প্রেসক্লাবের প্রচার সম্পাদক সেকেন্দার আবু জাফর বাবু, সাবেক ফুটবলার আরিফুল সরদার, কাশেম মোড়ল, হালিম শেখ, মোস্তাক মোড়ল প্রমুখ।

 

খেলা পরিচালনা করেন, শেখ আলাউদ্দিন, সহকারী হিসেবে ছিলেন ওহিদ বিশ্বাস, সুমন গাজী। টুর্নামেন্ট খেলার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ঈজ৭ খ্যাত ফুটবলার সৈকত রহমান শিমুল। খেলায় কৈয়ে ফুটবল একাডেমি খুলনা ১-১ খেজুরবুনিয়া আদর্শ যুব সংঘ ফুটবল একাদশ গোলে ড্ররা করে। ট্রাইবেকারে খেলায় খেজুরবুনিয়া আদর্শ যুব সংঘ ফুটবল একাদশ তালা ২-০ গোলে কৈয়ে ফুটবল একাডেমি খুলনাকে পরাজিত করে বিজয় লাভ করেন।

Ads small one

গীতাঞ্জলির সুরে আজও বাজে সেই অমৃত বাণী

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ণ
গীতাঞ্জলির সুরে আজও বাজে সেই অমৃত বাণী

অরুণ সান্যাল
শ্রাবণ আকাশ আজ বরিষণে ম্লান হয়ে আসে
তোমার প্রয়াণলগ্নে মন মোর বিষাদে ভাসে!
বাইশে শ্রাবণের ধারা ঝরে পড়ে অবিরল পাতার মায়ায়,
তুমি চলে গেছ বহু দূরে, তবু আছ অন্তরের গহনায়।
তোমার লেখনীতে
ফুটে উঠত বাংলার মাটি আর সুজলা-সুফলা নদী,
আজো তোমাকেই স্মরণ করি প্রতি ক্ষণে, প্রতিপদী।
“সোনার তরী” বেয়ে তুমি চলে গেলে চিরকালের তরে
তোমার অভাব আজও মোরা অনুভব করি অন্তরে।
গীতাঞ্জলির সুরে আজও বাজে সেই অমৃত বাণী,
তোমার কীর্তিগাথা গাইছে মোদের প্রতিটি তরুণ প্রাণী।
রক্তকরবীর আলোয়
আজও খুঁজে ফিরি মুক্তির ঠিকানা,
তোমার ভাবের রাজ্যে নেই তো কোনো সীমানা।
তুমি তো শুধু কবি নও, তুমি বাঙালির প্রাণ,
তোমার স্মরণে আজ হৃদয়ে বেজে ওঠে বিষাদের গান!
পঁচাশির শ্রাবণ দিনে নিভেছিল তোমার নশ্বর প্রদীপ,
তোমার অমর বাণী
আজও জ্বলে হৃদয়ে, উজ্জ্বল প্রদীপ্ত দ্বীপ।
হে বিশ্বকবি,
তোমার চরণে জানাই মোর শত কোটি প্রণাম,
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে
চিরদিন অমর থাকবে তোমার নাম।

প্রবন্ধ/বাংলা সাহিত্যে মহররম ও কারবালা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৩৩ পূর্বাহ্ণ
প্রবন্ধ/বাংলা সাহিত্যে মহররম ও কারবালা

নূরুজ্জামান দিশারী
হিজরি সনের সূচনা-মাস মুহাররম। এটি ইসলামের চারটি মহিমান্বিত ও সম্মানিত মাসের অন্যতম। ইতিহাসের দীর্ঘ পরিসরে এ মাস এক গভীর তাৎপর্য ও মর্মস্পর্শী স্মৃতির ভার বহন করে চলেছে। এর বুকে অঙ্কিত হয়েছে সত্য ও মিথ্যার চিরন্তন সংঘাতের এক জাজ্বল্যমান দলিল। ৬১ হিজরি সনের ১০ মহররম (১০ অক্টোবর ৬৮০ খ্রি.) ফোরাতের তীরে কারবালার প্রান্তরে সংঘটিত হয়েছিল এক হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি। ক্ষমতার মোহে অন্ধ, নিষ্ঠুর ইয়াযীদ বাহিনীর নির্মম আঘাতে শাহাদাত বরণ করেন প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর আদরের নাতি, জান্নাতের যুবকদের নেতা ইমাম হোসাইন (রা.)। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর নিষ্ঠাবান ৭২ জন সঙ্গী- যারা অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে, সত্যের পতাকা সমুন্নত রাখতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। এ বিয়োগান্ত ঘটনায় শোককাতর হয় না এমন মুসলমান নেই বললেই চলে। দল-মত, দেশ-ভাষা, বর্ণ, গোত্র, মাযহাব, তরিকা নির্বিশেষে সকল ঈমানদার মুসলমান- যাদের হৃদয়ে আল্লাহর রাসূল (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতের প্রতি বিন্দুমাত্র ভালোবাসা রয়েছে, তার পক্ষে কারবালার এই বিয়োগান্ত দৃশ্য উপেক্ষা করা অসম্ভব।
কারবালার প্রান্তরে সংঘটিত সেই হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি শুধু ইতিহাসের পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা রূপ নিয়েছে কবিতায়, কাব্যে, পুঁথিতে, গদ্যে, সংগীতে- এক বিস্তৃত সাহিত্যধারায়। এই ঘটনাই পরবর্তীকালে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে, আর বাংলাও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলায় মহররম বিষয়ক সাহিত্যচর্চার সূচনা মূলত মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের মধ্য দিয়ে যে নতুন সাংস্কৃতিক ধারা সূচিত হয়, তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল ছিল বাংলা ভাষার বিকাশ। মুসলিম শাসকরা বাংলা ভাষাকে রাজদরবারে মর্যাদা দেওয়ার ফলে এটি ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক কাহিনীর ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। এই প্রেক্ষাপটেই কারবালার ঘটনা বাংলা সাহিত্যে প্রবেশ কওে এবং ধীরে ধীরে একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যধারার জন্ম দেয়।
মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে মহররমের প্রভাব সবচেয়ে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে পুঁথি সাহিত্যে। এই পুঁথিগুলোতে কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে জঙ্গনামা ও মর্সিয়া- যেখানে যুদ্ধ, বীরত্ব, শোক ও বিলাপ একত্রে মিশে এক অনন্য রস সৃষ্টি করেছে। ষোলো শতকের কবি শেখ ফয়জুল্লাহ হোসাইন (রা.)-এর স্ত্রী জয়নবের শোক ও বিলাপকে আশ্রয় করে লিখেন ‘জয়নবের চৌতিশা’। এটিকেই ধরা হয় ‘মহররমের’ ওপর রচিত প্রথম মর্সিয়া। কবি ফয়জুল্লাহর পথ ধরে কবি দৌলত উজির বাহরাম খান রচনা করেন ‘জঙ্গনামা’। কবি ‘লায়লী-মজনু’ কাব্যের জন্য খ্যাতি অর্জন করলেও তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ হলো ‘ইমাম বিজয়’-যা রচিত হয়েছিল মহররমের বিষাদময় কাহিনীকে উপজীব্য করে।
