শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩

বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের অবসান ঘটবে কবে?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬, ৭:২৮ অপরাহ্ণ
বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের অবসান ঘটবে কবে?

তারিক ইসলাম

‎বর্তমান সময়ে বিদ্যুৎ কোনো বিলাসিতা নয়, বরং মানুষের মৌলিক চাহিদার মতোই এক অপরিহার্য উপাদান। বিদ্যুৎ আধুনিক সভ্যতার চালিকাশক্তি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা সাতক্ষীরার মানুষ এখন এক ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের মুখোমুখি। গত বেশ কিছুদিন ধরে জেলাজুড়ে যে তীব্র ও অনিয়মিত লোডশেডিং চলছে, তা কেবল নাগরিক অস্বস্তি বাড়ায়নি, বরং পুরো জেলার অর্থনীতি ও জনজীবনকে স্থবির করে দিয়েছে। কারণ বা অজুহাত যা-ই হোক না কেন, এই সংকটের একটি দ্রুত ও টেকসই সমাধান এখন সাতক্ষীরার লাখো মানুষের সময়ের দাবি।

‎সাতক্ষীরায় এখন বিদ্যুৎ থাকাটাই যেন একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা, আর লোডশেডিংটাই নিয়ম। শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম— সর্বত্রই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি সময় বিদ্যুৎহীন কাটানো এখন এখানকার মানুষের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নজিরবিহীন বিদ্যুৎ সংকটের বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সমাজের প্রতিটি স্তরে।

‎সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। সাতক্ষীরার অর্থনীতি অনেকাংশে চিংড়ি চাষ, কোল্ড স্টোরেজ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি কুটির শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে বরফ কলগুলো চাহিদা মতো বরফ উৎপাদন করতে পারছে না, ফলে মৎস্য শিল্পে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দোকানপাট খোলা রাখতে পারছেন না, সচল রাখা যাচ্ছে না কলকারখানার চাকা। এতে করে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, যা সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।

‎বিদ্যুৎ সংকটের কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে চিকিৎসাসেবা। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। জেনারেটর দিয়ে কতক্ষণ জরুরি সেবা চালানো সম্ভব? অপারেশন থিয়েটার থেকে শুরু করে আইসিইউ— সবখানেই এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। গরমে হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে চিকিৎসাধীন সাধারণ রোগীদের অবস্থা অবর্ণনীয়।

‎শিক্ষা খাতের ক্ষতিও কোনো অংশে কম নয়। সামনে বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষা। এই সময়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীরা টেবিলে বসতে পারছে না। তীব্র গরমে রাতের বেলা পড়াশোনা তো দূরের কথা, একটু শান্তিতে ঘুমানোর সুযোগও তারা পাচ্ছে না। ফলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

‎আমরা জানি, জাতীয় গ্রিডে নানা সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে কিংবা স্থানীয় সঞ্চালন লাইনে ত্রুটি থাকতে পারে। কিন্তু দিনের পর দিন একটি পুরো জেলাকে এভাবে বিদ্যুৎহীন রেখে উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার গল্প শোনানো অবান্তর। সাতক্ষীরার মানুষ নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেও কেন এই বৈষম্য ও ভোগান্তির শিকার হবে- এই প্রশ্ন আজ সর্বস্তরের নাগরিকের।

‎সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের কাছে আমাদের আকুল আবেদন— সাতক্ষীরার এই বিদ্যুৎ বিপর্যয়কে আর দীর্ঘায়িত করবেন না। অনতিবিলম্বে এই সংকটের সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। প্রয়োজনে সঞ্চালন লাইনের আধুনিকায়ন এবং আপদকালীন বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে সাতক্ষীরার জনজীবনে দ্রুত স্বস্তি ফিরিয়ে আনা হোক।

‎লেখক: সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি।

 

Ads small one

আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস: সম্মিলিত ক্ষুদ্র উদ্যোগে সমৃদ্ধি, সাম্য ও টেকসই উন্নয়নের পথ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬, ১০:১০ অপরাহ্ণ
আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস: সম্মিলিত ক্ষুদ্র উদ্যোগে সমৃদ্ধি, সাম্য ও টেকসই উন্নয়নের পথ

সাকিবুর রহমান বাবলা

প্রতি বছর জুলাই মাসের প্রথম শনিবার বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস। দিবসটি পারস্পরিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং টেকসই উন্নয়নের এক বৈশ্বিক দর্শনের স্মারক। ১৯২৩ সালে ‘আন্তর্জাতিক সমবায় জোট’ এ দিবস পালন শুরু করে এবং ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের স্বীকৃতির মাধ্যমে এটি আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভ করে।

