সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩

পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার পরিবেশ সংরক্ষণে পাইকগাছা পৌরসভার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬, ৯:৫৫ অপরাহ্ণ
পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার পরিবেশ সংরক্ষণে পাইকগাছা পৌরসভার

প্রকাশ ঘোষ বিধান, পাইকগাছা (খুলনা): খুলনার পাইকগাছা পৌরসভায় আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব মনুষ্য বর্জ্য পরিশোধন প্লান্ট বা সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট চালু হয়েছে। পৌরবাসীর স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে, ওয়াটারএইড ও নবলোক এর সহায়তায় এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। পৌরসভায় এ পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার বা সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট হলো একটি অত্যাধুনিক ব্যবস্থা। যার মাধ্যমে মানব সৃষ্ট মলমূত্র, গোসলের পানি ও গৃহস্থালির বর্জ্যমিশ্রিত দূষিত পানি বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিশোধন করে পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ পানিতে পরিণত করা হয়। এটি পরিবেশ দূষণ ও পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর।

পয়ঃবর্জ্য শোধনাগারের মূল ধাপসমূহ প্রাথমিক শোধন এতে ছাঁকনি ও থিতানো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বর্জ্য পানির ভারী ও ভাসমান কঠিন বস্তু (যেমন- পলিথিন, বালু) আলাদা করা হয়। মাধ্যমিক শোধন এই ধাপে ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে জৈব দূর্বল পদার্থ ও ময়লা পচিয়ে বায়োলজিক্যাল বা রাসায়নিক উপায়ে পানিকে প্রায় সম্পূর্ণ পরিষ্কার করা হয়। তৃতীয় বা উন্নত শোধন বিশেষ প্রক্রিয়ায় পানি থেকে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, ক্ষতিকর রোগজীবাণু ইত্যাদি শতভাগ দূর করা হয়। এরপর পরিশোধিত পানি নদী বা জলাশয়ে নিরাপদে ফেলা যায়।

অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য সরাসরি নদীতে বা খালে পড়লে জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয় ও নদীর পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। শোধনাগার ব্যবহারের ফলে এই দূষণ কমে যায়। ড্রেনেজ ব্যবস্থার উপচে পড়া ময়লা ও দুর্গন্ধ দূর করে এটি পরিবেশকে স্বাস্থ্যকর রাখে। শোধিত পানি কৃষিকাজ, শিল্প-কারখানা বা রাস্তার ধুলোবালু পরিষ্কারের মতো কাজে পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব।

খুলনার পাইকগাছায় প্রথম বারের মতো নির্মিত হয়েছে জাপানি উন্নত প্রযুক্তির পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার। প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয়ে শিববাটী সড়কের পূর্ব পাশে পৌর ভবনের পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে পয়ঃবর্জ্য শোধনাগারটি। দাতা সংস্থা ওয়াটার এইড বাংলাদেশ এর আর্থিক সহায়তায় নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নবলোক পরিষদ। শোধনাগারটি তদারকি ও দেখভাল করবে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে শোধনাগার থেকে ৬০ হাজার লিটার বর্জ্য শোধন করা হয়েছে। শোধনাগারের কার্যক্রম ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছে।

কিছু দিন আগে ও মানব বর্জ্য অপসারণ কিংবা শোধনের কোন ব্যবস্থা ছিল না প্রথম শ্রেণির এ পৌরসভায়। ফলে মানব বর্জ্য অপসারণ নিয়ে নানা বিড়ম্বনার শিকার হতে হতো পৌরবাসিকে। খরচ এবং সময় দুটোই বেশি লাগতো অপসারণের কাজে। বর্জ্য রাখার নির্দিষ্ট জায়গার অভাবে নানা সমস্যায় পড়তেন অনেকেই। অনেকের বাসাবাড়ি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ড্রেন হয়ে চলে যেত নদ-নদী ও খাল-বিলে। এতে পরিবেশ দূষণ হওয়ার পাশাপাশি চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকি ছিলো।

