শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১৩ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১৩ আষাঢ় ১৪৩৩

তিন মাসের জন্য বন্ধ সুন্দরবনের দুয়ার: বাঁচবে বন, নাকি বাড়বে গোপন প্রবেশ?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬, ৯:২৯ অপরাহ্ণ
তিন মাসের জন্য বন্ধ সুন্দরবনের দুয়ার: বাঁচবে বন, নাকি বাড়বে গোপন প্রবেশ?

ইব্রাহিম খলিল: ভোরের আলো ফোটার আগেই নদীর ঘাটে নৌকা বেঁধে বসে আছেন জেলেরা। আকাশে মেঘের আনাগোনা, চারপাশে নোনা জলের চেনা গন্ধ—সবই প্রস্তুত। শুধু নেই বনে যাওয়ার অনুমতি। ১ জুন থেকে তিন মাসের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে সুন্দরবনের দুয়ার।

কাগজে-কলমে এই সময়টাতে জেলে, মৌয়াল, বাওয়ালি কিংবা পর্যটকÑকারো জন্যই বনে প্রবেশের অনুমতি থাকে না। বন বিভাগের ভাষায়, এটি প্রকৃতি ও বন্য প্রাণীর ‘বিশ্রামের সময়’। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছেÑবাস্তবে কি সত্যিই এই তিন মাস বিশ্রাম পায় সুন্দরবন? নাকি জীবিকার তাড়নায় আড়ালে বাড়ে বনের অদৃশ্য ক্ষয়?

সুন্দরবন উপকূলের এলাকাগুলো ঘুরে দেখা গেছে, নিষেধাজ্ঞা জারি হলেও বনের ভেতরের অনাকাক্সিক্ষত কার্যক্রম পুরোপুরি থেমে থাকে না। নিষেধাজ্ঞার কারণে বিপুলসংখ্যক বনজীবী হঠাৎ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। কোনো সরকারি সহায়তা বা বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় জীবিকার তাগিদে অনেকে বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে গোপনে বনে প্রবেশ করছেন। একই সঙ্গে এই সুযোগে বনের ভেতরে বিষ দিয়ে মাছ ধরা, শুঁটকি তৈরি কিংবা হরিণ শিকারের মতো অসাধু চক্রগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের আয়তন প্রায় ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৩১ হেক্টর। এই বিশাল বনাঞ্চল তদারকির জন্য ৪টি স্টেশন ও ১২টি ক্যাম্প রয়েছে। গত অর্থবছরে প্রায় ৪৬ হাজার জেলে, বাওয়ালি ও বনজীবী অনুমতি (পাস) নিয়ে বনে প্রবেশ করেছিলেন। তিন মাসের এই নিষেধাজ্ঞায় এই বিপুল জনগোষ্ঠী এখন চরম সংকটে।

গাবুরা ইউনিয়নের জেলে রবিউল ইসলাম তাঁর ক্ষোভ ও সংকটের কথা জানিয়ে বলেন, তিন মাস আয় বন্ধ থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো সরকারি সহায়তা না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে পেটের দায়ে বনে ঢোকে। তিনি আরও জানান, ৯ মাস বনে মাছ ধরার সময় জলদস্যুদের নিয়মিত মাসোহারা দিতে হয়। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বছর পার করতে হয়। এর ওপর এই তিন মাস কোনো আয়ের পথ থাকে না, মেলে না কোনো সরকারি সাহায্যও।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্ষা মৌসুমে সুন্দরবনের নদী-খালে মাছ ও চিংড়ির প্রাচুর্য থাকে। একদিকে মাছের লোভ, অন্যদিকে পেটের টান—এই দুই মিলে অনেকেই গোপনে বনে ঢোকার ঝুঁকি নেন। অভিজ্ঞ এক জেলে জানান, এই সময়ে মাছ বেশি পাওয়া যায় বলেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অনেকে ভেতরে চলে যান। বনের ভেতরে গাছ কেটে মাছ শুকানোর অস্থায়ী আস্তানা বা ‘রঙঘর’ তৈরি করে আগুন জ্বালিয়ে শুঁটকি বানানোর অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
মুন্সিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা হাফিজুল বলেন, বনের গভীরে অনেক কিছুই ঘটে যা বাইরে থেকে বোঝার উপায় থাকে না। নজরদারির ফাঁক গলে অনেকেই অবৈধ কাজ চালিয়ে যান।