সমবায়ের মূল ভিত্তি হলো সম্মিলিত মালিকানা, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং ন্যায্য সুফল বণ্টন। এর দর্শন— “সকলের জন্য একজন, একজনের জন্য সকলে”Ñ ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে ক্ষুদ্রসমষ্টিগত কল্যাণকে গুরুত্ব দেয়। লাভের সর্বোচ্চীকরণের পরিবর্তে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নই সমবায়ের প্রধান লক্ষ্য।

আধুনিক সমবায় আন্দোলনের সূচনা ১৮৪৪ সালে ইংল্যান্ডের রচডেল শহরের ২৮ জন শ্রমিকের হাত ধরে। তাদের প্রণীত নীতিমালাই আজও বিশ্বব্যাপী সমবায় আন্দোলনের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। বর্তমানে বিশ্বের শতাধিক দেশে প্রায় ৩০ লাখ সমবায় প্রতিষ্ঠানে এক বিলিয়নেরও বেশি মানুষ যুক্ত রয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট কর্মসংস্থানের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমবায় খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি উন্নয়ন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং সামাজিক সুরক্ষায় সমবায়ের অবদান আজ বিশ্বস্বীকৃত।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সমবায়ের গুরুত্ব একটু গভীর। কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে সমবায় দীর্ঘদিনের ভূমিকা রয়েছে। কৃষি উৎপাদন, মৎস্য চাষ, পোল্ট্রি, গবাদিপশু ও দুগ্ধ শিল্প, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম, গ্রামীণ সঞ্চয় এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে সমবায় একটি পরীক্ষিত মডেল। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং সমবায় অধিদপ্তর এ খাতের উন্নয়ন, নিবন্ধন ও তদারকির দায়িত্ব পালন করছে। গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করা এবং আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে সমবায়ের অবদান অনস্বীকার্য, চলছে সরকারি বেসরকারি প্রকল্প।

বর্তমান বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন, আয়বৈষম্য, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এমন বাস্তবতায় সমবায় একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়ন মডেল হিসেবে বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। কৃষি ও ঋণ কার্যক্রমের বাইরে এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, ডিজিটাল সেবা এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও সমবায়ের বিস্তার ঘটছে। ডিজিটাল হিসাবরক্ষণ, অনলাইন বিপণন এবং ই-কমার্সভিত্তিক কার্যক্রম সমবায়কে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও যুগোপযোগী করে তুলতে পারে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। দুর্বল ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহিতার ঘাটতি, নেতৃত্ব সংকট এবং কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব সমবায়ের কার্যকারিতা ব্যাহত করে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সুশাসন নিশ্চিত করা, সদস্যদের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে সমবায় শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় করতে হবে এবং দূর করতে হবে সকল দুর্নীতি।

আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস স্মরণ করিয়ে দেয় যে, টেকসই উন্নয়নের প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে। ক্ষুদ্র সঞ্চয়, ক্ষুদ্র বিনিয়োগ ও ক্ষুদ্র উদ্যোগ যখন সমবেত শক্তিতে রূপ নেয়, তখন তা শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নই নয়, সামাজিক সাম্য ও মানবিক অগ্রগতির পথও সুগম করে। বৈষম্যহীন, অংশগ্রহণমূলক এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে সমবায় আন্দোলনের বিকল্প নেই। তাই সমবায়কে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তোলাই হতে পারে আগামীর উন্নয়ন অভিযাত্রার অন্যতম কৌশল।

বাংলায় পরীক্ষা প্রথা এলো কীভাবে?/ আখলাকুর রহমান

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬, ৯:৫৭ অপরাহ্ণ
বাংলায় পরীক্ষা প্রথা এলো কীভাবে?/ আখলাকুর রহমান

আখলাকুর রহমান

আজকালকার তরুণ সমাজ যখন রাজপথে কিংবা সামাজিক মাধ্যমে ‘পরীক্ষা পিছিয়ে দাও’ বলে শোরগোল তোলে, তখন আমার মনে ক্ষোভ নয়, এক গভীর বিষাদের জন্ম হয়। এই পোলাপানেরা যে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আজ আর্তনাদ করছে, তারা নিজেরাও জানে না এই মারণাস্ত্রের শিকড় কত গভীরে প্রোথিত। পরীক্ষা কোনো আকস্মিক আসমানি গজব নয়; এটি একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত, ঠান্ডা মাথার মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব তৈরির কারখানা। অথচ আমরা চোখ বন্ধ করে বছরের পর বছর ধরে আমাদের সন্তানদের এই যূপকাষ্ঠে বলি দিয়ে আসছি।