ওয়াটার এইড বাংলাদেশ-এর প্রতিনিধি সুমন সাহা বলেন, ১৫ হাজার লিটার বর্জ্য ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন শোধনাগারটি নির্মাণে প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এটি নির্মাণে জাপানি প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়েছে। বর্জ্য সংগ্রহ করার জন্য ৫০০ লিটার এবং ১০০০ লিটার বর্জ্য বহন সক্ষম দুটি ভেকুট্যাকচার গাড়ি রয়েছে। বাড়িতে কিংবা প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করা হবে পয়ঃ বর্জ্য। এরপর সেগুলো ৪ টি ধাপে শোধন করা হয়। শেষ ধাপে শোধনকৃত পানি পাইপের মাধ্যমে বাইরে বেরিয়ে যায়। বর্জ্য অপসারণের জন্য লিটার প্রতি ১ টাকা খরচ হবে বলে জানান দাতা সংস্থার এ প্রতিনিধি।

পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের ফলে এখন থেকে পরিবেশ দূষণ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকবে না এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্ট পৌর এবং সংস্থা কর্তৃপক্ষ। পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী বলেন এর আগে এলাকায় পয়ঃ বর্জ্য অপসারণের কোন আধুনিক ব্যবস্থা ছিল না। এখন থেকে খুব সহজে এবং স্বল্প খরচে বাসাবাড়ি কিংবা প্রতিষ্ঠানের পয়ঃবর্জ্য অপসারণ করতে পারবেন পৌরসভার বাসিন্দারা। এটি সম্পূর্ণ পরিবেশ বান্ধব। এছাড়া এলাকার নদ-নদী ও খালবিল দূষণ মুক্ত থাকবে, স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকবে না এবং রোগ বালাইয়ের প্রকোপ কমে আসবে।

Ads small one

সাতক্ষীরায় রোগী কল্যাণ সমিতির বার্ষিক সাধারণ সভা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ৭:২৭ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় রোগী কল্যাণ সমিতির বার্ষিক সাধারণ সভা

সংবাদদাতা: রোগী কল্যাণ সমিতির বার্ষিক সাধারণ সভা-২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (২৭ জুলাই) বেলা ১১ টায় সদর হাসপাতাল সম্মেলন কক্ষে হাসপাতাল সমাজ সেবা কার্যালয় সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের আয়োজনে সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ আব্দুস সালামের সভাপতিত্বে বার্ষিক সাধারণ সভায় উপস্থিত ছিলেন রোগী কল্যাণ সমিতির সদস্য ও বিশিষ্ট সমাজসেবক ডাঃ আবুল কালাম বাবলা, মোঃ দ্বিন আলী, সাবেক কাউন্সিলর শেখ শফিক উদ দৌলা সাগর, ডাঃ মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, ডাক্তার মোঃ আব্দুর রহিম, হাকিম রাজু আহম্মেদ, মোঃ হুমায়ুন কবীর, মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী, শেখ সাইফুল ইসলাম, মোঃ তুহিন আলী, মোস্তফা খাইরুল আকবর, মোঃ মাহবুবর রহমান, শেখ নিজাম উদ্দিন প্রমুখ।

রোগী কল্যাণ সমিতি সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে সেবাসমূহ এর মধ্যে রয়েছে হাসপাতালে ভর্তিকৃত গরিব, অসহায় ও অভিভাবকহীন রোগীদের চিকিৎসা স্বার্থে ঔষধ, পথ্য, রক্ত, অপারেশন ও চিকিৎসা সামগ্রী বিতরণ করা হয়। রোগ নির্ণয়ে হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে রোগীকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হয়। গরিব অসহায় ও দুঃস্থ পরিধেয় বস্ত্র ও শীতবস্ত্র সরবরাহ করা হয়।

অসুস্থ গরীব, অসহায় রোগীদের হাসপাতাল ত্যাগের সময় বাড়ী বা অন্য হাসপাতালে গমন বা স্থানান্তর বাবদ যাতায়াত ভাড়া বা এ্যাম্বুলেন্স এর ব্যবস্থা করা হয়।

বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিশু, প্রতিবন্ধী, হিজড়া ব্যক্তি ও প্রবীণদের চিকিৎসা সেবায় অগ্রাধিকার প্রদান।

কাউন্সেলিং এর মাধ্যমে রোগীর মনস্তাত্ত্বিক বিষয় উপলব্ধিসহ সমানুভূতির সাথে আর্থ-সামাজিক সেবা দান, আশ্রয়হীন, ঠিকানাবিহীন ও পরিত্যক্ত শিশু অথবা ব্যক্তির চিকিৎসাসহ প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সমাজসেবা অধিদফতরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

রোগীকে স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ে পরামর্শ প্রদানসহ প্রয়োজনে রোগীর গৃহ পরিদর্শন, ফলোআপ ও পরিবারবর্গের সাথে যোগাযোগপূর্বক পরিবার তথা সমাজে পুনঃএকীকরণে সহায়তা প্রদান।

ক্যান্সার, কিডনী, লিভার সিরোসিস, জন্মগত হৃদরোগ, স্ট্রোকে প্যারালাইজড, থ্যালাসেমিয়াসহ জটিল রোগাক্রান্ত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে সেবা দান ও সমাজসেবা অধিদফতরাধীন বিভিন্ন চিকিৎসা সহায়তা কর্মসূচির আওতায় সেবা/অনুদান প্রাপ্তিতে সহায়তা করা হয়।

এসময় নতুন সদস্য নেওয়ার ব্যাপারে এবং সাংগঠনিক বিবিধ আলোচনা করা হয়।

রোগী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সভার আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রদান করা হয়। মোট আয় কুড়ি লক্ষ পঁচিশ হাজার পাঁচশত এক টাকা বারো পয়সা। মোট ব্যয় এগারো লক্ষ সাতান্ন হাজার আটাত্তর টাকা সাতচল্লিশ পয়সা ধরা হয়েছে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন রোগী কল্যাণ সমিতির সদস্য সচিব শারমিন সুলতানা।

সুখের পেছনে ছুটা নয়/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ৭:০১ অপরাহ্ণ
সুখের পেছনে ছুটা নয়/ সচ্চিদানন্দ দে সদয়

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

“সুখ হলো একটি প্রজাপতির মতো। তুমি যত তাকে তাড়া করবে, ততই সে তোমার নাগালের বাইরে চলে যাবে। কিন্তু যদি তুমি শান্তভাবে বসে থাকো, তবে হয়তো সে নিজেই এসে তোমার কাঁধে বসবে।”Ñবিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক ন্যাথানিয়েল হথর্নের এই উক্তিটি শুধু একটি সুন্দর উপমাই নয়; এটি মানুষের জীবনবোধের এক গভীর দর্শন। আধুনিক সভ্যতার দ্রুতগতির জীবন, প্রতিযোগিতার চাপ এবং ভোগবাদী মানসিকতার ভিড়ে এই কথাটি যেন আজ আরও বেশি সত্য হয়ে উঠেছে। মানুষ আজ সুখের জন্য যত বেশি ছুটছে, সুখ যেন ততই অধরা হয়ে পড়ছে। মানুষের জীবনের প্রতিটি প্রচেষ্টার কেন্দ্রে থাকে সুখের অনুসন্ধান।

 

শিশুর পড়াশোনা, তরুণের কর্মজীবন, ব্যবসায়ীর বিনিয়োগ, কৃষকের মাঠে পরিশ্রম, শিল্পীর সৃষ্টিকর্ম কিংবা রাজনীতিবিদের জনসেবাÑসবকিছুর পেছনেই কোথাও না কোথাও সুখের আকাক্সক্ষা কাজ করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সুখ কি সত্যিই এমন কিছু, যা কেবল অর্জনের মাধ্যমে পাওয়া যায়? নাকি সুখ এমন এক অনুভূতি, যা আমাদের মনোজগতের গভীরে লুকিয়ে থাকে? আজকের পৃথিবীতে সাফল্যের সংজ্ঞা অনেকটাই বস্তুগত অর্জনের সঙ্গে যুক্ত। কে কত বড় বাড়ির মালিক, কার গাড়ি কত দামি, কে কত অর্থ উপার্জন করেন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার অনুসারী কতÑএসব দিয়ে অনেকেই সুখের পরিমাপ করতে চান। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। পৃথিবীর বহু ধনী মানুষও মানসিক অবসাদ, উদ্বেগ ও একাকীত্বে ভোগেন।