মধ্যযুগের অন্যতম শক্তিশালী কবি সৈয়দ সুলতানও (আনু. ১৫৫০-১৬৪৮) মহররমের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘মকতুল হোসেন’ লিখতে শুরু করেছিলেন। বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি উক্ত কাজ সম্পন্ন করতে না পারলেও তার প্রিয় শিষ্য মুহাম্মদ খান (১৫৮০-১৬৫০) তা সম্পন্ন করেন। কবি মুহম্মদ খান জঙ্গনামার শ্রেষ্ঠ কবি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন । তিনি ১১ পর্বে কারবালার যুদ্ধ, ঈমাম হোসাইনের শাহাদত, হোসাইন- পুত্র কাসেমের বীরত্ব, সখিনার বিলাপ প্রভৃতি বিষয়কে উপজীব্য করে রচনা করেন
‘মকতুল হোসেন’ । গ্রন্থটি মহররম মাসে চট্টগ্রাম অঞ্চলে সুর করে অধিক পরিমাণে পঠিত হতো। কাব্যরস সিক্ত গ্রন্থটি কোমল হৃদয় বাঙালি পাঠককে মুগ্ধ করেছিল। আঠারো শতকের আরেক পরিচিত কবি ফকীর গরীবুল্লাহও ‘মহররম সাহিত্য’ রচনা করেছিলেন। ফোরাত তীরের পানি সংকটের করুণ দৃশ্য তুলে ধরতে তিনি লিখেন, ‘ঘিরিয়া রাখিল কুফার পানি বন্ধ করে পানি পানি করে যত সব গেলো মরে।’
আঠারো শতকে কবি হায়াত মাহমুদ ‘জঙ্গনামা’ বা ‘মহরম’ পর্বে হযরত জিব্রাইলের জবানিতে রাসূল (সা.)-এর প্রিয় নাতির মৃত্যু দৃশ্য, বিষের পেয়ালা পানে হাসানের মৃত্যু, নববধূ সখিনার অকাল বৈধব্য, বিলাপ, হোসাইন (রা.)-এর নির্মম শিরচ্ছেদ করুণভাবে উপস্থাপন করেছেন। মূলত কাশেমের লড়াই নিয়ে রচিত তার ‘জঙ্গনামা’ মর্সিয়া সাহিত্যের এক সমৃদ্ধ রচনা। একই ধারায় আব্দুল হাকিম (১৬২০-১৬৯০) ‘কারবালা’, ইয়াকুব আলী (১৮শ শতক) ‘জঙ্গনামা’, জাফর (১৮শ শতক) ‘শহীদ-ই-কারবালা’ ও ‘সখিনার বিলাপ’, কবি হামিদ (১৮শ শতক) ‘সংগ্রাম হুসেন’, শেরবাজ চৌধুরি (১৮শ শতক) ‘কাশিমের লড়াই’ ও ‘ফাতিমার সুরতনামা’, মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ খান (১৯শ শতকের প্রথমার্ধ) গুলজার-ই- শাহাদৎ’, ওয়াহিদ আলী (১৯শ শতকের প্রথমার্ধ) ‘বড় জঙ্গনামা’, জনাব আলী (১৯শ শতক) ‘শহিদ-ই-কারবালা’, মুহাম্মদ মুনসি (১৯শ শতক) ‘শহীদ-ই-কারবালা’, মুহাম্মদ ইসহাক উদ্দীন (২০শ শতক) ‘দাস্তান শহিদ-ই-কারবালা’ রচনা করেন। এসব গ্রন্থাবলি মহররম মাসে পঠিত হতো এবং তা পাঠক-শ্রোতাদের মনে গভীর শোকাচ্ছ্বাস ও বেদনার সৃষ্টি করত। মহররমের সাহিত্যিক প্রভাব শুধু লিখিত কাব্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি প্রবলভাবে প্রভাব ফেলে লোকসংস্কৃতিতেও। জারি গান, মর্সিয়া, পাঁচালি- এসবের মাধ্যমে গ্রামবাংলার মানুষ কারবালার শোককে নিজের জীবনের অংশ করে নেয়। জারি গানের সুরে, করুণ বিলাপে, নাটকীয় উপস্থাপনায় কারবালার কাহিনী এমনভাবে পরিবেশিত হতো যে, শ্রোতারা অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ত।
