সম্পাদকীয়/উপকূলের কান্না ও পাউবো’র ‘জোড়াতালি’র অবসান হোক
বর্ষা মৌসুমের আগমন মানেই সাতক্ষীরার উপকূলীয় শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার মানুষের বুকে কাঁপন ধরা। বছরের পর বছর ধরে জরাজীর্ণ বেড়িবাঁধ, নদীভাঙন আর জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা এ অঞ্চলের মানুষের ললাটলিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২১জুন দৈনিক পত্রদূতে প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে, শ্যামনগর ও আশাশুনির অন্তত ৪০টি পয়েন্টে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধ ভেঙে বা ফাটল ধরে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
এর মধ্যে আশাশুনির তেঁতুলিয়া সেতুর পাড়, কুড়িকাউনিয়া, হরিষখালী, কাকবাসিয়া কিংবা শ্যামনগরের পদ্মপুকুর, গাবুরা ও বুড়িগোয়ালিনীর মতো বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ এখন লোনা পানিতে প্লাবিত হওয়ার চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। ভাঙন যখন মানুষের দোরগোড়ায় এসে ঠেকেছে, তখন পাউবো’র ধীরগতির ও আংশিক সংস্কারকাজ উপকূলবাসীকে কোনোভাবেই আশ্বস্ত করতে পারছে না।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য এই নদীই যেন দুঃখ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কপোতাক্ষ, মরিচ্চাপসহ বিভিন্ন নদ-নদীর ভাঙনে বছরের পর বছর ধরে ভিটেমাটি হারাচ্ছেন হাজারো মানুষ। আশাশুনির কুড়িকাহুনিয়া গ্রামের শফিকুল ইসলামের মতো অনেকেই একবার বসতভিটে হারিয়ে যেখানে আশ্রয় নিয়েছেন, ভাঙতে ভাঙতে নদী এখন সেখানেও হানা দিয়েছে। সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্যমতে, দুটি বিভাগের আওতায় প্রায় ২০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের ৪০টি স্থান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অথচ এর মধ্যে মাত্র ১০ কিলোমিটারের মতো জায়গায় সংস্কারকাজ চলছে এবং বাকি অংশের জন্য এখনো বরাদ্দের অপেক্ষা করা হচ্ছে। বর্ষার পূর্ণ মৌসুম শুরু হওয়ার পর এই বরাদ্দ আর সংস্কারের লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কতটুকু কাজে আসবে, তা সহজেই অনুমেয়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগÑপাউবো প্রতিবছর যে সংস্কারকাজ করে, তা অধিকাংশ সময়ই ‘দায়সারা’ ও ‘জোড়াতালি’র শামিল। ফলে বর্ষা বা সামান্য জলোচ্ছ্বাস এলেই সেই বাঁধ খড়কুটোর মতো ভেসে যায়। পরিবেশবিদ ও স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, প্রতিবছর যেনতেনভাবে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে বাঁধ মেরামতের নামে সরকারি অর্থের অপচয় না করে, একবারে স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হোক। আধুনিক প্রকৌশল বিদ্যা ব্যবহার করে ব্লক বা শক্তিশালী সিসি জিওব্যাগ দিয়ে যদি স্থায়ী বাঁধ দেওয়া না হয়, তবে এই ক্ষণস্থায়ী জোড়াতালি কোনো দীর্ঘমেয়াদি সুফল আনবে না।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই ক্রান্তিকালে উপকূলের মানুষকে এভাবে প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর ঝুঁকিতে রাখা অমানবিক। আমরা মনে করি, সরকারের নীতি নির্ধারকদের অবিলম্বে সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের এই বেড়িবাঁধ সংকটকে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বরাদ্দের অজুহাত সরিয়ে রেখে জরুরি ভিত্তিতে এই ৪০টি পয়েন্টসহ সমগ্র উপকূলের ২০ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ সংস্কারে শতভাগ সক্ষমতা নিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে পাউবো’র কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। উপকূলের মানুষ কেবল একটু নিরাপদে ঘুমানোর অধিকার চায়; সেই ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আর কতকাল সময় লাগবে, এটাই এখন বড় প্রশ্ন।












