শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩

বাংলা সাহিত্য উত্তরণের উপাখ্যান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৩২ অপরাহ্ণ
বাংলা সাহিত্য উত্তরণের উপাখ্যান

এড. সৈয়দ ইফতেখার আলী

কালের বিচারে বাংলা সাহিত্যকে তিনটা মোটা দাগে বিভক্ত করা হয়েছে। নানাবিধ মতভেদের মধ্যেও এই তিনটি মৌলিক বিভাজন হল ঃ (১) প্রাচীন যুগ (২) মধ্য যুগ (৩) আধুনিক যুগ। শিরোনামে উল্লেখিত বিবর্তনের আলোচনায় স্বাভাবিক নিয়মেই প্রাচীন যুগ নামক অধ্যায়টিকে পরিত্যাগ করলেও চলে। তবে সামগ্রিক বাংলা সাহিত্যের উৎসের বিচারে একে একেবারে উপেক্ষাও করা যায় না। সংক্ষেপে এতটুকু বলা যায় যে, প্রাচীন যুগের বাংলা সাহিত্যের নিদর্শন মিলেছে মাত্র দুটি। একটি হল চর্যাপদ আর অন্যটি হল নাথ সাহিত্যে। অবশ্য চর্যাপদের ভাষা প্রকৃত বাংলা কিনা তা নিয়ে মতভেদ আছে। অবশ্য এতটুকু বলা যায় যে বাংলার আগের স্তরে যে কথ্য প্রকৃত ভাষা প্রচলিত ছিল এটি সেই ভাষা। এছাড়া অন্য এক নিদর্শন নাথ সাহিত্য প্রাচীর যুগের নিদর্শন হলেও এটির লিখিত নিদর্শন পাওয়া গেছে অনেককাল পরে। বিশেষত মধ্যযুগের মধ্যবর্তী সময়ের। ফলে সময়ের বিবর্তনে এটির ভাষাও তথ্য উভয়ই বদলে গেছে।

 

এবার মধ্যযুগের কথায় আসা যাক। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাবার আগে সময়ের বিচার প্রসঙ্গে এ কথা পরিস্কার করে নেওয়া দরকার যে ইতিহাসসহ অন্যান্য বিচারে যাই হোক না কেন সাহিত্যের বিচারে মধ্যযুগের শুরু বারোশ খ্রিষ্টাব্দ থেকে। এর আগে যতদূর যাওয়া যায় তা প্রাচীন যুগের অন্তর্ভূক্ত। আর বারোশ খ্রিষ্টাব্দ থেকে আঠারোশো খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মধ্যযুগের সীমানা।

 

আঠারোশো খ্রিষ্টাব্দ থেকে আধুনিক যুগের সূচনা। মধ্যযুগেই বিপুল পরিমাণ সাহিত্যের নিদর্শন পাওয়া গেছে। শৈল্পিক মান যাই হোক না কেন পরিমাণের দিক থেকে আধুনিক সাহিত্যের তুলনায় কোন অংশ কম নয়। বিশেষত সেই সময়কার ছাপাখানা বিহীন কাগজ-কলমের দুলর্ভতার কথা বিবেচনা করলে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের নিদর্শনসমূহ মূলতঃ পঞ্চদশ শতাব্দী অর্থাৎ চৌদ্দশো খ্রিষ্টাব্দ থেকে মিলতে শুরু করেছে। এটাকে পুজি করে কোন কোন লেখক আগের দুটি শতাব্দীকে অন্ধকার যুগ বলে আখ্যায়িত করতে চান। সামগ্রিক গবেষণায় তথাকথিত অন্ধকার যুগ মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে। সেই সময়েই আবার শূন্যপুরাণ নামে একটা কাব্যগ্রন্থের নিদর্শন মিলেছে।

 