ইংরেজ আমলে বাংলা সাহিত্য প্রবেশ করে আধুনিক ধারায়। এ যুগেও ‘মহররম’কে কেন্দ্র করে মর্সিয়া সাহিত্য রচিত হতে থাকে সমান তালে। আবুল আলী মোহাম্মদ হামিদ আলীর কাসেম বধ কাব্য (১৯০৬) ও জয়নাল উদ্ধার (১৯০৯), মোহাম্মদ উদ্দীন আহমদের মোহররম কাব্য (১৯১২), মোহাম্মদ আব্দুল বারীর কারবালা (১৯১৩), কাজী আমিনুলের জঙ্গে কারবালা (১৯৪৫) ও মোহাম্মদ বরকতুল্লাহর কারবালার যুদ্ধ ও নবী বংশের ইতিবৃত্ত (১৯৫৭) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব রচনায় কবিদের মুনশিয়ানার পরিচয় মেলে। ঊনবিংশ শতকে এসে মহররম বিষয়ক সাহিত্য নতুন মোড় নেয় । এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি বিষাদ সিন্ধু, যার রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৮-১৯১২)। এই গ্রন্থে কারবালার ঘটনাকে গদ্যের শিল্পরীতিতে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা বাংলা সাহিত্যে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এর ভাষা, বর্ণনা, চরিত্র নির্মাণ- সবই এক ধ্রুপদী সৌন্দর্যে ভরপুর। তবে এই গ্রন্থের ঐতিহাসিক নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন কায়কোবাদ (১৮৫৭-১৯৫১)। তিনি ‘মহরম শরীফ’ রচনা করে কারবালার ঘটনাকে আরও ইতিহাসসম্মতভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন। তাঁর কাব্যে আমরা দেখি ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা ও সাহিত্যিক সংবেদনশীলতার এক সমন্বয়। কারবালাকে উপজীব্য করে অনল প্রবাহের কবি ইসমাইল হোসেন সিরাজী (১৮৮০- ১৯৩১) রচনা করেন ‘মহাশিক্ষা’ কাব্য। মহররমকে কেন্দ্র করে কবিতা লিখেছিলেন কবি শাহাদাৎ হোসেন (১৮৯৩-১৯৫৩) এবং পল্লীকবি জসীমউদ্দীনও (১৯০৩-১৯৭৬)। বিশ শতকে এসে মহররম বিষয়ক সাহিত্য এক নতুন চেতনার জন্ম দেয়, যার প্রধান রূপকার কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি মহররমকে ঘিরে কবিতা ও গান রচনা করেছেন প্রচুর। তাঁর বিখ্যাত ‘মহররম’ কবিতা বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য সংযোজন। কবিতার শুরুতে কবি লিখেন, নীল সিয়া আসমান, লালে লাল দুনিয়া ‘আম্মা! লা’ল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া!” কাঁদে