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যাবে, মানুষের চিন্তার স্বাধীনতাকে প্রথম শিকল পরানোর এই কায়দাটি আবিষ্কার করেছিল চার হাজার বছর আগের চৈনিক সামন্ত শাসকেরা। ‘কোজু’ নামের সেই রাজকীয় পরীক্ষা পদ্ধতি আসলে ছিল মানুষকে মগজহীন হুকুমবরদারে পরিণত করার প্রথম রাষ্ট্রীয় প্রজেক্ট। এক অন্ধকার কুঠুরির ভেতর দিনের পর দিন মানুষকে আটকে রেখে প্রাচীন পুঁথি মুখস্থ করানো হতো। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—এমন একদল অনুগত দাস তৈরি করা, যারা প্রশ্ন করতে শিখবে না, কেবল শাসকের আদেশ তামিল করবে। সামন্তবাদের সেই নোংরা ভূতটাই কালক্রমে আধুনিকতার মুখোশ পরে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

আমাদের এই বাংলায়, এই ভূখ-ে পরীক্ষা নামক এই মনস্তাত্ত্বিক জাঁতাকলটি আমদানি করেছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা। লর্ড ম্যাকলে যখন এই উপমহাদেশে ইংরেজি শিক্ষার নীল নকশা তৈরি করলেন, তাঁর উদ্দেশ্য আমাদের শিক্ষিত করা ছিল না। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এমন একদল ‘বাদামি সাহেব’ তৈরি করা, যারা রক্তে-মাংসাবে বাঙালি হলেও মগজে ও মনস্তত্ত্বে হবে খাঁটি ইংরেজ। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের ঠিক ক্রান্তিলগ্নে যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলো, তখন থেকেই মূলত এই অঞ্চলের মানুষের ঘাড়ে পরীক্ষার জোয়াল চিরতরে চাপিয়ে দেওয়া হলো। সাম্রাজ্যবাদীরা খুব ভালো করেই জানত, তরুণের স্বাধীন চিন্তা আর বিদ্রোহের আগুনকে যদি নিভিয়ে দিতে হয়, তবে তাকে পরীক্ষার হল নামক এক একটা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ঢুকিয়ে দিতে হবে।

আজ আমরা স্বাধীন দেশে বাস করছি বলে বড়াই করি, কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও পরীক্ষা পদ্ধতি এখনো সেই ঔপনিবেশিক দাসত্বের লিগ্যাসি বয়ে বেড়াচ্ছে। পরীক্ষা কখনো মেধার বিকাশ ঘটায় না, বরং তা মানুষের সহজাত সৃজনশীলতাকে গলা টিপে হত্যা করে। একটি তিন ঘণ্টার খাতার পৃষ্ঠায় কয়েকটি মুখস্থ করা বুলি উগড়ে দিয়ে যে নম্বর পাওয়া যায়, তা দিয়ে কেরানি তৈরি করা যায়, কিন্তু কোনো স্বাধীনচেতা চিন্তাবিদ বা মানুষ তৈরি করা যায় না। পোলাপানেরা যখন আজ পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার জন্য হাহাকার করে, আমি তার ভেতর এক অবচেতন বিদ্রোহের সুর শুনতে পাই। এই জীর্ণ, অচল আর প্রাণহীন শিক্ষাকাঠামো ভেঙে ফেলার এখনই সময়, অন্যথায় আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কেবলই সার্টিফিকেটধারী পঙ্গু মগজের এক একটা জীবন্ত লাশ হিসেবে বেঁচে থাকবে।

লেখক: উদ্যোক্তা ও স্বপ্নদ্রষ্টা: আসিফা

 

রক্তাক্ত রাজপথ থেকে গণঅভ্যুত্থানের গল্প/ ‎গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬, ৯:৪৮ অপরাহ্ণ
রক্তাক্ত রাজপথ থেকে গণঅভ্যুত্থানের গল্প/ ‎গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ

 ‎গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ

‎‎বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাসে স্লোগান সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। স্লোগান কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি নয়, এটি মানুষের আবেগ, প্রতিবাদ, আশা, ক্ষোভ এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে গণআন্দোলন ও গণজাগরণে স্লোগান জনমত গঠন এবং মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। জুলাইয়ের আন্দোলনও এর ব্যতিক্রম ছিল না।

‎গণঅভ্যুত্থানের গল্প বলতে গেলে এটি শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনার বিবরণ নয়, এটি মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার গল্প। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, ছোট একটি দাবি বা নির্দিষ্ট কোনো ইস্যুকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন একসময় বৃহত্তর জনআকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। মানুষের ক্ষোভ, বঞ্চনা এবং প্রত্যাশা যখন একত্রিত হয়, তখন তা গণজাগরণের রূপ লাভ করে।