মোটা দাগে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা:- (১) ধর্মভিত্তিক সাহিত্য (২) রোমাপ্ট সাহিত্য। ধর্মভিত্তিক সাহিত্যকে চারভাগে ভাগ করা যায়। যথাÑ (১) বৌদ্ধ ধর্মীয় (২) হিন্দু ধর্মীয় (৩) ইসলাম ধর্মীয় (৪) ধর্ম সমন্বয়। প্রথমে আসা যাক বৌদ্ধ ধর্মীয় বিষয়ক সাহিত্যে। এই ধারার সাহিত্যের সূচনা হয়েছিল প্রাচীন যুগ থেকেই। অনেকের মতে বৌদ্ধদের হাতইে বাংলা সাহিত্যের সূচনা হয়েছিল।

 

তৎকালীন বাংলা ভাষা ছিল তাদের ধর্মপ্রচারের বাহন। তারা মূলতঃ গানে গল্পে রঙ্গিয়ে রসিয়ে ধর্মীয় তত্ত্বকথা শোনাতেন। বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রচারকদের বলা হত বৈতালিক। পুরুষেরা গাইতেন থেরগাঁথা। আর মহিলারা গাইতেন থেরিগাঁথা। চর্যাপদের পুরোটাই বৌদ্ধ ধর্মীয় বিষয়ক রচনা। পরবর্তীকালে নাথ সাহিত্যও ছিল বৌদ্ধ প্রভাবিত। এছাড়া হিন্দু ও ইসলাম ধর্মীয় সাহিত্যেরও বড় একটা অংশ ছিল বৌদ্ধ ধর্মতত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত। ডাঃ আহমদ শরিফ যাকে বলেছেন “প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ সাহিত্য।” এরপর আসা ২ যাক হিন্দু ধর্মীয় বিষয় সাহিত্যে। এই সাহিত্যের ধারাটি সংখ্যায় বিপুল। যা উনবিংশ শতাব্দীতে চরমরূপ পেয়েছিল। সেই থেকে জনমনে এমন বিভ্রান্তিরও সৃষ্টি হয়েছিল যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বুঝি হিন্দুর দ্বারা সৃষ্ট ও চর্চিত। যা আজও কারো কারও মনে বৃদ্ধমূল।

 

আগেই বলা হয়েছে যে বাংলা সাহিত্যের সূচনা হয়েছিল বৌদ্ধ ধর্মীয় তাত্ত্বিকদের হাতে। এছাড়াও সেন বংশের শাসনামলে হিন্দু শাস্ত্রের এই ফতোয়া ছিল যে, ‘‘অষ্টাদশ পুরানানি রামস্য চরিতানিচ। ভাষায়ং মানব শ্রুতায় গৌরব নরকংব্রজেত্ম’’ অর্থাৎ রামায়ণ, অষ্টাদেশ পুরান প্রভৃতি জনগণের ভাষায় প্রচার করলে তাকে রৌরব নরকে যেতে হবে।

 

এখানে উল্লেখ্য যে, হিন্দু শাস্ত্রে সবচাইতে বেশি গুরুত্ব রাখে বেদ, তারপর মহাভারত তারও পরে রামায়ণ পুরাণের স্থান। যা থেকে হিন্দু ধর্মীয় সাহিত্যের প্রধান প্রধান ধারাগুলি হল (১) মঙ্গল কাব্য (২) বৈষ্ণব পদাবলী (৩) জীবনী কাব্য (৪) অনুবাদ কাব্য। মঙ্গল কাব্যগুলি প্রধানত উপাখ্যান ধর্মী কাব্য। মনষা, চন্ডী প্রভৃতি লৌকিক দেবদেবীর মর্তো পূজা প্রতিষ্ঠার কাহিনী অবলম্বনে রচিত।

 