কোন্ ক্রন্দসী কারবালা ফোরাতে সে কাঁদনে আসু আনে সীমারেরও ছোরাতে। তিনি কারবালার ঘটনাকে শুধু শোকের দৃষ্টিতে দেখেননি; বরং এটিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি জ্বালাময়ী আখরে লিখেন, ফিরে এল আজ সেই মহররম মাহিনা,- ত্যাগ চাই মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না। উষ্ণীষ কোরানের, হাতে তেগ আরবীর দুনিয়াতে নত নয় মুসলিম কারো শির,- তবে শোন ঐ শোন বাজে কোথা দামামা। শমসের হাতে নাও, বাঁধো শিরে আমামা! এভাবে আগুরা ও মুহররমের প্রেক্ষাপটে অনেকেই লিখেছেন। এখনো তা চলমান আছে। বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে। বিশ শতকের পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর, আশি ও নব্বই দশকের কবিরা অনেকেই আশুরা ও মুহররম নিয়ে কবিতা ও গান লিখেছেন। মর্সিয়া লিখেছেন ও লিখছেন অথবা আওরা, মোহররম, ইমাম হোসাইন, ফোরাত, কারবালা প্রান্তর, কে হোসাইন-কে ইয়াযীদ, ঘৃণিত সীমার ইত্যাদি মুহররম সম্পর্কিত শব্দাবলীকে উপমা-উৎপ্রেক্ষাতে হলেও বিভিন্ন কবিতার বিভিন্ন লাইন প্রসঙ্গে টেনে এনেছেন। কারবালা সংক্রান্ত স্বতন্ত্র কবিতার রচনা অথবা উপমা-উৎপ্রেক্ষায় মুহররমকেন্দ্রিক শব্দাবলিকে টেনে আনা এই সব কবির তালিকায় রয়েছেন ইসলামি রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ, সৈয়দ আলী আহসান, আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, আবদুস সাত্তার, মতিউর রহমান মল্লিক, আবদুল হাই শিকদার, গোলাম মোহাম্মদ, আসাদ বিন হাফিজ, আল মুজাহিদী, আসাদ চৌধুরী, মোশাররফ হোসেন খান, শাহাদাত হোসাইন, মাওলানা রুহুল আমিন খান, ফজল শাহাবুদ্দিন, মোহাম্মদ নূরুল হুদা, আ স ম বাবর আলী, মসউদ উশ শহীদ, জহুরুশ শহীদ, আবু নসরত রহমত উল্লাহ, ফারুক মাহমুদ, হোসেন মাহমুদ, মোহসিন হোসাইন, বুলবুল সরওয়ার, সৈয়দ মুসা রেজা, অধ্যাপক সিরাজুল হক, সোলায়মান আহসান, মুকুল চৌধুরী, আবদুল মুকিত চৌধুরী, মহিউদ্দিন আকবর, আমিন আল আসাদ, চৌধুরী গোলাম রব্বানী, আতিক হেলাল, মানসুর মুজাম্মিল, মোহাম্মদ আলী আকবর, এম. মনিরুল হক প্রমুখ।
বাংলা সাহিত্যে মহররম নিয়ে সপ্তদশ শতক থেকে শুরু করে বর্তমানকাল পর্যন্ত যত লেখা রচিত হয়েছে দ্বিতীয় এমন কোনো বিষয় নিয়ে এত লেখা ছাপা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। মধ্যযুগের পুঁথি থেকে আধুনিক কবিতা পর্যন্ত এই ধারার বিস্তার প্রমাণ করে, কারবালা কেবল অতীতের ঘটনা নয়; এটি বর্তমানের চেতনা এবং ভবিষ্যতের প্রেরণা। মহররম আমাদের শেখায় সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে, এবং মানবতার পথে অটল থাকতে। এই শিক্ষা যতদিন মানবসমাজে প্রাসঙ্গিক থাকবে, ততদিন বাংলা সাহিত্যে মহররমের এই প্রবাহও অবিরাম বহমান থাকবে।

