রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩
রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩

বিনা খরচে ১০ হাজার শ্রমিকসহ ২ লাখ শ্রমিক নেবে মালয়েশিয়া: স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ২:৩০ অপরাহ্ণ
বিনা খরচে ১০ হাজার শ্রমিকসহ ২ লাখ শ্রমিক নেবে মালয়েশিয়া: স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ থেকে দুই লাখ কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া আগামী সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ পর্যায়ক্রমে শুরু হবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ থেকে দুই লাখ কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া আগামী সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ পর্যায়ক্রমে শুরু হবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

রবিবার (৩০ আগস্ট) সচিবালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার মোহাম্মদ সুহাদা ওসমান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান প্রতিমন্ত্রী।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ থেকে যে জনশক্তি রফতানি হবে, সেটি সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ থেকে পর্যায়ক্রমে শুরু হবে এবং আগামী ৬ মাসের মধ্যে এটি সমাপ্ত হবে বলে উনি রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে দুই লাখ কর্মী পাঠানোর বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘টোটাল তো দুই লক্ষ যাবে, তাদের তালিকাভুক্ত কোম্পানির মাধ্যমে। এর বাইরে আরও ১০ হাজার শ্রমিক বিনা খরচে মালয়েশিয়া নেবে বলেও জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আর এর বাইরে ১০ হাজার শ্রমিক তারা একদম ফ্রি নেবে, যেটাতে কোনো খরচ নেই।

Ads small one

সাতক্ষীরায় জেলি পুশ করা ৩৬ কেজি চিংড়ি যশোরে আটক, ট্রাক চালককে জরিমানা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৩৭ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় জেলি পুশ করা ৩৬ কেজি চিংড়ি যশোরে আটক, ট্রাক চালককে জরিমানা

পত্রদূত ডেস্ক: সাতক্ষীরা থেকে চট্টগ্রামগামী একটি ট্রাক থেকে জেলি পুশ করা ৩৬ কেজি চিংড়ি মাছ জব্দ করেছে র‌্যাব-৬। এ ঘটনায় ট্রাকের চালক সাইফুল ইসলামকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন যশোর সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা রিপন কুমার ঘোষ।
শনিবার (২৯ আগস্ট) রাত সাড়ে ১০টার দিকে শহরের বকচর এলাকায় অভিযান চালিয়ে এ চিংড়ি মাছ জব্দ করা হয়। র‌্যাব-৬ সিপিসি-৩ যশোরের কোম্পানি কমান্ডার মেজর ফজলে রাব্বি প্রিন্সের তত্ত্বাবধানে অভিযানটি পরিচালিত হয়।

র‌্যাব সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরা থেকে চট্টগ্রামগামী একটি ট্রাকে জেলি পুশ করা চিংড়ি মাছ পরিবহন করা হচ্ছে এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বকচর এলাকায় ট্রাকটির গতিরোধ করে তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় ট্রাকে থাকা প্রায় ৩৬ কেজি চিংড়ি মাছ জব্দ করা হয়। পরে জব্দ করা চিংড়ি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য যশোর সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা রিপন কুমার ঘোষকে খবর দেওয়া হয়। তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে মাছগুলো পরীক্ষা করেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিংড়ির ভেতরে জেলি পুশ করার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়।

এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট আইনের ধারায় ট্রাকের চালক সাইফুল ইসলামকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা রিপন কুমার ঘোষ। একই সঙ্গে জব্দ করা চিংড়ি মাছ পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, অসাধু ব্যবসায়ীরা চিংড়ির ওজন ও আকার বাড়িয়ে বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে মাছের শরীরে জেলি বা অন্যান্য পদার্থ পুশ করে থাকেন। এতে চিংড়ির স্বাভাবিক গুণগত মান নষ্ট হয়। পাশাপাশি এসব মাছ খাওয়ার মাধ্যমে ভোক্তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

র‌্যাব-৬ যশোরের কোম্পানি কমান্ডার মেজর ফজলে রাব্বি প্রিন্স জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে চিংড়ি আটক ও জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।