দ্বিতীয় ধারার সাহিত্য মূলতঃ বৈষ্ণব গোষ্ঠীর রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক খন্ড কবিতা। এই ধারার কাব্যেই মানবিক প্রেমের আদি উন্মেষ লক্ষ্য করা যায়। জীবনী কাব্য মূলতঃ মধ্যযুগের ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতের প্রচারক শ্রী চৈতন্যদেবের জীবন কাহিনী অবলম্বনে রচিত। এর মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে প্রথমবারের মত জীবন্ত মানুষকে নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি শুরু হল। সর্বশেষ অনুবাদ সাহিত্যে ছিল রামায়ণ, মহাভারত ভাগবতের অনুবাদ।

 

এবার আসা যাক ইসলাম ধর্ম সন্বন্ধীয় সাহিত্যে। এই ধারার সাহিত্য বাংলা সাহিত্যে নতুন মাত্রা ও সৌন্দর্য নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল। কেননা বাংলা তথা উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলে ইসলামের আগমন ঘটেছিল তিনটি চ্যালেঞ্জ বা জটিলতা নিয়ে। প্রথমত এ অঞ্চলে ইসলামই ছিল প্রথম বিদেশী ধর্ম। কেননা হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন প্রভৃতি ধর্ম ছিল এ অঞ্চলে উদ্ভুত ও বিকশিত। এই উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে বিদেশী ধর্মের কিছু প্রভাব থাকলেও এই পূর্বাঞ্চল ছিল সম্পূর্ণ এর বাহিরে।

 

দ্বিতীয়ত ইসলামের মাধ্যমেই এই অঞ্চলে কোন তৌহিদি বা একাত্ববাদী ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হল। ইতিপূর্বে প্রতিষ্ঠিত ধর্মগুলি ছিল বহুত্ববাদী। এমনকি বৌদ্ধ ধর্মও এর বাইরে ছিল না। তৃতীয়ত ইসলামের মাধ্যমেই বাংলায় সর্বপ্রথম পরকালের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হল। পূর্ববর্তীবিষয়ের মূল ভিত্তিই ছিল পূর্নজন্ম। অর্থাৎ এ পৃথিবীতেই বার বার জন্ম নেওয়া। ভিন্নধর্মী বৌদ্ধধর্মও এর বাহিরে ছিল না।

 

এক্ষেত্রে ইসলামই সম্পূর্ণ নতুন কনসেপ্ট নিয়ে আসে। ইসলাম ধর্ম বিষয়ক সাহিত্যকে তিন ভাগে ভাগ করা যায় (১) লৌকিক ইসলাম (২) পৌরাণিক ইসলাম (৩) শাস্ত্রীয় ইসলাম। প্রথমটি মূলতঃ কারবালার ঘটনাকে ঘিরে নানাবিধ লৌকিক জনশ্রুতিমূলক কাব্য। এছাড়া সাহাবী আমীর হামজার বীরত্বের নানাবিধ কাল্পনিক উপখ্যানের মাধ্যমে এই ধারার ব্যাপক বিকাশ ঘটে। এছাড়াও সুফিবাদী তাত্ত্বিক সাহিত্যও এই ধারার মধ্যে পড়ে। এই ধারার সর্বপ্রথম উন্মেষ ঘটে শেখ ফয়জুল্লার “জয়নবের চৌতিশা” কাব্যকে ঘিরে। পরবর্তীকালের মোহাম্মদ খানের “মক্তুল হোসেন” থেকে নানাবিধ জংগনামা কাব্যের মাধ্যমে এই ধারার ব্যাপক বিকাশ ঘটে। এমনকি এর প্রভাব আমরা দেখি উনবিংশ শতাব্দীর আধুনিক যুগেও মির মোশাররফ হোসেনের “বিষাদ সিন্ধু” উপন্যাসে।

 

দ্বিতীয় ধারাটির ব্যাপক বিকাশ ঘটে মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি সৈয়দ সুলতানের হাতে। এক্ষেত্রে তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হল “নবী বংশ ও শবে মেরাজ।” পরবর্তীতে এর আরও বিকাশ আমরা দেখতে পাই কাসাসুল আম্বিয়াতে। তৃতীয় ধারাটির সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন হচ্ছে নসরুল্লাহ খন্দকারের “শরিয়ত নামা”। এর উপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালের শরিয়তী সাহিত্য ৩ বিকশিত হয়েছে।