গল্প/পদক

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:২৯ পূর্বাহ্ণ
গল্প/পদক

 

সাজেদা সুলতানা কলি
সকাল বেলায় পত্রিকার পাতায় চোখ পড়তেই নিলীমা চমকে ওঠে! হাতে লেখা একটি পা-ুলিপির ছবির নিচে লেখা- ‘এই হাতের লেখা কার? উপযুক্ত প্রমাণসহ খোজ চাই।’ এটা কিভাবে সম্ভব! এতকিছু হয়ে গেছে অথচ সে কিছুই জানলো না! সে কি তাহলে একবার পত্রিকা অফিসে যোগাযোগ করবে? স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষা চলছিল। তবু বড় ম্যাডামকে ফোন করে ছুটি নিল নীলিমা। পাঁচ বছরের চাকরিজীবনে এমনটা সে কখনো করেনি। :বাবা, তুমি সারাদিন কোথায় ছিলে? মন খারাপ করে কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছ? একটু বলেও তো যাও না। আমি তাহলে কিভাবে বাঁচবো? নাওয়া নেই, খাওয়া নেই। তোমার স্বাস্থ্যও তো পুরোপুরি ভেঙ্গে গেছে। আমার তো এখন তোমাকে নিয়ে ভয় হচ্ছে। বাবার গা থেকে শার্টটা খুলে বাতাসে মেলে দিতে দিতে নীলিমা কথাগুলো বলল, : কোথাও যাইনি। তোর মায়ের কবরটা দেখে আসলাম। চারপাশে ঝোঁপঝাড়ে কবরটা আড়াল হয়ে গেছে। সেগুলো সরিয়ে দিয়েছি। বেঁচে থাকতে তো কখনো যতœ করিনি। এখন যতœ করে ঋণ শোধ করার চেষ্টা করছি। কথাটা বলে, হু হু করে কেঁদে উঠে নীলিমার বাবা।
সায়রা আর মুজাফ্ফরের বিয়ে হয়েছে পারিবারিকভাবে। মুজাফ্ফর মফস্বল শহরের একটা কলেজের বাংলার প্রভাষক। সায়রার বাবা ছেলে কলেজে পড়ায় শুনে বিয়েতে আর দ্বিমত করেননি। অনার্সে ভর্তির কয়েক মাস পর সায়রার বিয়ে হয়ে যায়। পড়াশোনাও চলছিল। নিলীমা যখন পেটে আসলো তখন শ্বশুর বাড়ির লোকজন বিশেষ করে শ্বাশুড়ী সায়রাকে আর কলেজে যেতে দেননি। মেয়ের জন্মের পর থেকে সায়রা পুরোপুরি সংসারী হয়ে উঠেছে। এখন তার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান মেয়ে নিলীমাকে বড় করা ।
কলেজের সময়টুকু ছাড়া মুজাফফরের অখ- অবসর। সে শিক্ষকতার পেশায় গেছেও এই অবসরটুকুর জন্য। তার প্রচুর বই পড়ার নেশা। একসময় লেখালেখিও শুরু করে। মাস শেষে সায়রার হাতে বেতনের টাকাটা তুলে দিয়েই তার দায়িত্ব শেষ। প্রথম দিকে “নিয়ে সায়রা রাগারাগি করতো। এখন সে আর কিছু বলে না। মুজাফফরও স্বাধীন। অবসরে বই পড়া আর লেখালেখি ছাড়া তার কোনো কাজ নেই।