 

আবার সীমিত আয়ের বহু মানুষকে দেখা যায় পরিবার, প্রকৃতি ও আন্তরিক সম্পর্কের মধ্যেই পরম তৃপ্তিতে জীবন কাটাতে। অর্থাৎ সুখের সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক থাকলেও সুখের উৎস কেবল অর্থ নয়। অর্থ মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে, নিরাপত্তা দেয়, সুযোগ সৃষ্টি করে; কিন্তু মনের শান্তি কিনে দিতে পারে না। একটি নির্দিষ্ট সীমার পর অর্থের পরিমাণ বাড়লেও সুখের পরিমাণ সমানুপাতিকভাবে বাড়ে না। বরং নতুন সম্পদ নতুন দায়িত্ব, নতুন উদ্বেগ এবং নতুন প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়। বর্তমান সমাজে সুখকে সবচেয়ে বেশি দূরে ঠেলে দিচ্ছে তুলনার সংস্কৃতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন আমরা অন্যের সাজানো জীবন দেখি।

 

কারও বিদেশ ভ্রমণ, কারও নতুন গাড়ি, কারও সাফল্যের গল্প কিংবা বিলাসবহুল জীবনযাপন দেখে নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে হয়। অথচ আমরা ভুলে যাই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ তার জীবনের সেরা মুহূর্তগুলোই প্রকাশ করে; ব্যর্থতা, কান্না, হতাশা কিংবা একাকীত্ব খুব কমই প্রকাশ পায়। এই তুলনা মানুষের মনে অপ্রাপ্তির বোধ সৃষ্টি করে। ফলে নিজের জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলোও আর চোখে পড়ে না। যে মানুষ গতকাল পর্যন্ত নিজের পরিবার, সন্তান কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে আনন্দ পেতেন, আজ তিনি অন্যের জীবন দেখে নিজের সুখকেও অসম্পূর্ণ ভাবতে শুরু করেন। এভাবেই সুখ ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়।

 

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষের মন খুব দ্রুত নতুন অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেয়। এটিকে বলা হয় হেডোনিক অ্যাডাপটেশন। অর্থাৎ যে জিনিসটি একসময় আমাদের খুব আনন্দ দেয়, কিছুদিন পর সেটিই স্বাভাবিক হয়ে যায়। নতুন ফোন, নতুন বাড়ি, নতুন চাকরি বা পদোন্নতির আনন্দও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তখন আবার নতুন কিছু পাওয়ার আকাক্সক্ষা তৈরি হয়। এই অন্তহীন চক্রের মধ্যেই মানুষ সুখের পেছনে ছুটতে থাকে, কিন্তু স্থায়ী প্রশান্তি খুঁজে পায় না।বাংলার প্রাচীন দর্শন দর্শনÑসবখানেই সুখের মূল উৎস হিসেবে অন্তরের শান্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বুদ্ধও বলেছেন, আকাক্সক্ষাই দুঃখের মূল কারণ। আকাক্সক্ষা যত বাড়বে, অস্থিরতাও তত বাড়বে। আবার আকাক্সক্ষাকে পুরোপুরি ত্যাগ নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ করার মধ্যেই রয়েছে মুক্তির পথ।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর বহু রচনায় সুখকে বাহ্যিক অর্জনের পরিবর্তে অন্তরের বিকাশের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর দর্শনে মানুষ তখনই সত্যিকারের সুখী হয়, যখন সে প্রকৃতির সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে এবং নিজের অন্তরের সঙ্গে সুর মিলিয়ে চলতে পারে। জীবনানন্দ দাশের কবিতাতেও প্রকৃতির নির্জন সৌন্দর্যের মধ্যে যে প্রশান্তির সন্ধান পাওয়া যায়, তা আমাদের শেখায়Ñসুখ সব সময় কোলাহলের মধ্যে থাকে না। আজকের শিশু-কিশোররাও এই অস্থিরতার শিকার। পরীক্ষার ফল, প্রতিযোগিতা, ক্যারিয়ারের চাপ এবং অভিভাবকদের অতিরিক্ত প্রত্যাশা তাদের শৈশবের আনন্দ কেড়ে নিচ্ছে। তারা ভালো মানুষ হওয়ার আগে সফল মানুষ হওয়ার শিক্ষা পাচ্ছে। ফলে সাফল্য এলেও আনন্দ অনেক সময় আসে না।