 

মধ্যযুগের ধর্মভিত্তিক বাংলা সাহিত্যের আলোচনায় সবার শেষে আগে ধর্ম সন্নন্ধায় বিষয়ক সাহিত্যেক ধারা। এই ধারার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হল “সত্যপীর ও সত্য নারায়ণ বিষয়ক কাব্যে। যা সৃষ্টি হয়েছিল সুন্দরবন অঞ্চলে। অবিশ^াস্যভাবে এই প্রথম বাংলা সাহিত্যে বাংলার মাটিতে শোনা গেল, “হিন্দুর দেবতা তুমি। মুসলমানের পীর।” এর মধ্যে বাংলা ভাষা তথা বাংলার মাটিতে সর্বপ্রথম জাতীয়তাবাদের বীজ বপন করা হল। আজকের বাঙালী কিংবা বাংলাদেশী যে জাতীয়তাবাদের কথাই বলি না কেন তার আজ সূচনা হয়েছিল এর মাধ্যমেই। এতে সমন্বয় ঘটেছিল ইসলাম, হিন্দু এমনকি বিলুপ্ত প্রায় বৌদ্ধ ধর্মের। এই ধারার আরও উন্নততর রূপ দেখতে পাই বহুল আলোচিত বাউল সাহিত্যে।

 

এবার আসা যাক মধ্যযুগীয় সাহিত্যের সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী সুদরপ্রসারী রোমাঞ্জ রোমাপ্ট কাব্যধারার প্রসঙ্গে। এটিকে সুদূর প্রসারি বলা হচ্ছে এই অর্থে যে এর মাধ্যমেই বাংলা সাহিত্যসহ সমগ্র বাংলার জনজীবনের সর্বপ্রকার চিন্তা-চেতনা ও সৃষ্টিশীলতার বদ্ধ স্্েরাতখুলে দিয়েছিল। বহুল আলোচিত রোমান্টিকতা তো এ রোমাঞ্চরেই উন্নতরূপ মাত্র। আবার আধুনিকতাও উত্তর আধুনিকতা এই রোমান্টি সিজমেরই উন্নততর ও সূক্ষ্ম চিন্তা ধারা। অর্থাৎ সবকিছুর উৎস ও শিকড় নিহিত আছে এই রোমাঞ্চ কাব্যধারায়। এই কাব্যধারার সর্বশ্রেষ্ঠ কবিরা হলেন আলাওল, দৌলত কাজী, শবিরিদ খান, মোহাম্মদ কবির, মাগন ঠাকুর প্রভৃতি। উল্লেখ্য যে এই ধারার সর্বপ্রথম সূচনা করেছিলেন শাহ মোহাম্মদ সগির “ইউসুফ জুলেখা” কাব্যের মাধ্যমে। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী উল্লেখিত কবিরা সার্থক রোমাঞ্চ কাব্যই সৃষ্টি করেননি সেই সাথে তারা বাংলা সাহিত্যের বদ্ধ স্্েরাতকে খুলে দিয়ে বেশ বিন্দু নতুনমাত্রাও সংযোজন করেছিলেন।

 

আলাওল সমগ্র বাংলা সাহিত্যে প্রথম বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। একই সাথে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন উপাখ্যান ও খন্ড কবিতা। অনুবাদ ও মৌলিক রচনা। আবার ইসলামী সাহিত্যও। দৌলত কাজী শুধু রোমাঞ্চের সার্থক স্্রষ্টাই নন তিনি একই সাথে বাংলা সাহিত্যে জাগতিক জীবনবোধ অর্থাৎ রোমান্টিঞ্জিজমকেই নিয়ে এসেছিলেন। যা কিনা সমকালীন সমগ্র বিশ^সাহিত্যেও বিরল। বাংলা সাহিত্যকে প্রথম নাগরিক শালীনতা দান করেছিলেন শাবিরিদ খান।