সুখের সংসারে ঝড় উঠলো একদিন। সায়রা পেটের ব্যথায় ছটফট করছে। পরীক্ষা নিরীক্ষার পর জানা গেলো গলব্লাডারে পাথর। ডাক্তার পরামর্শ দিলেন যত তাড়াতাড়ি পাথর অপসারণ করা যায় তত মঙ্গল। কিন্তু ব্যথার ওষুধ খেয়ে আরাম পাওয়ায় বিষয়টা সায়রা আর গুরুত্ব দেয়নি। এদিকে মুজাফফর তো আগে থেকেই উদাসীন। যেদিন সায়রা ব্যথায় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল সেদিন মুজাফফরকে কিছুটা বিচলিত দেখা গেল। কারণ এবার সায়রার অসুস্থতা চিকিৎসার ঊর্ধ্বে চলে গেছে। তার পেটের ভেতর কর্কট রোগ বাসা বেঁধেছে । নিলীমা তখন এইচএসসি পড়ছে। মেয়ের পড়ার খরচ আর মায়ের চিকিৎসার খরচ নিয়ে ভাবতে গিয়ে মুজাফ্ফর এলোমেলো হয়ে গেছে। সায়রা চলে গেল চিরতরে। নিলীমা তখন সদ্য এইচএসসি পাশ করে বিভিন্ন জায়গায় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো ।
মুজাফ্ফর তিন বছর ধরে একটা উপন্যাস লিখেছে। সায়রা মাঝে মাঝে দুষ্টুমি কওে বলতো, ‘আমি মরে যাবো তবুও তোমার এই উপন্যাস শেষ হবে না। একটা উপন্যাস লিখতে যদি এত সময় লাগে তাহলে হুমায়ুন আহমেদ কিভাবে এত বই লিখলেন?’ সবার লেখার ধাঁচ এক নয়। আমি চাই আমার উপন্যাস কালজয়ী হবে। তাই সময় নিয়ে লিখছি। মুজাফফরের এই উত্তর শুনে সায়রা কি ভাবলো কে জানে। আর কিছু না বলেসে রান্না ঘরে চলে গেলো। এর ক’দিন পরই সায়রা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। সত্যি সত্যিই মুজাফফর উপন্যাস শেষ করতে পারেনি। সারাজীবন লেখালেখি করে কি লাভ হলো? আজ পর্যন্ত একটা লেখা মূলধারার পত্রিকায় ছাপা হলো না। অবশ্য এলাকা ভিত্তিক লিটল ম্যাগাজিনে অনেক লেখা ছাপা হয়েছে। কিন্তু এতে তো মন ভরে না। সায়রা চলে যাওয়ার পর সে এখন বই পড়ে না। লেখার কাগজ কলম ছুঁয়েও দেখে না। সুযোগ পেলেই চলে যায় স্ত্রীর কবরের কাছে। অনেক দিন হলো মুজাফফর পুরোপুরি অপ্রকৃতিস্থ হয়ে গেছে। এখন আর দিন রাত নেই। সবসময়ই সায়রার কবরের কাছে বসে কি যেন বিড়বিড় করে। প্রথম দিকে নিলীমা কোথাও খুঁজে না পেলে চিন্তিত হতো। এখন জানে তার বাবা মায়ের কবর ছেড়ে কোথাও যায় না।
অনিরুদ্ধ বাংলা সাহিত্যের ছাত্র এবং পরম ভক্তও। তার অদ্ভুত একটা শখ আছে। সে পুরনো বইয়ের দোকান খুঁজে খুঁজে বের করে। আর সেখান থেকে সংগ্রহ করে এমন কিছু বই যেগুলোর লেখককে কেউ চেনে না। মাত্র একটা বা দুটি বই প্রকাশ হয়েছে এমন লেখকের বইয়ে তার বুক শেলফ ঠাসা। তার যুক্তি হলো যে লেখক তার সারা জীবনে মাত্র একটা বই লিখেছেন সেটাতে তিনি তার সমস্তটা ঢেলে দিয়েছেন। তাই নিশ্চিত, এই বইটি হবে অসাধারণ। সেরকম একটা পুরনো বইয়ের দোকানে গিয়ে বই নাড়াচাড়া
করতে গিয়ে অনিরুদ্ধ পেয়ে গেলো চমৎকার একটা মাস্টারপিস!