 

শিক্ষা যদি কেবল প্রতিযোগিতা শেখায়, কিন্তু জীবনকে উপভোগ করতে না শেখায়, তবে সেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। একই ছাদের নিচে বসবাস করেও অনেক পরিবারে আন্তরিক আলাপের সময় নেই। সবাই ব্যস্ত নিজের কাজ, নিজের মোবাইল কিংবা নিজের জগৎ নিয়ে। অথচ একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়; পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান এবং সময়। যে পরিবারে আন্তরিক সম্পর্ক থাকে, সেখানে সীমিত সম্পদেও সুখের অভাব হয় না। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সুখ একটি সামাজিক বিষয়ও।

 

যে সমাজে বৈষম্য কম, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত, স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য, শিক্ষা সবার নাগালে এবং মানুষ একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীলÑসেই সমাজে মানুষ তুলনামূলক বেশি সুখী থাকে। অন্যদিকে দুর্নীতি, বৈষম্য, বেকারত্ব, সহিংসতা ও অনিশ্চয়তা মানুষের মানসিক প্রশান্তিকে নষ্ট করে দেয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে অর্থনৈতিক অগ্রগতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উন্নয়নের লক্ষ্য যদি কেবল মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি হয়, আর মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য, পরিবেশ, সামাজিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক চর্চা উপেক্ষিত থাকে, তবে সেই উন্নয়ন পূর্ণতা পায় না। উন্নয়নের প্রকৃত মানদ- হওয়া উচিত মানুষের জীবনমান, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং সুখের অনুভূতি।

সুখের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো কৃতজ্ঞতা। আমরা যা পাইনি, তা নিয়েই বেশি ভাবি; অথচ যা পেয়েছি, তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভুলে যাই। সুস্থ শরীর, পরিবারের ভালোবাসা, বন্ধুদের আন্তরিকতা, প্রতিদিনের সূর্যোদয় কিংবা একটি শান্ত সন্ধ্যাÑএসবের মূল্য অনেক সময় আমরা বুঝতে পারি না। অথচ এসবই জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। মানুষ যখন অন্যের উপকার করে, সমাজের জন্য কিছু করে কিংবা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তখন তার মনে যে আনন্দ জন্ম নেয়, তা কোনো বস্তুগত অর্জনের সঙ্গে তুলনীয় নয়।

 

গবেষণায়ও দেখা গেছে, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, দান এবং সামাজিক অংশগ্রহণ মানুষের মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধি করে। কারণ মানুষ স্বভাবগতভাবেই সামাজিক প্রাণী; অন্যের সুখের সঙ্গে নিজের সুখও জড়িয়ে থাকে। প্রকৃতিও সুখের এক অনন্য উৎস। অথচ আধুনিক নগরজীবনে মানুষ প্রকৃতি থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। নদী, গাছ, পাখি, খোলা আকাশ কিংবা বৃষ্টির শব্দÑএসবের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কমে যাচ্ছে। প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার মধ্যেও যে গভীর মানসিক প্রশান্তি রয়েছে, তা আজ বৈজ্ঞানিক গবেষণায়ও প্রমাণিত।

 

