বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬, ৫ ভাদ্র ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬, ৫ ভাদ্র ১৪৩৩

নদী বাঁচাতে শুধু আশ্বাস নয়, চাই দৃশ্যমান পদক্ষেপ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ৩:১১ অপরাহ্ণ
নদী বাঁচাতে শুধু আশ্বাস নয়, চাই দৃশ্যমান পদক্ষেপ

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সাতক্ষীরার নদী-খাল নিয়ে নতুন করে আশার কথা শুনিয়েছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। মঙ্গলবার সাতক্ষীরা সার্কিট হাউসের সম্মেলন কক্ষে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মকসুমুল হাকিম চৌধুরীর সঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় সভায় জেলার নদী-খালের বর্তমান পরিস্থিতি, অবৈধ দখল, নাব্যতাসংকট এবং পরিবেশগত নানা সমস্যা তুলে ধরা হয়।

 

কমিশনের চেয়ারম্যান সমস্যাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং পর্যায়ক্রমে সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। তাঁর একটি বক্তব্য বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখেÑনদী ও খাল রক্ষায় শুধু আইনি পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণ এবং জোরালো সামাজিক আন্দোলন। এই বক্তব্যের মধ্যেই সাতক্ষীরার নদী-খালের সংকটের মূল বাস্তবতা অনেকটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ নদী রক্ষার জন্য দেশে আইন আছে, সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে, আদালতের নির্দেশনা আছে, নদী রক্ষা কমিশন আছে, পরিবেশবাদী সংগঠন আছে।

 

তারপরও কেন নদী-খাল দখল হচ্ছে? কেন খাল ভরাট হয়ে যাচ্ছে? কেন নাব্যতা কমছে? কেন জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার সমস্যা বাড়ছে? প্রশ্নগুলো নতুন নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হলেও বাস্তব পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। সাতক্ষীরা একটি উপকূলীয় জেলা। এ জেলার প্রকৃতি নদী, খাল, বিল, জলাভূমি ও জোয়ার-ভাটার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

 

এখানকার কৃষি, মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জলপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল। ফলে কোনো নদী বা খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে তার প্রভাব শুধু একটি জলাশয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা ছড়িয়ে পড়ে কৃষিজমি, বসতবাড়ি, মাছের ঘের, সড়ক, বাজার এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। বর্ষা এলে এই বাস্তবতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। স্বাভাবিকভাবে বৃষ্টির পানি খাল ও নদীপথে নিষ্কাশিত হওয়ার কথা। কিন্তু কোনো খাল যদি দখল, ভরাট কিংবা পলি জমে সংকুচিত হয়ে পড়ে, তখন পানি নামার পথ বাধাগ্রস্ত হয়। সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা।

 

আবার নদীর নাব্যতা কমে গেলে জোয়ারের পানি প্রবেশ ও ভাটার পানি বের হওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াও ব্যাহত হয়। উপকূলীয় এলাকায় এর সঙ্গে যুক্ত হয় লবণাক্ততার সমস্যা। ফলে নদী-খাল রক্ষার বিষয়টি আসলে জলাবদ্ধতা, কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। নদী-খালের সংকটের অন্যতম কারণ অবৈধ দখল। নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, খালের জায়গা ভরাট করে বসতবাড়ি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, জলপ্রবাহের জায়গা সংকুচিত করাÑএসব কর্মকা- একদিনে তৈরি হয়নি।

 

দীর্ঘদিনের অবহেলা, দুর্বল তদারকি এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহলের নানা ধরনের প্রভাবের কারণে এসব দখল স্থায়ী রূপ পেয়েছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, একটি অবৈধ দখল যখন দীর্ঘদিন টিকে থাকে, তখন সেটিই ধীরে ধীরে স্থানীয় বাস্তবতার অংশ হয়ে যায়। একসময় মানুষ ভুলে যায়, ওই জায়গাটি আসলে নদী বা খালের। এখানে প্রশাসনের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদী-খালের সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল শনাক্ত করা, দখলদার উচ্ছেদ, অবৈধ স্থাপনা অপসারণ এবং পুনরায় দখল ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

 

শুধু উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। উচ্ছেদের পর জায়গাটি কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, কে নজরদারি করবে এবং ভবিষ্যতে নতুন করে কেউ দখল করার চেষ্টা করলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবেÑএসব বিষয়ও নিশ্চিত করতে হবে। নদী রক্ষার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ নাব্যতাসংকট। নদী ও খালে পলি জমা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা না থাকলে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

 