অনেকগুলো পুরনো বইয়ের ভেতরে পা-ুলিপিটা পেয়েছিলো অনিরুদ্ধ। উল্টে পাল্টে দেখে দোকানীকে জিজ্ঞেস করল, : এটা কার? আমি কি এটা নিতে পারি? একতাড়া কাগজ দেখে দোকানী তাচ্ছিল্যের
সুরে বললো, ‘এটা দিয়ে আমরা কি করবো! নিয়ে যান।’ পা-ুলিপিটা পড়ে অনিরুদ্ধ সিদ্ধান্ত নিলো এটা সে ছাপাবে। কিন্তু অসমাপ্ত পা-ুলিপি কোনো প্রকাশক নিচ্ছিল না। কারণ এটার শেষের বেশ কয়েকটি পৃষ্ঠা ছুটে গেছে। শেষ পর্যন্ত অনিরুদ্ধ সেটা গুছিয়ে নিয়ে বই আকারে ছাপলো। নীলিমা আজকে স্কুল থেকে ছুটি নিয়েছে। হলরুম লোকজনে পরিপূর্ণ। প্রধান অতিথি আসলেই অনুষ্ঠান শুরু হবে। অনিরুদ্ধও এসেছে। নিলীমার সাথে কথা বলছে সে। সেদিন পত্রিকায় অনিরুদ্ধের ‘খোঁজ চাই’ বিজ্ঞপ্তি দেখে নীলিমা তার সাথে দেখা করে। দৈনিক পূর্ববাংলা পত্রিকার আয়োজনে আজকে এখানে অনেক খ্যাতিমানের মিলনমেলা বসেছে। অতিথিদের বক্তব্য শেষে আসলো পুরস্কার প্রদানের পালা। নীলিমা ধীর এবং শান্ত পায়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যায়। হঠাৎ করে সে মাইকে ঘোষণা করে বসলো, ‘এই পুরস্কার আমি প্রত্যাখ্যান করলাম। এটা গ্রহণ করা মানে তিলে তিলে আমার নিজেকে শেষ করে দেওয়া। অনুষ্ঠান স্থলে গুঞ্জন উঠলো, কী ব্যাপার! কী হলো! সব তো ঠিকই ছিলো! নীলিমার বক্তব্য শুনে বোঝা গেল আসলে কিচ্ছু ঠিক নেই। নীলিমা বলতে শুরু করে- ‘সেদিন পত্রিকায় ‘সেরা বইয়ের পুরস্কার অর্জন’ কথাটার পাশে হাতে লেখা একটা কাগজের ছবির নিচে লেখা ছিলো, ‘এই হাতের লেখা কার? উপযুক্ত প্রমাণসহ খোঁজ চাই’। আমি দেখেই বুঝতে পেরেছি এটা আমার বাবার হাতের লেখা। পত্রিকা অফিস থেকে খোঁজ পাই অনিরুদ্ধের। বাবা মারা যাওয়ার পর আমি সব বই কাগজওয়ালার কাছে বিক্রি করে দিয়েছি। ওখানে বাবার লেখা একটা উপন্যাসের পা-ুলিপি ছিলো। যেটা নিয়ে বাবা প্রকাশকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে। যেটা লিখতে গিয়ে বাবা আমার মাকে কখনো সময় দেয়নি। মৃত্যুশয্যায় আমার মা অভিমান নিয়ে বাবাকে বলেছিলো, ‘এখন থেকে তুমি লেখালেখি নিয়ে থাকতে পারবে। কেউ কিছু তোমাকে বলবে না।’ সেই অপরাধবোধ থেকে বাবা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অপ্রকৃতিস্থ ছিলো। আমি সংসার করিনি, বাবাকে তাহলে কে দেখবে ? আমার বয়স এখন পঁয়তাল্লিশ। বাবার জন্য তো আমি ছিলাম। আমার জন্য কে আছে? আজ আমার বাবা বেঁচে নেই। এই পদক দিয়ে কি হবে? বেঁচে থাকতে মানুষটাকে কেউ দেখেনি। এখন এই সম্মান আমার কাছে অভিশাপ ছাড়া কিছু নয়।’ বলে, নীলিমা কান্নায় ভেঙে পড়ে। পুরো হলরুমে পিনপতন নীরবতা। অনিরুদ্ধ ও বাষ্পায়িত কণ্ঠে বলে উঠলো, ‘মানুষ বেঁচে থাকতে যদি তার বেতিভার স্বীকৃতি না পায়, মৃত্যুর পরের স্বীকৃতিতে তার কি আসে যায়? লেখক মুজাফফর হোসেন তাঁর জীবদ্দশায় একটি ভালো দৈনিক পত্রিকায়ও নিজের ভাপানো লেখা দেখেননি। এখন এই পদক কি তাঁকে ফিরিয়ে আনতে পারবে? নীলিমার জায়গায় আমি হলেও পদক প্রত্যাখ্যান করতাম। নীলিমা মঞ্চ ছেড়ে নেমে আসে। হলরুম তখনো নিস্তব্ধ।