সুন্দরবন ঘিরে সাতক্ষীরার যুবকদের কর্মসংস্থানের অপার সম্ভাবনা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৫১ অপরাহ্ণ
সুন্দরবন ঘিরে সাতক্ষীরার যুবকদের কর্মসংস্থানের অপার সম্ভাবনা

মো. মামুন হাসান

সুন্দরবনকে আমরা কতভাবে দেখি। কেউ দেখেন প্রকৃতির বিস্ময় হিসেবে, কেউ দেখেন জীববৈচিত্র্যের অনন্য আধার হিসেবে, কেউ দেখেন জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের জীবিকার জায়গা হিসেবে। আবার পর্যটকের চোখে সুন্দরবন হলো নদী, বন, বন্যপ্রাণী আর অপার সৌন্দর্যের এক অসাধারণ পৃথিবী। কিন্তু সুন্দরবনকে আরেকটি দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা দরকার।

 

সেটি হলো কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দৃষ্টিকোণ। বিশেষ করে সাতক্ষীরার জন্য সুন্দরবন শুধু একটি বনভূমি নয়, এটি হতে পারে হাজারো তরুণের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত একটি বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষেত্র।

সাতক্ষীরার দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবন বহু বছর ধরে প্রকৃতি ও জীবিকার নানা সংকটের সঙ্গে লড়াই করছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখানকার মানুষের জীবনকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে। কৃষি ও প্রচলিত জীবিকার ওপর চাপ বাড়ছে। ফলে নতুন প্রজন্মের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তারা কোথায় কাজ করবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের নিজেদের সম্পদের দিকে তাকাতে হবে। আর সেখানে সুন্দরবন একটি বড় সম্ভাবনার নাম।

সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রতি বছর অসংখ্য পর্যটক সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন। কিন্তু পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যটন থেকে স্থানীয় মানুষের আয় কতটা বাড়ছে। একজন পর্যটক যখন একটি এলাকায় আসেন, তখন শুধু একটি নৌযান বা একটি হোটেল আয় করে না। তার সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবহন, খাবার, গাইড, নৌকার মাঝি, হোটেল কর্মী, রেস্টুরেন্ট, স্থানীয় দোকানদার, হস্তশিল্পী, কৃষক, মৎস্যজীবী এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। অর্থাৎ পর্যটকের ব্যয় যদি স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে একজন পর্যটক বহু মানুষের আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারেন। এখানেই সাতক্ষীরার জন্য বড় সুযোগ।

সাতক্ষীরার তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু চাকরি পাওয়া নয়, কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা। সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে। প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইড, ওয়াইল্ডলাইফ গাইড, বার্ড ওয়াচিং গাইড, নৌপর্যটন কর্মী, হোটেল ম্যানেজার, ফ্রন্ট অফিস কর্মী, শেফ, রেস্টুরেন্ট কর্মী, ট্যুর অপারেটর, ট্রাভেল কনসালট্যান্ট, ফটোগ্রাফার, ভিডিওগ্রাফার, ডিজিটাল মার্কেটার, দোভাষী, পর্যটন নিরাপত্তাকর্মী এবং পরিবেশ সংরক্ষণকর্মীর চাহিদা তৈরি হতে পারে। এর বাইরেও রয়েছে উদ্যোক্তা হওয়ার অসংখ্য সুযোগ। কেউ সুন্দরবনভিত্তিক ট্যুর প্যাকেজ তৈরি করতে পারেন। কেউ হোমস্টে চালু করতে পারেন। কেউ স্থানীয় খাবারের ব্র্যান্ড তৈরি করতে পারেন। কেউ নৌভ্রমণের ব্যবস্থা করতে পারেন। কেউ পর্যটকদের জন্য ছবি ও ভিডিও তৈরির সেবা দিতে পারেন। অর্থাৎ পর্যটনের ভবিষ্যৎ শুধু চাকরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর বড় অংশ জুড়ে রয়েছে উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ।

