তিন মাসের জন্য বন্ধ সুন্দরবনের দুয়ার: বাঁচবে বন, নাকি বাড়বে গোপন প্রবেশ?
ইব্রাহিম খলিল: ভোরের আলো ফোটার আগেই নদীর ঘাটে নৌকা বেঁধে বসে আছেন জেলেরা। আকাশে মেঘের আনাগোনা, চারপাশে নোনা জলের চেনা গন্ধ—সবই প্রস্তুত। শুধু নেই বনে যাওয়ার অনুমতি। ১ জুন থেকে তিন মাসের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে সুন্দরবনের দুয়ার।
কাগজে-কলমে এই সময়টাতে জেলে, মৌয়াল, বাওয়ালি কিংবা পর্যটকÑকারো জন্যই বনে প্রবেশের অনুমতি থাকে না। বন বিভাগের ভাষায়, এটি প্রকৃতি ও বন্য প্রাণীর ‘বিশ্রামের সময়’। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছেÑবাস্তবে কি সত্যিই এই তিন মাস বিশ্রাম পায় সুন্দরবন? নাকি জীবিকার তাড়নায় আড়ালে বাড়ে বনের অদৃশ্য ক্ষয়?
সুন্দরবন উপকূলের এলাকাগুলো ঘুরে দেখা গেছে, নিষেধাজ্ঞা জারি হলেও বনের ভেতরের অনাকাক্সিক্ষত কার্যক্রম পুরোপুরি থেমে থাকে না। নিষেধাজ্ঞার কারণে বিপুলসংখ্যক বনজীবী হঠাৎ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। কোনো সরকারি সহায়তা বা বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় জীবিকার তাগিদে অনেকে বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে গোপনে বনে প্রবেশ করছেন। একই সঙ্গে এই সুযোগে বনের ভেতরে বিষ দিয়ে মাছ ধরা, শুঁটকি তৈরি কিংবা হরিণ শিকারের মতো অসাধু চক্রগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের আয়তন প্রায় ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৩১ হেক্টর। এই বিশাল বনাঞ্চল তদারকির জন্য ৪টি স্টেশন ও ১২টি ক্যাম্প রয়েছে। গত অর্থবছরে প্রায় ৪৬ হাজার জেলে, বাওয়ালি ও বনজীবী অনুমতি (পাস) নিয়ে বনে প্রবেশ করেছিলেন। তিন মাসের এই নিষেধাজ্ঞায় এই বিপুল জনগোষ্ঠী এখন চরম সংকটে।
গাবুরা ইউনিয়নের জেলে রবিউল ইসলাম তাঁর ক্ষোভ ও সংকটের কথা জানিয়ে বলেন, তিন মাস আয় বন্ধ থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো সরকারি সহায়তা না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে পেটের দায়ে বনে ঢোকে। তিনি আরও জানান, ৯ মাস বনে মাছ ধরার সময় জলদস্যুদের নিয়মিত মাসোহারা দিতে হয়। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বছর পার করতে হয়। এর ওপর এই তিন মাস কোনো আয়ের পথ থাকে না, মেলে না কোনো সরকারি সাহায্যও।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্ষা মৌসুমে সুন্দরবনের নদী-খালে মাছ ও চিংড়ির প্রাচুর্য থাকে। একদিকে মাছের লোভ, অন্যদিকে পেটের টান—এই দুই মিলে অনেকেই গোপনে বনে ঢোকার ঝুঁকি নেন। অভিজ্ঞ এক জেলে জানান, এই সময়ে মাছ বেশি পাওয়া যায় বলেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অনেকে ভেতরে চলে যান। বনের ভেতরে গাছ কেটে মাছ শুকানোর অস্থায়ী আস্তানা বা ‘রঙঘর’ তৈরি করে আগুন জ্বালিয়ে শুঁটকি বানানোর অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
মুন্সিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা হাফিজুল বলেন, বনের গভীরে অনেক কিছুই ঘটে যা বাইরে থেকে বোঝার উপায় থাকে না। নজরদারির ফাঁক গলে অনেকেই অবৈধ কাজ চালিয়ে যান।
অবৈধ প্রবেশ ও বনের সুরক্ষার বিষয়ে সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের ফরেস্টার এরফান উদ্দীন বলেন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও বন্য প্রাণীর নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতেই প্রতি বছরের মতো এবারও তিন মাসের জন্য সুন্দরবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে বন আবার সবার জন্য উন্মুক্ত হবে। ইতোমধ্যে উপকূলীয় এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে এবং সব ধরনের পাস পারমিট বন্ধ রাখা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে বন বিভাগ, কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশ যৌথভাবে নজরদারি চালাবে জানিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের নিয়মিত ‘স্মার্ট টহল’ ও বিশেষ টহল দল মাঠে থাকবে। বন্য প্রাণীর স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিতে আমরা নিজেরাও বনের ভেতরে অপ্রয়োজনীয় চলাচল করব না।” গোপনে প্রবেশের চেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে উল্লেখ করে তিনি স্পষ্ট জানান, এ ধরনের অবৈধ কাজে বন বিভাগের কেউ জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ (জিরো টলারেন্স) নীতি অনুসরণ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে বনের টেকসই সুরক্ষা ও বনজীবীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সামাজিক সংগঠনগুলোর দাবি, কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বন রক্ষা করা সম্ভব নয়। ইয়ুথনেট গ্লোবাল-এর সাতক্ষীরা জেলা সমন্বয়ক আশিকুর রহমান বলেন, “তিন মাস সুন্দরবন বিশ্রামে যায় বলা হলেও বাস্তবে এই সময়েই হরিণ শিকার বা বিষ দিয়ে মাছ ধরার মতো অপরাধের অভিযোগ বেশি ওঠে।”
তিনি আরও বলেন, ৪৬ হাজার কর্মহীন বনজীবীর জন্য পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা বা বিকল্প কর্মসংস্থান নেই। তাছাড়া জেলেরা ৯ মাস জলদস্যুদের যে চাঁদা দেয়, সেই টাকা যদি তাদের সাশ্রয় হতো, তবে এই তিন মাস তারা ঘরে বসে কাটাতে পারতেন।
বন সংরক্ষণ নাকি মানুষের জীবন-জীবিকাÑএই দুই সংকটের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে তিন মাসের এই নিষেধাজ্ঞা। স্থানীয়দের মতে, বনজীবীদের জন্য উপযুক্ত খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে বনের ‘বিশ্রাম’ কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে, বাস্তবে বাড়বে গোপন অনুপ্রবেশ।