অনেক খাল ও নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়ায় পানির ধারণক্ষমতা কমে যায়। কোথাও আবার জলপ্রবাহের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। একটি খাল অন্য খালের সঙ্গে, খাল নদীর সঙ্গে এবং নদী জোয়ার-ভাটার সঙ্গে যুক্তÑএই স্বাভাবিক জলব্যবস্থাকে বিবেচনায় না নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একটি স্থানে খনন করলে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া কঠিন। তাই সাতক্ষীরার নদী-খাল রক্ষায় প্রয়োজন সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা। শুধু বড় নদী খনন করলেই হবে না; নদীর সঙ্গে যুক্ত খাল, বিল ও জলাভূমির প্রবাহও সচল রাখতে হবে।

 

কোথায় খনন প্রয়োজন, কোথায় দখল উচ্ছেদ জরুরি, কোথায় পানির প্রবাহ পুনঃস্থাপন করতে হবেÑএসব বিষয় নিয়ে বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা করা দরকার। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণও অপরিহার্য। নদী-খালের পাশে বসবাসকারী মানুষই সবচেয়ে ভালো জানেন কোন খাল আগে কতটা প্রশস্ত ছিল, কোথায় পানি চলাচল করত, কোথায় দখল হয়েছে এবং কোথায় পানি আটকে থাকে। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও তথ্যকে গুরুত্ব দিয়ে নদী রক্ষার পরিকল্পনা করলে তা অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।

 

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো এ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। মতবিনিময় সভায় উপস্থিত পরিবেশকর্মীরা সাতক্ষীরার নদী-খালের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁদের মধ্যে দ্য ডেইলি স্টারের সাংবাদিক ও বাপা জেলা কমিটির উপদেষ্টা কল্যাণ ব্যানার্জি, এটিএন বাংলার সাংবাদিক ও বাপা জেলা কমিটির উপদেষ্টা এম কামরুজ্জামান, স্বদেশের নির্বাহী পরিচালক ও বাপার সাধারণ সম্পাদক মাধব চন্দ্র দত্ত, সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও বেলার নেটওয়ার্ক সদস্য শেখ আফজাল হোসেন এবং বেসরকারি সংস্থা ‘হেড’-এর নির্বাহী পরিচালক লুইস রানা গাইনসহ স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

 

এ ধরনের মতবিনিময় গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মাঠের বাস্তবতা অনেক সময় দাপ্তরিক নথির চেয়ে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। তবে শুধু পরিবেশবাদীদের উদ্যোগে নদী রক্ষা সম্ভব নয়। প্রয়োজন গণমাধ্যমের সক্রিয় ভূমিকা। নদী দখল বা দূষণের ঘটনা সামনে এলে সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে জনমত তৈরি হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে গণমাধ্যমের দায়িত্ব হবে শুধু অভিযোগ প্রকাশ না করে সমস্যার কারণ, প্রশাসনিক দুর্বলতা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব এবং সমাধানের পথও তুলে ধরা। ধারাবাহিক অনুসন্ধানী ও বিশ্লেষণধর্মী সাংবাদিকতা নদী রক্ষার আন্দোলনকে শক্তিশালী করতে পারে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

 

তাঁরা জনগণের প্রতিনিধি। তাঁদের উচিত উন্নয়ন কর্মকা-ের সঙ্গে পরিবেশগত বিষয়কে যুক্ত করা। কোনো রাস্তা, সেতু, কালভার্ট, বাঁধ বা স্থাপনা নির্মাণের সময় যাতে নদী-খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা দরকার। উন্নয়ন যদি জলপ্রবাহ বন্ধ করে দেয়, তাহলে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত মানুষের দুর্ভোগই বাড়াবে। সবচেয়ে বড় কথা, নদীকে শুধু পানি নিষ্কাশনের পথ হিসেবে দেখলে চলবে না। নদী একটি জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থা। এর সঙ্গে মাছ, পাখি, জলজ উদ্ভিদ, কৃষি এবং মানুষের জীবন জড়িত। একটি নদী শুকিয়ে গেলে কিংবা একটি খাল ভরাট হয়ে গেলে তার সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি সম্পূর্ণ প্রতিবেশগত ভারসাম্য।

 

তাই নদী রক্ষার প্রশ্নটি পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নও বটে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানের বক্তব্যে যে সামাজিক আন্দোলনের কথা বলা হয়েছে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে নদী সম্পর্কে দায়িত্ববোধ তৈরি করতে হবে। নদী দখলকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়Ñএমন একটি অবস্থান তৈরি করা জরুরি। স্থানীয়ভাবে নদী ও খাল রক্ষা কমিটি গঠন, নিয়মিত নজরদারি, দখলের তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রশাসনকে অবহিত করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

 