সাতক্ষীরার বাস্তবতায় পর্যটনকে শুধু বিনোদনের খাত হিসেবে দেখলে ভুল হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেসব মানুষের প্রচলিত জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়ছে, তাদের জন্য বিকল্প জীবিকা তৈরির প্রয়োজন রয়েছে।একজন জেলে পর্যটন নৌযানের দক্ষ কর্মী হতে পারেন। একজন স্থানীয় যুবক প্রশিক্ষণ নিয়ে সুন্দরবনের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য বিষয়ে গাইড হতে পারেন। একজন নারী পর্যটকদের জন্য স্থানীয় খাবার তৈরি করে আয় করতে পারেন। একটি পরিবার বাড়ির একটি অংশকে হোমস্টেতে রূপান্তর করতে পারে। এভাবে পর্যটন জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য বিকল্প আয়ের পথ তৈরি করতে পারে। এটি শুধু দারিদ্র্য কমানোর উদ্যোগ নয়। এটি জলবায়ু অভিযোজনেরও একটি কার্যকর কৌশল হতে পারে।

দারিদ্র্য বিমোচনের সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো মানুষের হাতে স্থায়ী আয়ের সুযোগ তুলে দেওয়া।সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে। কারণ পর্যটনের অর্থ স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একজন পর্যটক সাতক্ষীরায় এসে যদি স্থানীয় খাবার খান, স্থানীয় গাইড নেন, স্থানীয় নৌযানে ভ্রমণ করেন, স্থানীয় হোমস্টেতে থাকেন এবং স্থানীয় পণ্য কেনেন, তাহলে তার ব্যয়ের বড় অংশ স্থানীয় মানুষের কাছে থেকে যায়। এখানে তৈরি হয় একটি স্থানীয় অর্থনৈতিক চক্র। পর্যটক আসবেন, স্থানীয় সেবা নেবেন, স্থানীয় মানুষ আয় করবেন, সেই আয় আবার স্থানীয় বাজারে ব্যয় হবে। এই চক্র যত বড় হবে, স্থানীয় অর্থনীতিও তত শক্তিশালী হবে।

এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দক্ষ জনবল। সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ এখানেই নতুন সম্ভাবনার জায়গা তৈরি করতে পারে। চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা শিক্ষা একজন তরুণকে পর্যটন ও হসপিটালিটি খাতে প্রয়োজনীয় বাস্তব দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে পারে। হোটেল পরিচালনা, ফ্রন্ট অফিস, খাদ্য ও পানীয় সেবা, অতিথি আপ্যায়ন, ট্যুর অপারেশন, পর্যটন বিপণনসহ বিভিন্ন বিষয়ে হাতে কলমে দক্ষতা অর্জন করে একজন শিক্ষার্থী দেশ ও বিদেশের পর্যটন খাতে ক্যারিয়ার গড়তে পারেন। কিন্তু সাতক্ষীরার ক্ষেত্রে এই শিক্ষার গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ শিক্ষার্থীরা এমন একটি অঞ্চলে বাস করে, যেখানে তাদের চারপাশেই রয়েছে সুন্দরবন, নদী, গ্রামীণ জীবন, স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং অসংখ্য পর্যটন সম্ভাবনা। অর্থাৎ তাদের জন্য পর্যটন শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয় নয়। এটি তাদের নিজেদের এলাকার বাস্তব অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

একজন পর্যটক কোথাও যাওয়ার আগে অনলাইনে ছবি দেখেন, ভিডিও দেখেন, রিভিউ পড়েন, থাকার জায়গা খোঁজেন এবং ভ্রমণ পরিকল্পনা করেন। এই পরিবর্তন সাতক্ষীরার তরুণদের জন্য বিশাল সুযোগ। সুন্দরবনের গল্প, স্থানীয় খাবার, নৌযাত্রা, পাখি, বন্যপ্রাণী, গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতি নিয়ে তরুণরা তথ্যভিত্তিক ভিডিও তৈরি করতে পারেন। স্থানীয় হোটেল, রিসোর্ট ও ট্যুর অপারেটরদের জন্য ডিজিটাল মার্কেটিং করতে পারেন। এমনকি সুন্দরবনকেন্দ্রিক অনলাইন বুকিং ও তথ্যসেবা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে। একজন তরুণের হাতে একটি স্মার্টফোন ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা থাকলেই এখান থেকে নতুন কর্মসংস্থানের দরজা খুলে যেতে পারে।

সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের সুফল শুধু পুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। স্থানীয় নারীদের পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে পরিবারের আয় বাড়বে এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নও হবে। নারীরা স্থানীয় খাবার, পিঠা, হস্তশিল্প, নকশিকাঁথা, শুঁটকি, মধু ও অন্যান্য পণ্য পর্যটকদের কাছে তুলে ধরতে পারেন। হোমস্টে, ক্যাটারিং, স্থানীয় খাবারের ব্র্যান্ড, হস্তশিল্প এবং অনলাইনভিত্তিক ব্যবসায় নারীদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। ফলে পর্যটন একটি পরিবারের অর্থনৈতিক কাঠামোও বদলে দিতে পারে।

আগামী দিনের পর্যটন হবে পরিবেশবান্ধব পর্যটন। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে তাই শুধু প্রচলিত চাকরি নয়, গ্রিন জবের বাজারও তৈরি করতে হবে। পর্যটন এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণ, পানি সংরক্ষণ, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব নৌযান, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পর্যটকদের পরিবেশ সচেতন করার কাজে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। এখানে ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি শিক্ষার্থীদের জন্যও নতুন দক্ষতার ক্ষেত্র তৈরি হবে।

সুন্দরবনের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় পণ্য ও সংস্কৃতিকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। মধু, গোলপাতার তৈরি পণ্য, শুঁটকি, স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্পসহ নানা পণ্যকে সুন্দরবন ব্র্যান্ডিংয়ের আওতায় আনা যেতে পারে। একজন পর্যটক সুন্দরবন দেখতে এসে যদি সুন্দরবনের গল্প সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারেন একটি পণ্যের মাধ্যমে, তাহলে পর্যটন ও স্থানীয় উৎপাদনের মধ্যে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক তৈরি হবে।

সাতক্ষীরায় তরুণদের জন্য সুন্দরবনভিত্তিক একটি ট্যুরিজম ইনকিউবেটর গড়ে তোলা যেতে পারে। এখানে তরুণরা পর্যটন ব্যবসার ধারণা নিয়ে আসবে, প্রশিক্ষণ নেবে, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি করবে এবং অভিজ্ঞ উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে পরামর্শ পাবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, পর্যটন ব্যবসায়ী, স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করলে এখান থেকেই তৈরি হতে পারে নতুন প্রজন্মের পর্যটন উদ্যোক্তা।

তবে উন্নয়নের নামে সুন্দরবনের ক্ষতি করা যাবে না। সুন্দরবনকে ব্যবহার করে পর্যটন নয়, সুন্দরবনকে রক্ষা করেই পর্যটন গড়ে তুলতে হবে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ধারণক্ষমতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ সুন্দরবন নষ্ট হলে পর্যটনের সম্ভাবনাও নষ্ট হবে। আমাদের মূলনীতি হওয়া উচিত।