 

এছাড়াও বাংলা সাহিত্যে প্রথম নাটক সৃষ্টির উদ্যোগও নিয়েছিলেন। এই ধারার কবিদের আরও একটা অনন্য সাধারণ কৃতিত্ব এই যে, এই ধারার কবিদের মাধ্যমেই সর্বপ্রথম বাংলা সাহিত্য বাংলার সীমার বাইরে বিশেষত আরাকান রাজ্যে বিস্তৃত হয়েছিল। আলাওল, দৌলত কাজী, মাগন ঠাকুর প্রভৃতি এই কৃতিত্বের অধিকারী। এই ধারার সর্বাধিক দাবী রত্মগুলি হচ্ছে “আলাওলের পন্সাবতী”, দৌলত কাজীর “সতিময়না ওলোর চন্দ্রানী”, মোহাম্মদ কবিরের “মধুমদনতী”, শাবিরিদ খানের “বিদ্যাসুন্দর” প্রভৃতি। তবে যার শুরু থাকে তার শেষও থাকে। অনিবার্যভাবেই কালের কঠোর নিয়মে অষ্টাদশ শতাব্দীতে এসে মধ্যযুগীয় সাহিত্যের ধারাগুলির অবক্ষয় শুরু হল।

 

অবশেষে মধ্যযুগীয় সাহিত্যের ধপ্তংস¯দপ থেকে ফিনকস পাখির মত জন্ম হল আধুনিক বাংলা সাহিত্যের। এর শুভ সূচনা হয়েছিল কাটা কাটায় আঠারোশো খ্রিষ্টাব্দে। মূলতঃ পলাশীর পরবর্তী ঘটনার সূত্র ধরে সেই সময় ইংরেজ সিভিলিয়ানদের জন্য অত্যান্ত জরুরী ছিল দেশী ভাষা শিক্ষা। এই উদ্দেশ্যেই প্রতিষ্ঠিত হল ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ। এই কলেজের নিয়ন্ত্রণে রচিত হতে লাগল দেশী ভাষাসমূহের গদ্য গ্রন্থ। কেননা বাস্তব কর্মকান্ড গদ্য ভঙ্গীর গুরুত্ব বেশি। এই ধারায় রচিত হল মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার ? রাম রাম বসুর গদ্য গ্রন্থাবলী। মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকরের “প্রতাপাদিত্য চরিত” দিয়ে যে গদ্যের ৪ সূচনা করলেন তা অর্ধশথাব্দীরও বেশী সময় ধরে বহমান ছিল। যা পূর্ণতা পেয়েছিল রামমোহন বিদ্যাসমের বঙ্কিমচন্দ্রের মাধ্যমে।

 

মধ্যযুগের রোমাঞ্চধর্মী চেতনা রোমান্টিপিজমে রূপান্তরিত হয়ে এই সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছিল। যদিও এই আধুনিক তাকে ধর্ম নিরপেক্ষতা বলে চালানোর প্রয়াস ও তৎজনিত বিতর্ক সত্ত্বেও পাশ্চাত্যে প্রভাবিত এই ধারাকে একেবারে অস্বীকারও করা যায় না। তবে গদ্যের চেয়ে অধিকতর ফলবান হয়েছিল পদ্য বা কাব্য সাহিত্যে। এই ধারার সার্থক রূপকার ছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত একমাত্র তিনিই সার্থকভাবে বাংলা কাব্য তথা সমগ্র বাংলা সাহিত্যকে মধ্যযুগীয় সীমাবদ্ধতা ও পিছুটান থেকে বের করে নিয়ে এসে পরিপূর্ণ আধুনিকতার মধ্যে নিয়ে আসেন।

 

