আন্তর্জাতিক অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য দিবস: জীবন্ত ঐতিহ্য প্রজন্মান্তরে
সাকিবুর রহমান বাবলা
মানুষের পরিচয় শুধু ভাষা, ভূখন্ড কিংবা ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়; তার গান, গল্প, উৎসব, আচার-অনুষ্ঠান, লোকজ জ্ঞান ও কারুশিল্পের মধ্যেও সেই পরিচয় বহমান। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এসব ঐতিহ্য একটি জাতির সংস্কৃতি, জীবনবোধ ও সৃজনশীলতার পরিচয় বহন করে। দৃশ্যমান স্থাপনা বা প্রতœবস্তুর মতো এগুলোকে ছুঁয়ে দেখা যায় না, কিন্তু মানুষের জীবন ও সমাজে এগুলোর অস্তিত্ব সুস্পষ্ট। জীবন্ত এই ঐতিহ্যের গুরুত্ব তুলে ধরতে প্রতি বছর ১৭ অক্টোবর পালিত হয় আন্তর্জাতিক অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য দিবস।
২০০৩ সালের ১৭ অক্টোবর ইউনেসকোর সাধারণ সম্মেলনে অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক কনভেনশন গৃহীত হয়। কনভেনশনটির ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০২৩ সালের নভেম্বরে ইউনেসকোর ৪২তম সাধারণ সম্মেলনে ১৭ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। দিবসটি প্রথম পালিত হয় ২০২৪ সালে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর দিবসটির তৃতীয় সংস্করণ পালিত হচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তা সংরক্ষণে উৎসাহিত করা।
অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বলতে কোনো জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত চর্চা, প্রকাশভঙ্গি, জ্ঞান ও দক্ষতাকে বোঝায়, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়। এর পাঁচটি প্রধান ক্ষেত্র হলো-মৌখিক ঐতিহ্য ও প্রকাশভঙ্গি; পরিবেশনশিল্প; সামাজিক রীতিনীতি, আচার ও উৎসব; প্রকৃতি ও মহাবিশ্বসংক্রান্ত জ্ঞান ও চর্চা; এবং ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের দক্ষতা। লোককথা, প্রবাদ-প্রবচন, বাউল গান, লোকনৃত্য, নবান্ন উৎসব, ঐতিহ্যবাহী কৃষিজ্ঞান ও জামদানি বোনার কৌশল এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। একটি প্রাচীন মন্দির দৃশ্যমান ঐতিহ্য হলেও সেটি নির্মাণের বিশেষ কারিগরি জ্ঞান অমূর্ত ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশের সংস্কৃতি লোকজ জ্ঞান, সংগীত, উৎসব ও কারুশিল্পে সমৃদ্ধ। ইউনেসকোর মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় বাংলাদেশের ছয়টি উপাদান স্থান পেয়েছে। এগুলো হলো-বাউল গান (২০০৮), ঐতিহ্যবাহী জামদানি বুননশিল্প (২০১৩), পয়লা বৈশাখের শোভাযাত্রা (২০১৬), সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি বুননশিল্প (২০১৭), ঢাকার রিকশা ও রিকশাচিত্র (২০২৩) এবং টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী শাড়ি বুননশিল্প (২০২৫)।
বাউল গান মানুষের জীবনবোধ ও মানবপ্রেমের প্রকাশ ঘটায়। মঙ্গল শোভাযাত্রায় ফুটে ওঠে সম্মিলিত সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। জামদানি, শীতলপাটি ও টাঙ্গাইলের শাড়ি বুননশিল্পে প্রকাশ পায় প্রজন্মান্তরে অর্জিত কারিগরি দক্ষতা। ঢাকার রিকশা ও রিকশাচিত্র নগরজীবনের পরিচিত দৃশ্যকে লোকশিল্পের স্বতন্ত্র রূপ দিয়েছে। এসব ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের শ্রম, অভিজ্ঞতা, জীবিকা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বহু প্রাচীন সাংস্কৃতিক চর্চা এখনো টিকে আছে। ভারতের বেদপাঠের ঐতিহ্যে প্রাচীন মন্ত্রের নির্দিষ্ট উচ্চারণ ও সুর মৌখিকভাবে প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত হয়। ভারতের কুটিয়াট্টম সংস্কৃত নাট্যধারার একটি প্রাচীন রূপ। জাপানের গাগাকু রাজদরবারের ঐতিহ্যবাহী সংগীত ও নৃত্যকলা এবং চীনের কুনকু অপেরা দীর্ঘকাল ধরে চর্চিত হয়ে আসছে। ইউনেসকো এসব ঐতিহ্যের কয়েকটিকে মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের সংলাইনস বা গীতিপথও গান, কাহিনি ও ভূখন্ডসংক্রান্ত জ্ঞান প্রজন্মান্তরে সঞ্চারের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তবে কোনো একটিকে নিশ্চিতভাবে বিশ্বের সর্বপ্রাচীন অমূর্ত ঐতিহ্য বলা যায় না।
অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক গবেষণা ও শিক্ষার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। জাপানে অবস্থিত এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্র, দক্ষিণ কোরিয়ার আন্তর্জাতিক তথ্য ও নেটওয়ার্কিং কেন্দ্র এবং চীনের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এ ক্ষেত্রে গবেষণা, তথ্য বিনিময় ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম, লোকশিল্পের কর্মশালা, সাংস্কৃতিক উৎসব, গবেষণা, প্রামাণ্যচিত্র ও ডিজিটাল আর্কাইভের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
লোকসংগীত, গল্প বলা, নবান্ন উৎসব ও গ্রামীণ মেলা মানুষের মধ্যে আনন্দ, পারস্পরিক যোগাযোগ ও সামাজিক সম্প্রীতির সুযোগ সৃষ্টি করে। ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া ও বাউল গানের সুর মানুষের মনে প্রশান্তি জাগাতে পারে। দাদি-নানির মুখে শোনা রূপকথা, লোককাহিনি ও প্রবাদ শিশুদের ভাষা, স্মৃতি ও জীবনবোধ গঠনে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে জামদানি, শীতলপাটি ও নকশিকাঁথার মতো কারুশিল্প বহু মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। প্রকৃতি, কৃষি ও আবহাওয়াসংক্রান্ত লোকজ জ্ঞানও মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বহন করে।
বিশ্বায়ন, নগরায়ণ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং ঐতিহ্যবাহী পেশায় আগ্রহ হ্রাসের কারণে অনেক লোকজ চর্চা ধারাবাহিকতা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই ঐতিহ্যের ধারকদের স্বীকৃতি, ন্যায্য জীবিকার সুযোগ, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক চর্চা নিশ্চিত করা জরুরি। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন, সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগে এসব ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব। কারণ, ঐতিহ্য শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; এটি বর্তমানের জীবন্ত সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক অমূল্য উত্তরাধিকার।