কখনো কখনো ভবিষ্যৎ আমাদের নিজের মাটিতেই অপেক্ষা করে। সুন্দরবনের সবুজের ভেতরে সেই ভবিষ্যতের একটি বড় অংশ লুকিয়ে আছে। আজ যে তরুণ চাকরির জন্য শহরের পথে পা বাড়াচ্ছেন, আগামীকাল তিনিই হতে পারেন সুন্দরবনের দক্ষ ট্যুর গাইড, পর্যটন উদ্যোক্তা, হোটেল ম্যানেজার, নৌপর্যটন ব্যবসায়ী, ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা কিংবা পরিবেশবান্ধব পর্যটন উদ্যোগের সফল উদ্যোক্তা। তাই সুন্দরবনকে শুধু রক্ষা করার কথা বললেই হবে না। সুন্দরবনকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগও তৈরি করতে হবে।কারণ বন বাঁচবে তখনই, যখন বনসংলগ্ন মানুষের জীবনও নিরাপদ হবে। সাতক্ষীরার যুবকদের দক্ষ করে তুলতে পারলে সুন্দরবন হতে পারে তাদের কর্মসংস্থানের নতুন ঠিকানা। সুন্দরবন হতে পারে জলবায়ু ঝুঁকির বিরুদ্ধে একটি অর্থনৈতিক ঢাল। সুন্দরবন হতে পারে দারিদ্র্য বিমোচনের নতুন পথ।

সুন্দরবন হতে পারে স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরির বিশাল ক্ষেত্র।আর সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ হতে পারে সেই পরিবর্তনের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এখনই সময় সুন্দরবনের সম্ভাবনাকে দক্ষতা, প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা শক্তি ও পরিবেশ সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করার। কারণ সুন্দরবন শুধু সাতক্ষীরার প্রকৃতির অহংকার নয়, সুন্দরবন হতে পারে সাতক্ষীরার তরুণদের ভবিষ্যতের ঠিকানা।

লেখক: মো. মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।

নেপালের বন্যা: জলবায়ু দুর্যোগ যখন সীমান্ত পেরিয়ে যায়

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৪৩ অপরাহ্ণ
নেপালের বন্যা: জলবায়ু দুর্যোগ যখন সীমান্ত পেরিয়ে যায়

Damaged houses stand precariously near the swollen, debris-choked banks of the Trishuli River after flash floods in Nepal's Nuwakot district on Wednesday, Aug. 26, 2026. (AP Photo/Niranjan Shrestha)

নিকোলাস বিশ্বাস

নেপালে সাম্প্রতিক ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা বিশ্বকে এমন এক বাস্তবতার কথা গভীরভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, যা আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই: প্রাকৃতিক দুর্যোগ কোনো সীমান্ত মানে না। এগুলো জাতীয় সীমান্তে থেমে যায় না, ধনী ও দরিদ্র দেশের মধ্যে পার্থক্য করে না কিংবা কোনো দেশ বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে সামান্য অবদান রাখে বলে তাকে রেহাইও দেয় না।

 

পরিবর্তিত জলবায়ু একটি অভিন্ন বৈশ্বিক সংকট; কিন্তু এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে সেই দেশগুলোতেই, যারা এই সমস্যার জন্য সবচেয়ে কম দায়ী- এটাই এখন এক কঠিন বাস্তবতা।
নেপাল এই বৈষম্যের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। বৈশ্বিক নিঃসরণ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেপাল বৈশ্বিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণে ০.১ শতাংশেরও কম অবদান রাখে। অথচ দেশটি জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যা দেখিয়েছে, কীভাবে চরম আবহাওয়া খুব দ্রুত একটি মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে- ধ্বংস করতে পারে ঘরবাড়ি, অবকাঠামো ও মানুষের জীবিকা এবং অসংখ্য মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। সংযুক্ত বিভিন্ন নথিতেও একইভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, বৈশ্বিক নিঃসরণে নেপালের অত্যন্ত সামান্য অবদান দেশটিকে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করতে পারেনি।

নেপালের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করলে এই ট্র্যাজেডি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতমালাগুলোর আবাসস্থল নেপাল হিমালয় অঞ্চলের অংশ। বিপুল পরিমাণ বরফের মজুদের কারণে এই অঞ্চলকে কখনও কখনও “তৃতীয় মেরু” বলা হয়। বিভিন্ন ভিডিওতে হিমালয়ের হিমবাহের বরফ দ্রুত হারিয়ে যাওয়ার উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে গত তিন দশকে নেপালের হিমবাহগুলো তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। এই পরিবর্তন কেবল পরিবেশগত উদ্বেগের বিষয় নয়। এটি পানি নিরাপত্তা, কৃষি, প্রতিবেশব্যবস্থা, বসতি এবং হিমালয় থেকে উৎপন্ন নদীগুলোর ওপর নির্ভরশীল কোটি কোটি মানুষের জন্য হুমকি তৈরি করছে।