প্রজাপতির উপমাটি আমাদের আরও একটি শিক্ষা দেয়। প্রজাপতি কখনো কোলাহল পছন্দ করে না। শান্ত পরিবেশেই সে বসে। সুখও তেমনই। অস্থিরতা, লোভ, অহংকার, হিংসা এবং অযথা প্রতিযোগিতার মধ্যে সুখ বেশিক্ষণ থাকে না। সুখ আসে তখনই, যখন মানুষ নিজের ভেতরে শান্তির একটি আশ্রয় গড়ে তুলতে পারে। তাই সুখের জন্য লক্ষ্যহীন হয়ে বসে থাকাও সমাধান নয়। মানুষকে অবশ্যই পরিশ্রম করতে হবে, স্বপ্ন দেখতে হবে, সাফল্যের জন্য চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু সেই চেষ্টা যেন অস্থিরতা, লোভ বা আত্মবিনাশের কারণ না হয়। কাজের প্রতি নিষ্ঠা থাকবে, কিন্তু ফলের প্রতি অতি-আসক্তি থাকবে না। অর্জনের আনন্দ থাকবে, কিন্তু প্রাপ্তির অহংকার থাকবে না। এই ভারসাম্যই মানুষকে প্রকৃত সুখের কাছাকাছি নিয়ে যায়।

 

আমরা যদি সন্তানদের কেবল সফল নয়, সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারি; যদি পরিবারে একসঙ্গে বসে কথা বলার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে পারি; যদি সমাজে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সহযোগিতার মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারি; যদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানসিক সুস্থতা ও মানবিকতাকে গুরুত্ব দিইÑতবেই সুখী সমাজ গড়ার পথে এগোনো সম্ভব। শেষ পর্যন্ত সুখ কোনো গন্তব্য নয়, কোনো পুরস্কারও নয়। সুখ হলো জীবনযাপনের একটি শিল্প। এটি ছোট ছোট মুহূর্তে, আন্তরিক সম্পর্কের উষ্ণতায়, কৃতজ্ঞতার অনুভূতিতে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে এবং নিজের সঙ্গে নিজের শান্তিপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। প্রজাপতিকে ধরতে দৌড়ালে সে উড়ে যায়। কিন্তু ফুলে ভরা একটি সুন্দর বাগান তৈরি করলে প্রজাপতি নিজেই সেখানে আসে।

 

মানুষের জীবনও ঠিক তেমন। সুখের পেছনে অন্ধভাবে ছুটে বেড়ানোর চেয়ে এমন একটি সুন্দর, সৎ, সংযমী ও মানবিক জীবন গড়ে তোলাই শ্রেয়, যেখানে সুখ নিজেই একদিন নীরবে এসে আমাদের কাঁধে বসবে। তখন সুখ আর ক্ষণিকের অনুভূতি থাকবে না; তা হয়ে উঠবে জীবনযাপনের স্বাভাবিক সঙ্গী।

লেখক: সংবাদকর্মী

 

প্রাকৃতিক ব্রাশ : দাঁতের যত্নে নিম ডাল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ৬:৫৫ অপরাহ্ণ
প্রাকৃতিক ব্রাশ : দাঁতের যত্নে নিম ডাল

‎তারিক ইসলাম

‎ডিজিটাল যুগের আধুনিক বিজ্ঞাপনের ঝলকানিতে আমরা প্রতিদিন প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন টুথপেস্ট ও টুথব্রাশের মুখোমুখি হচ্ছি। কেমিক্যালযুক্ত পণ্য আর মেকানিক্যাল ব্রাশের ভিড়ে আমরা ভুলে যেতে বসেছি আমাদের পূর্বপুরুষদের শতবর্ষী স্বাস্থ্যচর্চার অভ্যাসগুলো। গ্রামীণ জীবনের সেই চেনা দৃশ্য-সকালে ঘুম থেকে উঠে নিমের ডাল দিয়ে দাঁত মাজা-কেবলই একটি প্রাচীন প্রথা ছিল না, বরং এর পেছনে লুকিয়ে ছিল নিবিড় বৈজ্ঞানিক ভিত্তি।

‎বর্তমান আধুনিক দন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভেষজ উপায়ের কার্যকারিতাকে স্বীকার করে নিয়েছে। নিমের ডাল দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করার ঐতিহ্যিক এই অভ্যাসের রয়েছে বহুমুখী স্বাস্থ্যগত উপকারিতা।