অবৈধ প্রবেশ ও বনের সুরক্ষার বিষয়ে সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের ফরেস্টার এরফান উদ্দীন বলেন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও বন্য প্রাণীর নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতেই প্রতি বছরের মতো এবারও তিন মাসের জন্য সুন্দরবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে বন আবার সবার জন্য উন্মুক্ত হবে। ইতোমধ্যে উপকূলীয় এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে এবং সব ধরনের পাস পারমিট বন্ধ রাখা হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে বন বিভাগ, কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশ যৌথভাবে নজরদারি চালাবে জানিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের নিয়মিত ‘স্মার্ট টহল’ ও বিশেষ টহল দল মাঠে থাকবে। বন্য প্রাণীর স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিতে আমরা নিজেরাও বনের ভেতরে অপ্রয়োজনীয় চলাচল করব না।” গোপনে প্রবেশের চেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে উল্লেখ করে তিনি স্পষ্ট জানান, এ ধরনের অবৈধ কাজে বন বিভাগের কেউ জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ (জিরো টলারেন্স) নীতি অনুসরণ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে বনের টেকসই সুরক্ষা ও বনজীবীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সামাজিক সংগঠনগুলোর দাবি, কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বন রক্ষা করা সম্ভব নয়। ইয়ুথনেট গ্লোবাল-এর সাতক্ষীরা জেলা সমন্বয়ক আশিকুর রহমান বলেন, “তিন মাস সুন্দরবন বিশ্রামে যায় বলা হলেও বাস্তবে এই সময়েই হরিণ শিকার বা বিষ দিয়ে মাছ ধরার মতো অপরাধের অভিযোগ বেশি ওঠে।”

তিনি আরও বলেন, ৪৬ হাজার কর্মহীন বনজীবীর জন্য পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা বা বিকল্প কর্মসংস্থান নেই। তাছাড়া জেলেরা ৯ মাস জলদস্যুদের যে চাঁদা দেয়, সেই টাকা যদি তাদের সাশ্রয় হতো, তবে এই তিন মাস তারা ঘরে বসে কাটাতে পারতেন।

বন সংরক্ষণ নাকি মানুষের জীবন-জীবিকাÑএই দুই সংকটের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে তিন মাসের এই নিষেধাজ্ঞা। স্থানীয়দের মতে, বনজীবীদের জন্য উপযুক্ত খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে বনের ‘বিশ্রাম’ কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে, বাস্তবে বাড়বে গোপন অনুপ্রবেশ।

 

Ads small one

একুশে পদকপ্রাপ্ত নির্ভীক সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালুর হত্যাবার্ষিকী পালন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬, ৩:৪৪ অপরাহ্ণ
একুশে পদকপ্রাপ্ত নির্ভীক সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালুর হত্যাবার্ষিকী পালন

একুশে পদকপ্রাপ্ত নির্ভীক সাংবাদিক, খুলনা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও দৈনিক জন্মভূমির সম্পাদক হুমায়ুন কবীর বালুর ২২তম হত্যাবার্ষিকী উপলক্ষে আজ শনিবার ক্লাবের পক্ষ থেকে স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। খুলনা প্রেসক্লাবের আয়োজনে স্মরণসভায় সভাপতিত্ব করেন ক্লাবের সভাপতি মোস্তফা সরোয়ার। সভা পরিচালনা করেন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোঃ তরিকুল ইসলাম।

স্মরণসভায় বক্তারা বলেন, ‘হুমায়ুন কবীর বালু ছিলেন একজন নির্ভীক সাংবাদিক। তাঁকে যারা হত্যা করেছে, তাদেরও সঠিক বিচার হয়নি। এই মামলার পুনরায় তদন্ত এবং প্রকৃত আসামি ও এর মদদদাতাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানানো হয়। এছাড়া এই হত্যা মামলার আসামিদের সাজা না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন বক্তারা।

স্মরণ সভায় বক্তৃতা করেন, খুলনা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও আজীবন সদস্য মকবুল হোসেন মিন্টু, ক্লাবের সহ-সভাপতি সোহরাব হোসেন ও কাজী শামীম আহমেদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোঃ সাহেব আলী ও মল্লিক সুধাংশু, ক্লাবের যুগ্ম-সম্পাদক বেল্লাল হোসেন সজল, সিনিয়র সদস্য মুহাম্মদ আবু তৈয়ব, কার্যনির্বাহী সদস্য মোঃ মাকসুদুর রহমান (মাকসুদ) ও কে এম জিয়াউস সাদাত, ক্লাব সদস্য আতিয়ার পারভেজ, রকিব উদ্দিন পান্নু, আনোয়ারুল ইসলাম কাজল, এ এইচ এম শামিমুজ্জামান, এস এম নূর হাসান জনি ও সাংবাদিক আবু তাহের।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও কার্যনির্বাহী সদস্য কাজী মোতাহার রহমান, সহ-সভাপতি মোঃ জাহিদুল ইসলাম, কার্যনির্বাহী সদস্য সোহেল মাহমুদ, ক্লাব সদস্য এস এম কামাল হোসেন,বাপ্পী খান, রিংটন মন্ডল, আল মাহমুদ প্রিন্স, মুহাম্মদ নূরুজ্জামান, আলমগীর হান্নান, মোঃ হুমায়ুন কবীর, মো. আজিজুল ইসলাম, মোঃ রবিউল গাজী (উজ্জ্বল), এস এম বাহাউদ্দিন, তিতাস চক্রবর্তী, মোঃ হেলাল মোল্লা, আলী আবরার, মোঃ সোহেল রানা, মোঃ রফিক আলী, তুফান গাইন, ইমাম হোসেন সুমন, মোঃ আনিছুর রহমান কবির, মো. রাজু হাওলাদার, নূরুল আমিন নূর, মো. মাসুম বিল্লাহ ইমরান, মোঃ হাবিবুর রহমানসহ অন্যান্য সাংবাদিকবৃন্দ।