হিমবাহ দ্রুত গলে গেলে এর পরিণতি ধাপে ধাপে দেখা দিতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে অতিরিক্ত বরফ গলার ফলে পানির প্রবাহ বেড়ে যেতে পারে এবং বিপজ্জনক হিমবাহ-হ্রদ সৃষ্টি হতে পারে। এসব হ্রদ অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে হঠাৎ নিচের দিকে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে, হিমবাহের অব্যাহত ক্ষয় স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও কৃষির জন্য দীর্ঘমেয়াদে পানির প্রাপ্যতাকেও হুমকির মুখে ফেলে। ফলে উঁচু পাহাড়ে যা ঘটছে, তা শেষ পর্যন্ত হিমবাহের নিকটবর্তী এলাকার অনেক দূরের মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে।

সাম্প্রতিক বন্যা এই সংকটের মানবিক দিকটিকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা যাচ্ছে, উদ্ধারকারীরা প্রবল ও বিপজ্জনক বন্যার পানির মধ্য দিয়ে এগিয়ে গিয়ে মানুষকে, বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি ও সমাজের অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ সদস্যদের, উদ্ধার ও নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। দ্য গার্ডিয়ান ও বিবিসি-তে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৬ আগষ্ট ২০২৬ -এ সংঘটিত নেপাল-তিব্বতের ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬৭৫-তে দাঁড়িয়েছে। এদিকে, উদ্ধার ও অনুসন্ধান কার্যক্রম পঞ্চম দিনে প্রবেশ করেছে। এখনও প্রায় ৩,০০০ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে।

এই বিস্ময়কর সংখ্যাগুলোর আড়ালে রয়েছে অসংখ্য ব্যক্তিগত মর্মান্তিক ঘটনা- পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, প্রিয়জনেরা একে অপরের কাছ থেকে আলাদা হয়ে পড়েছেন, ঘরবাড়ি ভেসে গেছে এবং পুরোপুরি জনপদগুলো ধ্বংসের পর ঘুরে দাঁড়ানোর কঠিন সংগ্রামে নেমেছে। অনেক বেঁচে যাওয়া মানুষের জন্য এই দুর্যোগ শুধু তাদের ঘরবাড়ি ও সম্পদই ধ্বংস করেনি; কেড়ে নিয়েছে তাদের জীবিকা, স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তাবোধও। এগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়- এগুলো এমন মানুষের জীবন, যেগুলো একটি দুর্যোগের কারণে বিপর্যস্ত হয়েছে এবং যার প্রভাব তাৎক্ষণিক বন্যার পানির সীমানা পেরিয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত।

এটাই জলবায়ু পরিবর্তনের মৌলিক অবিচার: যারা এই সংকটে সবচেয়ে কম অবদান রেখেছে, তারাই অনেক সময় সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতির শিকার হয়।

দশকের পর দশক ধরে শিল্পোন্নত অর্থনীতিগুলো ঐতিহাসিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে অসমভাবে বড় অংশের জন্য দায়ী। বিশ্বের ২০টি বৃহত্তম অর্থনীতির জোট এ২০ ২০২৪ সালে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৭৭ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল। অন্যদিকে, নেপাল ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো- যারা বৈশ্বিক সঞ্চিত নিঃসরণে তুলনামূলকভাবে সামান্য অবদান রেখেছে- জলবায়ু-সম্পর্কিত বিপদের অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকির মুখোমুখি।