যদিও একই সময়ে রামমোহন-বিদ্যাসাগর-বঙ্কিমরা গদ্য সাহিত্যে ছিটেফোটা আধুনিকতা এনেছিলেন কিন্তু তাদের মধ্যে ছিল হিন্দুত্বের পিছুটান। মাইকেল ছিলেন এই পিছুটান থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। এরই ধারাবাহিকতায় আরেকজন কবির আবির্ভাব ঘটেছিল। যার মাধ্যমে বাংলা কাব্য মধ্যযুগীয় রোমাঞ্চ থেকে পরিপূর্ণ রোমান্টিকতায় পরিণত হয়েছিল। তিনি হলেন বাংলা কাব্যের ভোরের পাখি বিহারীলাল চক্রবর্তী।

 

বলা যায় যে পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বিহারীলালের সম্প্রসারণ মাত্র। যদিও রবীন্দ্রনাথের খ্যাতির নীচে বিহারীলাল চাপা পড়ে গেছেন। রবীন্দ্রনাথকে বড় দেখানোর জন্য বিহারীলালের কথিত ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলিকে বড় করে দেখানো হয়েছে। তা সত্ত্বেও বিহারীলাল বাংলা সাহিত্যে রোমান্টিপিজমের জনক। পরবর্তীকালের আধুনিকতা কিংবা উত্তর আধুনিকতা যাই বলি না কেন এরই সম্প্রসারণ মাত্র। আগেই বলা হয়েছে রবীন্দ্রনাথ বিহারীলালের সম্প্রসারণ মাত্র। অন্ততঃ কাব্য সাহিত্যের বিচারে। তবে অনুগামীর চেয়ে পুরোগামরি স্বাচ্ছন্দ অনেক বেশি তাকে অস্বীকার করতে পারে। এছাড়া সাহিত্যের অনন্য শাখায়ও রবীন্দ্রনাথ তার প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। সেটাও উপেক্ষা করার মত নয়। তা সত্ত্বেও তিনি বঙ্কিম কিংবা পূর্বসুরীদের হিন্দুত্বের পিছুটান ছাড়তে পারেননি।

 

এমন এক যুগ সন্ধিক্ষণে প্রয়োজন ছিল যুগন্ধর সাহিত্য পাঠক প্রতিভার যিনি অবসান ঘটাবেন হাজার বছরের এই অচলাবস্থার। এই যুগন্ধর সাহিত্য প্রতিভাটি হলেন বিদ্রোহী, বিপ্লবী বর্তমানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সেই সময়কার পরিস্থিতির বিশ্লেষণে আমরা দেখতে পাই রবীন্দ্র অনুকৃতি তখন নিষ্ফলতার জন্ম দিতে শুরু করেছিল। শুধু কি তাই ? মাইকেল এমনকি মধ্যযুগীয় কাব্যধারার অনূকরণও তখন পর্যন্ত চলছিল। নজরুলের মত নক্ষত্রের আবির্ভাবে পুরনো সমস্ত ধারারই অবসান ঘটল। তা রূপান্তরিত হল মহৎ সমাধিক্ষেত্রে। নজরুলের অনুকৃতির পথ ধরেই বাংলা কাব্য সাহিত্যে রচিত হল আধুনিক ও উত্তর আধুনিক ধারার কাব্য সাহিত্য। যা আজও চলমান।

 

মধ্যযুগের রোমাঞ্চ রচয়িতারা যে বীজটি বপন করেছিলেন তা নজরুলের প্রতিভা ও মননের স্পর্শেতা রূপান্তরিত হয়েছিল বিশাল শৈল্পিক এক বটগাছে। পরবর্তী আধুনিক ও উত্তর আধুনিক যে কবির কথাই বলি না কেন সবাই কোন না কোনভাবে নজরুলের অধমর্ণ। এমনকি সবচাইতে তরুণতম কবির ব্যর্থতম রচনাটির ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য। পরবর্তীতে তথাকথিত আধুনিক কিংবা উত্তর আধুনিক যার কথাই বলি না কেন তারা আসলে নজরুলের বটগাছটিকে নতুন ফুল, পাতা, ফল দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন মাত্র। শুধু কি কাব্য সাহিত্য ? এর সম্প্রসারণ ঘটল উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, প্রবন্ধ প্রভৃতি সর্বক্ষেত্রেই। আর এভাবেই রচিত হল বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে উত্তরণের উপাখ্যান।