‎প্রাকৃতিক অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিফাংগাল উপাদান :
‎নিমের ডালে রয়েছে ‘নিমবিন’, ‘নিমবিডিন’ ও ‘মারগোসিন’ নামক শক্তিশালী জৈব উপাদান। এই রাসায়নিক উপাদানগুলো মুখের ভেতরের ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাস ধ্বংস করতে অত্যন্ত কার্যকরী। আধুনিক টুথপেস্টে ব্যবহৃত কৃত্রিম উপাদানের বিপরীতে নিম সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে মুখগহ্বরের ক্ষতিকারক জীবাণু দমন করে।

‎পায়োরিয়া ও মাড়ির রোগ প্রতিরোধ :
‎মাড়ি থেকে রক্ত পড়া, মাড়ি ফুলে যাওয়া বা পায়োরিয়ার মতো সমস্যায় নিম ডাল ব্যবহারে অলৌকিক উপকার পাওয়া যায়। নিমের প্রদাহনাশক উপাদান মাড়ির টিস্যুকে শক্ত ও সতেজ রাখে। নিয়মিত নিম ডাল দিয়ে দাঁত মাজলে মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার প্রবণতা অনেকাংশে কমে যায়।

‎মুখের দুর্গন্ধ দূরীকরণ :
‎মুখের দুর্গন্ধের প্রধান কারণ হলো দাঁতের খাঁজে জমে থাকা অ্যানারোবিক ব্যাকটেরিয়া। নিমের প্রাকৃতিক তিতকুটে রস ও সুবাস এই ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি রোধ করে দীর্ঘ সময় মুখ সতেজ ও দুর্গন্ধমুক্ত রাখে। কোনো কৃত্রিম মাউথওয়াশ নিমের মতো দীর্ঘস্থায়ী ও নিরাপদ সুরক্ষা দিতে পারে না।

‎প্লাক ও ক্যাভিটি প্রতিরোধ :
‎দাঁতের ওপর জমে থাকা মেচেতা বা ‘প্লাক’ হলো ক্যাভিটি বা দাঁত ক্ষয়ের প্রধান কারণ। নিম ডাল চিবিয়ে তৈরি করা মেছওয়াক (প্রাকৃতিক ব্রাশ) দাঁতের এনামেলকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেই দাঁতের ফাঁকে থাকা প্লাক ও খাবারের কণা দূর করতে সাহায্য করে। নিমের প্রাকৃতিক রস এসিডিক প্রভাব কমিয়ে মুখের পিএইচ ভারসাম্য বজায় রাখে, ফলে দাঁত ক্ষয়ের ঝুঁকি হ্রাস পায়।

‎রাসায়নিক মুক্ত মুখগহ্বরের যতœ :
‎বাজারে প্রচলিত অনেক টুথপেস্টে ট্রাইক্লোসান, সোডিয়াম লরিল সালফেট এবং কৃত্রিম সুগন্ধি থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। নিম ডাল ব্যবহারে এই ধরণের কোনো রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি থাকে না। এটি সম্পূর্ণ ১০০% প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব।

‎আমাদের যান্ত্রিক জীবনে যেখানে সুস্থ থাকার জন্য প্রাকৃতিক উপাদানের দিকে ফিরে যাওয়ার জোয়ার উঠেছে, সেখানে আমাদের নিজস্ব লোকজ ঐতিহ্য নিমের ব্যবহারকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। ব্যস্ত নাগরিক জীবনে প্রতিদিন সম্ভব না হলেও সপ্তাহে অন্তত দুই-একদিন সকালে প্রাকৃতিক নিমের ডাল বা অর্গানিক নিম ভিত্তিক সামগ্রী ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।

‎সামান্য সদিচ্ছা আর প্রাচীন এই অভ্যাসের চর্চা আমাদের উপহার দিতে পারে রাসায়নিক মুক্ত, সুস্থ ও সুন্দর এক চিলতে অমলিন হাসি।

‎লেখক: তারিক ইসলাম, ‎সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।