এই বৈষম্য জলবায়ু ন্যায্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে: যে সংকট সবাই মিলে সৃষ্টি করেছে, কিন্তু যার জন্য সবাই সমানভাবে দায়ী নয়-তার খরচ কে বহন করবে?
জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত কোনো বিষয় নয়। এটি ন্যায়বিচার, উন্নয়ন, দারিদ্র্য, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক দায়িত্বের বিষয়। নেপালে একটি ভয়াবহ বন্যা কোনো জনগোষ্ঠী কয়েক দশক ধরে যে উন্নয়ন অর্জন করেছে, তা ধ্বংস করে দিতে পারে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাস্তা, সেতু, স্কুল, ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে যেতে পারে। দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি বসবাসকারী পরিবারের জন্য একটি ঘর বা জীবিকা হারানোর অর্থ হতে পারে বছরের পর বছর দুর্ভোগ।

এর প্রভাব তাৎক্ষণিক দুর্যোগের এলাকাতেও সীমাবদ্ধ থাকে না। বন্যা পরিবহন, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ এবং খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত করতে পারে। কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, আর ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুননির্মাণের ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। ফলে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর সরকারকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য হ্রাস ও উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত থেকে সীমিত সম্পদ সরিয়ে জরুরি সাড়া ও পুনর্গঠনের কাজে ব্যয় করতে হয়।

এ কারণেই জলবায়ু দুর্যোগ কোনো সীমান্ত মানে না। বায়ুমন্ডল রাজনৈতিক সীমান্তকে স্বীকৃতি দেয় না। একটি দেশে নিঃসৃত কার্বন ডাই-অক্সাইড বৈশ্বিক বায়ুমন্ডলে মিশে গিয়ে সর্বত্র উষ্ণতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। পৃথিবীর এক প্রান্তের কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, যানবাহন ও অন্যান্য উৎস থেকে নির্গত গ্যাস হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের জলবায়ু পরিস্থিতিকেও প্রভাবিত করতে পারে। কোনো দেশ কেবল নিজস্ব নিঃসরণ কমিয়েই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পরিণতি থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না।

তবে এই পারস্পরিক সংযোগকে স্বীকার করা নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। প্রতিটি দেশের নিজস্ব সক্ষমতা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী নিঃসরণ কমানো এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি করার দায়িত্ব রয়েছে। একই সঙ্গে, যেসব দেশ ঐতিহাসিকভাবে বেশি পরিমাণে নিঃসরণ করেছে, তাদের ওপর বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো—বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে সহায়তা করার বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে।

নেপালের মতো দেশগুলোর জন্য অভিযোজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য আরও শক্তিশালী আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো, নিরাপদ বসতি, উন্নত দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং কার্যকর জরুরি সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা প্রয়োজন। পাহাড়ি প্রতিবেশব্যবস্থাকে আরও বেশি সুরক্ষা দিতে হবে। একই সঙ্গে হিমবাহ, হিমবাহ-হ্রদ এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের অন্যান্য সূচক পর্যবেক্ষণের জন্য বিজ্ঞানীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে।

তবে শুধু অভিযোজন দিয়ে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। বৈশ্বিক তাপমাত্রা যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তাহলে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজনেরও একটি সীমা রয়েছে। তাই বিশ্বকে সম্মিলিতভাবে সমস্যার মূল কারণ মোকাবিলা করতে হবে; আর তা হল গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ বন্ধ করা।

নেপালের অভিজ্ঞতা দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে। বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, পাকিস্তান এবং এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশ ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হলেও পরস্পর-সংযুক্ত জলবায়ু ঝুঁকির মুখোমুখি। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিধস, খরা, তাপপ্রবাহ, নদীভাঙন এবং পরিবর্তিত বৃষ্টিপাতের ধরন ইতোমধ্যে জাতীয় সীমান্ত পেরিয়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য হুমকি তৈরি করছে। হিমালয়ে যা ঘটে, তা নিম্নাঞ্চলের নদীব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। একটি দেশে যা ঘটে, তা অন্য দেশের জন্যও পরিণতি তৈরি করতে পারে।

