বজ্রপাতের ভয়াল থাবা: জীবন বাঁচাতে করণীয় কী?
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
বাংলাদেশে দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে বজ্রপাত। প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বজ্রপাতে প্রাণ হারাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। বিশেষ করে মাঠে কর্মরত কৃষক, জেলে, দিনমজুর ও খোলা আকাশের নিচে কাজ করা সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাতের তীব্রতা ও ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সচেতনতা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ধর্মীয় শিক্ষার অনুসরণ করলে এ দুর্যোগে প্রাণহানি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
কোরআনে বজ্রপাত: পবিত্র আল-কোরআনে বজ্রপাতকে মহান আল্লাহ তাআলার অসীম ক্ষমতা ও মহিমার নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা আর-রাদের ১৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, “মেঘের গর্জন তাঁর প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করে এবং ফেরেশতারাও তাঁর ভয়ে পবিত্রতা ঘোষণা করে। তিনি বজ্রপাত প্রেরণ করেন, অতঃপর যাকে ইচ্ছা তা দ্বারা আঘাত করেন।”
এ আয়াত মানুষের জন্য সতর্কবার্তা ও শিক্ষা বহন করে। প্রকৃতির শক্তির সামনে মানুষের অসহায়ত্ব এবং মহান আল্লাহর ক্ষমতার প্রতি বিনয়ী হওয়ার আহ্বান এতে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। একই সঙ্গে সূরা আর-রূমের ৪১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ”মানুষের কৃতকর্মের কারণেই স্থলে ও জলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। পরিবেশবিদদের মতে, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, পরিবেশ দূষণ এবং জলবায়ুর ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কোরআনের এ সতর্কবাণীর সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বজ্রপাতের সময় ইসলামের শিক্ষা: হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, বজ্রধ্বনি শুনলে রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর স্মরণ করতেন এবং দোয়া পাঠ করতেন, ”সুবহানাল্লাযি ইউসাব্বিহুর রা’দু বিহামদিহি ওয়াল মালাইকাতু মিন খীফাতিহি”। ইসলামে যেকোনো বিপদ-আপদে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনার পাশাপাশি নিজের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় বিশেষজ্ঞরা বলেন, বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠ, উঁচু স্থান ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিহার করে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়া ইসলামের শিক্ষারই অংশ।
বিজ্ঞান যা বলছে: আবহাওয়া ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রপাত একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা। এটি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে যথাযথ সতর্কতা ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী: বজ্রপাতের পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা নিয়মিত অনুসরণ করতে হবে। বজ্রঝড়ের সময় খোলা মাঠ, জলাশয় ও উঁচু স্থানে অবস্থান করা যাবে না। নিরাপদ পাকা ভবন বা আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনায় বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি জোরদার করতে হবে।
রাষ্ট্রের করণীয়: বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রপাত মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় আধুনিক পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও সম্প্রসারণ করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমে বজ্রপাত থেকে নিরাপদ থাকার নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। সচেতনতাই হতে পারে প্রাণরক্ষার প্রধান হাতিয়ার
বজ্রপাত একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও অসচেতনতা ও অবহেলার কারণে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে। কোরআনের শিক্ষা মানুষকে সতর্কতা, দায়িত্ববোধ ও মহান আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের বার্তা দেয়।