এর আগে ক্লাবের নেতৃবৃন্দ ক্লাব চত্বরে অবস্থিত শহিদ সাংবাদিক স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন। এছাড়া স্মরণসভার শুরুতে সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর বালুসহ নিহত সাংবাদিকদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।

 

এছাড়া হুমায়ুন কবীর বালুসহ নিহত ও মৃত্যুবরণকারী অন্যান্য সাংবাদিকদেরও আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া করা হয়। দোয়া পরিচালনা করেন ক্লাবের ইমাম হাফেজ মাওলানা মো. ইউসুফ হাবিব।

উল্লেখ্য, গত ২০০৪ সালের ২৭ জুন নগরীর ইসলামপুর রোডে অবস্থিত নিজ কার্যালয় জন্মভূমি ভবনের সামনে সন্ত্রাসীদের বোমা হামলায় তিনি শাহাদাৎ বরণ করেন। প্রেসবিজ্ঞপ্তি

 

হজযাত্রীদের প্রাক-নিবন্ধন বিষয়ক আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠিত

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬, ৩:৪০ অপরাহ্ণ
হজযাত্রীদের প্রাক-নিবন্ধন বিষয়ক আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠিত

সংবাদদাতা: সৌদি আরব ও বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত হজ ও ওমরাহ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান নাঈম ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেলস এন্ড টুরস (লাইসেন্স নং-৫১৮)-এর উদ্যোগে ২০২৭ সালের হজযাত্রীদের প্রাক-নিবন্ধন উপলক্ষে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।

শনিবার (২৭ জুন) সকাল ১০টায় সাতক্ষীরা শহরের মুনজিতপুর এলাকায় একাডেমি মসজিদ রোডস্থ আল-আকসা মসজিদ সংলগ্ন নাঈম ইন্টারন্যাশনালের নিজস্ব হজ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে ২০২৭ সালের হজযাত্রীদের প্রাক-নিবন্ধন, সরকারি নীতিমালা, নিবন্ধন প্রক্রিয়া, হজের পূর্বপ্রস্তুতি, হজের গুরুত্ব এবং ওমরাহ সেবাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। বক্তারা বলেন, হজ পালনে আগ্রহীদের সময়মতো প্রাক-নিবন্ধন সম্পন্ন করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত। একই সঙ্গে নিরাপদ ও সুষ্ঠুভাবে হজ পালন নিশ্চিত করতে সরকার অনুমোদিত হজ এজেন্সির মাধ্যমে নিবন্ধনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নাঈম ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেলস এন্ড টুরসের স্বত্বাধিকারী আলহাজ মাওলানা আব্দুল হাদী, ড. মুফতি আক্তারুজ্জামান, আলহাজ নজরুল ইসলাম, আলহাজ আব্দুল রাজ্জাক, আলহাজ গোলাম মোর্তজা, আলহাজ মাওলানা মহাসীনুর রহমান, আলহাজ কাজী শামসুর রহমানসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

আলোচনা সভা শেষে দেশ, জাতি এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।

আয়োজকরা জানান, ২০২৭ সালের হজযাত্রীদের প্রাক-নিবন্ধন ও বুকিং কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং তা চলমান রয়েছে। আগ্রহী হজযাত্রীদের দ্রুত প্রাক-নিবন্ধন সম্পন্ন করে প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য নাঈম ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেলস এন্ড টুরসের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হয়।

বজ্রধ্বনি ও সাতক্ষীরার অরক্ষিত জনপদ/ আখলাকুর রহমান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬, ৩:১৯ অপরাহ্ণ
বজ্রধ্বনি ও সাতক্ষীরার অরক্ষিত জনপদ/ আখলাকুর রহমান