জলবায়ু ঝুঁকির এই পারস্পরিক সংযোগের জন্য প্রয়োজন পারস্পরিকভাবে সংযুক্ত সমাধান।
সরকারগুলোকে দুর্যোগ প্রস্তুতি, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, নদী ব্যবস্থাপনা এবং তথ্য আদান-প্রদানে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে যে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো অর্থবহ আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা পাচ্ছে। জলবায়ু অর্থায়নকে জটিল আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আটকে না রেখে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মুখসারিতে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জলবায়ু মোকাবিলার কার্যক্রমকে বক্তৃতা ও ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। বন্যা, ঝড়, খরা এবং বিলীন হয়ে যাওয়া হিমবাহের মুখোমুখি মানুষগুলো অন্তহীন প্রতিশ্রুতির সামর্থ্য রাখে না। তাদের প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ-নিরাপদ অবকাঠামো, নির্ভরযোগ্য আগাম সতর্কবার্তা, সহনশীল জীবিকা, সহজলভ্য অর্থায়ন এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমাতে আন্তর্জাতিক সংহতি।

বন্যার পানি থেকে উদ্ধারকারীদের মানুষকে তুলে আনার দৃশ্যগুলো কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের চিত্র নয়। এগুলো বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এসব দৃশ্য দেখিয়ে দেয়, কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত একটি মানবিক সংকটে পরিণত হয়। প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে একজন মানুষ, যার জীবন কোনো না কোনোভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে।

তাই নেপালের অভিজ্ঞতা আমাদের জলবায়ু-দায়বদ্ধতা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। কোনো দেশের নিঃসরণ সামান্য হতে পারে, কিন্তু সেই দেশের ঝুঁকিপ্রবণতা হতে পারে বিপুল। বিপরীতভাবে, যেসব দেশের ঐতিহাসিক নিঃসরণ বেশি, তাদের কম-কার্বন ভবিষ্যতের দিকে রূপান্তরের নেতৃত্ব দেওয়া এবং ইতোমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের পরিণতি ভোগ করা দেশগুলোকে সহায়তা করার দায়িত্বও বেশি।

জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক, কিন্তু জলবায়ু ঝুঁকি অসম।
ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ওপর নেমে আসা এই বিপর্যয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মনে করিয়ে দেওয়া উচিত যে জলবায়ু সংকট থেকে নিরাপদ দূরত্ব বলে কিছু নেই। রাজনৈতিকভাবে সীমান্ত দেশগুলোকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু আমাদের গ্রহকে সংযুক্ত করে রাখা বায়ুমন্ডল, মহাসাগর, নদী ও আবহাওয়াব্যবস্থা থেকে কোনো সীমান্ত দেশগুলোকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না।
জলবায়ু দুর্যোগ কোনো সীমান্ত মানে না। তেমনি এগুলো প্রতিরোধ করা, মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হওয়া এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের সুরক্ষিত করার ক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্বেরও কোনো সীমান্ত থাকা উচিত নয়।

এখন সময় এসেছে বিশ্বের উপলব্ধি করার যে জলবায়ু ন্যায্যতা কোনো দয়া বা দান নয়; এটি আমাদের সবার যৌথ দায়িত্ব। বিশ্বের এক প্রান্তে সৃষ্ট নিঃসরণ যদি অন্য প্রান্তের মানুষের দুর্ভোগের কারণ হতে পারে, তাহলে জলবায়ু মোকাবিলার পদক্ষেপ, অর্থায়ন, প্রযুক্তি এবং সংহতিকেও সীমান্ত অতিক্রম করতে হবে।

নেপালের বন্যাকে একটি বিচ্ছিন্ন জাতীয় ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটিকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ দেশের পক্ষ থেকে সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত: পরিবর্তিত জলবায়ু থেকে কোনো দেশ একা রক্ষা পেতে পারে না, এবং এর পরিণতি মোকাবিলায় কোনো দেশকেই একা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।

লেখক: নিকোলাস বিশ্বাস একজন মিডিয়া ফ্রীল্যান্সার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। যোগাযোগ: মড়হড়সধফফুড়স@মসধরষ.পড়স