সাকিবুর রহমান বাবলা
মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ মেরুদণ্ড। এটি শরীরের কাঠামোকে দৃঢ়তা দেয়, সোজা হয়ে দাঁড়াতে ও হাঁটতে সাহায্য করে এবং সুষুম্নাকাণ্ডকে সুরক্ষিত রাখে। দৈনন্দিন চলাফেরা, কাজকর্ম ও স্বাভাবিক জীবনযাপনে মেরুদণ্ডের ভূমিকা অপরিসীম। অথচ দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে বসে থাকা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ভুলভাবে ভারী বস্তু তোলা এবং বয়সজনিত পরিবর্তনের কারণে মেরুদণ্ডের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। এসব সমস্যা মানুষের কর্মক্ষমতা ও জীবনযাত্রার স্বাভাবিকতা ব্যাহত করতে পারে।
প্রতি বছর ১৬ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব মেরুদণ্ড দিবস। মেরুদণ্ডের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পিঠ ও কোমরের ব্যথা প্রতিরোধ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো এ দিবসের প্রধান উদ্দেশ্য। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘আজীবনের জন্য মেরুদণ্ডের সুস্বাস্থ্য’। এর মূল বার্তা হলো, শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে মেরুদণ্ডের যত্ন নেওয়া।
বিশ্ব মেরুদণ্ড দিবসের সূচনা ২০০৮ সালে। ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব কাইরোপ্র্যাকটিক আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পেশাজীবী ও স্বাস্থ্যসংস্থার সহযোগিতায় দিবসটির কার্যক্রম সমন্বয় করে। এ উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ, স্বাস্থ্যকর্মী ও সামাজিক সংগঠন সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বিশ্বে প্রায় ৬১ কোটি ৯০ লাখ মানুষ কোমরব্যথায় আক্রান্ত ছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৮৪ কোটি ৩০ লাখে পৌঁছাতে পারে। কোমরব্যথা বিশ্বব্যাপী অক্ষমতার অন্যতম প্রধান কারণ, যা মানুষের কর্মজীবন, পারিবারিক দায়িত্ব, ঘুম ও স্বাভাবিক চলাফেরায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ ছাড়া শৈশবে অতিরিক্ত ভারী স্কুলব্যাগ বহন করাও মেরুদণ্ডের ওপর ক্ষতিকর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই মেরুদণ্ডের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় প্রতিরোধমূলক সচেতনতা বৃদ্ধি, সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
মেরুদণ্ড একক কোনো হাড় নয়; এটি কশেরুকা, মধ্যবর্তী ডিস্ক, পেশি, লিগামেন্ট ও অন্যান্য সংযোগকারী কলার সমন্বয়ে গঠিত। জন্মের সময় সাধারণত ৩৩টি কশেরুকার উপাদান থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় কিছু কশেরুকা যুক্ত হয়ে যাওয়ায় সাধারণত ২৪টি স্বতন্ত্র কশেরুকার সঙ্গে স্যাক্রাম ও কক্সিক্সের যুক্ত হাড়ের অংশ থাকে।
মেরুদণ্ডের পাঁচটি অঞ্চল হলো—ঘাড়ের সারভাইকাল অংশে ৭টি, বুকের পেছনের থোরাসিক অংশে ১২টি, কোমরের লাম্বার অংশে ৫টি, স্যাক্রামে সাধারণত ৫টি যুক্ত কশেরুকা এবং কক্সিক্সে সাধারণত ৪টি যুক্ত কশেরুকা। মেরুদণ্ড শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করে, মাথা ও ধড়কে সমর্থন দেয় এবং বাঁকানো ও ঘোরানোর সুযোগ তৈরি করে। এর ভেতরের সুরক্ষিত পথে থাকা সুষুম্নাকাণ্ড মস্তিষ্ক ও শরীরের বিভিন্ন অংশের মধ্যে স্নায়বিক সংকেত আদান-প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মেরুদণ্ডের সাধারণ সমস্যার মধ্যে রয়েছে ডিস্ক প্রোল্যাপ্স বা হার্নিয়েটেড ডিস্ক, স্পন্ডাইলোসিস, অস্টিওপোরোসিস, স্পাইনাল স্টেনোসিস ও সায়াটিকা। ডিস্কের কোনো অংশ সরে গিয়ে স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করলে ঘাড় বা কোমরে ব্যথা, হাত-পায়ে ঝিনঝিন অনুভূতি কিংবা অসাড়তা দেখা দিতে পারে। বয়সজনিত ক্ষয়, হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া এবং স্নায়ু চলাচলের পথ সংকীর্ণ হয়ে যাওয়াও ব্যথা ও চলাফেরায় অসুবিধার কারণ হতে পারে। এ ছাড়া স্কোলিওসিস, আঘাত, সংক্রমণ এবং বিরল ক্ষেত্রে টিউমার মেরুদণ্ডের ক্ষতি করতে পারে।