স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদেরও নদী ও পরিবেশ রক্ষার কার্যক্রমে যুক্ত করা সম্ভব। একই সঙ্গে নদী রক্ষায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো নদী বা খাল দখল হলে শুধু দখলদারকে দায়ী করলেই প্রশ্ন শেষ হয় না; দীর্ঘদিন ধরে কীভাবে সেই দখল টিকে থাকল, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী করেছে, কোথায় তদারকির ঘাটতি ছিলÑএসব প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন। কারণ নদী দখল অনেক সময় একদিনের ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তারও ফল হতে পারে।

 

সাতক্ষীরার নদী-খাল রক্ষায় এখন প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা। প্রথমে জেলার নদী ও খালের পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও বর্তমান অবস্থা নিরূপণ করতে হবে। এরপর দখল, দূষণ, নাব্যতা ও প্রবাহের সমস্যাকে আলাদা করে চিহ্নিত করতে হবে। অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে সময়সীমাবদ্ধ কর্মসূচি নিতে হবে। কাজের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করলে জবাবদিহিও বাড়বে। মঙ্গলবারের মতবিনিময় সভা তাই শুধু একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

 

এটি সাতক্ষীরার নদী-খাল রক্ষার দীর্ঘদিনের দাবিকে জাতীয় পর্যায়ে আবারও সামনে আনার একটি সুযোগ। এখন এই সুযোগকে কাজে লাগানোর দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সবার। সাতক্ষীরার নদী-খাল বাঁচাতে শুধু আশ্বাস যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ। আইনের প্রয়োগ, প্রশাসনিক সদিচ্ছা, বৈজ্ঞানিক নদী ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের সামাজিক আন্দোলনÑএই চারটি বিষয় একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।

 

নদী রক্ষা কমিশনের আশ্বাস যদি মাঠপর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগে রূপ নেয়, তাহলে তা শুধু নদী-খাল নয়, সাতক্ষীরার প্রাণ-প্রকৃতি ও মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কারণ নদী হারালে শুধু একটি জলধারা হারায় নাÑহারায় একটি জনপদের জীবনপ্রবাহ। তাই নদী বাঁচানোর লড়াই আসলে সাতক্ষীরাকে বাঁচানোর লড়াই।

লেখক: সংবাদকর্মী

 

Ads small one

সন্ত্রাসবাদের শিকারদের প্রতি শ্রদ্ধা: স্মরণ, সহমর্মিতা ও মানবাধিকারের অঙ্গীকার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, ৬:৩০ অপরাহ্ণ
সন্ত্রাসবাদের শিকারদের প্রতি শ্রদ্ধা: স্মরণ, সহমর্মিতা ও মানবাধিকারের অঙ্গীকার

সাকিবুর রহমান বাবলা

প্রতি বছর ২১ আগস্ট বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘সন্ত্রাসবাদের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানানোর আন্তর্জাতিক দিবস’। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০১৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর গৃহীত এ/আরইএস/৭২/১৬৫ প্রস্তাবের মাধ্যমে এই দিবস ঘোষণা করে। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো সন্ত্রাসবাদের কারণে নিহত, আহত এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির শিকার মানুষদের সম্মান জানানো, তাদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা এবং তাদের পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তার প্রতি বিশ্বসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন দিবসের প্রতিপাদ্য হলো ‘স্মৃতির মাধ্যমে নিরাময়’। সন্ত্রাসবাদের শিকার ব্যক্তিদের অ্যাসোসিয়েশন নেটওয়ার্কের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার ভিত্তিতে জাতিসংঘ এই প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে। এর মূল বার্তা হলো-ভয়াবহ ঘটনার স্মৃতিকে শুধু অতীতের অংশ হিসেবে বিবেচনা না করে, সেই স্মৃতিকে ভুক্তভোগীদের মানসিক পুনরুদ্ধার, সম্মান প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক সংহতি জোরদারের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগানো। একই সঙ্গে স্মারক সংরক্ষণ ও স্মৃতি ধারণের গুরুত্বও এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

সন্ত্রাসবাদ দমনে জাতিসংঘ বৈশ্বিক নীতি ও আইনগত কাঠামো তৈরির মাধ্যমে প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে। ২০০৬ সালের বৈশ্বিক সন্ত্রাস দমন কৌশল এবং নিরাপত্তা পরিষদের বিভিন্ন প্রস্তাবের মাধ্যমে এটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও উগ্রবাদ মোকাবেলার পথ সুগম করেছে। পাশাপাশি, ইউনাইটেড নেশনস অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম এবং সন্ত্রাস দমন অফিসের মতো বিশেষায়িত সংস্থাসমূহ দেশগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি ও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