আখলাকুর রহমান

‘শুনলে বজ্রধ্বনি, ঘরে যাই তখনই’-খনা যখন তাঁর চিরন্তন বচনে এই সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছিলেন, তখন বাঙালির বিজ্ঞানচেতনা হয়তো আজকের মতো ল্যাবরেটরির কাচে বন্দি ছিল না, কিন্তু প্রকৃতির মেজাজ চেনার এক মায়াময় প্রজ্ঞা তাঁদের ছিল। আজ ২৮শে জুন, আন্তর্জাতিক বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবস। জলবায়ু পরিবর্তনের এই চরম সংকটের দিনে ক্যালেন্ডারের এই তারিখটি আমাদের কাছে কেবলই এক লৌকিক আয়োজন হয়ে আসে, অথচ খোদ জাতিসংঘের জলবায়ু বিজ্ঞানীরা এই বজ্রপাতকে অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

 

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে প্রতি এক ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়ার কারণে বজ্রপাতের আশঙ্কা প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। আজ এই দিবসের আলোয় যখন আমাদের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল, বিল আর নদীপাড়ের প্রান্তিক মানুষের দিকে তাকাই, তখন প্রকৃতির এই রুদ্র রূপকে এক অনিবার্য মরণফাঁদ বলে মনে হয়।

 

বাঙালি সাহিত্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমাদের ঔপন্যাসিকরা প্রকৃতির এই রুদ্রলীলাকে মানুষের নিয়তির সাথে বারেবারে এক সুতোয় বেঁধেছেন। কালজয়ী কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ উপন্যাসের সেই অমোঘ ট্র্যাজেডির কথা কি আমরা ভুলতে পারি? ঝুমুর দলের নর্তকী বসন্ত যখন নিতাইয়ের জীবনের সমস্ত আলো কেড়ে নিয়ে অকাল বসন্তেই বিদায় নিল, তার আগে সেই কালবোশেখীর রাতে আকাশ চিরে নেমে আসা বজ্রপাত যেন তাদের নিয়তিরই এক নিষ্ঠুর অট্টহাসি ছিল।

 

আবার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’তে কিংবা রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে ঝড়ের রাতের যে বর্ণনা, তা কেবল রোমান্টিকতা নয়, প্রকৃতির এক আদিম ও অমোঘ শক্তির জানান দেয়। বজ্রপাত তো আসলে কোনো আকস্মিক দৈব দুর্ঘটনা নয়, এটা আমাদের প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করার এক চরম প্রতিশোধ। সাতক্ষীরার সীমান্তঘেঁষা গ্রামগুলোতে আজ অপরিকল্পিতভাবে তালগাছসহ সব বড় বড় গাছ কেটে সাবাড় করা হয়েছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে মাঠের কৃষক আর মৎস্যজীবীদের। খোলা বিলে বা মৎস্য ঘেরে কাজ করার সময় একটু অসচেতনতার কারণেই প্রতি বছর কতশত তাজা প্রাণ ঝরে যাচ্ছে, কত সোনার সংসার মুহূর্তের মধ্যে ছাই হয়ে যাচ্ছে।

আইনের শুষ্ক বিধি বা লিফলেট বিলি করে প্রকৃতির এই মরণকামড় থেকে মানুষকে বাঁচানো যাবে না, এর জন্য প্রয়োজন আমাদের মজ্জাগত অভ্যাসের আমূল পরিবর্তন। খনার সেই প্রাচীন সূত্রকে আজ আমাদের আধুনিক জীবনের বর্ম বানাতে হবে; আকাশে মেঘের প্রথম গুড়গুড়ানি শুনলেই সমস্ত অবহেলা দূরে ঠেলে নিরাপদ আশ্রয়ে বা পাকা দালানের নিচে চলে যাওয়াটাই বেঁচে থাকার একমাত্র পথ। ইসলামে বজ্রপাতকে আল্লাহর মহিমার এক পরম নিদর্শন ও সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এই সময়ে বিশেষ দোয়া পড়ার নির্দেশ রয়েছে, যা মানুষের মনকে শান্ত ও সচেতন করে।

 

স্থানীয় প্রশাসনের উচিত কেবল কাগজে-কলমে দিবস পালন না করে প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে, বিশেষ করে আমাদের সাতক্ষীরার ঘের অঞ্চল ও কৃষিমঠে বজ্রপাত নিরোধক দন্ড স্থাপন এবং ব্যাপক হারে তালগাছ রোপণের এক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। এই আন্তর্জাতিক দিবসে আমরা সর্বস্তরের মানুষ একটাই প্রতিজ্ঞা করি, প্রকৃতির নিয়মকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং নিজস্ব সচেতনতাকে ঢাল বানিয়ে আমরা এই অদৃশ্য মরণ আঘাত থেকে আমাদের প্রিয়জনদের রক্ষা করবই।

লেখা : আখলাকুর রহমান, উদ্যোক্তা ও স্বপ্নদ্রষ্টা : আসিফা