লেখক : এড. সৈয়দ ইফতেখার আলী, সাবেক আহবায়ক, সাতক্ষীরা জেলা বিএনপি

Ads small one

সাতক্ষীরায় জেলা মুফাসসির সম্মেলন অনুষ্ঠিত

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:৩২ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় জেলা মুফাসসির সম্মেলন অনুষ্ঠিত

সংবাদদাতা: বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীন, সাতক্ষীরা জেলা শাখার আয়োজনে জেলা মুফাসসির সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের আমির উপাধ্যক্ষ মো. শহিদুল ইসলাম মুকুল বলেন, মানুষের কাছে কোরআনের সঠিক শিক্ষা পৌঁছে দিতে এবং সমাজের নৈতিক অবক্ষয় দূর করতে আলেম-ওলামা ও মুফাসসিরদের সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে কোরআন ও ইসলামের সুমহান আদর্শের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, কোরআনের আলোকে মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, পারস্পরিক সহমর্মিতা ও ন্যায়বোধ জাগ্রত করতে হবে। দ্বীনি জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি সমাজের অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোও আলেমদের অন্যতম দায়িত্ব।

 

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) বিকাল ৩টায় সাতক্ষীরা আল আমিন ট্রাস্ট কার্যালয়ের কাজী শামছুর রহমান মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীন, সাতক্ষীরা জেলা শাখার সভাপতি অধ্যাপক মাওলানা মনিরুল ইসলাম বিলালীর সভাপতিত্বে এবং সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হাফেজ মাওলানা মনোয়ার হুসাইন মোমিনের সঞ্চালনায় সম্মেলনে প্রধান বক্তার বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীন খুলনা বিভাগের সভাপতি মাওলানা ইব্রাহিম খলিল মুজাহিদ।

 

সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, জেলা ওলামা বিভাগের সভাপতি মাওলানা ওসমান গনি, বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীনের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মাওলানা আব্দুল কাদের জিহাদী।
সম্মেলনে আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ মসজিদ মিশন সাতক্ষীরা জেলা শাখার সভাপতি অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল বারি, জেলা ওলামা বিভাগের সেক্রেটারি ড. রুহুল আমিন, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি সাতক্ষীরা জেলা শাখার সভাপতি আলহাজ্ব মাওলানা আব্দুর রশিদ এবং সাতক্ষীরা সদর উপজেলা ওলামা বিভাগের সভাপতি মাওলানা আব্দুরস সবুর, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা মোঃ আহম্মদ আলী, সাতক্ষীরা জেলা কমিটির সদস্য মাওলানা আজিজুল ইসলাম জিহাদী, মাওলানা রেজাউল করিম, মুহাঃ আসাদুজ্জামান ফারুকী, মাওলানা ইমাম হাসান নাসেরী, জিয়াউল ইসলাম যুক্তিবাদী, মাওলানা তরিকুল ইসলাম জিহাদী প্রমুখ।

সম্মেলনে প্রধান বক্তা বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীন খুলনা বিভাগের সভাপতি মাওলানা ইব্রাহিম খলিল মুজাহিদ বলেন, ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ জীবনে কোরআনের আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষের মধ্যে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি পাবে। তাই কোরআন-সুন্নাহর শিক্ষা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়নের পাশাপাশি অন্যদের কাছেও তা পৌঁছে দিতে হবে।
সম্মেলনে জেলার বিভিন্ন এলাকার আলেম-ওলামা, মুফাসসির, ইমাম-খতিবসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন।