সন্ত্রাসবাদ কেবল একটি সহিংস ঘটনা বা প্রাণহানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতা তৈরি করে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এটি কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল, ধর্ম বা সংস্কৃতির একচ্ছত্র বিষয় নয়; বরং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সংঘাত, দুর্বল শাসনব্যবস্থা, দারিদ্র্য ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মতো বাস্তবতার কারণে রাজনৈতিক, জাতীয়তাবাদী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী বিভিন্ন গোষ্ঠী বোমা হামলা ও অপহরণের মতো সহিংস পথ বেছে নেয় ইদানিং সাইবার হামলা এর অন্তর্ভুক্ত। তাই সন্ত্রাসবাদকে কোনো একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ের সঙ্গে না জড়িয়ে এর মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।

সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিভিন্ন দেশ কঠোর আইন ও বিশেষায়িত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট, চীনে কাউন্টার-টেররিজম আইন এবং সিঙ্গাপুরে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আইন সন্ত্রাস দমনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে সন্ত্রাস বিরোধী আইন, ২০০৯, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আইনি কাঠামোর মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ মোকাবিলা করা হয়। একই সঙ্গে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম, অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট, প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড, স্পেশাল ওয়েপনস অ্যান্ড ট্যাকটিক্স এবং অন্যান্য বিশেষায়িত বাহিনী দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে।

তবে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানো। কোনো হামলার পর সংবাদ শিরোনাম পরিবর্তিত হলেও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও পরিবারগুলোকে দীর্ঘদিন শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। অনেকেই আজীবন মানসিক আঘাত বহন করেন, কেউ হারান কর্মক্ষমতা, আবার অনেক পরিবার হারায় তাদের প্রধান উপার্জনক্ষম সদস্যকে। ফলে চিকিৎসা, পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের কাউন্টার-টেরোরিজম অফিসের উদ্যোগে গঠিত হয়েছে ভিকটিমস অব টেররিজম অ্যাসোসিয়েশনস নেটওয়ার্ক। এই বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মটি সন্ত্রাসবাদের শিকার ব্যক্তি, তাদের পরিবার, ভুক্তভোগী সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের একত্রিত করে। বর্তমানে বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশের ১২০টির বেশি ভুক্তভোগী ও সংগঠন এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। ভুক্তভোগীদের অধিকার রক্ষা, অভিজ্ঞতা বিনিময়, নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, মনোসামাজিক সহায়তা এবং পুনর্বাসন-সংক্রান্ত তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ বৃদ্ধিতে এই নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

সন্ত্রাসবাদের শিকার মানুষের জন্য রাষ্ট্রের করণীয়ের মধ্যে রয়েছে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, বিনামূল্যে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা, ক্ষতিপূরণ ও স্থায়ী সহায়তা তহবিল গঠন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সহমর্মিতা প্রকাশ, সামাজিক অপবাদ দূর করা, পুনর্বাসনে সহযোগিতা করা, রক্তদান ও স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ এবং সন্ত্রাসবিরোধী সচেতনতা গড়ে তোলা একটি মানবিক ও দায়িত্বশীল সমাজ নির্মাণের জন্য অপরিহার্য।

২১ আগস্টের এই আন্তর্জাতিক দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সন্ত্রাসবাদের প্রকৃত মূল্য শুধু নিহতের সংখ্যায় পরিমাপ করা যায় না; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে অসংখ্য পরিবার, সম্প্রদায় এবং প্রজন্মের জীবনে। তাই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করা বিশ্বসমাজের একটি যৌথ দায়িত্ব। স্মরণ, শ্রদ্ধা, মানবাধিকার এবং সহমর্মিতার এই বার্তাই দিবসটির মূল তাৎপর্য।

কেশবপুরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গ্যাসবাহী ট্যাংকার বসতবাড়িতে, ভবন ক্ষতিগ্রস্থ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, ৬:০৪ অপরাহ্ণ
কেশবপুরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গ্যাসবাহী ট্যাংকার বসতবাড়িতে, ভবন ক্ষতিগ্রস্থ

এম আব্দুল করিম, কেশবপুর (যশোর): যশোরের কেশবপুরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি গ্যাসবাহী ট্যাংকার লরি সড়কের পাশের বসতবাড়িতে ঢুকে পড়েছে। এতে বাড়ির বাথরুমসহ ভবনের বিভিন্ন অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেঙে গেছে একটি প্রাইভেটকারের গ্লাস। দুর্ঘটনার সময় ঘরে ঘুমিয়ে থাকা পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তবে অল্পের জন্য বড় ধরনের প্রাণহানি থেকে রক্ষা পেয়েছে ঘুমিয়ে থাকা পরিবারের সদস্যরা।