‎জুলাইয়ের আন্দোলনের সূচনাও হয়েছিল শিক্ষার্থীদের একটি দাবিকে কেন্দ্র করে। শুরুতে এটি ছিল ন্যায্যতা, সমঅধিকার এবং বৈষম্যহীন ব্যবস্থার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাপ্রবাহ পরিবর্তিত হতে থাকে। বিভিন্ন সংঘাত, উত্তেজনা, দমন-পীড়নের অভিযোগ এবং রাজপথে সহিংস পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফলে আন্দোলন ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের গ-ি পেরিয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।

‎যখন কোনো আন্দোলনের দাবি মানুষের হৃদয়ের দাবি হয়ে ওঠে, তখন সেটি আর একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহেও সেই বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, শ্রমজীবী মানুষ, পেশাজীবী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করতে শুরু করেন। ফলে আন্দোলন একটি বৃহত্তর সামাজিক চেতনার প্রতীকে রূপ নেয়।

‎এই সময়ে রাজপথে জন্ম নিতে থাকে অসংখ্য স্লোগান। এসব স্লোগান কোনো আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনার ফল ছিল না, বরং মানুষের অনুভূতি, প্রতিবাদ এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা থেকেই এগুলোর জন্ম। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, শহরের প্রধান সড়ক এবং জনসমাগমস্থল স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীদের কণ্ঠে উচ্চারিত সেই স্লোগান দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

‎স্লোগানের অন্যতম শক্তি হলো এটি জটিল বার্তাকে খুব অল্প কথায় মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। একটি স্লোগান মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের অনুভূতির প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হয়। আন্দোলনের সময় রাজপথে উচ্চারিত স্লোগানগুলো আন্দোলনকারীদের সাহস জুগিয়েছে, তাদের মধ্যে ঐক্যের বোধ সৃষ্টি করেছে এবং আন্দোলনের বার্তা আরও বিস্তৃত পরিসরে পৌঁছে দিয়েছে।

‎বাংলাদেশের ইতিহাসে স্লোগানের শক্তি নতুন কোনো বিষয় নয়। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার জনমত গঠন এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে স্লোগান মানুষের চেতনা জাগিয়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সেসব আন্দোলনের মতো জুলাইয়ের আন্দোলনেও স্লোগান ছিল প্রতিবাদের অন্যতম ভাষা।

‎একটি আন্দোলনের সাফল্যের পেছনে নেতৃত্ব, সংগঠন এবং কৌশলের পাশাপাশি জনসম্পৃক্ততাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধিতে স্লোগান কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। কারণ স্লোগান মানুষের অনুভূতিকে এক সুতোয় গেঁথে দেয় এবং তাদের একটি অভিন্ন লক্ষ্য ও প্রত্যাশার দিকে ঐক্যবদ্ধ করে। জুলাইয়ের আন্দোলনে রাজপথে ধ্বনিত হওয়া স্লোগানগুলো সেই ভূমিকা পালন করেছে বলেই অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন।

‎গণঅভ্যুত্থান কখনো শুধু রাজপথের ঘটনা নয়, এটি মানুষের মনের ভেতরে জমে থাকা প্রত্যাশা, বেদনা এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। যখন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তাদের কণ্ঠস্বর গুরুত্বপূর্ণ, তখন আন্দোলন নতুন শক্তি অর্জন করে। ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ে এই বাস্তবতা দেখা গেছে এবং জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহও সেই ধারারই অংশ।

‎আজ সময় এগিয়ে গেছে, কিন্তু সেই উত্তাল দিনের স্মৃতি এখনো অনেক মানুষের মনে জীবন্ত। আন্দোলনের নানা ঘটনা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, বিশ্লেষণ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই সেই সময়ের স্লোগানগুলো মানুষের আবেগ ও প্রত্যাশার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হয়ে উঠেছিল। এগুলো শুধু আন্দোলনের মুহূর্তকে ধারণ করেনি, বরং একটি সময়ের সামাজিক বাস্তবতা এবং জনগণের মানসিক অবস্থারও প্রতিচ্ছবি হয়ে রয়েছে।

‎ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, মানুষের অধিকার, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নে প্রতিবাদের ভাষা কখনো হারিয়ে যায় না। সেই ভাষা কখনো বক্তৃতায়, কখনো লেখায়, কখনো গান বা কবিতায়, আবার কখনো স্লোগানে প্রকাশ পায়। জুলাইয়ের স্লোগানগুলোও তেমনই এক সময়ের স্পন্দন বহন করে। এগুলো কেবল কিছু শব্দ নয়, এগুলো একটি প্রজন্মের অনুভূতি, প্রতিবাদী চেতনা এবং গণজাগরণের স্মারক। ভবিষ্যতে ইতিহাস যখন জুলাইয়ের দিনগুলোকে মূল্যায়ন করবে, তখন রাজপথে ধ্বনিত সেই স্লোগানগুলোও একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে স্মরণ করা হবে। ‎

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও উদ্যোক্তা