সম্মেলনে সংগঠনটির ২০২৬-২৮ সেশনে সাতক্ষীরা জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন মাওলানা মনিরুল ইসলাম বেলালি ও সেক্রেটারী নির্বাচিত হন মাওলানা মনিরুল ইসলাম ফারুকি। এছাড়া সহসভাতি মনোনিত হন মাওলানা আজিজুল ইসলাম জিহাদি, মাওলানা আব্দুল মজিদ, ইমাম হাসানসহ কমিটির ২৪ জনের নাম ঘোষণা করা হয়।

এরপর ঢাকায় লংমার্চ হবে, চিড়ামুড়ি নিয়ে চলে আসবেন: জামায়াত আমির

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:১২ অপরাহ্ণ
এরপর ঢাকায় লংমার্চ হবে, চিড়ামুড়ি নিয়ে চলে আসবেন: জামায়াত আমির

জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘এই সরকার জনগণকে যে কথা দিয়েছিল সেই কথা রাখেনি। তাই দাবি আদায়ের প্রস্তুতি নিন, আমরা আশাবাদী, আমরা আস্থাশীল। ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশের জন্য সব দাবি আদায় করা হবে। আমরা প্রত্যেকটি বিভাগীয় শহরে যাবো। এরপর ঢাকায় লংমার্চ হবে। ঢাকায় যেতে প্রয়োজনে চিড়া মুড়ি নিয়ে যাবো। চিড়ামুড়ি নিয়ে আপনারাও চলে আসবেন। দাবি আদায় করেই ফিরবো।’

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) ১১ দলীয় জোটের লংমার্চে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে পথসভায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘১৯৯৪ সালে সিলেট ও কুমিল্লা বিভাগের দাবি উঠেছিল। কুমিল্লা বিভাগ হয়নি হয়েছে সিলেট। এরপর ফ্যাসিবাদ সরকার বলেছিল কুমিল্লায় বিভাগ হবে না। কারণ কুমিল্লায় খন্দকার মুশতাক আছে। এখন কেন কুমিল্লা বিভাগ হবে না? কুমিল্লাবাসীর অপরাধ কী? কী কারণে একটি অঞ্চলকে বঞ্চিত করা হবে?’

তিনি বলেন, ‘আমরা খবর পাচ্ছিলাম রাস্তায় কেউ বাধা দেবে। রাস্তায় বাধা দিলে, দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাবো। আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাবোই।’

তালায় সমতা ফোরাম সিএসও হাবের ত্রৈমাসিক সভা অনুষ্ঠিত

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:০১ অপরাহ্ণ
তালায় সমতা ফোরাম সিএসও হাবের ত্রৈমাসিক সভা অনুষ্ঠিত

তালা প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় সামাজিক সংগঠন ‘সমতা ফোরাম সিএসও হাব’-এর ত্রৈমাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (৫ আগস্ট) সকালে উপজেলার ভূমিজ ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে ১৪টি সিএসও হাবের প্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সমতা ফোরামের সভাপতি আনিসুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ভূমিজ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অচিন্ত্য কুমার সাহা। সুশীল প্রকল্পের জেলা সমন্বয়কারী দে অঞ্জন কুমারের সঞ্চালনায় সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সমতা ফোরামের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম।

সভার প্রারম্ভে বিগত সভার কার্যবিবরণী ও রেজুলেশন পাঠ করে শোনান এমদাদুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রেস ইনস্টিটিউট বিআইজিএম আয়োজিত প্রশিক্ষণ শেষ করে এসে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন সাংবাদিক সেকেন্দার আবু জাফর বাবু। তিনি সাংবাদিকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে অব্যাহত সহযোগিতার জন্য অ্যাকশনএইড, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিআইজিএম কর্তৃপক্ষের প্রতি বিশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

সভায় বক্তারা তৃণমূল পর্যায়ে সামাজিক অধিকার সুরক্ষা ও উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড বাস্তবায়নে সিএসও হাবগুলোর পারস্পরিক নেটওয়ার্কিং আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।