বুধবার (২০ আগস্ট ২০২৬) ভোরে যশোর-চুকনগর সড়কের কেশবপুর উপজেলার আলতাপোল চারের মাথা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনা কবলিত গ্যাসবাহী ট্যাংকারটির নম্বর চট্টগ্রাম মেট্রো-ঢং-৬১-০৩৯৮।

স্থানীয় সূত্রে জানাগেছে, গ্যাসবাহী ট্যাংকারটি ঢাকা থেকে ছেড়ে খুলনার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল। ভোরে আলতাপোল চারের মাথা এলাকায় পৌঁছালে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্যাংকারটি সড়কের পাশের স্বাস্থ্যকর্মী হাবিবুর রহমানের বাড়িতে সজোরে ধাক্কা করে। এতে বাড়ির বাথরুমের বিল্ডিং ভেঙে ট্যাংকারটি ভেতরে ঢুকে পড়ে। পরে বাড়ির অপর একটি অংশেও আঘাত লাগে।

বাড়ির মালিক হাবিবুর রহমান জানান, দুর্ঘটনার সময় পরিবারের সদস্যরা সবাই ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে গেলে সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। বাইরে এসে তাঁরা দেখতে পান, একটি গ্যাসবাহী ট্যাংকার তাঁদের বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়েছে। এতে বাথরুমসহ বাড়ির বিভিন্ন অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, ভোররাতে সড়কটি দিয়ে ভারী যানবাহন চলাচল করে। জনবসতিপূর্ণ এলাকায় গ্যাসবাহী ট্যাংকারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ যান নিয়ন্ত্রণ হারালে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে। এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

এবিষয়ে থানার অফিসার ইনচার্র রোকসানা খাতুন বলেন খবর পেয়ে পুলিশের একটি টিম ঘটনা স্থল পরিদর্শন করেছে।

 

ভারত থেকে ভোমরা বন্দর দিয়ে ১৫ দিনে ৪ হাজার ৯২ মেট্রিকটন কাঁচামরিচ আমদানি, কমেছে দাম

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৫৭ অপরাহ্ণ
ভারত থেকে ভোমরা বন্দর দিয়ে ১৫ দিনে ৪ হাজার ৯২ মেট্রিকটন কাঁচামরিচ আমদানি, কমেছে দাম

এম শফিকুল ইসলাম, ভোমরা: গত ৩ আগস্ট থেকে ভোমরা স্থল বন্দর ব্যবহার করে ভারত থেকে ৩২০টি ট্রাকে ৪ হাজার ৯২ মেট্রিকটন কাঁচামরিচ আমদানি করা হয়েছে। ভোমরায় কাস্টম হাউজের রাজস্ব শাখা এ তথ্য নিশ্চিত করেন। বন্দর ব্যবসায়ী বলছেন, পর্যাপ্ত কাঁচামরিচ আমদানি হওয়ায় গ্রাম ও শহর অঞ্চলের হাট-বাজারগুলোতে কমেছে কাঁচা মরিচের দাম।

 

এখন কেজি প্রতি কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা থেকে ৮০ টাকায়। যা ১৫ দিন আগে প্রতি কেজি ৩০০ টাকা থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মূল্য স্থিতিশীল ও চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত পরিমাণ আমদানি হওয়ায় এবং স্থানীয় বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহের কারণে সাধারণ ক্রেতারা ক্রয়মূল্য সুবিধা পাচ্ছেন। স্বস্তি ফিরে এসেছে বাজারমূল্যে।

এদিকে বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় কমে গেছে ভারত থেকে কাঁচা মরিচ আমদানি। ভোমরা বন্দর দিয়ে গত ২/৩দিন কাঁচা মরিচ আমদানি নেই বললেও চলে। বাজারে হঠাৎ করে দাম কমে যাওয়ায় এখন মুনাফার পরিবর্তে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা।

 

আমদানিকারক ফারহাদ হোসেন জানিয়েছেন, বিপুল পরিমাণ কাঁচা মরিচ সরবরাহ থাকায় আগস্ট মাস পর্যন্ত বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। পরবর্তী সেপ্টেম্বর মাস থেকে আবার চাহিদায় বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সুতরাং আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান কাঁচা মরিচ আমদানির লক্ষ্য এলসি (ঋণপত্র) খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে আমদানি অনুমতি (আইপি) নিয়ে আবার পুরোদমে চলবে কাঁচা মরিচ আমদানি কার্যক্রম। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে কাঁচা মরিচ আমদানির সম্ভাবনা রয়েছে। নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার আমদানি অনুমতি বহাল রাখে।