সব পিঠ বা কোমরব্যথার কারণ এক নয়। দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার ব্যথা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ব্যথার সঙ্গে দুর্বলতা, অসাড়তা কিংবা প্রস্রাব-মলত্যাগের নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিন। মেরুদণ্ড সুস্থ রাখতে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা এড়িয়ে চলুন, নিয়মিত হাঁটাচলা করুন এবং বসার সময় পিঠ ও ঘাড়ের সঠিক ভঙ্গি বজায় রাখুন। সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর অভ্যাস ও সময়মতো চিকিৎসাই মেরুদণ্ডের সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে মেরুদণ্ডের রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। শারীরিক পরীক্ষা, এক্স-রে ও এমআরআইয়ের মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী রোগ নির্ণয় করা হয়। রোগের ধরন অনুসারে ওষুধ, ফিজিওথেরাপি, পুনর্বাসন কিংবা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। কৃত্রিম ডিস্ক প্রতিস্থাপন, স্নায়ু উদ্দীপক যন্ত্র এবং সুষুম্নাকাণ্ডের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে স্টেম সেল ও টিস্যু প্রকৌশল নিয়েও গবেষণা চলছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতিতে মেরুদণ্ড ও সুষুম্নাকাণ্ডের আঘাতের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। গবেষণায় ল্যাবে তৈরি স্পাইনাল কর্ড অর্গানয়েড, ‘ড্যান্সিং মলিকিউলস’, ৩ডি বায়োপ্রিন্টিং ও স্টেম সেল প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত স্নায়ু পুনর্গঠনের পথ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। পাশাপাশি, ক্ষুদ্র রোবট, কৃত্রিম ডিস্ক প্রতিস্থাপন এবং বৈদ্যুতিক স্নায়ু উদ্দীপনা প্রযুক্তি মেরুদণ্ডের কার্যকারিতা ও চলনক্ষমতা উন্নয়নের সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। তবে এসব প্রযুক্তির অনেকগুলো এখনো গবেষণা বা পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।
বাংলাদেশে কৃষিকাজ, নির্মাণশ্রম, পরিবহন ও অন্যান্য পেশায় শারীরিক পরিশ্রমের পাশাপাশি দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করার অভ্যাসও মেরুদণ্ডের সমস্যার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। স্কুল-কলেজ, কর্মক্ষেত্র, হাসপাতাল ও কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্যশিক্ষা বাড়ানো, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং সাশ্রয়ী চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসেবার সুযোগ সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ স্পাইন সোসাইটি, নিউরোস্পাইন সোসাইটি অব বাংলাদেশ এবং সংশ্লিষ্ট ফিজিওথেরাপি পেশাজীবী সংগঠনগুলো এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
মেরুদণ্ডের সুস্বাস্থ্য রক্ষা নির্দিষ্ট কোনো বয়সের বিষয় নয়; শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি ধাপে এর ধারাবাহিক যত্ন প্রয়োজন। শৈশবে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গঠন, কৈশোরে নিয়মিত খেলাধুলা ও শারীরিক কর্মকাণ্ড, কর্মজীবনে বসার সঠিক অঙ্গভঙ্গি বজায় রাখা এবং বার্ধক্যে হাড় ও পেশির বিশেষ পরিচর্যা মেরুদণ্ডকে কর্মক্ষম রাখে। দৈনন্দিন জীবনে প্রতি ৩০ মিনিট পর পর উঠে দাঁড়ানো কিংবা ‘২০-২০-২০’ নিয়মের মতো ছোট ছোট অভ্যাস বড় প্রভাব ফেলে। মূলত মেরুদণ্ড সুস্থ রাখতে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্ব মেরুদণ্ড দিবসের মূল শিক্ষা হলো, ব্যথা দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিদিনের জীবনযাপনে মেরুদণ্ডের যত্ন নেওয়া। সুস্থ মেরুদণ্ড স্বাভাবিক চলাফেরা, কর্মক্ষমতা ও স্বাধীন জীবনযাপনের অন্যতম ভিত্তি। তাই ২০২৬ সালের ‘আজীবনের জন্য মেরুদণ্ডের সুস্বাস্থ্য’ প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে গড়ে উঠুক মেরুদণ্ডের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি। আজকের স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই হোক আগামী দিনের সুস্থ ও সক্রিয় জীবনের ভিত্তি।