আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস: সম্মিলিত ক্ষুদ্র উদ্যোগে সমৃদ্ধি, সাম্য ও টেকসই উন্নয়নের পথ
সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রতি বছর জুলাই মাসের প্রথম শনিবার বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস। দিবসটি পারস্পরিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং টেকসই উন্নয়নের এক বৈশ্বিক দর্শনের স্মারক। ১৯২৩ সালে ‘আন্তর্জাতিক সমবায় জোট’ এ দিবস পালন শুরু করে এবং ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের স্বীকৃতির মাধ্যমে এটি আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভ করে।
সমবায়ের মূল ভিত্তি হলো সম্মিলিত মালিকানা, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং ন্যায্য সুফল বণ্টন। এর দর্শন— “সকলের জন্য একজন, একজনের জন্য সকলে”Ñ ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে ক্ষুদ্রসমষ্টিগত কল্যাণকে গুরুত্ব দেয়। লাভের সর্বোচ্চীকরণের পরিবর্তে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নই সমবায়ের প্রধান লক্ষ্য।
আধুনিক সমবায় আন্দোলনের সূচনা ১৮৪৪ সালে ইংল্যান্ডের রচডেল শহরের ২৮ জন শ্রমিকের হাত ধরে। তাদের প্রণীত নীতিমালাই আজও বিশ্বব্যাপী সমবায় আন্দোলনের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। বর্তমানে বিশ্বের শতাধিক দেশে প্রায় ৩০ লাখ সমবায় প্রতিষ্ঠানে এক বিলিয়নেরও বেশি মানুষ যুক্ত রয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট কর্মসংস্থানের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমবায় খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি উন্নয়ন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং সামাজিক সুরক্ষায় সমবায়ের অবদান আজ বিশ্বস্বীকৃত।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সমবায়ের গুরুত্ব একটু গভীর। কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে সমবায় দীর্ঘদিনের ভূমিকা রয়েছে। কৃষি উৎপাদন, মৎস্য চাষ, পোল্ট্রি, গবাদিপশু ও দুগ্ধ শিল্প, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম, গ্রামীণ সঞ্চয় এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে সমবায় একটি পরীক্ষিত মডেল। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং সমবায় অধিদপ্তর এ খাতের উন্নয়ন, নিবন্ধন ও তদারকির দায়িত্ব পালন করছে। গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করা এবং আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে সমবায়ের অবদান অনস্বীকার্য, চলছে সরকারি বেসরকারি প্রকল্প।
বর্তমান বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন, আয়বৈষম্য, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এমন বাস্তবতায় সমবায় একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়ন মডেল হিসেবে বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। কৃষি ও ঋণ কার্যক্রমের বাইরে এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, ডিজিটাল সেবা এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও সমবায়ের বিস্তার ঘটছে। ডিজিটাল হিসাবরক্ষণ, অনলাইন বিপণন এবং ই-কমার্সভিত্তিক কার্যক্রম সমবায়কে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও যুগোপযোগী করে তুলতে পারে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। দুর্বল ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহিতার ঘাটতি, নেতৃত্ব সংকট এবং কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব সমবায়ের কার্যকারিতা ব্যাহত করে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সুশাসন নিশ্চিত করা, সদস্যদের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে সমবায় শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় করতে হবে এবং দূর করতে হবে সকল দুর্নীতি।
আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস স্মরণ করিয়ে দেয় যে, টেকসই উন্নয়নের প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে। ক্ষুদ্র সঞ্চয়, ক্ষুদ্র বিনিয়োগ ও ক্ষুদ্র উদ্যোগ যখন সমবেত শক্তিতে রূপ নেয়, তখন তা শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নই নয়, সামাজিক সাম্য ও মানবিক অগ্রগতির পথও সুগম করে। বৈষম্যহীন, অংশগ্রহণমূলক এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে সমবায় আন্দোলনের বিকল্প নেই। তাই সমবায়কে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তোলাই হতে পারে আগামীর উন্নয়ন অভিযাত্রার অন্যতম কৌশল।








