সাতক্ষীরার শাহপুরে ফ্রিল্যান্সারের হাত ধরে গড়ে উঠল বক ও পানকৌড়ির অভয়ারণ্য
পত্রদূত ডেস্ক: একদিকে ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য ওয়েব ডেভেলপমেন্টের কাজ, অন্যদিকে প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের নীরব সাধনা। প্রযুক্তিনির্ভর পেশার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার খেশরা ইউনিয়নের শাহপুর গ্রামের বাসিন্দা ফ্রিল্যান্সার মোহাম্মদ মনজুরুল হাসান গড়ে তুলেছেন বক ও পানকৌড়ি পাখির একটি নিরাপদ অভয়ারণ্য।
মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে তার বাড়ির চারপাশের গাছগুলো আজ পরিণত হয়েছে হাজারো বন্যপাখির নিরাপদ আশ্রয়ে। বর্তমানে এলাকাটির বিভিন্ন গাছে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি বক ও পানকৌড়ি বাসা বেঁধেছে। ডিম পাড়া, বাচ্চা ফোটানো এবং বংশবিস্তার-সব মিলিয়ে প্রতিদিনই মুখর থাকছে পুরো এলাকা। ভোরের কিচিরমিচির আর সন্ধ্যার ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির ফিরে আসা এখন শাহপুর গ্রামের নতুন পরিচয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি বক দেখা গেলেও চলতি বছর হঠাৎ করেই বিপুল সংখ্যক বক ও পানকৌড়ি এখানে এসে বসতি গড়েছে। পাখিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দিন-রাত নজর রাখছেন মোহাম্মদ মনজুরুল হাসান ও তার প্রতিবেশীরা। কেউ যেন পাখির বাসা নষ্ট না করে বা শিকার না করে, সে বিষয়েও সবাইকে সচেতন করা হচ্ছে।
মোহাম্মদ মনজুরুল হাসান বলেন, “বন্যপাখি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই বাড়ায় না, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অবাধ শিকার, জলাভূমি ধ্বংস, অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশে বক ও পানকৌড়ির সংখ্যা কমছে। তাই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী একটি নিরাপদ আশ্রয় তৈরির চেষ্টা করেছি। পাখিগুলো এখানে নিরাপদে থাকুক-এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
তবে এই উদ্যোগের মাঝেও রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জ। এলাকার কয়েকজন কৃষক পাখির বিষ্ঠার কারণে ফসলের ক্ষতির অভিযোগ তুলছেন। ফলে পাখিগুলোকে তাড়িয়ে দেওয়ার দাবি উঠেছে, যা প্রকৃতিপ্রেমীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
স্থানীয় ওয়ার্ডের মেম্বার শামসুল হুদা পল্টু বলেন, “এত সংখ্যক বক ও পানকৌড়ি আমরা আগে কখনও দেখিনি। আমরা সবাইকে নিয়ে পাখিগুলোকে রক্ষা করছি। এটি শুধু শাহপুর নয়, পুরো সাতক্ষীরার জন্য গর্বের বিষয়। সরকারিভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে এটি পর্যটনেরও আকর্ষণ হতে পারে।”
প্রতিবেশী মোছা. মাহমুদা খাতুন বলেন, “শুরুতে অনেকেই বিরক্ত হতেন। কিন্তু এখন সবাই বুঝতে পারছেন, পাখিগুলো আমাদের গ্রামের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। বাইরে থেকেও মানুষ শুধু পাখি দেখতে আসছেন। আমরা চাই এগুলো নিরাপদে থাকুক।”
স্থানীয় শিক্ষক মোছা. নাজমুন নাহার বলেন, “শিশু-কিশোরদের মধ্যে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে এই অভয়ারণ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এটি সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি জীবন্ত শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।”
পরিবেশ সচেতন ব্যক্তিরা মনে করছেন, ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা এ ধরনের বন্যপাখির আবাসস্থল বাংলাদেশে খুবই বিরল। যথাযথ সরকারি স্বীকৃতি, বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা এবং এলাকাবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকলে শাহপুর গ্রামের এই প্রাকৃতিক আবাসস্থল ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বক ও পানকৌড়ির অভয়ারণ্যে পরিণত হতে পারে।
প্রকৃতি সংরক্ষণে একজন ফ্রিল্যান্সারের এই উদ্যোগ ইতোমধ্যেই এলাকায় প্রশংসিত হয়েছে। প্রযুক্তির পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তার এই নীরব প্রচেষ্টা প্রমাণ করে-পরিবেশ রক্ষায় বড় পরিবর্তনের সূচনা একজন মানুষের হাত ধরেও সম্ভব।












